অগস্ত্য (অ)যাত্রা

বহুদিন আগের কথা, চাকরি জীবনের শুরুর দিকে হঠাৎ করে একবার রেলওয়ের কিছু কাজে আমায় যেতে হল অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়নগরম, ইংরেজিতে যার …

বহুদিন আগের কথা, চাকরি জীবনের শুরুর দিকে হঠাৎ করে একবার রেলওয়ের কিছু কাজে আমায় যেতে হল অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়নগরম, ইংরেজিতে যার আদুরে নাম ভিজিয়ানাগ্রাম। কন্ট্রাক্টের কাগজপত্র থেকে জেনেছি, বিজয়নগরম পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব রেলের ওয়ালটেয়ার ডিভিশনের মধ্যে; ইস্টকোস্ট রেলওয়ে তখনও তৈরি হয়নি।

বলে রাখা ভালো, তখনও মুঠোফোন হাতের মুঠোয় আসেনি, কম্পিউটারে বসে বিভিন্ন ট্রেনের হালহদিশ করাও প্রায় অসম্ভব ছিল। অফিসের কাজে কোথাও যেতে হলে, গন্তব্য আর পছন্দের ট্রেন বলে দিলে এজেন্ট একেবারে কনফার্ম টিকিট নিয়ে দোরগোড়ায় হাজির হত। আমি অবশ্য দূরে বলতে একবার দিল্লি আর দুবার মুম্বাই গেছি, তবে দাঁতন পেরিয়ে ওই প্রথম দক্ষিণমুখী হলাম; তখনও আমার কাছে দক্ষিণ ভারত মানে স্কুলের ভূগোল বইয়ের কয়েকটা পাতা।

যাওয়ার প্রস্তুতি ঠিকঠাক চলছিল, যথা সময়ে টিকিট হাতে পেয়ে গেলাম; সন্ধ্যেবেলার চেন্নাই মেল, এসি টু, লোয়ার বার্থ, হাওড়া থেকে বিজয়নগরমের কমফার্ম টিকিট। তবে প্রথম ওদিকে যাচ্ছি তো, একা, তাই একটু কেমন কেমন লাগছিল; অগস্ত্যমুনির দাক্ষিণাত্যে গিয়ে আটকে পড়ার কথাটা কেন জানিনা মনে কয়েকবার উঁকি দিয়ে গেল।

অফিস থেকে হাওড়ার উদ্দেশ্যে বেরোনোর ঠিক আগে, রেলের এক অফিসারের ফোন এল; প্ল্যান একটু বদলাতে হল। উনি চান আমি যেন প্রথমে ওয়ালটেয়ারের ডিভিশনাল অফিসে গিয়ে বড়কর্তার সঙ্গে দেখা করি, ওখানে বসেই কাজকর্মের পরিকল্পনা তৈরি হবে। পরের দিন থেকে বিজয়নগরম-এ কাজকর্ম শুরু করতে হবে, রেলের কর্তাব্যাক্তিরাও সঙ্গে থাকবেন। একটু ঘাবড়ে গেলাম, আসলে নতুন তো, বুদ্ধি তখনও ‘পাকল’ হয়নি; বা বলা ভালো চাকরির ‘পাঁক’ তখনও আমাকে ‘পাঁকাল’ বানায় নি।

কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। অভিজ্ঞ সহকর্মীরা বুঝিয়ে দিলেন, হোটেলের ভাত খেতে হলে ওয়ালটেয়ার যা বিজয়নগরমও তাই। শুধু টিকিটটা পাল্টাতে হবে; পাল্টানো মানে টেনে লম্বা করতে হবে, বিজয়নগরম পেরিয়ে ওয়ালটেয়ার যেতে হয় কিনা। তাঁরা আরও বলে দিলেন, খুব ভিড় না থাকলে টিটিই-র সঙ্গে কথা বলেলেই হবে; এ দুনিয়ায় সব কিছুই ‘ম্যানেজেবল’। একজন আবার বুঝিয়ে বললেন, ভোরবেলা চেন্নাই মেল চিল্কার একেবারে গা ঘেঁষে যায়| ঘুম থেকে উঠে চিল্কার জলে ভোরের আলোর লুকোচুরি দেখতে দেখতে এগারোটা নাগাদ পৌঁছে যাবো। আ হা হা, মজাই মজা, একেবারে সোনায় সোহাগা।

সুতরাং ‘নো প্রবলেম’ বলে চেপে বসলাম ট্রেনে; যথাসময়ে তা হাওড়া ছাড়ল, ভিড়ের বালাই নেই। একটু পরেই টিটিই সাহেব এলেন, টিকিট দেখিয়ে অনুরোধ করলাম ওয়ালটেয়ার পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে। আশ্বস্ত করে তিনি বললেন, “বসুন, টিকিটগুলো চেক করে নিই আগে।”

একটার পর একটা স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে হুশ হুশ করে| আমার কম্পার্টমেন্ট-এ কয়েকজন দক্ষিণী নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল; আলাপ জমাতে গিয়ে ব্যার্থ হলাম। যাকগে, টিকিটের ঝামেলাটা মিটে গেলে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ব, ভোরবেলা উঠে চিল্কার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে হবে।

একসময় কামরার ওই পারে কালো কোট দেখা গেল; যাক বাবা, নিশ্চিন্ত! আমার কাছাকাছি এসে টিটিই সাহেব হাওয়ায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, “কে যেন ভাইজ্যাগ যাবেন বললেন?”

ভাইজ্যাগ! আমি তো ওয়ালটেয়ার যাবো বলেছিলাম। অন্য কাউকে খুঁজছে বোধহয়। এদিকে ভাইজ্যাগের প্রশ্নে দক্ষিণী ভাইসাহেবদের কোনও হেলদোল নেই, গল্পে একই রকম মশগুল। বেশি কিছু ভাবার আগেই টিটিই বাবু আমাকেই পাকড়াও করলেন, “দিন টিকিটটা।”

যন্ত্রের মতো টিকিটটা বাড়িয়ে দিলাম, যদিও আমার গন্তব্য ওয়ালটেয়ার! হতেই পারে, ওয়ালটেয়ার যেতে গেলে ভাইজ্যাগে নামতে হয়। এরমধ্যে টিটিই বাবু অনেক অংক করে ফেলেছেন। হিসেব শেষ হলে টাকা গুনে দিয়ে রশিদ নিলাম, থ্যাংক ইউ বললাম| উনি চলে গেলেন।

রসিদটা পকেটে ঢোকানোর আগে উল্টে পাল্টে দেখলাম; খারাপ লেখার জন্য সবাই শুধু ডাক্তারদের কেন দোষ দেয় জানিনা, চেকার বাবুরাও কম যান না। যাইহোক, অনেক চেষ্টার পরে বুঝলাম, মানে আন্দাজ করলাম, রসিদে গন্তব্য হিসেবে কিছু একটা স্টেশনের কোড লেখা আছে; ‘ভি’ দিয়ে শুরু। ভাইজাগ তো, ‘ভি’ দিয়েই শুরু হবে; বাকিগুলো পড়তে পারলাম না। ইংরেজি ‘এস’ এর মতো কি একটা অক্ষর আছে মনে হল; যতদূর মনের পড়ছে, ভাইজ্যাগ বানান আইজ্যাক এর মতো নয়| ‘ভি’ আর ‘এস’ দিয়ে যে ভাইজ্যাগ লেখা নেই সেটুকু না বুঝতে পারলে আমার ‘ভি আর এস’ নিয়ে বাড়িতে বসে থাকা উচিত। কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা যে, জিজ্ঞাসা করব। উল্টোদিকের বার্থে এক সহযাত্রী ততক্ষণে লম্বা হয়েছেন। তাঁকে চোখ পিটপিট করতে দেখে ট্রেন কটায় ভাইজ্যাগ পৌঁছবে জিজ্ঞাসা করলাম| “মর্নিং”, ছোট্ট উত্তর দিয়ে তিনি পাশ ফিরলেন। অতঃপর নিজেকে নিজেই সাহস যোগানো ছাড়া উপায় নেই, কম্বল মুড়ি দিয়ে তারই চেষ্টা করতে লাগলাম।

দক্ষিণ-পূর্ব রেলের হেড অফিস গার্ডেনরিচ-এ, গার্ডেনরিচ কলকাতায়, কলকাতা যেতে গেলে হাওড়া বা শিয়ালদায় নামতে হয়। তাহলে ওয়ালটেয়ারের ডিভিশনাল অফিস ভাইজ্যাগে হলে ক্ষতি কি! আর ভাইজ্যাগ যেতে গেলে ‘ভি’ আর ‘এস’ অক্ষরওয়ালা নামের স্টেশনে নামলে সুবিধা হতেই পারে| মুম্বাইতেও তো তাই, সেন্ট্রাল রেলের অফিস সি.এস.টি-তে, আমি তো হাওড়া থেকে ট্রেনে করে গিয়ে লোকমান্য তিলক টার্মিনাস-কুর্লায় নামলাম। আর যে বার ওয়েস্টার্ন রেলের চার্চগেটের অফিসে গেলাম, সেবার দাদার-এ নেমেছিলাম| দিল্লি অবশ্য এদিক থেকে অনেক ভালো জায়গা, ট্রেনে চেপে সোজা চলে যাও দিল্লি বা নয়াদিল্লি, কোনও সমস্যা নেই (কি মূর্খ ছিলাম তখন! নিজামুদ্দিন বা সরাই রোহিলার কথা জানতামই না; তখনকার চুন্নুমুন্নু আনন্দবিহার স্টেশনের এখন ‘টার্মিনাল’-এ পরিবর্তনের কথা বাদই দিলাম)। জামশেদপুর যেতে গেলেও তো টাটানগরে নামতে হয়।

কিন্তু মানুষ একবার ভয় পেলে, ভয় তাকে আরও চেপে ধরে। আমারও তাই হল, এদিক ওদিক থেকে শোনা হরেক ঘটনা মনে পড়তে লাগল। কেউ একজন বোকারো থার্মাল প্ল্যান্ট-এ যাওয়ার জন্য বোকারোতে পৌঁছে হিমশিম খেয়েছিল। আবার কলকাতা থেকে কন্টাই যাওয়ার জন্য একজন ট্রেনে কন্টাই রোড গিয়ে ঝাড়া আড়াই ঘন্টা বাসে বসে নাস্তানাবুদ হয়েছিলেন। কন্টাই রোড স্টেশনের নাম বদলে বেলদা করার সময় তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চই রেল কোম্পানিকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লিখতেন। দক্ষিণে আবার ভাষার একটু সমস্যা আছে বলে শুনেছি; ট্যাক্সি বা অটো ড্রাইভারকে বোঝাতে পারলে হয়! রেল স্টেশনের দুর্বোধ্য সব কোড নাম হল আরেক জটিল ব্যাপার, রীতিমত চর্চা লাগে তার মানে বুঝতে। এ চত্বরে আদ্রা ছাড়া নামে-কোডে সবাই আলাদা। নগরায়নের কথা বাদ দিলে টাটাও ভালো। কিন্তু নিউ দিল্লি কথাটার মধ্যে এস অক্ষরটা কোথা থেকে এল জানি না।

এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়েছি জানিনা। ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই দেখলাম চিল্কার জল রেললাইন ছুঁয়ে খেলা করছে। ছোট ছোট ঢেউ থেকে ঠিকরে আসছে দিনের প্রথম আলো। উঠে গিয়ে দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নিলাম খোলা হাওয়ায়। ধীরে ধীরে আলো বাড়লো, পুরোপুরি সকাল হল, রোদ ঝিকমিকিয়ে উঠল চিল্কার জলে, মন ভরে গেল।

দিনের আলোয় মনে বল-ভরসা বাড়লেও ওয়ালটেয়ার-ভাইজাগ সমস্যা তখনও কিন্তু মেটেনি। সহযাত্রীদের সঙ্গে মন খুলে কথাও বলতে পারছি না, আমি এদিকে নতুন আসছি বুঝে যদি ভুলভাল বুঝিয়ে দেয়! যদি চুরি ছিনতাই করে! যদি চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ দিয়ে খাইয়ে দেয়! যদি অজ্ঞান অবস্থায় কিডনি কেটে বেচে দেয়! আসলে তখন ব্যাপক ভাবে ইন্টারনেট চালু না থাকলেও চুরি ছিনতাই কিছু কম হত না। আর নেট-পান্ডিত্য থেকে মানুষের মধ্যে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়, তা এমন বাড়াবাড়ি রকমের না থাকলেও অচেনাকে সন্দেহ করার চল রেলের চাকা গড়ানোর সঙ্গেই শুরু হয়েছিল।

একসময় বিজয়নগরম পেরিয়ে গেল, সিটে গ্যাঁট হয়ে বসে রইলাম| রেল কোম্পানির দেওয়া রসিদ আছে আমার কাছে, ‘ভি’ আর ‘এস’ অক্ষরওয়ালা স্টেশন পর্যন্ত তো যাওয়াই যায়| তবু একটু চালাক চালাক মুখ করে সেই দক্ষিণী সহযাত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভাইজাগ কখন পৌঁছবে?” গতকাল তাও ঠোঁট ফাঁক করে ‘মর্নিং’ বলেছিলেন, আজ বিনা বাক্যব্যয়ে ডান হাতের তর্জনী তুলে দেখালেন| এক ঘন্টাই বোঝাতে চাইলেন বোধহয়, এক দিন নিশ্চই নয়; চুপ করে বসার শাসানিও হতে পারে।

বেলা এগারটা নাগাদ লাইনের আশেপাশে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটের ‘হুলিয়া’ বদলে গেল, কোনও বড় শহর আসছে সামনে| ভাইজ্যাগই হবে হয়তো, রেলের ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার বলে কথা! পাপী মন অবশ্য চিমটি কাটল, রেলের ডিভিশনাল অফিস তো চক্রধরপুরেও আছে। পাত্তা দিলাম না, ভাইজ্যাগ নামটা ছোটবেলাতেই পেপার পড়ে জেনেছিলাম; ময়দান কাঁপানো ফুটবলার চিমা ওকেরি নাইজিরিয়া থেকে ভাইজাগ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতে এসেছিলেন; নেহাৎ অজ পাড়াগাঁ নিশ্চই নয়। এদিকে, সহযাত্রীরা বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে টানাটানি করতে শুরু করেছেন। লাইনের পাশে দোকানদানির নাম গোলগোল অক্ষরে লেখা, কিছুই পড়তে পারছি না, কি স্টেশন বুঝতে পারছি না। উৎকণ্ঠার সঙ্গে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম একটা ইংরেজি বা হিন্দিতে লেখা হোর্ডিং দেখার আশায়।

এর মাঝে বাথরুমে গিয়ে মুখেচোখে জল দিয়ে, চুল আঁচড়ে ফিটফাট হয়ে এসেছি। দাড়িও কেটেছি চলন্ত ট্রেনে ব্যালেন্স রেখে। সোজা লক্ষ্মীমন্ত গ্রাহকের শ্রীমুখের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে কিনা। তাছাড়া নিজেকে ব্যস্ত রাখলে কি হয় কি হয় ভাবনাটা একটু কমে। স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে কিনা, যেখানে যাচ্ছি সেখানে অভ্যর্থনা ঠিকঠাক পাওয়া যাবে কিনা, সব কিছু ভালোয় ভালোয় মিটবে কিনা, এইসব ফালতু টেনশন কিছুটা হলেও কমে।

এটা আমি শিখেছিলাম মুম্বাই থেকে ফেরার সময়। দুবারই দেখেছি, খড়্গপুর পেরোলেই কামরার সমস্ত আলো জ্বেলে হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়, ব্রাশ কই, পেস্ট কই, চিরুনি কোথায় ইত্যাদি। তারপর সেজেগুজে বারবার জানলায় উঁকি মেরে দেখা আর রানিং কমেন্ট্রি দিয়ে যাওয়া – হাউর পেরোলো, এবার পাঁশকুড়া, রাইট টাইমে ঢুকিয়ে দেবে ইত্যাদি। ব্যাগ একবার সিটের নিচ থেকে বেরোবে একবার ঠেলে ঢোকানো হবে। ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে কাল্পনিক দর কষাকষি, কুলির ভাত মারার জন্য ডিভিশন অফ লেবারের তত্বতালাশ, কিছু রয়ে যাচ্ছে কিনা বারবার উঁকি মেরে দেখা, এসব চলতেই থাকবে যতক্ষণ না টিকিয়াপাড়া, ‘ঘুঁটেপাড়া’, ‘একটু দাঁড়া’ পেরিয়ে ট্রেন হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকবে। অনেক ভেবে বুঝেছি ট্যাক্সি ড্রাইভারের জুলুম আর কুলির পয়সা আদায়ের যুদ্ধে অবশ্যম্ভাবী হারের টেনশন এড়ানোর চেষ্টা ছাড়া এসব আর কিছু নয়।

স্টেশন এসে যাওয়ায় কামরার মধ্যে কলরব বেড়ে গেল; সর্পিল গতিতে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ালো। বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে ঠেলাঠেলির প্রাথমিক পর্যায়টা পার করে হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে টুক করে নেমে দাঁড়ালাম প্ল্যাটফর্মে।

কাছাকাছি একটা রং চটা ছোট বোর্ডে স্টেশনের নাম নজরে এল। কিন্তু কপাল খারাপ, মাঝের তেলেগু লেখাটা ঠিক আছে, ইংরেজি আর হিন্দি একেবারেই পড়া যাচ্ছে না। ‘ভি’ দিয়ে স্টেশনের নাম শুরু তো বটে কিন্তু তারপরে কি! নামের লম্বাই দেখে ভাইজ্যাগ তো মনে হচ্ছে না| এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে প্লাটফর্মের প্রান্তে বিশাল হলুদ রঙের বোর্ডে কালো অক্ষরগুলো দেখতে পেলাম। ইংরেজিতে লেখা স্টেশনের নামটা সত্যিই লম্বা; চশমাটা ঠিক করে দমবন্ধ করে মনোযোগ সহকারে বানান করে করে নামটা পড়ার চেষ্টা করলাম।

হুম, এবার পড়া গেল, দ্ব্যর্থহীন অক্ষরে স্পষ্ট লেখা আছে –  ‘VISAKHAPATNAM’|

সর্বনাশের মাথায় পা! এ কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা!

কাছেই এক জন ডাবওয়ালা দাঁড়িয়েছিল, মরিয়া হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “ওয়ালটেয়ারে রেলের অফিস কোনদিকে যাব ‘ভাইয়া’? ডানদিকে না বামদিকে?” কাঁচুমাচু মুখে স্মার্ট ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা নিশ্চই করেছিলাম, কতটা পেরেছিলাম নিজেরই সন্দেহ আছে!

অতি তুচ্ছ ভঙ্গিতে হাত তুলে বামদিক দেখিয়ে দিল সে।

বাঁচলাম! তবু ভালো করে বুঝে নেওয়ার জন্য বললাম, “আই অ্যাম ফ্রম ক্যালকাটা, ডি.আর.এম-এর সঙ্গে জরুরী মিটিং আছে, ট্যাক্সিতে কতক্ষন লাগবে ভাই?” রেলের ডি.আর.এম-রা খুব ক্ষমতাবান হন, ডিভিশনাল অফিসের শহরে তাই নামটা নিয়ে রাখলাম। কলকাতার কথাও কায়দা করে বলে দিলাম, দক্ষিণপূর্ব রেলের হেডকোয়ার্টারের শহর থেকে আসছি, চিমা ওখানেই খেলত; এসব জেনে কিডনি কাটার আগে যদি দুবার ভাবে, সেই আশায়।

“ট্যাক্সি দরকার নেই, অটোতে পাঁচ মিনিট”, ভাঙা হিন্দিতে জানালো ডাবওয়ালা।

ওফফ, নিশ্চিন্ত! ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।

মহাপুরুষরা বলে গেছেন ভগবান সব জায়গাতেই আছেন; ডাবওয়ালার মধ্যেও তিনি বিরাজ করছেন নিশ্চই| পনেরো টাকার পূজা চড়ালাম, ডাবের মিষ্টি জলে চুমুক দিয়ে শরীর জুড়িয়ে গেল।

“বাম দিকে বেরোলেই অটো পেয়ে যাবেন, দশটাকা নেবে”, ভগবানের আশ্বাসবাণী কানে এল ফেরৎ পয়সার সঙ্গে।

হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ডাবের জলের পরে কচি শাঁস খেয়ে ব্যাগ নিয়ে ওভারব্রীজের দিকে এগোনোর সময় মনে হল, দাক্ষিণাত্যে এমন ডাবওয়ালার সঙ্গে অগস্ত্যমুনির দেখা হলে হয়তো ‘অগস্ত্যযাত্রা’ কথাটাই অভিধানে ঠাইঁ পেত না।

এখনও মুঠোফোনে ম্যাপ দেখে কানাগলিতে ঢুকে পড়লে, সেই ডাবওয়ালারূপী ভগবানকে স্মরণ করি।

**********************

(এই লেখাটি কেশিয়াড়ি, পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে প্রকাশিত শারদীয় সুবর্ণধারা- ১৪২৫ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে)

Keep reading

More >