অথ ভাদুর গান

  ভাদ্র মাস এলেই বাঙালির মন নীল সাদা মেঘ আর শিউলি, কাশফুলের সারির সাথে পাল্লা দিয়ে উড়তে থাকে। মনে শারদীয়ার …

  ভাদ্র মাস এলেই বাঙালির মন নীল সাদা মেঘ আর শিউলি, কাশফুলের সারির সাথে পাল্লা দিয়ে উড়তে থাকে। মনে শারদীয়ার ঢাকের কাঠি পড়ে। মায়ের আগমনী বলে কথা।তাছাড়া এই তো জমজমাট উৎসব পর্বের সূচনার সূচনা। এরপর প্যাচপাচে গরমের ধীরে ধীরে বিদায় আর হুল্লোড়ে বাঙালির উৎসব যাপনের ধারাবাহিকতা চলতেই থাকবে। দুর্গা, লক্ষী, কালী, কার্ত্তিক, সরস্বতী, শিব, গনেশ, আরো কত। কিন্তু এত অল্পে বাঙালির মন ভরে না, তাই তো ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’।এগুলোর বাইরেও যে গ্রাম বাংলার আনাচে কোনাচে কত দেব- দেবী, উপকথা- লোককথা ছড়িয়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই। সে কারণেই ভাদ্র মাসের প্রথম দিন থেকেই রাঢ় বাংলায় (বীরভূম,পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বর্ধমানের কিছু অংশ)শুরু হয় ভাদুর গান ও পুজো।

    পয়লা ভাদ্র গ্রামের কুমারী মেয়েরা কোনো বাড়ির কুলুঙ্গী বা প্রকোষ্ঠ পরিষ্কার করে ভাদু প্রতিষ্ঠা করে। আসলে ভাদুর কোনো মূর্তি নেই তাই একটি পাত্রে ফুল রেখে ভাদুর বিমূর্ত রূপ কল্পনা করে শুরু হয় ভাদুর গান—

    “ভাদু তুমায় আনব্য মা গ

     পুজব সব্বাই আজিকে

     রাখব তুমায় যতন কইর‍্যে

     মাণিক হঁইয়ে থাকব্যে বুকে সোনার বাঁউটি দিব ভাদু

     যায়ো না’ক কুথাকে

     আমার ঘরে থাক মা’গ

     গড় করি মা তুমাকে……।

যেমন মনের কল্পনার গান, কোনো শাস্ত্রীয় বচন নয়, তেমনই মনের মত ভাদুর নারী মূর্তি গড়া হয়। ভাদ্র সংক্রান্তির সাতদিন আগে এই মূর্তি এনে সংক্রান্তির পূর্ব রাত্রে ভাদুর জাগরণ পালন হয়। রঙিন কাপড় বা কাজগের ঘর তৈরী করে ভাদুকে সারারাত রেখে নাচ গান চলতে থাকে। কুমারী ও বিবাহিত মহিলাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। পরের দিন সদলবলে মহিলারা ভাদু মূর্তির বিসর্জন দেয়।

  এই পুরো মহিলা পরিচালিত নাচ, গান, পুজোর পিছনে আছে এক বিষাদগাথা। কেউ বলে মিথ, কেউ বলে কল্পনা। পঞ্চকোট রাজপরিবারের রাজকন্যা ভাদু বা ভদ্রেশ্বরীর কাহিনী থেকে এর উদ্ভব।মানভূমের পঞ্চকোট রাজ নীলমণি সিং দেও। রাজা তাঁর সীমানার এক গ্রামে সুলক্ষণা কন্যার সন্ধান পেলেন। নিজের কন্যা রূপে তাকে তিনি গ্রহণ করতে চাইলেও কন্যার আসল পিতা রাজি হলেন না। শেষে রাজা সেই মেয়েটিকে রাজার ঘরের মেয়ের মত সুখ সুবিধা দিয়ে মানুষ করতে লাগলেন। কিন্তু সুখের দিন সইল না। দেশে সিপাহী বিদ্রোহের ঝড় উঠল। নীলমণি সিং দেও বৃটিশদের হাতে বন্দী হলেন। কিছুদিন কারাবাসের পর ফিরে এসে শোনেন ভদ্রাবতী/ভদ্রেশ্বরী কবিরাজ পুত্রের প্রেমে পাগল। যদিও কোনো সঠিক বা দৃঢ় তথ্যের অভাব রয়েছে। কারণ মানুষেরা—‘সুনা কথা , যেমুন সুনি, তেমুনি জানি’ তেই আস্থা রাখে। যাই হোক,  রাগে অধীর রাজা সেই প্রেমিককে কারারুদ্ধ করে রাখলেন আর বদ্ধ কারার পাশে ঘুরে ঘুরে ভদ্রেশ্বরী গান গাইতে থাকেন এই আশায় যে সেই গান শুনে তাঁর প্রেমিক তাকে মনে রাখবে। কন্যার এই অবস্থায় অনুশোচনাগ্রস্ত রাজা প্রেমিককে মুক্ত করেন, কিন্তু ততদিনে ভদ্রেশ্বরী হারিয়ে গেছেন, মনের দুঃখে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

    আবার অন্য একটি গল্পে জানা যায়, নীলমণি সিং দেও’র তৃতীয় কন্যা  ভদ্রাবতীর বিবাহের পূর্বেই স্বামী মারা গেলে, দুঃখে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ভাদু আত্মহত্যা করেন। তখন ভদ্রাবতীকে জনমানসে স্মরনীয় করে রাখার জন্য ভাদু পুজোর প্রচলন করেন নীলমণি সিং দেও। ঘটনা যাই হোক, এর ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলেনি। রাখালচন্দ্র চক্রবর্তীর ‘পঞ্চকোট ইতিহাস’ বইটিতে এই রকম কোনো ঘটনার কথা পাওয়া যায় না।

    আবার কেউ কেউ বলেন ভাদু হল মূলত বাঙালি কৃষকের বীজবপন উপলক্ষ্যে মেয়েদের দ্বারা পালিত লোকউৎসব। কারণ এখন মূর্তি বানানো হলেও আগে পাত্রে গোবর রেখে তার উপর ধান, ফুল, দূর্বা ছড়ানো হত। সে যাক, এই রীতি উৎসবের পিছনে এক প্রেমের করুণ কাহিনী রূপকথার মত বয়ে চলেছে।সেকারণে
বিবাহ প্রধান গান ভাদু উৎসবের মূল আকর্ষণ। প্রেমের গান, দুঃখের বারোমাস্যা’র গানও থাকে। কুমারী ভাদু তো প্রেমের জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছেন তাই কোথাও কোথাও ভাদু’র কোলে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি থাকে। যা চিরন্তন প্রেমের প্রতীক। এই প্রেমের সমাপ্তি বিষাদে—

    “ভাদুমণি দুখ পাঁইয়েছ্যে বেথা তাকে দিও না

     ভাদু বিটি বড় দুখী, তুমর‍্যা কিছু বইল্য না।“ এটাই চিরন্তন আকুল প্রার্থনা।

           

      বীরভূম জেলায় ভাদু উৎসব  অন্যান্য অঞ্চলের থেকে সামান্য আলাদা। বীরভূমের ভাদুতে নারীরা অংশগ্রহণ করেন না। গ্রামের একটি পুরুষকে নারী সাজিয়ে তার কোলে ভাদুমূর্তি স্থাপন করে সারা মাস ব্যাপী গান গেয়ে ও নাচ করে ঘুরে ঘুরে অর্থ আদায় করে। ভাদু সংগীতে রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে ঝুমুর কীর্তন এবং রামপ্রসাদী সুরেরও প্রাধান্য থাকে। আরো একটা মজার ব্যাপার হল এই সব গানে এখনকার সময়ের কথা, জীবনের কথাও উঠে আসে সহজেই।

      “আমার ভাদু সোনার জাদু, কে পাঠাইলে কোলকেতা

        সেই কেলকেতারই লুনা জলে, ভাদু হইল শ্যামলতা…….।”

যে কোনো লোককথার মত এখানেও সেই পরিবর্তনশীলতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ লক্ষ্য করি। ভাদু গান, নাচ, রীতি’র পরিবর্তন সেটাই প্রমান করে। তবে ভাদু’র ঐতিহাসিকতা বা সত্যতা যাই হোক, গ্রাম বাংলার মানুষের মনে আর সংস্কারে ভাদুর আসন অটুট থাকবে বলাই যায়।

Keep reading

More >