আবার বৈঠক গন্ধমাদনে-২

সেদিন সারাদিন মন উচাটন। যা হল, তা কি সত্যি? স্বপ্নে এরকম হতে পারে? সম্ভব? অথচ আমি সেই সব কন্ঠস্বর, স্পর্শ …

সেদিন সারাদিন মন উচাটন। যা হল, তা কি সত্যি? স্বপ্নে এরকম হতে পারে? সম্ভব? অথচ আমি সেই সব কন্ঠস্বর, স্পর্শ এখনও অনুভব করতে পারছি। একথা কাউকে বলার নয় তাই আর বেরোই নি আজ, শুধু যেন রাত হওয়ার অপেক্ষা, সেই প্রহর আসার অপেক্ষা!
রাতে একটু দুধ রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম, কিন্তু ঘুম আসে না কিছুতেই, জোর করে চোখ বুঝে শুয়ে আছি, মনে মনে আকাশ-কুসুম সিঁড়ি ভাঙার অঙ্ক কষেই চলেছি। কাদের দেখলাম আমি, সপ্ত চিরঞ্জীবি! এও কি সম্ভব, আমি গাঁজা খাইনা, মদ খেলে এরকম অবাস্তবতা স্বপ্নে আসা সম্ভব না, আর আমি সেদিন খাইও নি। আমি কে এমন হরিদাস পাল যে আমাকে ওঁদের কাজে লাগতে পারে! এরকম চিন্তার জট পাকানো আর খোলার মধ্যেই এক মন্দ্রস্বর আমায় ডেকে উঠল, “ওঠো, তন্দ্রা ত্যাগ করো”। গোটা গা শিউরে আমি উঠে পড়লাম।
আবার শনশন হাওয়া, মুহুর্মুহু আলোর পরিবর্তন, তারপর একসময় সেই পাহাড়ের চুড়োয় এক গোপন কোণে সাতজন পৌরাণিক ব্যক্তির মাঝে আমি। এতক্ষণ আমি খেয়াল করিনি আমি কার সাথে এলাম, গলার স্বর একটু অন্য মনে হলেও চূড়ান্ত উত্তেজনায় সে খেয়াল রাখিনি আমি, এখন সামনে দেখি স্বয়ং পবননন্দন মুচকি হাসছেন। খেয়াল করে তাকাতে গিয়ে একটু ভিরমি খাওয়ার মতই অবস্থা হল, কি বিশাল চেহারা, সৌম্য অথচ যেন এক চরম উগ্রতা, শুধু চোখ দুটো বড় শান্ত। ব্যাসদেব ডেকে বললেন, ‘কেকসী তনয়, রাবনের ছোটভাই সার্থকনামা, বিভীষণ”।
মাথার মধ্যে উত্তেজনা আর প্রশ্ন ক্রমাগত যোগ আর বিয়োগের অঙ্ক কষে চলেছে, কি হচ্ছে আমার সাথে, স্বপ্নই যদি হয় তা কি এত নিয়ম মেনে হত? এরা কি চায় আমার থেকে?
আবার ব্যাসের ডাকে আমার সম্বিত ফিরল, “শোনো হে, আজ কিছুটা প্রকৃতিস্থ লাগছে, তোমাকে। আজ তোমায় এখানে এভাবে নিয়ে আসার কারণ বলব। তার আগে কিছু সাবধান বাণী”- এতটা বলে একটু থামলেন ঋষি, আবার শুরু করলেন, “তুমি কেন এখানে এ প্রশ্ন তোমায় জর্জরিত করছে তো? তুমি ভেবেছ এভাবে তাই তুমি এখানে। দেখ, অতি জটিল হিসাব সব, আমি চাইলেও সব ব্যাখ্যা দিতে পারব তা নয়, আবার আমি যা বলব, তাও যে তুমি সব বুঝবে তা নয়। তবে একটা বন্দোবস্ত করতে পার যে, আমরাই করে দিচ্ছি, তুমি এই জগতে যথাইচ্ছা আসা যাওয়া করতে পারবে। আর যদি সময়ের ইচ্ছা হয় তুমি আপনিই সব রহস্য বুঝে যাবে”। দ্রোণপুত্র বলে উঠলেন, “সেটা কি উচিৎ হবে?”। ব্যাস বললেন, “সেটা সময়ের উপড় ছেড়ে দাও হে কৃপীসুত”, বলে আমার দিকে তাকালেন, “কলির অবস্থা কেমন বোঝ ছোকরা?”
আমার এমনিতেই পেট গুড়গুড়, তারমধ্যে এমন প্রশ্ন, আমি বলতে যাচ্ছিলাম ভালোই তো, তারমধ্যে পরশুরাম একটা তাচ্ছিল্য হুঁ করে উঠলেন, আমি আরো ভেবলে গেলাম। অশ্বথামা এগিয়ে এসে বললেন, “আমাদের খবর অনুযায়ী কলির অবস্থা শোচনীয়। অবতার গ্রহণে এখনও অনন্তকাল, তবে যদি সময়কে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ না করা যায় আর সময় যেভাবে চলছে তাতে হয়ত অবতার গ্রহণের উপযুক্ত প্রেক্ষিতই তৈরী হবেনা, তখন এই মোহাবিষ্ট কাল চলতে থাকবে, এক দুরাচারীকে মারবে আরেক দুরাচারী কিন্তু সংবরণে কারো আয়ত্ত থাকবে না আমার মত, আর তারফলে সত্য প্রতিষ্ঠা হবেনা। মনুষ্যেতর জীবে পৃথিবী পুতিগন্ধময় হবে” বলতে বলতে মুখ লাল হয়ে এল অশ্বথামার।
-“তুমি লেখ তো?”, প্রশ্ন শুনে মুখ ব্যাসদেবের দিকে চেয়ে অতি লজ্জায় মাথা নাড়লাম।
– লিখতে হবে?
-কি?
– আমাদের কথা
– সে তো লিখতেই হবে, লিখবোই…
– না কল্পকাহিনী নয়, হয়ত তাই হবে কিন্তু তুমি লিখবে ভবিষ্যৎ
– মানে?
“বড় সময় নষ্ট কর তোমরা”, বলে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন পরশুরাম। বললেন, “অন্যায়ের শাসনের জন্য আমাদের আবার জন্মাতে হবে, কিন্তু আমরা অতীতের গর্ভে অথচ আমরা আছি। আবার আমাদের তেজ, আমাদের ধরণ এই যুগে অচল, আমি অবশ্য দ্বাপরেও নাকগলাইনি… সে থাক তাই তোমাকে আমাদের চরিত্র লিখতে হবে, বুঝলে?”
আমার অবস্থা খুব খারাপ, নিজের অস্তিত্ব নিয়েই চরম দ্বিধায় তারমধ্যে এঁরা কি বলে চলেছে কিছুই বুঝতে পারছিনা, আর আবার অদ্ভুত এক অস্বস্তি বোধ হতে লাগল। ব্যাসদেব এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখলেন, “সময় আবার শেষের পথে, এটুকু শুধু মনে রেখো, তোমায় জন্ম দিতে হবে মহাবলীদের, স্মৃতিভ্রষ্ট মহাবলীদের কলির মধ্যে ফেলতে হবে, তাদের দিয়ে খানিকটা পাপ নিষ্কাশন করাতে হবে। আজ রাতে আর ঘুমিওনা তুমি”।
আমি পড়তে থাকলাম… অনন্ত থেকে বাস্তব অবধি।
ক্রমশ…

Keep reading

More >