আবার বৈঠক গন্ধমাদনে

তারপর তো অনেক কাল কেটে গেছে, কোনো কথা হয়নি কারো মধ্যে, যে যার মতো আলাদা রয়েছে, সেবার আলোচনা সভা অকারণ …

তারপর তো অনেক কাল কেটে গেছে, কোনো কথা হয়নি কারো মধ্যে, যে যার মতো আলাদা রয়েছে, সেবার আলোচনা সভা অকারণ মতবিরোধে অমীমাংসিত ভাবে ভেঙে গেছিল।
আসলে ঘটনাটা হঠাৎ ই শুরু হল, ফোন টা সুইচ অফ করে চার্জ দিচ্ছিলাম, হঠাৎ রিংটোন শুনে ছুটে এসে দেখি কোনো নাম্বার নেই খালি কয়েকটা অচেনা অক্ষর ফুটে উঠেছে। ধরলাম ফোনটা, ধরতেই একটা গম্ভীর কর্কশ গলার আওয়াজ যেন বহুদূর থেকে ধ্বনিত হল, ‘আমি দ্বৈপায়ন বলছি’। বললাম, ‘হ্যাঁ বলুন’।
-তোমায় একটু আসতে হচ্ছে।
-কোথায়?
-বেশিদূর না, এই গন্ধমাদনের চুড়োয়।
-মানে?
-বৈঠক হচ্ছে, একজন মীমাংসা করার লোক লাগবে তো।
-ও তা মানে…
-না না, কোনো অজুহাত নয়, মারুতিকে পাঠাবো না জামদগ্ন্যকে? না থাক মারুতিই যাক। তৈরি হয়ে থাক হে।
কট শব্দে ফোনটা কেটে গেল, দেখলাম বন্ধই আছে ফোনটা।
কি করব ভাবতে ভাবতেই দেখলাম কে যেন দরজায় টোকা দিল, খুলে দেখি পক্ককেশ, দীর্ঘদেহী এক বৃদ্ধ। দীর্ঘ মানে বেশ বিশাল, সেরকম চেহারা হতে পারে বলে আমার ধারণা ছিল না। বললাম, ‘মোবাইলটা নিয়ে নি স্যার?’, বললেন, ‘ সে সব তো এখানেই থাকবে শুধু আমার হাতটা ধর’। ধরলাম আর তাকাতে পারলাম না শন শন বাতাস আর তারপর সেকেন্ডের ভগ্নাংশে চোখের সামনে শুধু আলোর পরিবর্তন, কিছুই ঠাহর হচ্ছেনা। একসময় থামলাম, ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল।
চেয়ে দেখি ৭ জন বিশাল বড় বড় চেহারার মানুষের মত কিন্তু অদ্ভুত দেখতে লোক, সবারই মুখ ঢাকা বিশাল বিশাল দাড়ি গোঁফে, এক একজনের যা চেহারা তিন চারটে সালমান খানকে নিয়ে জাগলিং করতে পারবে মনে হল।
একজন এগিয়ে এসে বললেন, ‘যাক খুব একটা অস্থির হওনি তো?’।
আমি কিছু বলতে যেতেই এক বুড়ো তেড়িয়া ভাবে বলে উঠল, ‘কেন হে, সত্যবতী নন্দন আর কেউ ছিলনা আমাদের কালের?’।
আগের জন বললেন, ‘সমস্যাটা বোধহয় মর্তলোকের আর ইদানিং বোধহয় তুমি যাদের কথা বলছো তারা নিষ্প্রভ’। তেড়িয়া লোকটা ‘হু:’ শব্দে আবার বসে পড়ল।
আমাকে যে লোকটা নিয়ে এসেছিল সে গিয়ে বুড়োর পাশে বসে বলল, ‘কলা খাবে? কলা খেলে মেজাজ শান্ত হয়’, বলে একটা কলার কাঁদি টেনে নিল।
রাগী বুড়ো বলে, ‘তুই খা মর্কট! নির্বোধ কপি’।
-‘আহা রাগ করো কেন ব্রাহ্মণ, দোষ তোমার বাবার, চরু বানিয়ে কেউ মেয়েদের ভাগ করতে দেয়? এত রাগ তোমার আসে কোত্থেকে? আচ্ছা একটু কুস্তি করবে কতকাল করিনি…’
এই সব কথার মাঝে আমার যখন নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছা করছিল, তখন সেই কৃষ্ণকায় সৌম্য বৃদ্ধ বলল, এস হে পরিচয় টা সেড়ে ফেলা যাক, বলে আমায় প্রথম নিয়ে যে লোকটা আমায় আনতে গেছিল তার সামনে দাঁড় করালেন। বললেন, ‘এই হল মারুতি’। নিষ্পাপ উজ্জ্বল মুখ প্রশান্ত, থুতনির নিচের দিকটা একটু বাঁকা। শেষ কলাটা খেয়ে নিয়ে আমার নজর লক্ষ্য করে বললেন, ‘ও ছোটবেলার একটা বাদরামির ফল’।
এরপরের জন সেই তেড়িয়া, রাগী বুড়ো। মারুতি ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘এনাকে একটু নমো করে নিও’, করলাম নমো, আর দ্বৈপায়ন বললেন, ‘আশীর্বাদ কর হে জামদগ্ন্য ব্রাহ্মণ সন্তান’। এ কথার পর দেখলাম বুড়ো খানিক চেয়ে আলগোছে একটা ‘জয়স্তু’ করলেন।
তারপর আলাপ হল কৃপ, বলি র সাথে, তারপর একটা লোক পিছন ঘুরে ছিল মারুতি এসে বলল, ‘ওঁর সাথে আলাপ হয়ে যাবে ক্ষণ, সবে এসেছে!’। দ্বৈপায়ন এরপর যার সাথে আলাপ করালো তার কপালের মাঝখানটা মনে হবে যেন কেউ খুবলে দিয়েছে, মুখে একটা হালকা অশান্তি, নাম অশ্বথামা। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল, মারুতি মানে কি, জামদগ্ন্য কে? কৃপ? বলি রাজা? আমি যখন চূড়ান্ত বিষ্ময়ে একগাদা প্রশ্ন নিয়ে তাকালাম, মৃদু হেসে দ্বৈপায়ন বলল, হ্যাঁ আমি পরাশর পুত্র কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস।
অসম্ভব শীত করতে লাগল, মনে হচ্ছে আমি তলিয়ে যাচ্ছি, আমি ব্যাসদেবের হাত ধরতে চাইছি পারছিনা, প্রশ্ন করলাম,
-এরকম কেন হচ্ছে?
-তুমি সহ্য করতে পারছ না।
-আমাকে নিয়ে এলেন কেন?
-আবার আসতে হবে তোমায়, একবারে কি হবে!
পরশুরাম বলে উঠলেন, ‘হুঁ কলির প্রাণ!’
ব্যাস বললেন, ‘আবার দেখা হবে, রাতে গুরুপাক খেয়োনা’।
তলিয়ে যেতে যেতে একসময় পড়ে গেলাম আমার ঘুম ভাঙল…।
ক্রমশ…

Keep reading

More >