আমার বাড়ি

  অনেকেই আমাকে একটা ফ্ল্যাট কেনার কথা বলে। আমার যদিও একটা ছোটখাট বাড়ি আছে কিন্তু বন্ধুরা যারা পঁচাত্তর লক্ষ বা …

 

অনেকেই আমাকে একটা ফ্ল্যাট কেনার কথা বলে। আমার যদিও একটা ছোটখাট বাড়ি আছে কিন্তু বন্ধুরা যারা পঁচাত্তর লক্ষ বা এক কোটির কাছাকাছি দক্ষিনা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছে তারা সবাই উপদেশ দেয় একটা ফ্ল্যাট কেনার জন্য।
থ্রি বি এইচ কে, টু বি এইচ কে রাজারহাট, দমদম, নাগেরবাজার, টালিগঞ্জ আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাটগুলো যেন আমাকে গিলে ধরে মাঝে মাঝে। লোন দেবার জন্য ব্যাংক যখন বসেই আছে তখন একটা নিয়ে নিলেই হয়। কমপ্লেক্সের ভেতর দুর্গাপূজা সোশ্যাল পারিবারিক অনুষ্ঠান সবই হবে। খেলার মাঠ লিফট সুইমিং পুল কিছুই বাদ নেই। আপনার স্বপ্নের বাড়ি আপনার হাতের মুঠোয়।
কিন্তু সেসব কিছুই কেন জানি মনে ধরে না। মনের মধ্যে ঢুকে আছে ছোট্ট একটা বাগান বাড়ি। সামনে একটু লন। দুপাশে ঘন গাছের জঙ্গল। ঢুকতে গেলেই মাধবী লতার একটা ভারী সুবাস। ছোট্ট দোতলা বাড়ি। গাছের পাতাগুলো জানালা দিয়ে প্রায় ঢুকে পড়ে। গাছে জড়ানো লতাগুলো জানালার গ্রিল বেয়ে বেয়ে ছাদে উঠে গেছে। বৃষ্টি পড়লে ভেজা পাতা থেকে টুপ টুপ করে জল পড়বে জানালার বক্সের ভেতরে। দূরে সাদা রাস্তা দিয়ে হুস হুস করে গাড়ি ছুটে যাবে।
বৃষ্টি থেমে গেলে অনেক্ষন একটা ভেজা বিকেল বাড়িটাকে ঘিরে রেখে দেবে। আকাশ ফেটে এক চিলতে বিকেলের লাল আলো ঘরে ঢুকবে। বাগানটা কাঁদায় প্যাঁচ প্যাঁচ করবে। সকালের ফুলগুলো নুয়ে ঝুঁকে পড়বে। সারা বাড়িটা ডুবে যাবে বর্ষার অন্ধকারে। রাত বাড়লে ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডেকেই যাবে। যদিও এখন কারেন্ট যায় না, তবু বিনা কারণে হঠাৎ করে কারেন্ট চলে যাবে। মোমবাতি জ্বালিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকব। দূরে পুকুরের পার থেকে গ্যঙ্গর গ্যাং ব্যাঙ ডাকবে। মালতী ফুলের ভারী সুবাস দোতলাটা ভরিয়ে দেবে।
মোবাইল বন্ধ থাকবে। পেসেন্টরা বিরক্ত করবে না। রাতে একটু খিচুড়ি আর ডিম ভাজা নিয়ে ডাইনিংয়ে বসব। অনেক রাত জেগে ভূতের গল্প পড়ে শুতে যাব। খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবব যদি তাদের দেখা পাই।
হয়ত বাড়িটার একটা ভৌতিক ইতিহাস আছে। একটা শিরশিরে ভয় আমাকে ঘিরে ধরবে। বাড়িটা আস্তে আস্তে আমাকে অধিকার করে নেবে।

সকালবেলায় ঘুম ভাঙলে দেখব মৌটুসী লেজ ঝুলিয়ে লম্বা ঠোঁট দিয়ে ফুলের মধু খাচ্ছে। বেশ কয়েকটা লাল মুনিয়া এগাছ ওগাছ করছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বারান্দার ইজি চেয়ারে বসব। আস্তে আস্তে ভোর হচ্ছে। একটু একটু শীত লাগবে। আবার পাহাড়ে বেড়াতে যাবার ইচ্ছে হবে। অস্থির হয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দেখব সামনে ছুটি কবে আছে। ডুয়ার্সের জঙ্গল আর পাখিরা আমাকে ডাকতে থাকবে।

এমন একটা বাড়ি আমি ঠিক কিনব একদিন। এখন থেকেই খোঁজ করছি। আমার বাগানবাড়ি থেকে এখনকার বাড়িতে ফিরে এসে কাজে বেরিয়ে যাব। কলকাতার ওই প্রচন্ড সুযোগ সুবিধা আর কংক্রিটের জঙ্গলে আমি নেই। আমার সত্যিকারের একটা জঙ্গল চাই।

Keep reading

More >