ইটলি

#ইটলি        বেশ কয়েকদিন ধরে ‘কান পেতে রই’ কিন্তু ‘ইটলে’, ‘ইটলে’ এটুকুই কানে আসে। মাঝারি গলি রাস্তা বেয়ে ঝনঝনিয়ে সাইকেল …

#ইটলি

       বেশ কয়েকদিন ধরে ‘কান পেতে রই’ কিন্তু ‘ইটলে’, ‘ইটলে’ এটুকুই কানে আসে। মাঝারি গলি রাস্তা বেয়ে ঝনঝনিয়ে সাইকেল নিয়ে লোকটা দ্যায় ছুট। যাতে করে ঘর থেকে বারান্দায় ছুটে গিয়েও আমি চ্যাম্পিয়ান না হতে পারি। অবশ্য দৌড়বীর আমি কোনও দিনই নই। স্কুলবেলায় একমাত্র অঙ্ক রেসেই নাম দিতাম। শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ সেখানে কম ছিল। ঐ রেসের মূল কথাই হল ‘বুদ্ধি যস্য বলং তস্য’। সে যাকগে! এখন ফেরিওয়ালার মৌখিক ‘হাঁকস্য’*(হাঁক দেওয়ার ভঙ্গী। আমার মুণ্ডুপ্রসূত, বেশি পন্ডিতি মনে হলে অন্য কিছু বের করুন মাথা খুঁড়ে) উদ্ধার পর্বে  আমি বিশেষ বিচলিত হয়ে উঠলাম।

       গবেষণামূলক মন কিনা, তাই   ‘যেখানে শুনিবে হাঁক

                                            খুঁজে দ্যাখো দ্যায়

                                             কিনা গোরু ডাক”—

কবিতা হিসেবে অতি জঘন্য। কারণ কবিতা আমি লিখতে নারি। আমার গোরু খোঁজা থুড়ি গবেষণার প্রথম ফলিত তত্ত্ব হল–  লোকটা যায় সাইকেলে, অথচ বলছে ‘ইটলে’। বরাবরের মতো আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে দেখে এসেছি ট্রাক্টারে বা ট্রাকের মাথায়, বুকে ভরে ইঁট আনা হয়। সেই ইঁট যা ছুঁড়লে মাথা ফেটে রক্তারক্তি হতে পারে। আবার এই সেই ইঁট যাতে বাড়ির ভিত তৈরী হয়। তাবলে সাইকেলে করে ইঁট বিক্রি করছে! যদি একটি বস্তাও সাইকেলের ক্যারিয়ারে রাখে তো কটাই বা ইঁট ধরবে? আর ওরকম খুচরো ইঁট কেইবা কিনবে? একি আলু, পটল বা মাছ/ডিম? আর এতে করে সে ফেরিওয়ালার লাভই বা কি থাকবে?

         এসব গবেষণায় মাথায় দুচারটে চুল পেকে গেলো, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলো না। বিষন্ন বদনে শুধু ‘ইটলে’ ‘ইটলে’ শুনে ‘হৃদয় ওঠে চঞ্চলি’। এমতাবস্থায় দশটা –পাঁচটার মহাপ্রস্থানের জন্য একদিন রথসহ রথী উপযুক্ত সাজসজ্জায় সিংদরজায় বর্তমান। ঠিক তখনই হাঁক পড়ল ‘ইটলে’। এজন্যই বলে ভগবান আছেন। রথ ধূলোয় গড়াগড়ি। রথী দড়াম দিড়িম আওয়াজসহ একলাফে রাস্তায়। লংজাম্পের কম্পিটিশন থাকলে অন্তত তৃতীয় পুরস্কার রথীর কপালে জুটেই যেত। এসব দৌড়ঝাঁপের পর অবাক বিস্ময়ে ড্যাবডেবিয়ে রথী দেখল একটি সাইকেলে ফতুয়া ও সাদা ধুতি পরা শিড়িঙ্গে মাঝারিপানা( গায়ের রঙ) মানুষটা প্রাণপণে জোরে সাইকেল হাঁকাচ্ছে। সাইকেলের ক্যারিয়্যারে ঝনঝনে টিনের বাক্সের গায়ে বড় বড় হরফে লেখা ‘ইটলি’। টিনের মাথায় গামছা কষে বাঁধা।  

         এ আবার কি জিনিস রে বাবা! ভেবলে গিয়ে ভাবতে ভাবতেই লোকটা দৃষ্টির বাইরে। যাহ, চলে গেলো। হায় হায়, ফস্কে গেলো। হাহুতাশ করে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বুদ্ধি ঝিকিয়ে উঠল। আরে ওর তো সাইকেল আর আমার পেট্রোলচালিত গাড়ি। মনে করলে এখনও হয়ত রাস্তায় তাকে পাকড়াও করাই যায়! যদিও পিঠ পর্যন্ত চাপড়ানোর জন্য হাত পৌঁছায় না, কিন্তু মনে মনে পিঠ চাপড়ে নিজেকে বেশ বুদ্ধিমতী বলেই বাহবা দিলাম। কিন্তু রাস্তায় কিছুদূর গিয়েও যখন সে ফেরিওয়ালার টিকি দেখা গেল না তখন বুঝলাম অভিজ্ঞ মানুষেরা শুধুই বলেনি যে ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে!’।

         সুতরাং আবার মাথা চুলকে চুলকে চিন্তা শুরু। ‘ইটলি’ কি? কোন ধরণের বস্তু হতে পারে? কোনোভাবে ইটালির(ইতালি দেশ) সঙ্গে সম্পর্কিত নয় তো। ইটালির কোনো জিনিস বিক্রি করছে নাকি—এমন অসম্ভব অতিকল্পনাও মনে ফেনিয়ে উঠল। পরদিন সেই নির্দিষ্ট সময়ে দরজায় রথসহ রথী প্রস্তুত ‘ইটলি’ অভিযানের পরোয়ানা নিয়ে। যথারীতি সে লোক সাইকেল ঝনঝনিয়ে দৌড় মারল। রথ প্রায় গোয়েন্দা বিভাগীয় নজরদারি ও পিছু ধাওয়ার দক্ষতায় পাকড়াও করল অভিযুক্তকে।

          “দাদা, আপনি ঠিক কি বিক্রি করছেন? মানে এই টিনের বাক্সে কি আছে?”

           “দিদি ও ‘ইটলি’ আছে।  আপনি নিবেন? “

টিনের দিকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে প্রচন্ড কৌতূহলে অনুরোধ করলাম  — “একবার দেখাবেন জিনিসটা কি?”

         “শুধু শুধু ধূলো পড়বে দিদি ঢাকনা খুললে! আপনি কিনে লিন! আমার তাড়া আছে। “

হুঁ তাড়া তো আমারও আছে। অগত্যা রথীর ব্যাগস্থ টঙ্কা আর ফেরিওয়ালার টিনস্থ ‘ইটলি’ আধা সেকেন্ডের দ্রুততায় হস্তান্তর হল।

             সাদা ঠোঙায় মোড়া ‘ইটলি’ খুলে ভেবলি দিদিমণি উপহার পেল দুটো মাঝারি সাইজের ‘ইডলি’। তখন রাগ করার কোনও উপায় নেই। ‘ইটলি’ওয়ালা তার ‘ইডলি’ নিয়ে ততক্ষণে ‘ইটালি’ পৌঁছে গেছে!

#বকবকম

Keep reading

More >