একটি হ্যান্ডতাল ম্যাচ

বর্ধিষ্ণু গ্রামের এক কোণ ঘেঁষে কোনো পাড়া থাকলে তাকে ‘কোঁধাপাড়া’ বলে। যেন পাড়াটি ফস্কে যেতে যেতেও গ্রামের এক কোণে কোনও …

বর্ধিষ্ণু গ্রামের এক কোণ ঘেঁষে কোনো পাড়া থাকলে তাকে ‘কোঁধাপাড়া’ বলে। যেন পাড়াটি ফস্কে যেতে যেতেও গ্রামের এক কোণে কোনও ক্রমে টিকে গেছে। এইরকম পাড়ার মানুষদের সাধারণত ঘরকুনো হওয়া উচিত। কিন্তু ‘কোঁধাপাড়া’ বিপরীত ধর্মযুক্ত। আড্ডাবাজ। হুল্লোড়ে। বাহানা একটা হলেই হল, অমনি উৎসব, অনুষ্ঠান ফুর্তি ফাত্তা। সে আপনি যতই রামগড়ুর আর নিয়ম নিষ্ঠার পূজারি হন না কেন, কোঁধাপাড়ার হলারে একবার ঢুকলেই এমনি প্যাঁচে পড়বেন যে কিছু না কিছু তালকীয় ঘটনা ঘটবেই।

তাহলে খেলা ধূলো দিয়েই শুরু হোক। মন, শরীর দুই জমে থাকবে। জমে থাকুন, জমিয়ে রাখুন কেস। পুরনো দিনের শ্যামরায় মন্দিরের বড় চাতাল। মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে অসূর্যম্পশ্যা শ্যাওলা ও ঘাসের দল। দৈর্ঘ্য প্রস্থের আট দশ হাত মাপের আয়তন ছেড়ে পুকুরের পাড়ে তালসারি, চটাওঠা শিবমন্দির, জানলায় দাসান বুড়ির ফোকলা হাসি আরেকদিক উজ্জ্বল করেছে। অন্য পাশে গ্রামের রাস্তা আর হাতিকল। মাঠ পর্যবেক্ষণ কমপ্লিট। বড় বড় মাঠ বিশেষজ্ঞ এর মতামত অনুযায়ী ভরা শ্রাবণে এই মাঠ ‘হ্যান্ডতাল’ ম্যাচের উপযুক্ত সময়।

আজ সেই বিশেষ দিন। ম্যাচ আসলে একটিই। খেলোয়াড়ের সংখ্যা গুনে বা খেলার নিয়ম জানতে চেয়ে লজ্জায় ফেলবেন না দয়া করে। ওপাড়ার খেঁদি পেঁচি, বামুনপাড়ার চক্রবর্তী বৌদি, ভটচাজ দা, গোপা, নীপা, সম্পা, টুম্পা, সিং বাড়ি, মজুমদার গুষ্টি…. এরা সব দর্শক। লাইভ শুরু হবে এক্ষুনি, তখন কার কি এক্সপ্রেশন বলে যাব, ম্যাচের ফাঁকেফোকরে। পরিচিতি পর্ব তাই আগেই দিলাম।

ম্যাচ শুরু হতে চলেছে। জনা সাতেক খেলোয়াড় মুন্ডগুলো একজায়গায় জড়ো করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই মনুষ্য গুহার গভীর গহ্বরে উপবিষ্ট এক ধ্যানী কিশোর। হাঁটু মুড়ে কোলে তাল নিয়ে বসে। রেফারির এক বালতি জল শুন্যে উড়তে উড়তে এসে পড়ল ছড়াৎ করে। খেলোয়াড় সুলভ জলাঘাত দ্বারা ম্যাচের শুরু। শুরুতেই দেখা যাচ্ছে কোঁধাপাড়ার রাজুর কোমরে চেপে বসেছে বামুনপাড়ার সুমন। হ্যাঁ হ্যাঁ চালিয়ে যা!!!! ভটচাজদার দরাজ গলার মন্দ্রধ্বনিতে দাসান বুড়ির দাঁতের পাটি নড়ে গেলো। ততক্ষণে পিছন থেকে সুমনের ঠ্যাং টেনে ধরেছে সিংবাড়ির নিতাই। গুড্ডু আর বিশু এতক্ষণ এদের পায়ের ফাঁকে লুকোচুরি খেলতে খেলতে পায়ের ভিড়ের সেন্টার পজিশনে চলে গেছে।

ঘোষ কত্তা চেঁচিয়ে উঠলেন নিতায়ের ফাউল…. এই হুড়োহুড়িতে পেঁচিয়ে লেপ্টেলুপ্টে থাকা ছজন যোদ্ধা অক্টোপাসের মতো জড়াজড়ি গড়াগড়ি তথা তালগোল পাকাতে থাকে তাল নিয়ে। ছড়াৎ ছড়াৎ করে বাজতে থাকে বালতি বালতি রেফারির জল। গুড্ডু আর বিশু জিতবে কিনা, সে চিন্তায় মজুমদারদের মিতাদি নখ খেয়ে পেট ভরিয়ে ফেলেছে। ওদিকে সুমনের খেলোয়াড়সুলভ ব্যাকড্রপ দেখে উত্তেজনায় চক্রবর্তী বৌদি ভটচাজদার হাত এমন কষে ধরেছেন যে আর ছাড়ানো যাচ্ছে না। একেবারে কচ্ছপের কামড়।

হঠাৎ করে কুন্ডলীকৃত মনুষ্যতাল থেকে অফসাইডে চলে গেলো রাজু। সে তার সর্বস্ব শক্তি খরচ করে লম্বা জিভ দিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ করছে দেখে, মেডিক্যাল টিম এসে মুখে জলের বোতল ঠুসে তাকে মাঠ থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলো। বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে নিমতলার আশীষ আর রক্ষাকালীতলার ফুলেশ ঝাঁপিয়ে পড়ল জানপ্রাণ লড়াইয়ে। লড়াই জমে উঠেছে। সম্পা, টুম্পা, গোপা, নীপারা বিজয়ী না দেখে ঘরে ফিরবে না, এদিকে মা’রা কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করছে রান্না বসাতে হবে বলে। কিন্তু এরা পা জমিয়ে বসে আছে। ম্যাচে এখন প্রবল উত্তেজনা।

এরই ফাঁকে ঘুঁষোঘুঁষির চোটে, গড়াতে গড়াতে তাল হাত ফস্কে পাশে পুকুরের জলে হাবুডুবু। ঝপাঝপ খেলোয়াড়রা ঝাঁপাল। সারা পুকুর তোলপাড় করে জলকেলি করছে এখন তারা। কিন্তু না, তাল কারো মুঠোয় এখনও আসেনি। দর্শকদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা। এদিকে আঁটি ভুঁতি বেরিয়ে তালের মরমর দশা। কিন্তু খেলার প্রাণ যাতে নিভে না যায়, সেজন্য পুকুরে আরো একটি তাল ছুঁড়ে দেওয়া হল। উফফ! পুকুরের পাড়ের কাছে থাকা গুড্ডুর হেডে তাল ঠোক্কর খেয়ে ঘুরে ব্যাকভলি কায়দায় সেই পুরনো মাঠে। মাঠে তাল পড়তে না পড়তেই খেলোয়াড়েরা টানা হেঁচড়া করে
পুকুর ছেড়ে ডাঙায় হামলে পড়ল। খেলার শক্তি আর প্রায় শেষের দিকে।

দেখা গেলো গুড্ডু আর বিশু কুন্ডলী থেকে মুখ চুন করে ফিরে আসছে। হাতে তালের ছেঁড়া অংশ বিশেষ। বোঝা যাচ্ছে ম্যাচ আর বেশিক্ষণ নেই। দর্শকাসনের যে সব ভীম পালোয়নেরা গামছা, লুঙ্গি জড়িয়ে প্রস্তুত হচ্ছিল ম্যাচে অংশগ্রহণের আশায়। তাদের উৎসাহে এক বালতি জল ঢেলে রেফারির ঘোষণা, খেলা আর মাত্র পাঁচ মিনিট। বলতে বলতেই সুমনের হাতের কনুই আর ডান পায়ের পাতা দেখা গেছে যদিও জল কাদায় মাখামাখি হওয়ার দরুন সবাই একাকার। হ্যাঁ সুমন, সেই আগের বারের বিজয়ী বীর সুমন। এবারেও হাতে ‘হ্যান্ডতাল’টি ধরে প্রতিপক্ষদের ধরাশায়ী করে তাদের কাঁধের উপর দিয়ে মাথায় চড়েছে।

সে যে অবশ্যই সুমন এটা জানার জন্য রেফারি আরেকবার জলাঘাত করলেন। ম্যাচ শেষ। তাল হাতে নিয়ে গর্বিত দৃপ্ত পদক্ষেপে সুমন বাড়ির দিকে ধীরে ধীরে এগোয়। তালগাছের এই বিশুদ্ধ কালো পাকা তালে একমাত্র তারই অধিকার।

#বকবকম

Keep reading

More >