এক ডক্টর কি খোঁজ

মাঝে মাঝে ডাক্তার বাবুরা দেবদূতের মতো অবতীর্ণ হন আর্ত-ত্রাণের জন্য, খুব ‘অসুখী’ না হয়েও আমি তা বিশ্বাস করি।  বিয়ের পর …

মাঝে মাঝে ডাক্তার বাবুরা দেবদূতের মতো অবতীর্ণ হন আর্ত-ত্রাণের জন্য, খুব ‘অসুখী’ না হয়েও আমি তা বিশ্বাস করি।  বিয়ের পর নতুন বউয়ের কাছে আমার মানরক্ষা করেছিলেন এক ডাক্তারবাবু, সে কথা এত বছর পরেও মনে পড়ে| তাঁর মতো একজন ডাক্তারের খোঁজ না পাওয়ায় আমি ধীরে ধীরে আবার হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছি।

না না, তিনি কোনও গুপ্তরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন না; আর শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে আমি সেসব সমস্যামুক্ত।

তাহলে ব্যাপারটা খুলেই বলি।

তখন চাকরিসূত্রে এক কোলিয়ারির টাউনশিপ-এ কোম্পানির দেওয়া কোয়ার্টার-এ থাকতাম।  টাউনশিপ মানে কিন্তু ‘টাউন’ নয়, মাঝদরিয়ার জাহাজের সঙ্গেই তার মিল ছিল বেশি।  টাউনশিপে একটা ছোট বাজার ছিল, সেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যেত।  একটাই আড়ে বহরে বড় দোকান ছিল; গরমের শুরুতে এয়ার কুলার আর শীতের শুরুতে রুম হিটার বিক্রি করত, সঙ্গে দুচার খানা টিভি ফ্রিজও রাখা ছিল।

টাউনশিপ-এ একটা হাসপাতাল ছিল, আশেপাশের সব কোলিয়ারির লোক ওখানে আসত ডাক্তার দেখাতে।  টাউনশিপের একটা অঞ্চলে সারিবদ্ধ লোহার গেটওয়ালা বাগান ঘেরা বাড়িতে ডাক্তারবাবুরা থাকতেন, ওখানকার ভাষায় ‘সি টাইপ’ কোয়ার্টার।  ডাক্তারদের খুব খাতির ছিল ওখানে, অনেকের সঙ্গেই আমার ভালো পরিচয় ছিল।  অস্থি-বিশেষজ্ঞ ডঃ গুপ্তা ছিলেন খুব আমুদে মানুষ, অবসর সময়ে হৈচৈ আড্ডায় মেতে থাকতেন।

ওখানে একটা হোটেল ছিল; তারকা খচিত নয়, পিদিম জ্বলা; দুবেলা ওখানেই খেতাম।  কাজের চাপ না থাকায় বগল বাজিয়ে ঘুরে বেড়ানোর ফলে শিগগিরই একটা নোয়াপাতি ভুঁড়ির আভাস দেখা দিল।  ছুটিতে বাড়ি গেলে ভুঁড়ি দেখে শুভানুধ্যায়ীরা চিন্তিত হয়ে পড়লেন।  দুবেলা হোটেলের মশলাদার খাবার, একা থাকা, অসুখ বিসুখ বিপদ আপদে কেউ দেখার নেই ইত্যাদি আলোচনাগুলো ইচ্ছে করেই টেনে লম্বা করতাম এবং গুরুজনরা মনোগত ইচ্ছেটা বুঝতে পেরে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান করলেন।  সুতরাং আমি বাধ্য ছেলের মতো পরের ছুটিতে বিয়ে সেরে নতুন বৌ নিয়ে টাউনশিপের কোয়ার্টারে ফিরলাম।

দিনকয়েক যেতে না যেতেই নতুন বৌয়ের মন ভোলাতে এবং নিজেকে দায়িত্ববান প্রমাণ করতে এক দূর্বল মুহূর্তে অতি উৎসাহে একটি টিভি আর একটি ফ্রিজ কেনার কথা বলে বসলাম; এবং সেটা সাতপাঁচ না ভেবেই। বউয়ের মৃদু আপত্তি তখন আমার ভালোবাসার সামনে কুটোর মত উড়ে গেল।

তখনও মাছের বাজারে গেলে প্রশ্ন শুনতে হত – ‘লোকেল’ না ‘ডাঙ্কেল’; যার অর্থ দেশি না চালানের মাছ। অর্থাৎ দেশে জাতীয়তাবাদী হাওয়ার প্রাবল্য একটু কমে পশ্চিমি হাওয়া ঢুকেছে; কিন্তু পীত নদীর দিক থেকে পূবালী হাওয়া বইতে শুরু করলেও তাতে তেমন জোর নেই। সুতরাং হিসেব করতে বসে আমার চুল খাড়া হয়ে গেল, ওসব টিভি ফ্রিজ ইত্যাদির দাম তখন একটু বেশিই ছিল। সে সময় কত নম্বর পে-কমিশন ছিল খেয়াল নেই, তবে ‘পে’ কম ছিল পাক্কা মনে আছে। বিয়ের পরে ব্যাঙ্কের খাতাও শূন্য, ক্রেডিট কার্ডের নাম শুনেছি কিন্তু চোখে দেখিনি তখনও। তবু নতুন বউ কে দেওয়া, ‘মরদ কা বাত’ রাখার তাগিদে একদিন সন্ধ্যেবেলা বউকে নিয়ে দোকানে হাজির হলাম।

দোকানে ঢুকেই দেখি ডঃ গুপ্তা বসে কথা বলছেন, আমাকে দেখেই স্বভাব আমুদে ডাক্তারবাবু হই হই করে উঠলেন, নমস্কার নমস্কার।

হেসে প্রতিনমস্কার জানালাম। বউয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম, দুজনের নমস্কার বিনিময় হল।

দোকানদার হেসে নমস্কার করলেন, বসার জন্য চেয়ার এগিয়ে দিলেন; সহকারীকে চায়ের ব্যবস্থা করতে বললেন। সে যুগে দোকানে গেলে বসতে দিত, এবং স্থান কাল পাত্র বিশেষে চা-লস্যি-কোল্ড ড্রিঙ্কস এসব খাওয়াতো, তাই আপত্তি করলাম না।

ডাক্তারবাবু ছদ্ম অভিযোগ জানালেন বিয়ের নেমন্তন্ন না পাওয়ার জন্য, আমি কথা ঘোরালাম। উনি পাত্তা না দিয়ে নিজস্ব মুডে গপ্পো জুড়লেন আমার বউয়ের সঙ্গে – বাড়ি কোথায়, এখানে অসুবিধে হচ্ছে কিনা, সময় কাটছে কি করে, কত্তা সময় দিচ্ছে না এখনও গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি।  প্রসঙ্গ উঠতেই জানিয়ে দিলাম, সময় কাটানোর উপায় হিসেবেই টিভি কিনতে দোকানে আসা।  আরও কিছুক্ষণ গল্প করে ডাক্তারবাবু বিদায় নিলেন।  যাওয়ার আগে দোকানের মালিককে পইপই করে বলে গেলেন, নতুন অতিথির কাছে যেন টাউনশিপের মান বজায় থাকে।

ডাক্তারবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পরে জিনিসপত্র বাছাই হল, ভালমন্দ বাছবিচার হল, চালিয়ে দেখা হল।  তারপর মালিকের কাছে কুণ্ঠিত কণ্ঠে আসল কথাটা পাড়লাম, মানে পুরো টাকা একবারে মেটাতে পারবো না জানালাম। ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না; দোকানদার তেমন পরিচিত নয় যার কাছে ধার চাওয়া যায়।  তাছাড়া দোকানের বাইরে বড়বড় করে “ইএমআই @ 0% ইন্টারেস্ট”, তার নিচে খুদি খুদি অক্ষরে ‘T&C এপ্লায়েড’ লেখা তখন খুব একটা চালু হয়নি, তাই বুক ফুলিয়ে ধার করা একটু অসুবিধেজনক ছিল বৈকি!

আশাতীত ভাবে মালিক একগাল হেসে বললেন, যা পারেন দিন, পরে ধীরে সুস্থে বাকিটা দেবেন।  উনি এককথায় রাজি হওয়ায় আমিও ছাতি ফুলিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম, ভদ্রতাবশে এক মাসের সময়সীমা নিজের থেকেই জানিয়ে দিলাম।  উনি পরেরদিন সকালে দুটো জিনিস বাড়িতে পৌঁছে দেবেন বললেন।

দুজনেই খুশি হয়ে ঠিক আছে ঠিক আছে করলাম খানিক।  মালিক রসিদ লেখা শুরু করলেন।  প্রথমে জিনিসপত্রের বর্ণনা, দাম ইত্যাদি লিখে, এখন কত দিচ্ছি, বাকি কত রইল সে সব হিসেব লিখলেন।  এটা একটা অদ্ভুত রীতি, রসিদের মাথায় নাম ঠিকানা শেষে লেখা হয়, বহু দোকানেই দেখেছি, কেন জানিনা।  সব শেষে রসিদের মাথায় কলম ঠেকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – স্যার, আপনার পুরো নামটা?

নাম বললাম।  নামটা ঠিকঠাক লেখা হল কিনা দেখার জন্য উঁকি মেরে দেখি নামের আগে ‘ডঃ’ লেখা।

কিছু বলার আগেই প্রশ্ন এল – ঠিকানাটা স্যার?

ব্লক আর কোয়ার্টার নাম্বার বললাম।  সঙ্গে আগবাড়িয়ে ডানদিক বামদিক তারপরে সোজা একটু গেলেই ইত্যাদি বোঝাতে লাগলাম। কথা বলতে বলতে দেখলাম ওনার মুখটা হাঁ হয়ে গেছে।  আমি থামতেই উনি বললেন, সি-টাইপ কোয়ার্টার নয়?  ডাক্তারদের জন্য তো সি-টাইপ দেয়!

বিনয়ের সঙ্গে বললাম আমি তো ডাক্তার নয় দাদা, জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের তো বি-টাইপ।

হতভম্বের মতো কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন ভদ্রলোক। তারপর রশিদ বইতে কলম ঠুকতে ঠুকতে খুব গম্ভীর ভাবে বললেন, মাসখানেকের মধ্যে টাকা মিটিয়ে দেবেন তো!

তারপর বিড়বিড় করে বললেন, ডঃ গুপ্তার সঙ্গে এত কথা বললেন, আমি ভাবলাম নতুন ডাক্তার এসেছেন।

মনে মনে হাসলাম, আমাকে ডাক্তার ভেবে ভবিষ্যতে চিকিৎসার সুবিধের আশায় এত খাতিরযত্ন করেছেন ভদ্রলোক, বিনা দ্বিধায় ধার দিতে রাজি হয়ে গেছেন; কিন্তু ডাক্তারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকতে হলে ডাক্তার হতে হবে এমন কোনও আইন নেই সেটা ভুলে গেছেন। এখন পেন ঠুকলে আর কি হবে! মুখের ওপর নতুন করে আর না বলতে যে উনি পারছেন না, সে আমি ততক্ষণে বুঝে গেছি।  দোকান ছাড়ার আগে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে পরদিন সকালে জিনিসপত্র বাড়িতে পৌঁছে দেবেন বললেন ভদ্রলোক; আরও একবার একমাসের সময়সীমা মনে করিয়ে দিলেন।

তবে আমিও কথা রেখেছিলাম, টাকা আমি সময়ের আগেই মিটিয়ে দিয়েছিলাম। টিভি, ফ্রিজ দুটোই বহুদিন কোনও সমস্যা ছাড়াই চলেছিল। নতুন বৌ শুধু নয়, নতুন বাচ্চারাও সেসব ব্যবহার করেছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চোদ্দ ইঞ্চি টিভি আর একশো পঁয়ষট্টি লিটার ফ্রিজ পাল্টে বাড়িতে চব্বিশ ইঞ্চি আর দুশো দশ এসেছে। কিন্তু ডঃ গুপ্তার কথা ইদানিং খুব মনে পড়ে, বিশেষ করে পঁয়ষট্টি কি বাহাত্তর ইঞ্চি প্লাজমা টিভির বিজ্ঞাপন দেখলে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারদের কাছে যাতায়াত বেড়েছে, ওষুধ খাই, অসুখ সারে। কিন্তু পুরোনো বৌয়ের সামনে নতুন করে আমার ‘মর্দাঙ্গী’ প্রমান করতে সাহায্য করার মতো ডাক্তারের সাক্ষাৎ আর পাইনি। পেলে নাহয় ধারবাকিতে টিভি ফ্রিজের সঙ্গে নতুন একটা বৌও আনার কথা ভাবতাম।

Keep reading

More >