এমনি কথা

মফঃস্বলের অনেকগুলো পাড়ার পাশেই আস্ত একটা নদী থাকে, তাতে আজীবনকাল ধরে ভেসে যায় কচুরিপানার ঝাঁক। নদীর ধারে বড় শিশুগাছে বাসা …


মফঃস্বলের অনেকগুলো পাড়ার পাশেই আস্ত একটা নদী থাকে, তাতে আজীবনকাল ধরে ভেসে যায় কচুরিপানার ঝাঁক। নদীর ধারে বড় শিশুগাছে বাসা করে থাকে অনেক টিয়া, তার গভীর কোটরে ঘুমিয়ে থাকে গোখরো সাপ। দুটো বা তারও বেশি মাঠ থাকে এক একটা পাড়ায়, দল বেঁধে খেলা করে বেড়ানো একদল ইস্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়ে থাকে। একটা ভুতের বাড়ি থাকে, চেনা পাগল/পাগলী থাকে, আদর করে বাড়িতে ডেকে পুজোর থালার বাতাসা খাওয়ানো জেঠিমা/কাকীমা থাকেন, অন্ধকার হওয়ার পরে রাস্তায়  দেখলে বকুনি দেওয়া কাকু/জেঠুরাও থাকেন। খেলতে গিয়ে কেটে-ছড়ে গেলে ঝোপ থেকে পাতা ছিঁড়ে ডলে দেওয়া বন্ধু থাকে, ঝুলন দেখতে এসে পুতুল উঠিয়ে নিয়ে চলে যাওয়া বন্ধুও থাকে। কবিতার লাইন ভুলে যাওয়া রবীন্দ্রজয়ন্তী থাকে, সরস্বতীপুজোর ফুলচুরি থাকে।
মফঃস্বলের বাড়িগুলো মনে হয় একরকমই হয়। অল্প উঁচু পাঁচিল, গ্রীলের গেটের মাথায় মাধবীলতার ঝাড়। গেট পেরিয়ে উঠোন, উঠোনে তিন/চারটে গোলাপ, একটা জবা, একটা শিউলি, একটা রঙ্গন, একটা কামিনী গাছ, যার মাথা পৌঁছে যায় দোতলার ঘরের জানলা অবধি। উঠোন পেরিয়ে সাদা-কালো চক মেলানো বারান্দা, সেখানে একসাথে দুজন বসার একটা লম্বা চেয়ার। কোণের দিকে টেবিল থাকে, আরও কিছু চেয়ার। বারান্দার একদিকে রাখা থাকে জুতোর র‍্যাক আর পুরোনো সাইকেল।
ওই লম্বা চেয়ারে কেউ সকালে ব্রাশ নিয়ে বসে, কেউ চায়ের কাপ। বেলা বাড়লে হাতে ওঠে খবরের কাগজ। শীতের বেলায় রোদ এলে আলোয়ান মেলা থাকে, উঠোনে লোহার বালতিতে স্নানের জল গরম হয়। বিকালে আনমনে বসে থাকে কেউ, খালি চায়ের কাপের পাশে শোয়ানো থাকে তিন ব্যাটারির টর্চ, কখন লোডশেডিং হবে কে বলতে পারে। কেউ ঘড়ি দেখে, ট্রেনের সময় হয়ে এলো। টিভিতে চলে, “আজ কাল পরশু একদিন, সময়ের সমুদ্রে মিশে যায়…”, হাওয়ায় ওড়ে ঘরে বানানো ছোট ফুলছাপ সুতির পর্দা। একসময় গেটের সামনে রিকশা এসে থামে, গেট খোলার আওয়াজে জ্বলে ওঠে উঠোনের আলো, লোডশেডিং এ টর্চ নিয়ে কেউ দরজা খোলে।

তারপর বা তারও পরে…
মাঠে খেলা করা ছেলে মেয়েরা ইস্কুল কলেজের গন্ডী পার হয়, আকাশ বড় হয়, বড় হয় ডানা। 
মফঃস্বল ছোটো লাগে, শীর্ণ হয় নদীটা, টিয়ার ঝাঁক বাসা বদলায়, বুড়ো গাছ ঝড়ে ভেঙে যায়। মাঠ কমে যায়, বন্ধুরা কমে একে একে, কালবৈশাখী হাওয়ায় উড়ে যায় রবীন্দ্রজয়ন্তীর সামিয়ানা, স্নেহমাখা মুখগুলোতে বলিরেখা জীবনের অমোঘ নির্দেশ এঁকে দেয়। মফঃস্বলের পাড়াগুলোর ছবি বদলে যায়।
মাধবীলতার দিন ফুরায়,বারান্দায় রাখা সাইকেলে জং পড়ে, টর্চের ব্যাটারি পাল্টানোর দরকার পড়ে না আর, মফঃস্বলের বাড়িগুলো একলা হতে থাকে।
মফঃস্বলের বাড়িগুলো একলাই থাকে…

Keep reading

More >