ওই হোল

সুপ্রিয়া বেডরুমে এসে মোবাইলটা হাতে নিয়েই দেখতে পেলো সাতটা মিসড কল। সবকটাই ওর বোন সুচেতার নম্বর থেকে।সুপ্রিয়া কলব্যাক করতেই ওপাশ …

সুপ্রিয়া বেডরুমে এসে মোবাইলটা হাতে নিয়েই দেখতে পেলো সাতটা মিসড কল। সবকটাই ওর বোন সুচেতার নম্বর থেকে।সুপ্রিয়া কলব্যাক করতেই ওপাশ থেকে হ্যালো শুনতে পেলো।

সুপ্রিয়াঃ “সরি, সরি, সরি রে- সাইলেন্সার লাগানো ছিল। একদম শুনতে পাই নি।”

সুচেতাঃ “সে আর নতুন কি। কিন্তু তন্ময়দা,বাচ্চারা সব ঠিক আছে তো? কাউকে হাসপাতালে দিতে হয় নি?

সুপ্রিয়াঃ “ও আবার কি অলুক্ষুণে কথা? হঠাৎ হাসপাতালের কথা উঠছে কেন?”

সুচেতাঃ “না, মানে সাইলেন্সার তো সাধারণতঃ বন্দুক পিস্তলে লাগায়। তোরতো আবার ওসব চালানোর অভ্যেস নেই কিনা- তাই জিজ্ঞেস করছিলুম।”

সুপ্রিয়াঃ “ওই হোল। তুই মানেটা তো ঠিকই বুঝেছিস। খামোখা রাজ্য শুদ্ধু লোকের ভুল ধরে বেড়াস। জানিস সারদা মা কী বলেছেন?

সুচেতাঃ “পরে শুনবো। তুই আগে কাজের কথাটা শোন।—-”

সুপ্রিয়ার সব ভালো। কিন্তু ওই এক দোষ। এমনিতে এমন নয় যে ইংরাজিটা কম বোঝে। সে হোল গিয়ে ইংলিশ মিডিয়াম হাইস্কুলের হিস্ট্রি টীচার। তৈমুর লঙ থেকে কুতুব্বুদ্দীন আইবক সব্বার নাম গড়গড় করে বলতে পারে। শুধু রোজকার কথা বলতে গেলেই এরকম উল্টোপাল্টা বেরিয়ে পড়ে।

সেদিন তো তন্ময়ের সাথেই এই সব নিয়ে এক চোট হয়ে গেলো। তন্ময় মাসকাবারি বাজার করে নিয়ে এসেছিলো।

তন্ময়ঃ “শোনো, জুনিয়ার হরলিক্সটা পাই নি। সাপ্লাই আসছে না বলছে। রবিবার এনে দেবে।”

সুপ্রিয়াঃ “সে কি! টুবু, বুবু তো ওগুলো ছাড়া দুধ একদম মুখেই তুলবে না। কমপ্লান টমপ্লান কিচ্ছু পেলে না?”

তন্ময়ঃ “কিন্তু তুমিতো হরলিক্স লিখে দিয়েছিলে!!”

সুপ্রিয়াঃ “ওই হোল। মানেটা ঠিক করে বুঝতে হবে। আমি যখন তোমাকে জেরক্স করে আনতে বলে ছিলাম তখন কি তুমি ফটোকপি মেশিনের কোম্পানির নাম দেখতে গেছিলে? নাকি ডালডা আনতে বললে তুমি ডালডা কোম্পানির তেল এনে হাজির হবে?”

তন্ময় বেচারী একে ভালো মানুষ। তার ওপর আট বছর হয়ে গেলো এই বউ নিয়ে ঘর করছে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে সে আবার কমপ্লানের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। তবে মনে মনে ভাবলো “যে মেয়ে এই ভাবে যুক্তি-তক্কো করে নিজের ভুল জাস্টিফিই করতে পারে সে মেয়ে মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয়”।

এমনি করেই দিন যাচ্ছিলো। বোন, বন্ধু, বর সব্বাই সুপ্রিয়াকে হাড়েহাড়ে চিনে গেছে। তাই সে এখন কাউকে শ্যামবাজারে রীবকের দোকানের সামনে দাঁড়াতে বললে সে বিনা বাক্যাব্যয়ে বাগবাজারে বাটার সামনে গিয়ে  দাঁড়িয়ে থাকে। কাজেই খুব একটা অসুবিধা হচ্ছিলো না।

কিন্তু চির দিন কাহারো সমান নাহি যায়। সুপ্রিয়ার ছয় বছরের মেয়ে টুবু ক্লাস ওয়ানে পড়ে। ইংলিশ মিডিয়াম, তাই বাংলাটা দেরীতে শিখছে। সে সেদিন বাংলা ক্লাসে ‘ঐ’ দিয়ে ‘ঐরাবত’ না লিখে লিখেছে ‘হাতি’। আবার টীচারের মুখেমুখে বলে এসেছে “ওই হোল। মানেটা তো একই আছে।” তারপর যা হয় আর কি। গারজেন কল। সুপ্রিয়ার ঘরেবাইরে খোঁটা। এমন কি তন্ময় অব্দি বলে বসলো—“মা কি বেটি, সিপাহি কা ঘোড়া—”।

সেই থেকে সুপ্রিয়া ভীষণ সাবধান হয়ে গেছে। ভুল কথা বলা আর চলবে না। প্রায় দু’সপ্তাহ হতে চললো সে এখন একদম অন্য সুপ্রিয়া।

স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করতেই তিনটে ভয়েস মেল। সুচেতা ফোনব্যাক করতে বলেছে। হাতপা না ধুয়েই  সে বোনকে ফোন করতে বসলো।

সুচেতাঃ “তোরতো আগে অ্যাটলিস্ট মিসড কল হ’ত। এখন ভয়েস মেল হচ্ছে। ব্যাপারখানা কী বলতো?

সুপ্রিয়াঃ “সরি, সরি, সরি রে-ফোনটা ব্যাগে চাপাচাপিতে হেলিকপ্টার মোডে চলে গেছিলো।”

তারপর আর কি! বোনের অট্টহাসি,প্রচার। তন্ময়ের টিপ্পনি “অঙ্গার  শত ধৌতেন—”। সুপ্রিয়া দু’একবার আস্তে করে “ওই হোল” বলতে গেছিলো। কিন্তু সবার হাসিতে সে আর কেউ শুনতে পায় নি।

Keep reading

More >