করম পরব

করম পরব     আষাঢ় শ্রাবনের অঝোর বর্ষণের পর মাটির নরম বুকে বীজ বপন হয়। সেই বীজ থেকে চারাগাছ- ফুল- ফলে পরিণতি। …

করম পরব

    আষাঢ় শ্রাবনের অঝোর বর্ষণের পর মাটির নরম বুকে বীজ বপন হয়। সেই বীজ থেকে চারাগাছ- ফুল- ফলে পরিণতি। এ যেন এক স্বপ্নের বপন। জীবনের বুনে যাওয়া। তাই ভাদ্র মাসে সোনা রোদ উঁকি দিলেই আদিম জীবনও মাদলের তালে দুলে ওঠে। শুরু হয় করম পরব। ভাদু ছাড়াও ভাদ্র মাসে পশ্চিমবঙ্গের মানভূম এলাকায় করম একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উৎসব। এই সময় হো, খেড়িয়া, শবর, মুন্ডা, মাহাতো, বীড়হড়, কূরমী, সাঁওতাল, এইরকম আরো অনেক উপজাতি—এককথায় সমগ্র আদিবাসীদের জীবনশৈলী ও যাপন পদ্ধতি উৎপাদিত শস্যের উপর বহুল পরিমাণে নির্ভরশীল। মাঠের সবুজাভের সঙ্গে মিশে যায় প্রাণের খুশি। মন নেচে গেয়ে ওঠে নীল –সাদা- ঘন মেঘের লুকোচুরিতে। স্বভাবতই করম পরব নাচে, গানে, গল্পে যেন এক সম্পূর্ণ জীবনগাথা। আর হবে নাই বা কেন এ পরব যে প্রকৃতির কোল ঘেঁষা সন্তানদের প্রধান বড়  পরব।

  ভাদ্রমাসের শুক্ল পক্ষের একাদশীর দিনে এই পরব অনুষ্ঠিত হয়। পুজোর রীতি হল– গ্রামবাসীরা জঙ্গলে   গিয়ে পুজোর জন্য কাঠ, ফুল, ফল সংগ্রহ করার সময় ‘করম’ গাছের একটি ডাল কেটে ‘করম দেবতা’ রূপে গ্রামে নিয়ে আসে। ঐ কাটা ডালটিকে বলা হয় ‘করম রাজা’। ‘করম রাজা’ কে মাটিতে পুঁতে জল দিয়ে , বাতি জ্বালিয়ে, দুধ- ঘি দিয়ে পুজো করা হয়। পরের দিন করম ঠাকুরকে ফুল দিয়ে পুজো করে চাল এবং দই প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হয়। প্রসাদ দেওয়ার নির্দিষ্ট নিয়মটি হল লাল ঝুড়িতে গম রেখে শসা ও হলুদ দেওয়া হয়। পুজোতে যারা উপোস করে থাকে পুজো শেষে তারা এগুলো খায়। যুবক আদিবাসীরা বার্লির বীজ হাতে নিয়ে সারারাত আরাধনা চালায়। বাবা মা’রা সন্তান, পাড়াপ্রতিবেশী, তাদের আত্মীয় পরিজন, দূর প্রবাসী ভাই বা বোনকে নিয়ে নতুন জামাকাপড় পরে আনন্দে মাতে।

   ভাদুর মত বিষাদগাথা না হলেও এই পরবের অভ্যন্তরেও এক গল্পকথার ফিসফাস শোনা যায়। কোনো এক গ্রামের সাত ভাই ফসল উৎপাদন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, বউরা মাঠে তাদের খাবার নিয়ে যায়।, কিন্তু একদিন এর ব্যতিক্রম হলে ক্ষিধের জ্বালা নিয়ে ঘরে ফিরে সাত ভাই দেখে বউরা ‘করম গাছ’কে ঘিরে নাচগান করছে। তখন রাগে সাত ভাই সেই ডাল ছুঁড়ে ফেলে দিলে তাদের সংসারে অনটনের করাল ছায়া নেমে আসে। সেসময় এক ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী এসে তাদেরকে উপদেশ দেয় ‘করম পুজো’ করার জন্য। এই যে ব্রতমূলক গল্প এটি পুজো প্রচার করার জন্য না কি এর কোনো বাস্তবতা আছে তা গভীর গবেষণাযোগ্য। তবে এখান থেকে বেরিয়ে আসা প্রধান বক্তব্য বিষয়টি হল- কৃষিকাজ এবং নাচ, গান। করম পরবে এই তিনের প্রাধান্য।  

    সে কারণেই বোধহয় ‘জাওয়া’ ও ‘করম’ পরব একে অপরের পরিপূরক। ভাদ্র মাসের একাদশীর তিন, পাঁচ বা সাতদিন আগে থেকে খুব ভোরে কুমারী মেয়েরা বন থেকে শালের দাঁতন কাঠি ভেঙে নিয়ে আসে। তারপর স্নান করে ডালায় কিংবা চুপড়িতে পুকুর বা নদীর বালি ভরে তার উপর মুগ, কলাই, অড়হড়, গম ও ধান প্রভৃতি শস্যের বীজ ছড়িয়ে দেয়। এই বীজগুলির উপর হলুদগোলা জল ছিটিয়ে দাঁতন কাঠিগুলো ভেঙে কম্পাস কাঁটার মতো ডালার বালিতে পুঁতে দেওয়া হয়। এই ডালাটিকে ‘জাওয়া ডালি’ বলে। ডালাটিকে সযত্নে কোঠাঘরের ভিতরে কোনো উঁচু জায়গায়, তক্তায় কিম্বা শিকেতে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ‘জাওয়া ডালি’কে কোথাও কোথাও ‘দৌড়া’ও বলা হয়। এরপর প্রতি সন্ধ্যায় কুমারী মেয়েরা সবাই মিলে ডালাটির চারপাশে ধরে গান গাইতে গাইতে উঠোনে নিয়ে গিয়ে পরস্পর হাত ধরাধরি করে নৃত্য পরিবেশন করে থাকে—

     “ঈদ করম ল’জকাল্য ভাই আল্য লিতে ল

      আস্য ভাই বস্য পিড়ায় বেউনী দলাই দিব।“

অর্থাৎ নববিবাহিতা বধূরা ঈদ করমের দিনে পিতৃগৃহে যাবার ছাড়পত্র পায়। সেজন্য শ্বশুরালয়ে অম্লানবদনে  সব দুঃখ কষ্ট সহ্য করে থাকে। এই ‘জাওয়া’ তাই ‘করম’ পরবেরই অংশবিশেষ।

     তাহলে শুধু শস্যউৎসব নয়। এ হল জীবনের উৎসব, ভালোবাসার বাঁধনের উৎসব। প্রেমের উৎসব। তাইতো করম রাজা আর করম রানীকে (দুটি গাছের ডাল) সুতো দিয়ে গাঁটছড়ার মতো বাঁধা হয়। দুটি ডাল আসলে সূর্য ও পৃথিবীর প্রতীক। এই অনুষ্ঠানটি কোথাও কোথাও আদিবাসীদের বিয়েরও অনুষ্ঠান। সেকারণে করম পুজোর মন্ডপে সাপ ছেড়ে দেবার রীতিও আছে, কারণ ‘সাপ’ প্রজননের প্রতীক। তাই তো নাচে গানে আদিম জীবন ঠিকরি দেয়—

    ১। ‘পাকিল ফাটিল ডালিম চোরে তুলে খায় হে’

 

    ২। ‘বাঁধ বাঁধালে না বাঁধালে ঘাট হে,

       ডালিম লাগাই বধূ গেল পর দেহ হে।‘

    ৩। ‘এমন সময় বঁধু ঘরে আমার নাই হে

       একদিনকার হলেদ বাঁটা দুদিনকার বাসি লো,

      মা বাপকে বল্যে দিহ, বেজাঞ সুখে আছি লো।‘

    ৪। ‘বাসি ভাতে নুন লঙ্কা লুচির মজা পুরি হে

       নৌতন পিরিতির মজা চোখ ঠেরাঠেরি হে।‘

আবার শ্রেণী সুখ দুঃখ, হাসি- কান্না, আনন্দ উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশও থাকে—

    ১।“ আমার বঁধু হাল করে কেঁদে কানালির ধারে।

      হায় হায়—মাথার ঘাম চোখে পড়ে,

         দেখি হিয়া ফাটে।“

  ২। “আদাড়ে বাদাড়ে ঝিঙ্গা ঝিঙ্গায় শুধুই

                  জালি হে,

    ননদ মাগী ছল ছল তুলে ডালি ডালি হে”

অন্যদিকে গভীর জীবন দর্শনেরও পরিচয় পাওয়া যায়।

  “সাঁঝে ফুটে ঝিঙ্গাফুল

    সকালে মলিন

    আজ কেনে বঁধুর

   বদন মলিন হে?

   সাঁঝে ফুটে ঝিঙ্গাফুল

   সকালে মলিন”

অর্থাৎ ঝিঙ্গাফুলের সৌন্দর্য যেমন ক্ষণস্থায়ী, মানবজীবনও তেমনি ক্ষণস্থায়ী। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকে আনন্দময় করে তোলাই মানব জীবনের অন্যতম লক্ষ্য।  

 এইভাবে দুকলি চারকলি  করম গানের কোনো শেষ নেই পাশাপাশি উদ্দাম নৃত্যেরও শেষ নেই। মূলত নাচ ও গান ছাড়া করম পরব কল্পনাই করা যায় না। করম নাচের প্রকার অনেক দাঁড়শাল্যা, দাঁড়ঝুমুর, পাতাশাল্যা, ঝিঙ্গাফুল্যা প্রভৃতি। ‘দণ্ড’ থেকে দাঁড়। দন্ডায়মান অবস্থায় নৃত্যগীত করা হয় তাই দাঁড়শাল্যা। আর যেখানে ঝুমুরের বোল প্রাধান্য পায় তখন তা হয়ে ওঠে দাঁড়ঝুমুর। এভাবেই ঝিঙ্গাফুল। একসময় এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই আদিবাসী সমাজ জীবনে স্বামী স্ত্রী বা জীবনের সখা সখী নির্বাচন করা হত বলে এই নৃত্য গীত ‘পাতাশাল্যা’ নামেও পরিচিত। এছাড়াও এই পরব উপলক্ষ্যে পাতা শুদ্ধ ডালকে কেন্দ্র করে নাচ হয় বলেও এর নাম পাতা নাচ। সারাদিনের খাটাখাটনির শেষে চলে উদ্দাম নৃত্য গীতের আসর। হাসি আনন্দের বিনিময়। কখনও নেহাতই প্রেম ভালোবাসা, হাসি ঠাট্টা, কখনও সমাজের যৌথ সুখ দুঃখ, কখনও জীবনের গভীর দর্শন আবার কখনও বা শরীরের মুদ্রা ও গান দ্বারা ধান রোপন, ধান কাটার চিত্র প্রদর্শিত হয়।–

   “মহলের ভিতরে থাকি জানালায় নাম রাখি

    আমি শুব জানলার গড়াতে

    খোঁচা দিয়ে উঠাবে আমাকে…”

       যাই হোক এই মাটির সাথে মিশে থাকা তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলি বোঝে জীবন বড় ক্ষণস্থায়ী। ‘পদ্মপাতায় জল’, কিন্তু সে নিয়ে তাদের কোনো আক্ষেপ নেই। বরং তারা হেসে, নেচে, গেয়ে জীবন কাটায়। আর মনপ্রাণ ভরে ঈশ্বরে নির্ভর করে। তিনি যা করবেন তাই হবে। এটাই এই আদিবাসী মানুষগুলির যাপন প্রক্রিয়া। উপবাসী হয়ে কৃচ্ছ্রসাধনায় প্রাণের সমস্ত কোলাহলকে নিস্তব্ধ করে দিতে হবে তা তারা মনে করে না বলেই বোধহয় হাড়িয়া, নৃত্য, গীত, প্রেম ভালোবাসার বাঁধন ছাড়া তাদের উৎসব যাপন হয় না—

    “ কিবা লয়ে আলি রে মন কিবা লয়ে যাবি,

        এমন সুন্দর দেহ মাটিতে মিশাবি,

       রে মন, এ ভব সংসার ছাড়ি যাবি।“

   

  এই জীবনের উৎসবই করম পরবের মূল কথা।

Keep reading

More >

মানদন্ড