কল্প বাস্তব

দিন দিন জিনিসপত্রের দাম এত বাড়ছে, বিমলবাবু আর পেরে উঠছেন না- সামান্য কটা পেনশনের টাকায় । একমাত্র ছেলে অবশ্য বিদেশে …

দিন দিন জিনিসপত্রের দাম এত বাড়ছে, বিমলবাবু আর পেরে উঠছেন না- সামান্য কটা পেনশনের টাকায় ।

একমাত্র ছেলে অবশ্য বিদেশে থাকে ।
বারবার বলেছে,টাকা লাগলে বলো-পাঠাব, তবে বিমলবাবু নিতে চান না।

স্ত্রীর এবং নিজের ওষুধ কিনতেই তো মাসে হাজার দশেক মত বেরিয়ে যায় ।

মাছ ছাড়া বিমলবাবু আর তাঁর স্ত্রী খেতে পারেন না ।

মাছেরও যা দাম ! মাংস বলতে মুরগি, তাও ছিবরে লাগে ।
রেড মিট বলে খাসীর মাংস খেতে পারেন না দুজনেই ।
অবরে সবরে খেলেও, খাসীর মাংসর কেজি আবার প্রায় ছয়শো টাকা ।
পাঁচশ গ্রাম খেলেও তো তিনশো টাকা । শাক সব্জীর দাম তো প্রায় আকাশ ছোঁয়া ।

একটু ভাল চাল নিতে গেলেই আবার পঁয়তাল্লিশ টাকা কেজি ।

দম বন্ধ হয়ে আসে । কোথায় গেল সেই সব সোনালি দিন !
ভেবেই কান্না আসে বিমলবাবুর ।
রাতে শোবার আগে এই সবই ভাবছিলেন তিনি ।
হটাৎ দেখলেন-একজন সিড়িঙ্গে চেহারার লোক জানলা দিয়ে গলে এল ঘরে ।
ভয় পেলেন বিমলবাবু । চোর কি করে ঘরে ঢুকল? অবশ্য ঘরে বেশী নগদ নেই, সোনা দানাও ব্যাংকের লকারে ! তবু যদি কিছু না পেয়ে – রাগে দুজনকে খুন করে চলে যায়?
লোকটা বোধহয় বুঝল – বিমলবাবুর মনের কথা !
একটা চোঙার মত কি একটা দিয়ে বলল – ঘাবড়াবেন না । আমি বাংলা জানি না, তবে এই ট্র্যানশ্লেটার যন্ত্র দিয়ে বাংলায় কথা বলছি ।
আমি এসেছি ০৯ বি গ্রহ থেকে । এক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে এটা ।
আমাদের বৈজ্ঞানিকরা একটা টাইম মেশিন আবিস্কার করেছেন, যেটাতে চড়ে আপনি ১৯৬০ পর্যন্ত যেতে পারবেন । আপনার জন্মের পর ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত ।
তা, এটা পরীক্ষা করার জন্য একজন পৃথিবীর লোক খুঁজছিলাম । আমরা লোকেদের মনের ভাবনা টের পাই । প্রথমেই পড়ল আপনার বাড়ী । তাই ভাবলাম আপনাকে দিয়েই শুরু করি আমাদের এক্সপেরিমেন্ট ।
বিমল বাবু হাঁপ ছেড়ে বললেন – বেশ, তবে আমি কি যন্ত্রটায় চড়ে তখনকার বাজারে গিয়ে জিনিসপত্র কিনতে পারব?

স্বচ্ছন্দে, তবে পনেরো কেজির বেশী নয় আর আপনার বয়স কিন্তু সেই সময়ের হবে !
মানে ধরুন – আমার বয়স এখন ৬৭ । ৫০ বছর আগের ওই সময়ে গেলে কি আমার বয়স ১৭ হবে ? বিমলবাবু জিজ্ঞাসা ।
তাতো বটেই ! সেটাই তো বললাম !
ভারতের যে কোনো জায়গায় যেতে পারবো?
না, সেটার অনুমোদন নেই । তবে আপনি পশ্চিমবঙ্গের যে কোনো বাজারে যেতে পারবেন । আর কোনো আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করতে পারবেন না ।
দেখা করলে ?
পৃথিবী থেকে ভ্যানিস হয়ে যাবেন !
ওরে বাবারে না ! আমি বরং বাজার করে চলে আসবো । কতক্ষণ থাকতে পারব?
ঘন্টা খানেক খুব বেশী হলে !
তাতেই হবে ! আচ্ছা, টাকা পয়সার কি হবে?
এখনকার টাকা পয়সা নেবেন, তবে ওই সময়ে গেলে তখনকার টাকা পয়সাতে বদলে যাবে !
রাজী তো?
একদম ! কাল সকাল থেকেই শুরু করব ।
বেশ তবে নিন এই যন্ত্র । এটা আপনার কাছে থাকবে দশদিন ।
প্রতি তিন মাস অন্তর যন্ত্রটা মাসে পাঁচ দিনের জন্য পাবেন , আপনার বেঁচে থাকা পর্যন্ত ।
কতদিন বাঁচব?
সেটা বলব না, তবে এখনও বেশ কিছু দিন বাঁচবেন ।
আর ওষুধ? এখনকার ওষুধ গুলো তো তখন ছিল না !
এই যন্ত্রটা পরলে আপনার স্ত্রীর আর আপনার অসুখ অনেকটা কমবে ।
বেশ দিন । আমি কাল সকাল থেকেই শুরু করব আমার অভিযান ।
বেশ নিন । একটা ছোট চৌকো বাক্সের মত মেশিনটা । গায়ে শুধু স্পর্শ করে , বোতামগুলো টিপে আপনার সময় সেট করে চলে যাবেন । দেখিয়ে দিচ্ছি । অটোম্যাটিক এক ঘন্টা পরে যন্ত্রটা আর কাজ করবে না । আপনাকে তার মধ্যেই ফিরে আসতে হবে । এলেই আপনি আবার এই সময় চলে আসবেন ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে বিমলবাবু ভাবলেন – গত রাতের ঘটনাটা স্বপ্ন ছিল ।
কিন্তু, অবাক হয়ে দেখলেন- মেশিনটা বেড সাইড টেবলে পড়ে আছে ।
দুটো ঝোলা আর ১০ টাকার ১ টা নোট নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন । গিন্নিকে বললেন – বাজারে যাই !
বোতাম সেট করে চলে গেলেন – মালদহের ১৯৮০ সালের মকদুমপুর বাজারে । মদন বলল – টাটকা ইলিশ এসেছে । নেবেন নাকি বিমলদা?
কত করে রে?
১০ টাকা কেজি । একটা ২ কেজির ইলিশ দেখাল মদন । কি তার রং ! ঝকঝক করছে রূপোলি আঁশগুলো । একটু গোলাপি আভাও আছে । আর সারা শরীরটা ধনুকের মত না হলেও একটু ব্যাঁকা ।
১৫ টাকা দেব । দিবি?
লস হবে বিমলদা, আমার কেনাই ৭ টাকা করে । একটু বেশী দেন । যান আপনি ১৮ টাকাই দেন ।
বিমলবাবু আর দেরী না করে কিনে ফেললেন । কেটে দিল মদন ।
চাল কিনলেন পাঁচ টাকা করে ১০ কেজি ।
তারপর কচুর শাক, আর অন্যান্য শাকসব্জী । ঘড়িতে দেখলেন ৪৫ মিনিট কেটে গেছে । দেরি না করে চলে এলেন দমদমের ফ্ল্যাটে ।
এসেই একটা বাজে গন্ধ পেলেন । গিন্নির কাছে ঝোলা গুলো দিতেই – উনি রেগে বললেন, কোথা থেকে এই সাতজন্মের পচা মাছ আর শুকনো তরকারি গুলো নিয়ে এসেছো? ফেলে দিচ্ছি সব !
চাল গুলোও সব পচা ।
বিমলবাবু শোকে দুঃখে মুহ্যমান হয়ে যন্ত্রের সামনে বললেন – আগে তো বলেন নি, জিনিসগুলো পচা বেরুবে !
যন্ত্র থেকে উত্তর এলো – এটাই তো এখনও পারি নি আমরা । চেষ্টা করব । যন্ত্রটা মিলিয়ে গেল ।
বিমলবাবু দেখলেন – একটা একশো টাকার নোট সেন্টার টেবিলে পেপার ওয়েট দিয়ে চাপা পড়ে আছে ।

Keep reading

More >