কালের জন্ম

একটা অদ্ভুত ঘোরলাগা ভাব নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম, বোধোদয় দার বাড়ি থেকে। এরকম মাঝে মাঝে হয়, বোধোদয়দা মানুষটাই এরকম একেকটা …

একটা অদ্ভুত ঘোরলাগা ভাব নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম, বোধোদয় দার বাড়ি থেকে। এরকম মাঝে মাঝে হয়, বোধোদয়দা মানুষটাই এরকম একেকটা চিন্তা এমন করে মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে প্যাঁচ মেরে ছেড়ে দেবে, আড়াই দিন মাথাটা ভন ভন করবে। বোধোদয় ব্যানার্জীকে ‘দা’ বলে ডাকা একদিকে আমার স্পর্ধা আবার একদিকে আমার অধিকার। বোধোদয় বাবু আমাদের ক্লাস সিক্সে ইংলিশ ক্লাসে নির্দিষ্ট শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে ক্লাস নিতে আসেন। সেখানেই প্রথম একজন বাংলা মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক মাইকেল জ্যাকসনের নাচ দেখান, ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে বলেন। তখন উনি কি বলেছিলেন আজ আর মনে নেই, শুধু এটুকু মনে আছে, যদি কেউ ব্ল্যাক হোল পার করে পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে তাহলে সে এক সুদূর অতীত বা সুদূর ভবিষ্যতে চলে যাবে। বাকী কিছু না বুঝলেও এই কথাটুকু আমার কল্পনার জাল বুনতে খুব সাহায্য করেছিল।

এরপর হঠাৎ একদিন খবর পাই, স্যার নাকি হরিদ্বারে চলে গেছেন সন্ন্যাসী হয়ে। খবরটা আমাদের খুব হতাশ করেছিল, সে সময় ভাবপ্রকাশে আমরা খুব একটা পটু ছিলাম না আর সময়ও আমাদের হাতে ১২/১৩ বছর বয়সে বড্ড কম ছিল ভাবনা চিন্তা করার জন্য, তবু বোধোদয় স্যারের কথা অনেক দিন মনে ছিল।

এরপর আবার ক্লাস টুয়েলভে উঠে জানতে পারি, স্যার নাকি আবার ফিরে এসেছেন, পড়ানো শুরু করেছেন প্রাইভেট, পড়ান ভালো তবে নাকি ফুল ম্যাড কেস। আমি ছোটবেলায় রামকৃষ্ণ কথামৃত পরে ফেলি, পড়তে পড়তে অনেকবার আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, আমার ঠাকুমা বলতেন, ‘তোর হইব’, ঠাকুরের নাম গায়ে কাঁটা দিলে তার নাকি আর বেশি জন্ম নিতে হয়না। আমি বুঝলাম ঠাকুর বলেছেন ভোগ না মিটলে ত্যাগের চেষ্টা করা বৃথা, তাই নমো করে বইটা তাকে তুলে রাখি।

আবার বছর সাতেকের বিরতি, আমি প্রেমে ল্যাং খেয়েছি, মনে ব্যাথা জমেছে, সেই ব্যাথা বাষ্প হয়ে কয়েকগাছি পদ্য হয়ে জন্মেছে। আমার এক বন্ধু পড়ে বলল, “তোর কবিতা গুলো সেক্সিস্ট”, বলতে চেলেছিল কবিতা গুলো বড্ড শরীর গন্ধ ময়, বাংলা মিডিয়ামে ৯০-এর দশকে পড়লে যা হয় আরকি। তো সেই বন্ধুটি, কিছুদিন পরে ঘুরে এসে বলল, “তোর কবিতা আমি আমার এক স্যারকে পড়িয়েছি, উনি তোর সাথে দেখা করতে চেয়েছেন”। আমার কবিতা, তা আবার একজন আরেকজনকে পড়িয়েছে, তিনি আবার এক মাস্টারমশাই, সেই তিনি আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন, এসব একবারে ভাবা যায়? জেলুসিল লাগবে তো। তো গেলাম, আমি গিয়েই চিনতে পেরেছি, ইনি বোধোদয় ব্যানার্জী। আমি যেকোন আলাপের শুরুর দিকে একটু গুটিয়ে থাকি, তা দেখলাম উনি নিজেই বেশ কথা টথা বলছেন, কবিতা লেখায় অনুপ্রেরণা জাগালেন। পরে আমি বলেছিলাম, যে কবিতাটা ওরকম আলটপকা এসে গেলে লিখে ফেলি, কবিতা আমার খুব একটা ভালো লাগেনা, পড়িও না, আমি সিনেমা বানাতে চাই। বোধোদয়দা এমন অনেক কথা বলতেন যা কিনা বুঝতে পারতাম ওর আশেপাশের মানুষের টাওয়ার নিতে পারছেনা। বেশিরভাগই সন্ন্যাস জীবনের অভিজ্ঞতা, তবে লোকে চাইত কিছু অলৌকিক গল্প, আর সেইটে পাওয়ার আশাতেই একটু ভিড়। আমার অনেকগুলো প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করত কিন্তু সুযোগ পেতাম না, আর ঠিক এটাও বুঝতাম না করাটা ঠিক হবে কিনা।

আরো অনেকগুলো দিন কেটে গেছে, যাতায়াত অনেকটা ফিকে হয়েছে, তবু যাই মাঝে মধ্যে। একদিন সন্ধ্যের সময় গেলাম গিয়ে দেখি এক বসে আছে, আর একটু উশখুশ ভাব। আমায় দেখে বলল, “বস”, একটু বিরতি নিয়ে, “মদ খাবি?”। এই প্রশ্নটা আমার মনে অনেক গুলো জিনিস উস্কে দিল, মদ খাওয়াই যায়, বোধোদয়দা আমার থেকে ১৪/১৫ বছরের বড়, সেটা সমস্যার না, তবে মদের তারল্য যদি গোপন কিছু জানতে পারি। এতদিনে আমার প্রশ্ন প্রচুর আছে, করার মত লোক পাইনা, শুধু একটু লোভ আছে নইলে, এক বস্ত্রে বেরোবার চিন্তা বহুবার করেছি। বিভূতিভূষণের ‘দেবযান’ পড়ে মাথা আউলে গেছে, তন্ত্রে নাকি সরস্বতীর অন্য মন্ত্র আছে, তারানাথ তান্রিকে যা লেখা আছে তা কি শুধু কল্পনায় সম্ভব? মোটকথা আমার প্রশ্নের শেষ নেই এবং অকাল্ট সম্পর্কে একটা প্রবল জানার ইচ্ছার যদি একটা সূত্রপাত হয় তাতে ক্ষতি কি!

সেদিন তেমন কিছুই জানতে পারিনি, আর আমার কেমন জানিনা মনে হয়েছিল বোধোদয়দা খুলে বলতে চাইছেন না, শুধু বললেন এক উঁচু স্তরের সাধক তাকে বলেছেন, এ জন্মে ওর হওয়ার নয় আর সংসার ভোগ আছেই, এছাড়া উনি পালিয়ে গেছিলেন, মা বাবার অনুমতি ছাড়া নাকি সন্ন্যাস গ্রহণ করা যায়না। এইসব কথাগুলো আমি বিভিন্ন জায়গায় পড়েছি, মোটামুটি জানতাম। লাভের মধ্যে বোধোদয়দার সাথে সখ্যতাটা বেশ খানিকটা বেড়ে গেল।

ধান ভাঙতে শিবের গীত গেয়ে ফেললাম তবে এটুকু দরকার ছিল। বোধোদয়দার কথা মত যোগ সাধনা করলেই মানুষ অদ্ভুতভাবে অনেকটা উঁচু স্তরে পৌঁছতে পারে, তবে সন্ন্যাসী হওয়া যার তার পক্ষে সম্ভব না। আমাকে একদিন বলল, “তোর প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বললেও তুই বুঝবিনা আর না বললেও তোর খটকা যাবেনা, হওয়ার হলে তুই এমনিই একদিন জানতে পারবি”। তবে আজ যা হল সেটা বেশ অদ্ভুত, আজও মদ নিয়ে বসা হয়েছিল, একটু নেশা ধরার পর বলল, “কাল একজনের কথা শুনলাম জানিস? তোর একটা সিনেমার গপ্পো হয়ে যেতে পারে”। আমি বললাম, বলো গল্পটা। বোধোদয়দা বলল, “আমি গল্পের মত করে শুনিনি, গল্পটা তোকে বানিয়ে নিতে হবে”। আমি বললাম, বেশ। তবে এই গল্পটা চোখ বুজে শুনতে হবে। আমি রাজী হলাম।

“অন্ধকার, তবু তার একটা আলো আছে। আসতে আসতে চোখ সয়ে এল, চারিদিকে থৈ থৈ করছে জল, কোথাও কোনো ডাঙার অস্তিত্ব নেই। আমি কোথায় জানিনা, কে আমি জানিনা, বর্ননা করার মত কিছু নেই আমার কাছে। প্রশ্ন তৈরী হচ্ছে, আমি ডুবে ডুবে যাচ্ছি আবার ভেসে উঠছি যেন। চারিদিকে নিস্তব্ধ শূন্যতা যেন হাহাকার করছে, তা সুন্দর না ভয়ঙ্কর তাও বুঝতে পারছিনা। আমার কি করণীয় জানিনা। মৃদু একটা কম্পন শোনা যায় যেন, যেন কোন পরপার থেকে আসা ধ্বনি, ক্ষীণ, গম্ভীর। আরো মনোযোগ দিলাম স্বরটা পাক খেয়ে খেয়ে এসে যেন ফেটে যাচ্ছে। আরো কান পাতলাম, শুনলাম-‘জাগো জাগো’, আবার আবছা হয়ে এল।

আবার ধৈর্য্যের পরীক্ষা, আবার পাক খেয়ে খেয়ে আসা গুরু গুরু ধ্বনি, -‘নিজেকে জানো’। কে বলছে? আমি কোথায়? আকার, আয়তন, অবয়ব ইত্যাদি কোনোটারই ধারণা নেই আমার। আমার আমি সত্ত্বা, তার শুরু কোথায়, শেষ কোথায়? আমি শুরু করছি, করে ছড়িয়ে যাচ্ছি, ধরে রাখতে পারছি না, আবার ফিরে আসছি আগের জায়গায়, অসহ্য লাগছে। আবার সেই স্বর, নাকি এক কম্পন আমার ভিতর থেকেই আসছে? কিভাবে শুনতে পাচ্ছি জানিনা, বলছে- ‘তৈরী হও, সময় কম’। মনে মনে বলতে থাকলাম, কে? কে? উত্তর এল- ‘জানো’।

আবার অপেক্ষা, ধৈর্য্যের পরীক্ষা। পরিবর্তন হচ্ছে যেন একটু একটু করে, সময়ের মাপ জানিনা বলে বুঝতেও পারছিনা কত যুগ বা কাল কেটে যাচ্ছে!

একধরনের জ্বালা অনুভব হল, যেন অনেকটা অন্ধকার কেটে গেছে, কিছু কিছু দেখা যায় জলের মধ্যে, তারপর প্রচন্ড আলো। চোখ বুজেও সে আলোকে বন্ধ করা যায়না, ভিতর অবধি খুঁড়ে ফেলা আলো. তারপর আবার শুনলাম- ‘ওঠো সাবর্ণ’। কিছু দেখতে পেলাম না এক অদ্ভুত জ্যোতি ছাড়া। প্রশ্ন করলাম, আমি কে?, উত্তর এল- সৃষ্টি।

-কি করব?

-সৃষ্টি করবে।

-কিছু বুঝতে পারছি না তো।

-তার জন্যই সৃষ্টি করতে হবে।

-কিছু না হলে?

-তখনই বুঝতে পারবে।

-আপনি কে?

-তুমি বুঝতে পারবে, আবার দেখা হবে।

খানিকক্ষণ স্তব্ধতার পর, প্রশ্ন এল-কি জানলে?

-আমি কে জানলাম।

-কি জানলে?

-আমার নাম সাবর্ণ।

জ্যোতি অদৃশ্য হল। চোখ ঠিক হলে দেখলাম এক অনন্ত বিস্তৃত অনাসৃষ্টি”।

আমিও চোখ খুললাম, বোধোদয়দা বলল, “তোর বেলা ভার্সনটা একটু অন্যরকম হল, সাবর্ণ কে জানিস তো?”। আমি মাথা নেড়ে বেরিয়ে চলে এলাম, হিপ্নোটিজম হতে পারে, তবে আমি চোখ বুঝে বোধোদয়দার গলা শুনতে পাইনি, এমন একটা গলা শুনেছি যাকে ভাষায় ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব না।

আমি কি ভাবছি তা আমি নিজেই জানিনা, তবে ইনফো হিসাবে একটা ছোট্ট কথা, সাবর্ণ হল বৈবস্বত মনুর পরের মনু, এখনও নাকি কয়েক লক্ষ বছর বাকি… যাক একটা গল্পের প্লট পেলাম এটা সত্যি।

Keep reading

More >