কুক কেলভির ঘড়ি পর্ব ১

  কুক কেলভির ঘড়ি   ।।১।।   হেড কারিগর বলরাম নিপুণ হাতে কড়ায় তাডু় চালাচ্ছে, ভীম উনুনের পাশে দাড়িয়ে একদৃষ্টে …

 

কুক কেলভির ঘড়ি

 

।।১।।

 

হেড কারিগর বলরাম নিপুণ হাতে কড়ায় তাডু় চালাচ্ছে, ভীম উনুনের পাশে দাড়িয়ে একদৃষ্টে কড়ার দিকে তাকিয়ে আছে। বলরামের হাতের টানে ছানার তাল আর পয়রা গুড় একটু একটু করে মিলেমিশে গিয়ে কড়াপাকের চেহারা নিচ্ছে। সারা দোকান গুড়ের সুবাসে ম-ম করছে।

 

কাছেই পাটায় বসা একটি ছেলে একমনে হাতের তালু দিয়ে পাটায় ঘসে ঘসে ছানা বাটছিল।ভীম তার কাছে গিয়ে বাটা ছানাটা বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর সাহায্যে পরীক্ষা করল।

“আর একফেত্তা বাট। এট্টু কচা কচা আচে। মাকম হেন মোলাম না হলি আর কিসির কড়াপাক। একি নোকড়োর দোকান পেয়েচিস?”

পরাণ ছেলের কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেললেন। ভীম কেন যে কথায় কথায় নকুড়ের খোঁটা দেয় কে জানে। এককালে নকুড় আর তিনি দুজনেই কড়াপাকের নামজাদা কারিগর ছিলেন। এখন বয়েসের কারণে নিজেরা বিশেষ দরকার ছাড়া হাত লাগান না। নকুড়ের কড়াপাকে ছানা সাড়ে তিনফেত্তা বাটে, তিনি চারফেত্তা। যে কারিগরের যেমন তার। তবে একটু কম মোলায়েম করার একটা কারণ হতে পারে জলভরা। নোকড়ো জব্বর একখান মাল বানিয়েছিল বটে। দুখানা তালশাঁস সন্দেশ জোড়া দিয়ে তার ভেতরে কড়ে আঙুলের চাপে সামান্য গর্ত করে চামচে টাক গোলাপজলের বাসওলা পাতলা রস ভরে গর্তের মুখখানা ফের সন্দেশ দিয়ে বন্ধ করা। বাবুরা খেয়ে একবারে রাস্তায় গড়াগড়ি। জলভরার লোভে কোথা কোথা থেকে লোকে না আসে। তিনি নিজেও খেয়ে দেখেছেন, চমৎকার। মুখে দেওয়ার সাথে সাথে মুখের মধ্যে গলে গিয়ে কড়াপাক আর গোলাপজলের সুবাসে একবারে অমৃত।

তবে হ্যাঁ, বাপেরও বাপ আছে। তিনি পারেন নি, কিন্তু ভীম পাল্টা দিয়েছে। প্রায় একই কায়দায় তৈরি অমৃত কলস, কলসীর মতো দেখতে, ভেতরে  বড়োএলাচ পেস্তা দেওয়া খোয়াক্ষীর কাজুবাটার পাক। সেও কলকাতা জুড়ে নাম করে ফেলেছে। ভীম এইটুকু বয়েস থেকেই পাকা কারিগর। বাপ ঠাকুদ্দার কাছ থেকে যা কাজ শেখার শিখেছে, কিন্তু ওতে ওর পেট ভরে নি। উড়িয়া কারিগরের কাছে খাজা বানানো শিখেছে, পশ্চিমা কারিগরের কাছে মতিচুর, গজা, দরবেশ। এ পাড়ায় অনেকগুলো মিষ্টির দোকান, খদ্দের টানার জন্যে সবাই কিছু না কিছু নতুন মাল বানাবার চেষ্টা করে। ভীম এই ব্যাপারে মহারথ। এই তো কবছর আগে ছানা, খোয়া, পেস্তা গোলাপজল দিয়ে এক খানা মাল নামিয়ে সবার সামনে ধরল; মুখে দিয়ে তাঁর মত তিন পুরুষের বনেদি কারিগরেরও উল্টে পড়ার জোগাড়। বলরাম বামুন মানুষ,সে হাতজোড় করে পেন্নাম করল। ছোঁড়াগুলো ধপাধপ গড় হয়ে পায়ের ধুলো নিল। খেতে ভাল হয়েছিল, কিন্তু এখানে চলবে কিনা তা নিয়ে একটু ধন্দ ছিল কারণ এখানকার বাবুরা একটু চড়া মিষ্টি পছন্দ করে, নতুন মিষ্টিটা চার এক ভাগের, একটু হালকা মিষ্টি। বসাক বাড়ির পাঁচুবাবুকে একদিন চাখতে দেওয়া হল, তিনি মুখে দিয়েই বললেন,” আবার খাবো।” ওই নামটাই মুখে মুখে চাউর হয়ে গেল। সেদিন তিনি মনে মনে স্বীকার করেছিলেন ছোঁড়ার এলেম আছে বটে। অনেক কষ্ট করে দোকান দিয়েছেন তিনি, এ দোকান রাখতে পারবে।

বউবাজারের বাবুরা মিষ্টি খেতে পারে বটে। সকালে বিকেলে জলখাবারে জিলিপি, বোঁদে মালপো রসগোল্লা  কিম্বা সন্দেশ, রাতে ভাতের পাতেও মিষ্টি। বাবুদের মিষ্টি ছাড়া চলে না তার একটা কারণ বোধহয় প্রায় সবাই বোষ্টম মানুষ। বাড়িতে বাড়িতে গিরিধারী, মদনমোহন গোপাল, জনার্দন। বাড়ির চৌহদ্দির ভেতরে মাছ মাংস খাওয়া দূরস্থান, নাম নেওয়া বারণ। তো মানুষগুলো খাবেটা কি?

ওই জন্যেই তো এপাড়ায় একহাত পরপর মিষ্টির দোকান। শ তিনেক লোক করেকম্মে খাচ্ছে।

রাস্তার দিকে তাকিয়ে পরাণ ঈষৎ চিন্তিত হলেন। গলা তুলে বললেন,” কইরে, হল তোদের? একপ’র বেলা যেতে গেল, একুনি তো জানবাজার থেকে সরকার মশায় এইসে যাবেন।”

জানবাজারের রাণীমা গঙ্গার পারে দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিনী প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখানে পুজো দিতে গেলে প্রতিবার দশসের বারোসের সন্দেশ নিয়ে যান। এছাড়াও অনেক বাঁধা বাড়ি আছে। ভোগের মিষ্টির আলাদা বাসন, আলাদা উনুন। কারিগররা সকাল সকাল গঙ্গাস্নান সেরে শুদ্ধবস্ত্রে সেই সন্দেশ তৈরি করে। তারপর দিনের কাজ শুরু হয়। আজ বলরামের সাথে ভীমও রাণীমার বায়নার মিষ্টি বানানোর কাজে হাত লাগিয়েছে।

 

ভীম কোমর থেকে ট্যাঁকঘড়ি বার করল,” অ্যাকন সাড়ে আটটা বাজে বাবা, সক্কার মশায়ের আসতে আরো পোঁয়ারো মিনিট। আপনে উতলা হবেন নি।”

 

পরাণ পুরোনো আমলের মানুষ, ঘড়িফড়ির ধার ধারেন না। রোদের আন্দাজে সময় নির্ধারণ করেন। তাঁদের সময় প্রহর, দন্ড, পল দিয়ে বাঁধা। এখনকার সময়ের যে বিলিতি মাপ, সে মাপ তাঁদের অজানা। বাড়িতে একখানা বড়ো ঘড়ি আছে, দেয়ালে আটকানো। ভীম আর নাতি নাতনি কটা ইংরিজি পড়তে পারে, ওরাই দেখে আর ওসব ঘন্টা মিনিট বলে। বাকিরা সেই আগেকার মাপেই আটকে আছেন।

 

বাঁধা বাড়িগুলোতে নিত্যপুজোর মিষ্টি যায়। ছোট ছেলে একটা ছোঁড়াকে সাথে নিয়ে সেগুলো শালপাতার ঠোঙায় বা চ্যাঙারিতে ভাগ করছে। এখুনি ভীড় লাগবে। কিছু কিছু চলেও গেছে।

 

বিশাল এক জুড়ি এসে দোকানের সামনে দাঁড়াল। এ গাড়ি গোটা কলকাতা চেনে; জানবাজারের রাণীমার নিজস্ব বাহন। পেছনে পাশে চাপরাশ আঁটা লাঠিবল্লম মায় বন্দুকধারী পাইক। পরাণ চমকে দোকানের বাইরে এসে দাঁড়ালেন, রাণীমা নিজেই এলেন নাকি!

 

হ্যাঁ, তাইই। রাণীমার খাস দাসী নেমে এল। “কিগো মোদকমশায়, ভোগের সন্দেশ বেঁধে রেকেছ? বসতে পারবুনি কিন্তু, মা স্বয়ং নিতে এয়েচেন।

 

ভীম আর বলরাম কয়েকখানা শালপাতা মোড়া চ্যাঙারি হাতে বেরিয়ে এল,” কি কইরে ভাবলি দিদি রানীমাকে রাস্তায় দেঁড় কইরে রাকবো? এই দ্যাক। সব বেঁদে ছেঁদে তৈরি। নে যা।”

 

একজন পাইক গাড়ির দরজা খুলে দিতে বলরাম পোঁটলাগুলো গাড়িতে উঠিয়ে দিল। কোচোয়ানের চাবুকের ফটাস শব্দের সাথে সাথে বিলিতি ঘোড়া জোতা গাড়ি যেন উড়ে চলে গেল।

 

বলরাম জোড়হাত কপালে ঠেকাচ্ছে। ভীম রাস্তার ওপরেই গড় করল। উপস্থিত পথচারীরাও কপালে হাত ঠেকাচ্ছে। রাণীমা পরদা নশীনা নন, গাড়ির জানলা খোলাই ছিল, দয়াময়ী সকালবেলা দর্শন দিয়ে গেলেন। আজ দিনটা ভাল যাবে।

 

“অ্যাকসের রসগোল্লা আর অ্যাকপো প্রাণহরা দ্যানগো মোদকমশায়।”

 

“আমায় সাড়ে তিন গন্ডা কচুরি, সাড়ে তিন গন্ডা জিলিপি, দেড়গন্ডা বাবু, দেড়গন্ডা দেদো।”

 

“কই হে সহদেব, আমার জিনিস?”

 

ছেলেদের সাথে পরাণও হাত লাগালেন। এ সময়টা বড্ডো চাপ যায়।

Keep reading

More >