কুক কেলভির ঘড়ি পর্ব ২

কেবল এদেশি মানুষরাই যে মিষ্টি খোর এমনটা নয়, মিষ্টি খেতে সাহেবরাও কিছু কম যান না। সাহেবি খানার তালিকায় চোখ বোলালেই …

কেবল এদেশি মানুষরাই যে মিষ্টি খোর এমনটা নয়, মিষ্টি খেতে সাহেবরাও কিছু কম যান না। সাহেবি খানার তালিকায় চোখ বোলালেই শেয পাতে সুফলে, টার্ট, পাই, মাফিনের ছড়াছড়ি। কিন্তু সাহেবি মিষ্টির বেশিরভাগটাই কেক এর রকমফের। যেসব সাহেব এদেশে এসেছিলেন তাঁদের কেউ কেউ এদেশি মিষ্টি চেখে দেখলেন এবং মজলেন। সত্যি বলতে গেলে অষ্টাদশ শতাব্দীর কলকাতায় যতরকমের চিড়িয়া, ততরকমের মিষ্টি। ছানা, খোয়া,ময়দা, বেসন, কাজুবাদাম, কি না দিয়ে মিষ্টি বানানো হয়? শুধু কি কলকাতা; হাওড়া, নদীয়া, চব্বিশ পরগনা, হুগলি, বর্ধমান এ বলে আমায় দ্যাখ,ও বলে আমায়। কারো বাবরশা, তো কারো মনোহরা। এ যদি চমচম বানিয়ে বলে কেমন দিলাম? অন্যজন মিহিদানা এগিয়ে দিয়ে বলে পাগলা ক্ষীর খা। মিষ্টিখোরদের পোয়াবারো যাকে বলে। সাহেবরাই বা আর কতক্ষন নোলা সামলে রাখবেন?

 

মাঝখানে ব্যারাকপুরের ঝামেলাটা হয়ে গিয়ে ব্যাবসায় একটু টান পড়েছিল। শোনা যাচ্ছিল সিপাহিরা নাকি খেপেছে; সাহেবদের এদেশ ছাড়া করবে। আবার বাহাদুর শা বলে কে এক মোগল বাদশা দিল্লির তখতে বসবে। অনেক সাহেব কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছিলেন। সাহেববাড়ীর কাজ বন্ধ হয়ে গেছিল। এখন অবশ্য সব ঠান্ডা হয়ে গেছে। আজকাল অনেক সাহেববাড়ী তাদের বাঁধা খদ্দের।সন্দেশ ছাড়াও চড়ারসের মিষ্টিরও চাহিদা বেশ ভালোর দিকে।

কাল সন্ধেবেলা একটা বাজে ব্যাপার হয়ে গেল। সাহা বাড়ি তাদের বাঁধা খদ্দের, সেই বাড়ির মেজবাবু বলরাম হঠাৎ দোকানে এসে হাজির।

মেজবাবু মেজাজি মানুষ। গাড়ি থেকে নেমেই হাঁক পাড়লেন,” ভীমসেন, টাটকা মাল কি আচে?”

ভীম একখানা মাটির সানকির ওপর কলাপাতা দিয়ে কয়েকখানা মিষ্টি এগিয়ে দিল,” এজ্ঞে এগুলো এট্টু আগেই ভেন থে নেমেচে। আর ক্ষীরকান্তি একন ভেনে। মুকে দে দ্যাকেন, তাপ্পর যেটা যেটা পচন্দ হয়।“

 

মেজবাবু একটা সন্দেশ ভেঙে মুখে দিলেন, ”আকায় তেঁতুল কাট ঢুইক্কেচিস?”

ভীম হাসতে হাসতে দুকান ধরল,” এজ্ঞে আ্যাক দু কান না দেলে আকা ধরতি তো দু গন্টা নেইগে যাবে। তা বেভুল হয়ে গ্যাচে বাবু, দুমুটো মুড়কি আকায় ফেলি দেলে তেঁতুলের বাসটা পেতেন নি। এবারটা মাপ করেন।“

 

মেজবাবুও হাসতে হাসতে বললেন, “জ্ঞানপাপী।“ বলে আর এক খানা সন্দেশ মুখে পুরলেন।

 

সন্দেশটা মুখে ফেলেই মেজবাবুর মুখখানা থমথমে হয়ে গেল। ভীম সেটা লক্ষ্য করে চমকে উঠল। নির্ঘাত কিছু গন্ডগোল হয়েছে। অন্য খদ্দের ধরতে পারবে না, কিন্তু মেজবাবুকে ঠকানো অসম্ভব।

 

মেজবাবু বললেন,” পাগটা করেচে কোন শালা রে?”

ভীম গলা বাড়িয়ে দেখল মেজবাবু একটা প্রাণহরার আধখানা ধরে আছেন। প্রাণহরা, মানে নরহরির ভিয়েন। সে গলা তুলল,” নোড়ো দাদা!”

নরহরি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল,” এজ্ঞে ছোটকত্তা?”

ভীম কিছু বলার আগেই মেজবাবু নরহরির গলার গামছাখানা খপ করে ধরে বাঘের মতো গর্জে উঠলেন,” হারামজাদা, বুড়ো হয়ে মত্তি চল্লে, এ্যাদ্দিনের পুরোনো কারিগর তুমি, তোমার এসব মতি বুদ্দি? ভেয়েনে বসি তুমি গুরুক টানচেলে? তামুকের বাসে মাল ভুরভুর কচ্চে, এই এঁটো সন্দেশ কিনা সন্দের শেতলে গিরিধারী খাবে? পাপে মরবি যে শো’র। বংশে বাতি দেবার কেউ থাকবে নি কো ।“

নরহরি দড়াম করে মেজবাবুর পায়ে পড়ল,” কত্তা মা কালির কিরে ভেনে বসি গুড়ুক টানি নি কো। কারখানা ঘরের বাইরে বসি দু টান টেনে এয়েচেনু। সকাল থেকে তাড়ু টানচেলাম, তা এট্টু তামুকের নেশা উটি গেল, তাই দুকুরের ভেনে বসার আগে ভাত খেয়ি এট্টু গুড়ুক সেবা করেচিনু। আর কককনো এমনটে হবে নি। আপনি তো আমায় জানেন কত্তা।“

মেজবাবু শিবতুল্য মানুষ। যেমন ঝপ করে রেগেছিলেন, ঝপ করে ঠান্ডাও হয়ে গেলেন ,” হুঁ, বুয়েচি। গুরুক সেবা করে কেবল জল দে হাতখান ধুয়েছেলে, তাপ্পর ওই হাতে ছানা মেকেছেলে। তা ক্ষার দে হাত ধুতে হোত নি? দেক দিনি, পুরো এক ঘান মাল বরবাদ করে দেলি। যাগগে, ষোল গন্ডা  চন্নপুলি, ষোল গন্ডা ক্ষীরতক্তি আর তোর ওই শাঁকসন্নেশ সেরটাক বেঁইদে দে । “ কপাল ভাল সন্ধেবেলা খদ্দের লক্ষী ফিরে যায়নি।

 

একটা জুড়ি গাড়ি এসে দোকানের ঠিক সামনেতেই দাঁড়াল। ভীম একটু চকিত হল; কোন বড়ো খদ্দের।কিন্তু গাড়ি থেকে যারা নেমে এল তাদের দেখে এলাকাসুদ্ধু লোক বোমকে যাওয়ার যোগাড়। একজন আপাদমস্তক দুরস্ত চাপরাশি। অন্যজন এদেশি বাবু, কিন্তু পরে আছেন কোটপ্যান্ট।

কোটপ্যান্ট ধারী বাবু এখানে বিরল নন, কিন্তু তাঁরা উকিল বা ব্যারিস্টার। তাঁদের কালো কোট, সাদা প্যান্ট সবাই চেনে। ইনি কিন্তু পরে আছেন একরঙা সুট। ইনি তবে কে? আবার সাথে চাপরাশি।

বাবু দোকানে ঢুকেই বললেল,” ভীম নাগ কে?”

ভীম হাতজোড় করে বলল,”আজ্ঞে এই আমি। হুকুম করুন।“

বাবু বললেন,” সাহেব পাটালেন।“

ভীম বলল,”কোন সাহেব এজ্ঞে? আমার দোকানে অনেকগুনো সায়েব খদ্দের আচেন।“

বাবু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন,”এই বয়েসেই চোকের মাতা খেয়ে বসে আচো নাকি মোদকের পো? দেকতে পাচ্চ না কো ওর কোমরে লাটবারির চাপরাশ রয়েচে?” বলে আরদালিকে দেখিয়ে দিলেন।

লাটবাড়ি কথাটা কানে যেতে ভীমের দুভাই ঘুরে তাকাল। ভীম বলল,” হুকুম করুন।“

“ শোন হে মোদকমশায়, কাল এক কান্ড হয়েচে।  কদিন আগে সায়েবের মেম এয়েচেন বিলেত থে। তো  সায়েবের সাতে বিলিতি বাবুর্চিও এয়েচে। তা সে বেটা কাল কি এক বিলিতি মেটাই বাইনেচে, না সায়েবের পচন্দ হয়েচে, না মেম সায়েবের। মেম সায়েব তো বলেই বসল মুককান কেমন ফসফস কচ্চে। আমি জানতুম আমাদের জন্যি ভাঁড়ারে তোমার দোকানের আবার খাবো আর রসকদম আচে। তা আমি সায়স কইরে বন্নু আমাদের মেটাই খেয়ে দেকবেন? তা সায়েব বল্ল দাও। দেলুম সায়স করে ওনাদের সামনে ধইরে।“

ভীমের ভাইরা একমনে শুনছিল। মেজভাই বলল,” সায়েবের পচন্দ হল কত্তা?”

“পচন্দ কিরে? চেয়ে চেয়ে গন্ডা দুয়েক কইরে ওড়ালো দুজনে। আজ হুকুম হয়েচে মেটাই আনো, তার সাতে মেটাইওলাকেও। তা টাটকা মেটাই সের দশেক দ্যাও, আর সাতে তুমিও চলো।“

ভীম মনে মনে বেজায় খুশি। লাটবাড়ি বলে কথা। এ ঘরটা ধরতে পারলে কলকাতাসুদ্ধ নাম তো ছড়াবেই, তার সাথে সায়েববাড়ির বড়ো কাজগুলো পাওয়া যাবে।

ভীম ভাইদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ভেতরে জামাকাপড় বদলাতে গেল। পরাণ এখন নেই, দুপুরবেলাটা বাড়িতে বিশ্রাম করে ঠাকুরকে বিকেলের শেতল দিয়ে তারপর দোকানে আসবেন। এখনও তাঁর আসতে ঘন্টাখানেক দেরি।

ভীম জামাকাপড় পরে আসতে আসতে মিষ্টি বাঁধাছাঁদা হয়ে গেছে। ভাইরা মিষ্টির চ্যাঙারি ও হাঁড়িগুলো গাড়িতে তুলে দিল। বাবু ভীম ও আরদালি গাড়িতে উঠে বসলেন।

 

বাবু বললেন ,” মোদকের পো, ইংরিজি বোজ? সায়েব কিন্তু বাংলার ব ও জানে না।“

ভীম সলজ্জে বলল,” আজ্ঞে, বুজি। এট্টু এট্টু বলতেও পারি। কানা সায়েবের কাচে ক বচর পড়িচি তো।“

বাবু মাথা নাড়লেন। গাড়ি গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তার দিকে ছুটল।

 

Keep reading

More >