গঙ্গারাম আর আমি

আমি আগেই বলেছিলাম আমার বিষন্নতায় গঙ্গারামের জন্ম। আচ্ছা, আচ্ছা গঙ্গারাম অব্যয় অক্ষয় আগেও ছিলেন শুধু আমার মন খারাপ হলে উদয় …

আমি আগেই বলেছিলাম আমার বিষন্নতায় গঙ্গারামের জন্ম। আচ্ছা, আচ্ছা গঙ্গারাম অব্যয় অক্ষয় আগেও ছিলেন শুধু আমার মন খারাপ হলে উদয় হন। এইটুকু শুধু এইটুকু কনসেপ্ট নোলনদা বা রিচিদাকে গিয়ে শোনাতে পারলে দেখতেন কেমন একটা কায়দার হলিউডি কাল্ট তৈরী হয়ে যেত। যাক আক্ষেপ আমার প্রিয়তমা সে এসে বসলেই গঙ্গারামও এসে হাজির হন, আক্কেলটা ভাবুন! এবার আমি কী করব বলুন দুঃখ হলে আমার মন খারাপ হয় আর মন খারাপ হলে দুঃখ।
এবার যদি ভেবে থাকেন গঙ্গারাম একটা সাধারণ ত্রিমাত্রিক চরিত্র যা আমিও ভেবে আসতাম এতদিন তাহলে ভুল করবেন। গঙ্গারাম সতত পরিবর্তনশীল একটা চরিত্র। গত কয়েকদিনে আমি শার্লক হোমস পড়তে শুরু করেছি, সেই সাথে সেক্রেড গেমস দেখে ফেলেছি, ফলত একজন চিন্তাশীল ব্যক্তির কাছে নেশার কি অমোঘ প্রয়োজনীয়তা এটা আমার কাছে পরিষ্কার। আবার আমি সাধারণ মানুষ আত্মা উপর দিকে উঠলেই নীচে নামতে চায় তাই নওয়াজউদ্দিনের মত লুঙ্গি মুখে নিয়ে…যাক বাদ দিন।
কথা হচ্ছে আমার কথা উঠছে কেন? আমি না থাকলে গঙ্গারাম আসত না এটা একটা সার সত্য। এবার আমি টাকে আপনি কিভাবে নিচ্ছেন সেটা হচ্ছে প্রশ্ন। গঙ্গারাম হল একটা অস্তিত্বময় প্রশ্ন। গঙ্গারামকে আসতেই হবে তার আগে একটু ভূমিকা।
আমি একটা প্রকান্ড উপন্যাস লিখতে চাই, এখনও অবধি যতটা মশলা জোগাড় হয়েছে তাতে এগোনো যায়, তবে আমার বই পড়ার সময় এই অভ্যাস না থাকলেও নিজে লেখার সময় শেষটা না দেখা থাকলে শুরুটা করতে পারিনা। বা অন্যভাবে শুধু শেষ নয় আমি সম্পূর্ণ ম্যাপটাই দেখতে চাই। এইরকমই ভাবছিলাম বসে, মুম্বইতে বসে ভাববার একমাত্র জায়গা হল ট্রেন। ট্রেন আমার ভাবনাবিলাসের অন্যতম পীঠস্থান। দাদর পার হয়ে গেছি ভাবছি আর একঘন্টা সময় ঘুমোবো না বাজে লিখব। আজ ট্রেনে কুম্ভ মেলা বসে যেতে পারে এমন অবস্থা, অন্যদিন চুলকুনি পেলে অন্যলোককে জড়িয়ে ধরতে হয়। ঠিক এমন সময় মাথায় ঠাসা ঢেউ খেলানো ব্যাক ব্রাশ করা চুলের একজন লোক ট্রেনে উঠলেন মাটুঙ্গা স্টেশন থেকে। একদম সামনা সামনি বসলেন, স্থির চোখ, গালের চামড়া টানটান, থুতনি দৃশ্যমান, হাত গোটানো শার্ট গুঁজে পড়া, নীচে জিন্স। চিনতে পারলাম না তবু মনে হল কোথায় দেখেছি। চোখ সরিয়ে মনটাকে লোকটার থেকে সরালাম, উপন্যাসে ফেরালাম। উপন্যাসটা একটা গোয়েন্দা কাহিনি, আবার শুধু গোয়েন্দা এমন নয়, একজন খুনী আছেন যিনি মারাত্মক সব খুন হরিনাম জপতে জপতে করে দেন, একজন গোয়েন্দা আছেন যার স্ত্রী তার থেকে বেশি বুদ্ধিমতী, একটি প্রেমিক গোছের আঁতেল ছেলে আছে আর একজন সুন্দরী আছেন এর বেশি ট্রেলারে বলা যায় বলুন! এইসব যখন ভাবছি তখন প্রশ্নটা এলো- ‘এত ভাবার দরকার আছে?’। সত্যি কথা পুরো কানচাপাটির মত আঁছড়ে পড়ে, এ আমি বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু লোকটা কে? ভেতো দেখতে নয়, গ্যাদগ্যদে গলা নয়, অকারণ উপদেশ নয় অথচ বাঙালী, কাল্টিভেট করতে হবে মনে হচ্ছে।
কে আপনি?- এই প্রশ্নটাই বেরিয়ে এল প্রথমে। নিজেকে সংযত করতে চেয়েও পারলাম না।
চোখের কোণে হেসে বললেন, ‘চিনতে পারবে, অত তাড়া কিসের? পালিয়ে তো যাচ্ছি না।
-বেশ, চিনলাম না, কিন্তু প্রশ্ন তো থেকে যাচ্ছে।
– করে ফেল।
-আপনি কে? আমি কি ভাবছি জানলেন কি করে? জেনে ফেললে কি জানলেন?
– সামান্য পর্যবেক্ষণ। তুমি স্থির চোখে দেখলে অথচ কিছু বুঝতে পারলেনা, আমি তোমার চোখে চোখ রাখলাম তুমি সরিয়ে নিলে, মোবাইল টা তিনবার খুলে অনিচ্ছুক ভাবে স্ক্রল করে গেলে এগুলো ভাবার লক্ষণ কিনা?
-আর কি ভাবছি?
-সে কথা কি আমি কিছু বলেছি?
– অ, তা আপনাকে চেনা লাগছে কিন্তু…
– তুমি লিখবে গোয়েন্দা গল্প, হয়েছে!
– ব্যক্তিগত মতামত হয়ে গেল না? কিন্তু উত্তর পেলাম না।
– না ব্যক্তিগত নয়, একজন গোয়েন্দা যেটা ভাববে তার সৃষ্টিকর্তা কে তার উর্দ্ধে জেতে হবে, গোয়েন্দার pov কে ছাপিয়ে যেতে হবে। রহস্যসৃষ্টি এবং উদ্ধার তোমার হাতে।
– নিজেকে কিরকম ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর বলে মনে হচ্ছে।
– ওটুকু স্পর্ধা তো করতে হবে।
– কিন্তু ইনফো গুলো বেশ কিছু বাকি যে…
– আজ সকালে কি পড়েছো?
– উফ, কত জানেন আপনি। পড়েছি, ‘লিখতে ভালো লাগে বলে লেখো, যশের পিছনে ছুটো না, যশ আপনিই আসিবে’। আচ্ছা রাজকুমার হিরানী কি বঙ্কিম পড়েছিল?
-আহ। যা বলছিলাম, এডিট বলে একটা বস্তু হয় জানো বোধহয়।
– আজ্ঞে।
– যে চিন্তাটা আসছে ওটা বাদ দিয়ে আসল কথা ভাব। জটায়ু জিতবে না হারবে তা ভেবে দেখতে গেলে রামায়ণ লেখা হতনা।
– হ্যাঁ আজকাল লেখার মান, বিষয় এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না।
– সেটা প্রতিপাদ্য হল?
– না মানে ভিতরকার বর্জ্য গুলোও তো বেরোতে হবে
এতদূর বলার পর দেখি লোকটা উঠে যাচ্ছে।
– চললেন নাকি?
– তুমি জানো তো আমার এন্ট্রি এক্সিট সম্মন্ধে, ত্রিমুর্তির কথা বললে একটু আগে।একটা ছোট্ট ধাঁধা বলে যাচ্ছি সলভ করে রেখো, আমার নাম ভাগীরথী দাশরথি।
নালাসোপারা আসার পর বুঝলাম এতদিন কেন শার্লক হোমস আমি পড়তে পারিনি।

তবে সব দুঃখে মন খারাপ হলেও, মন খারাপ সব সময় খারাপ না।

Keep reading

More >