গোরে রঙ পে

২৫/৮/৯৬ রঙ যেন মোর চর্মে লাগে, আমার সকল ঘর্মে লাগে, গভীর ঘুমের স্বপ্নে লাগে…রাঙিয়ে নিয়ে যাও, যাও গো এবার যেথায় …

২৫/৮/৯৬

রঙ যেন মোর চর্মে লাগে, আমার সকল ঘর্মে লাগে, গভীর ঘুমের স্বপ্নে লাগে…রাঙিয়ে নিয়ে যাও, যাও গো এবার যেথায় যাবে… ওফ সে সব দিন ছিল বটে। তবে সুখের কথা, সে সব এখন ইতিহাস…আমরা সবাই ইদানীং মরাল… ধবধবে পালকে আমাদের পালকে কে বলবে আমরা কোনদিন কৃষ্ণাঙ্গ ছিলাম, মর‍্যালি আমরা এখন অনেকটা উঁচু থাকের মানুষ!

আজকাল ইওরোপে সবচেয়ে জনপ্রিয় গবেষণার বিষয় হচ্ছে “ভারতবর্ষ কোন এক সময় কৃষ্ণত্বক মানুষের দেশ ছিল এরকম অপপ্রচার কে বা কাহারা করিয়াছিল?”

এ সবের পিছনে কারণ আছে। আজকাল আমাদের ছেলেমেয়েদের ফর্সা রং দেখে গোরা সায়েবরাও হীনমন্যতায় ভোগে। এমনকি আমি যে আমি, যার থোবোর – সবাই বলত ধানসেদ্ধ হাঁড়ির তলার মতো – সেই আমাকেও যে কেউ ঢকঢকে কেল্টে বুড়ো বলবে, সে জো আর রাখিনি। ফেয়ারনেস ক্রিমের দৌলতে মাত্র কয়েকমিনিটের মধ্যে আমি টুকটুকে বুড়ো হয়ে উঠি। অ্যাকচুয়ালি বাইরে বেরোবার আগে দাড়ি কামিয়ে স্নান করে উঠে এক বিন্দু ফেয়ারনেস ক্রিম – একবার ক্লকওয়াইজ আর একবার অ্যান্টিক্লকওয়াইজ – সারা গায়ে মাখলেই, ব্যস। রাশিয়ান ভদ্রলোকেদের মধ্যে থেকে আমাকে খুঁজে বের করতে ফেলুদা কিংবা ব্যোমকেশ বক্সিও হিমসিম খায়।

বঙ্কিমবাবু আয়েষার রূপ বর্ণনায় যে কৃষ্ণত্বকের কথা লিখেছিলেন – গায়ে জল লাগিলে মনে হয় কালি আর কালি লাগিলে মনে হয় জল। সেই আয়েষা যদি আজকের নায়িকা হতেন, বঙ্কিমবাবু হয়তো খুব ক্ষুণ্ণ হতেন! এ সব রূপের কথা এখন নেহাতই রূপকথা – রাক্ষস-খোক্কোস, ব্যঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী্র মতোই অলীক। তারাশংকরবাবুর সেই নেতাই কবিয়ালকেও, তার ঠাকুরঝির জন্যে আর ভেবে ভেবে গান বাঁধতে হত না – ‘কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ ক্যানে’?

আজকাল মেয়েদের বাপিরা বিয়ের সময় মেয়ের কালো রংকে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বলে আর ছেলের বাপের সামনে হেদিয়ে পড়েন না। তবে ছেলেদের বাপিরা একটু দমে গেছেন, আগে মেয়ের কালো রংয়ের অজুহাতে নাক কুঁচকে দুদশ লাখ নগদ, আটত্রিশ ভরি গয়না, মোটরসাইক্ল, স্মার্ট ফোন আর টিভি হাতিয়ে নেবার যে ফিকির করতো, সে সব এখন চুলোয় গেছে। ছেলেদের অনেক বাপিকে দেখেছি, মাথার চুল ছিঁড়তে…তবে তারও সমাধান আছে…কিন্তু সে কথা পরে আরেকদিন।

ফেয়ারনেস ক্রিমের দামও খুব বেশি নয় কিন্তু, ঝোপ বুঝে কোপ মারতে পারলে জলের দরই বলা চলে। চারটে প্যাকেট একসঙ্গে কিনলে ছটা প্যাকেট ফ্রি! বছরে পাঁচ থেকে ছবার এই অফার চলে,  বোশেখী (পয়লা আর পঁচিশে – একসঙ্গে কম্বো) হাঙ্গামা, বাইশে শ্রাবণ মেগা অফার, পুজো বাম্পার, দিওয়ালি ধামাকা, ক্রিসমাস বোনাঞ্জা…।

রোজ নিয়ম করে চিকন হাতে দুবেলা ফেয়ারনেস ক্রিম মাখুন আর নিন্দুকদের মুখে ঝামা ঘষে দিন ঘস ঘস করে! আমাদের ভবিষ্যৎ ফটফটে ফর্সা!!

–০০–

Keep reading

More >