গ্রীষ্মের ছুটিতে ইউরোপে, জুলাই ২০১৭

(নিচের লেখাটি ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইউরোপ ভ্রমণের ঠিক পরেই লিখি। ) বেশ কয়েক মাস ধরে প্ল্যান করার পর ২০১৭-র  জুলাই মাসে …

(নিচের লেখাটি ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইউরোপ ভ্রমণের ঠিক পরেই লিখি। )

বেশ কয়েক মাস ধরে প্ল্যান করার পর ২০১৭-র  জুলাই মাসে আমরা সপরিবারে ইউরোপ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। আমরা বলতে আমি, আমার স্ত্রী ও আমাদের তিন পুত্র। আমরা আজ ১২ বছর ধরে সুইডেনের স্টকহোম শহরে থাকি। তা সত্ত্বেও আমাদের ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ও শহর দেখা হয় নি। আমাদের প্রধান গন্তব্যস্থল ছিল জার্মানী ও নিকটবর্তী দেশগুলি।

১২ই জুলাইয়ের সকালে আমরা স্টকহোম থেকে সুইডিশ রেলওয়ের ট্রেনে করে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে পৌঁছলাম। এই ট্রেনটি সুইডেনের হাই স্পীড ট্রেন X-২০০০, যেটি ঘন্টায় ২০০ কিমি বেগে ছোটে। সেই ট্রেনে কোপেনহেগেন যেতে সময় লাগে পাঁচ ঘন্টার সামান্য বেশি। কোপেনহেগেন পৌঁছতে ট্রেনটিকে ইউরোপের দীর্ঘতম রেল ও রোড ব্রীজ ওরেসুন্দ ব্রীজ পেরোতে হয়। ওরেসুন্দ ব্রীজ ৮ কিমি দীর্ঘ এবং এই ব্রীজটি সুইডেনকে ডেনমার্ক ও মেনল্যান্ড ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।

কোপেনহেগেন সেন্ট্রাল স্টেশন এ পৌঁছে আমরা ২৪ ঘন্টার সিটি পাস কিনে নিলাম যাতে করে আমরা পরবর্তী ২৪ ঘন্টা বাসে ও মেট্রো তে কোপেনহেগেন শহরের মধ্যে অবাধে ভ্রমণ করতে পারি।

তারপর বাসে করে আমরা আমাদের প্রথম দিনের থাকার জায়গা, Danhostel Copenhagen Bellahøj তে গেলাম। এই হোস্টেল টি দুই-তিন দিন থাকার জন্য বেশ ভালো। ছিমছাম, পরিষ্কার, বড় রান্নাঘর, প্রতি তলায় অনেকগুলি বাথরুম আছে। সেখানে আমরা দ্বিপ্রাহরিক আহার সম্পন্ন করে বাসে করে কোপেনহেগেন শহরের মধ্যে ঘুরে বেড়ালাম। সন্ধ্যে বেলায় শহরের একটি খাবার দোকানে পিৎজা সহযোগে নৈশভোজ সম্পন্ন করে হোস্টেল এ ফিরে সেদিনের মতো ইতি।

Danhostel Copenhagen Bellahøj

Danhostel Copenhagen Bellahøj

পরের দিন সকাল সাড়ে এগারোটায় কোপেনহেগেন সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ট্রেন ধরলাম হ্যামবুর্গ এ যাওয়ার জন্য। এই ট্রেনটি যৌথভাবে ড্যানিশ রেলওয়ে ও জার্মান রেলওয়ে চালায়। এই ট্রেনে দেখলাম প্রচুর যাত্রী উঠেছে যাদের কোনো সিট রিজারভেশন নেই। তারা হয় দাঁড়িয়ে, নাহয় বাথরুমের কাছে  বা প্যাসেজ এ বসে সারাটা সময় গেলো। এই ট্রেনটি ওতো বেশি গতিতে চলে না এবং অনেক স্টেশনে দাঁড়ায়। আমরা আমাদের সঙ্গে স্যান্ডউইচ ও প্রচুর ফল নিয়ে নিয়েছিলাম এবং সেগুলো দিয়ে আমরা আমাদের আহারাদি সারলাম। এই ট্রেনটি ডেনমার্কের Rødby থেকে একটা ফেরীর মাধ্যমে জার্মানীর Puttgarden শহরে প্রবেশ করে। জীবনে প্রথম দেখলাম একটা গোটা ট্রেন প্যাসেঞ্জার সমেত একটা নৌকোর খোলের মধ্যে ঢুকে গেলো।  সেটা ও তার সঙ্গে শ-দুয়েক গাড়ী ও ট্রাক নিয়ে সেই মোটরচালিত নৌকো দিব্বি ডেনমার্ক ও জার্মানীর মধ্যে ডেলী প্যাসেঞ্জারি করে যাচ্ছে। ট্রেন ফেরীতে ঢুকে গেলে সব যাত্রীরা ফেরীর উপরে ডেকে উঠে গেলো। তারপর ফেরী চলতে শুরু করলো। ৪০ মিনিট পরে আমাদের ফেরী জার্মানীতে পৌঁছলো, আমরা আবার ট্রেনে উঠে পড়লাম ও ট্রেন চলতে শুরু করলো।

জার্মানীতে ঢোকার পর দেখলাম জার্মান পুলিশ যাত্রীদের পাসপোর্ট ও মালপত্র পরীক্ষা করছে। হ্যামবুর্গ সেন্ট্রাল স্টেশন এ আমরা পৌঁছলাম বিকেল সাড়ে চারটের সময়। সেন্ট্রাল স্টেশন এ পৌঁছে আমরা মালপত্র সঙ্গে নিয়ে প্রায় আধ ঘন্টা হেঁটে ইউরোপকার এর অফিস পৌঁছলাম।  সেখান থেকে আমাদের বুক করা গাড়ী নিয়ে আমরা আমাদের সেদিনের গন্তব্যস্থল ব্রেমেন শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। প্রায় একঘন্টা সময় লাগলো হ্যামবুর্গ শহরের যানজট কাটিয়ে হাইওয়েতে উঠতে। এই সেই বিশ্ববিখ্যাত জার্মান অটোবান বা জার্মান হাইওয়ে, যেখানে জায়গায় জায়গায় গাড়ীর কোনো স্পীড লিমিট নেই। অর্থাৎ ড্রাইভাররা যতখুশি স্পীডে গাড়ী চালাতে পারে। ব্রেমেন শহরে পৌঁছতে প্রায় রাত আটটা বাজলো। ব্রেমেন শহরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল Airbnb -র মাধ্যমে বুক করা একটি জার্মান পরিবারের বাড়ীতে। সেখানে পৌঁছোবার পর গৃহকর্ত্রী আমাদের স্বাগত জানিয়ে আমাদের থাকার জায়গা দেখিয়ে দিলেন। সেটা দেখে আমাদের ভীষণ আনন্দ হলো, কারণ এতো ভালো জায়গায় আমরা আজ পর্যন্ত কখনো থাকিনি। আমাদের থাকার বাড়ীটি ছিল দোতলা। নিচের তলায় অত্যন্ত আধুনিক রান্নাঘর, ভীষণ ভালো বাথরুম, প্রশস্ত বৈঠকখানা, চওড়া বারান্দা এবং উপরতলায় শোবার ঘর। ঘরের আসবাবপত্র, রান্নার বাসনপত্র এতো রুচি সম্পন্ন ও দামী  যে স্পর্শ করতেই দ্বিধা হচ্ছিলো। আমরা আসবো বলে আমাদের জন্য জার্মান ওয়াইন, বাচ্চাদের জন্য ফলের রস, দুধ, লজেন্স,দামি কফি ক্যাপসুল, মিনারেল ওয়াটার এর বোতল এই সমস্ত রাখা ছিল। অতিথিদের জন্য এক আলমারি ভর্তি বিভিন্ন বোর্ড গেমস ছিল। আমাদের ছেলেরা নিমেষের মধ্যে ওই গেমস খেলতে বসে গেলো। আমরা ব্রেমেন শহরে দুই রাত্রি ছিলাম। যেহেতু থাকার জায়গাটা এতো ভালো ছিল তাই ব্রেমেন শহরে ভ্রমণের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা আমাদের খুব ভালো হয়েছিল।

পরেরদিন সকলে আমরা প্রাতঃরাশ করে ব্রেমেন শহর দেখতে বেড়িয়ে পড়লাম। বাড়ির কাছেই একটা ট্রাম স্টপেজে থেকে ট্রামে উঠে শহরের দিকে গেলাম। ট্রাম এ একখানা টিকিট কাটার যন্ত্র আছে, সেখান থেকে টিকিট কাটলাম। টিকিট কাটার ব্যাপারটা একটু খটমট।  একজন জার্মান সহযাত্রীর সহায়তায় আমরা শেষপর্যন্ত ঠিকঠাক টিকিট কাটতে পারলাম। ব্রেমেন শহরের কেন্দ্রে পৌঁছে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। প্রথমে দেখলাম ব্রেমেন ক্যাথেড্রাল। একটা বিশাল চার্চ, প্রায় ১২০০ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও ব্রেমেন শহরের এক অনবদ্য স্থাপত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চার্চের মূল কাঠামোটি আজ থেকে ১২২৮ বছর আগে স্থাপিত হয়। এই চার্চ কে পেছনে ফেলে এগোতেই দেখলাম টাউন হল। সেই টাউন হলটি ১৪০৫ থেকে ১৪১০ সালে তৈরী করা হয়। সেই টাউন হলের সামনেই অবস্থিত রোল্যান্ড স্ট্যাচু, যাকে জার্মানীর স্ট্যাচু অফ লিবার্টি বলা হয়। এই স্ট্যাচুটি লম্বায় সাড়ে পাঁচ মিটার (চাঁদোয়া সহ দৈর্ঘ্য হলো দশ মিটারের ও বেশী) এবং এটি তৈরি করা হয় ১৪০৪ সালে। এই স্ট্যাচু এবং টাউন হল সম্মিলিত ভাবে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্ট্যাটাসে ভূষিত। টাউন হলের পশ্চিম দিকে অবস্থিত Bremen Town Musicians. এটি একটি ব্রোঞ্জের স্থাপত্য এবং এটিকে শিল্পী Gerhard Marcks তৈরী করেন ১৯৫১ সালে। এটিকে ঘিরে শিশুদের খুব ছবি তোলার ঝোঁক দেখলাম। এইসব দেখার পর আমরা বেশ কিছুক্ষন ব্রেমেন এর ঐতিহাসিক market square এ ঘুরলাম। তারপর অনুভব  করলাম যে আমরা সবাই বেশ ক্ষুধার্ত। তাই আবার ট্রাম এ করে আমাদের বাসস্থানে ফিরে এলাম। সেখানে রান্না করে খেয়ে, একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার শহরের অন্য দিকটায় গেলাম যেখানে শহরের Weser নদীটিকে সামনাসামনি প্রত্যক্ষ করা যায়। এই নদীটির দুইপাশে ব্রেমেন শহর গড়ে উঠেছে। সেই নদীতীরে আমরা সূর্যাস্ত দেখে তারপর বাড়ী ফিরলাম।

Bremen Town Musicians,  ব্রেমেন

 

Bremen Town Musicians,  ব্রেমেন

রোল্যান্ড স্ট্যাচু, জার্মানীর স্ট্যাচু অফ লিবার্টি,  ব্রেমেন

ব্রেমেন শহরে দুইরাত্তির কাটিয়ে তৃতীয়দিন সকালে আমরা প্রাতঃরাশ ইত্যাদি করে আমরা আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল ডোরমগেন এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ডোরমগেন একটা ছোট্ট গ্রাম, যেটা ব্রেমেন থেকে ৩১৫ কিমি দূরে অবস্থিত। এখানেও আমরা  Airbnb -র মাধ্যমে বুক করা একটি জার্মান পরিবারের বাড়ীতে ছিলাম। ডোরমগেন এ আমরা তিন রাত্তির ছিলাম। আমরা যে বাড়িটিতে ছিলাম, সেই পাড়াটি মাত্র কয়েকবছর আগে গড়ে উঠেছে। পাড়ার সবকটি বাড়ি ই নতুন এবং খুব আধুনিক ডিজাইনের। ব্রেমেন এ যে পাড়ায় আমরা ছিলাম, সেখানকার বাড়িগুলি সাবেকি ইউরোপিয়ান স্টাইলে বানানো। ডোরমগেনের বাড়ীতে পৌঁছতে প্রায় বিকেল তিনটে হয়ে গেলো।  সেখানে বাড়ীর গৃহকর্ত্রী আমাদের স্বাগত জানিয়ে আমাদের থাকার জায়গা দেখিয়ে দিলেন। একটা আধুনিক ডিজাইনের দোতলা বাড়ী , তার উপরতলায় আমাদের থাকা ও নিচেরতলায় গৃহকর্তা ও কর্ত্রী থাকেন। সেখানেও আমাদের ভীষণ ভালো লাগলো। পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস, পরিষ্কার রান্নাঘর, বাথরুম, শোবার ও বসার ঘরে আমরা তিনটে দিন দারুন কাটিয়েছি। পাড়ার যে খেলার মাঠ ছিল, সেখানে আমরা দিনের বাকি সময় টা  কাটালাম। সেখানে কিছ স্থানীয় জার্মান ছেলেরা ফুটবল খেলছিল, আমার ছেলেরা যেতেই তারা একসঙ্গে খেলতে শুরু করলো। যেহেতু একে ওপরের ভাষা বোঝেনা, তাই তারা হাত পা নেড়ে হাব ভাব প্রকাশ করছিলো।

 

পরেরদিন সকালে বেশ খেলিয়ে প্রাতঃরাশ করে, দ্বিপ্রাহরিক খাবার বানিয়ে সঙ্গে নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের সেদিনের গন্তব্যস্থল ছিল নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম। যেহেতু এই দেশ দুটি জার্মানীর পাশেই এবং সে দেশে আমার তখন পর্যন্ত পদার্পন করা হয়নি, তাই কালক্ষেপ না করে গাড়ী নিয়ে সোজা ৮৫ কিমি ড্রাইভ করে নেদারল্যান্ডস এর Nieuwstadt শহরে পৌঁছলাম। সেখানে দেখলাম লোকজনের বাড়ী, রাস্তাঘাট, বাস, খেলার মাঠ, পথের দুধারে সারি দেওয়া গাছ, সবুজ প্রান্তর। সবকিছু ছবির মতো সুন্দর।

নেদারল্যান্ডস এর Nieuwstadt শহরে

সেখানে ঘন্টাদুয়েক কাটিয়ে আমরা যাত্রা করলাম বেলজিয়ামের Maaseik শহরের উদ্দেশ্যে। Nieuwstadt থেকে মাত্র ১৭ কিমি দূরে বেলজিয়ামের এই শহর, যেটা Meuse নদীর ধারে অবস্থিত। নদীর উপর একটা সেতু আছে, যেটা দুই দেশের সীমানা। আমরা সেই সেতুতে বেশ কিছুটা সময় কাটালাম, ছবি তুললাম, নদীর দৃশ্য দেখলাম। দেখলাম প্রচুর বয়স্ক মানুষ (পুরুষ এবং নারী) সাইকেল চালিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন। সকলেই পক্ককেশ এবং সত্তোরোর্ধ। দুই দেশের সীমানায় না আছে পুলিশ, না আছে চেকপোস্ট, না আছে সিকিউরিটি ক্যামেরা। থাকার মধ্যে আছে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আর মানুষে মানুষে বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা। আর আছে কতিপয় নিষ্প্রাণ রঙিন সাইনবোর্ড যেগুলি  দুটি দেশের সীমানা নির্ধারণ করছে। সেতুর পাশে গাড়ি রেখে আমরা ঢুকলাম Maaseik শহরে। ছোট ছোট পুরোনোদিনের বাড়ি (১৭০০ এবং ১৮০০ সালে তৈরী), সরু রাস্তা, গলি, তস্য গলি এইসব পেরিয়ে হঠাৎ একটা খোলা চতুষ্কোন জায়গা যেটা হলো Market Square. সেখানে শহরের কৃতী ব্যক্তিত্বের মূর্তি আছে, টাউন হল আছে, কিছু ব্রোঞ্জের মূর্তি আছে আর আছে প্রচুর রেস্তোরাঁ , যেখানে স্থানীয় মানুষ ও ট্যুরিস্ট সবাই খোলা জায়গায় বসে পানাহার করতে পারে। ভীষণ ভালো টিপিক্যাল ইউরোপিয়ান পরিবেশ। সেখানে বসে de Potter বলে একটা আইসক্রীমের দোকান থেকে আমরা আইসক্রীম খেলাম। দোকানটি ১৯২৬ থেকে আইসক্রীম বানাচ্ছে। সেখান থেকে সোজা হেঁটে আমরা গেলাম একটা পাঁচ মাথার মোড়ে। সেখানে বেশ কিছুক্ষন ধরে আমরা বেলজিয়ামের দৈনন্দিন জীবন পর্যবেক্ষণ করলাম। তারপর আমরা আবার হেঁটে ফিরলাম গাড়ীতে এবং পর্যায়ক্রমে বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ডস ও নেদারল্যান্ডস-জার্মানী বর্ডার পেরিয়ে আমরা আমাদের ডোরমগেন এর বাসস্থানে ফিরে এলাম।

বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস এর সীমানায়
বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস এর সীমানায়
বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস এর সীমানায়
বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস এর সীমানায়
বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস এর সীমানায়
নেদারল্যান্ডস ও জার্মানীর সীমানায়

জার্মানীর কোলন শহরটি আমাদের দেখার ইচ্ছে ছিল, তাই পরেরদিন ডোরমগেন স্টেশনে আমাদের গাড়ি রেখে ট্রেনে করে আমরা কোলন সেন্ট্রাল স্টেশন এ  উপস্থিত হলাম। কোলন জার্মানীর চতুর্থ বড়ো শহর এখানে লোকসংখ্যা প্রচুর।  ট্রেন থেকে নেমে, স্টেশনের বাইরে এসে দেখলাম কোলনের বিখ্যাত ক্যাথেড্রাল।  এই চার্চটি ১২৪৮ থেকে ১৪৭৩ সালের মধ্যে তৈরী হয়েছিল। এরপর চার্চটি বহুবার ক্ষতিগ্রস্থ হয় ও পরে আবার এর সংস্কার করা হয়। চার্চটি লম্বায় ১৪৪ মিটার, চওড়ায় ৮৬ মিটার ও উচ্চতায় ১৫৭ মিটার। এর সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায় যে এই স্থাপত্যটি কত উঁচু।

এইখানে বলে রাখা ভালো যে আমি ধর্মীয় কারণে চার্চ দর্শন করিনি। আগেকার দিনে ইউরোপে বড় , মেজো , সেজো , ছোটো ও ন, সব শহরই চার্চ কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতো। তার ফলে কোনো ইউরোপিয়ান শহরের old city বেড়াতে গেলে চার্চ স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে।

কোলনের বিখ্যাত ক্যাথেড্রাল প্রায় দু ঘন্টা ধরে দেখার পর আমরা আশেপাশের কিছ রাস্তা দিয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটলাম। দেখলাম বড়ো শহরের সব উপাদান ই সেখানে রয়েছে। প্রচুর মানুষ বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন জাতির, প্রচুর দোকানপাট, বাতাসে ধূমপানের গন্ধ, রাস্তায় ময়লা, ভিক্ষুক, স্ট্রিট পারফরমার রা, উঁচু উঁচু বাড়ী ইত্যাদি। কোলন শহরে হাঁটা শেষ করে আমরা ট্রেনে করে ডোরমগেনে  ফিরে এসে আমাদের গাড়ি নিয়ে আমরা Zons বলে একটা ছোট্ট পুরোনো শহরে গেলাম। এই শহরটি দ্বাদশ শতাব্দী বা তার ও বেশি পুরোনো। Zons এর যে old city, সেটা ব্যাসল্ট পাথর দিয়ে বানানো প্রাচীর এ ঘেরা। প্রাচীরের প্রতিটি কোনে একটি করে মিনার আছে। old city তে ঢোকার দুটো দরজা আছে। এবং শহরটি রাইন নদীর পাশে অবস্থিত।  শহরটি ঘুরে ভীষণ ভালো লাগলো, তারপর রাইন নদীর ধরে গিয়ে ঘন্টাদুয়েক বসে রইলাম। এই প্রথম আমার রাইন নদী দর্শন। যেহেতু এই নদীতে নিয়মিত মালবাহী জাহাজ চলাচল করে, তাই এই নদীতে স্নান করা বারণ। কিন্তু আমি আমার ছেলেদের নিয়ে নদীর পাড়ে হাঁটুজলে শিশুদের মতো খেলা করেছি।  তারপর সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে বিশ্রাম। ডোরমগেনে আমরা যে পাড়ায় ছিলাম, তার একদিকে মাইলের পর  মাইল জুড়ে শুধু শস্যের ক্ষেত। ভুট্টা, গম, যব, আলু ইত্যাদি। আমরা প্রতিদিন সন্ধেবেলায় সেই শস্যক্ষেতের মধ্যে দিয়ে হেঁটেছি। আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল ছিল ডোরমগেন থেকে ২৬৬ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে ম্যানহাইম শহর। সেইমতো আমরা পরেরদিন বেলা সাড়ে দশটার সময় বেরিয়ে, বিভিন্ন জায়গায় থেমে বেলা একটার  সময় পৌঁছলাম ম্যানহাইম শহরে। ম্যানহাইমে আমরা ছিলাম DJH Jugendherberge Mannheim International hostel এ। আমরা দোতলায় যে ঘরটি পেলাম, সেটি একরাত থাকার মতো।  কিন্তু আমাদের সেখানে তিনরাত থাকতে হবে। ঘরে একটাই জানালা এবং সেই জানালা হাট করে খোলা যায় না, নিরাপত্তার কারণে। অথচ ঘরে পাখা নেই এবং ঘরের ভিতর বেশ গরম। বেশ মনখারাপ হলো। এই হোস্টেলটি রাইন নদীর ধরে অবস্থিত, নদীরপাড়ে  সুন্দর করে ছাঁটা প্রশস্ত ঘাসজমি, হাঁটা ও সাইকেল চালাবার রাস্তা এবং পর্যাপ্ত বসার বেঞ্চ। বিশাল বৃক্ষরাজী ওই গরমে প্রয়োজনীয় ছায়া বিতরণ করছে। কিন্তু নদীতে নামার কোনো উপায় নেই। অন্তত এই পার থেকে। উল্টোদিকের পারে দেখলাম একটা জায়গা আছে যেখানে লোকজন জলে নামছে। আমরা বিকেলের দিকে সেখানে গেলাম ও নদীর জল উপভোগ করলাম। রাতে নৈশভোজের পরে আমি নদীর পারে অনেক্ষন বসে রইলাম। বহু মানুষ সেই সময় নদীর ধারে নিছক বসে আছে, হাঁটছে, দৌড়োচ্ছে, সাইকেল চালাচ্ছে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মত্ত ইত্যাদি। বিভিন্ন বয়সের লোকজন। আনন্দ আছে, আনন্দের অভিব্যক্তি আছে, কিন্তু উছশৃংক্ষলতা চোখে পড়লো না। নদীর ধারে  বসে, বহমান স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকার একটা মাদকতা আছে, যেটা আমি অনেক্ষন ধরে উপভোগ করলাম।

জার্মান IKEA তে লাঞ্চ
জার্মান IKEA তে লাঞ্চ

 

তার পরেরদিন আমরা প্রাতঃরাশ করলাম হোস্টেলেই।  প্রাতঃরাশের দাম ভাড়ার মধ্যেই ধরা ছিল। প্রাতঃরাশ এমন কিছু আহামরি নয়, চলনসই। প্রাতঃরাশ করে আমরা ফ্রান্সের Strasbourg শহরের দিকে যাত্রা করলাম। ম্যানহাইম থেকে Strasbourg  এর দূরত্ব ১৪০ কিমি। জার্মানী ও ফ্রান্সের বর্ডার পেরোলাম Scheibenhard বলে একটা জায়গায়। সেখানে থেমে একটা ফরাসী সুপারমার্কেট এ গিয়ে আমাদের সেদিনকার মধ্যাহ্নভোজের খাদ্যসামগ্রী কিনে নিলাম। সুপারমার্কেটে দোকানির সঙ্গে ভাষাগত কিছু সমস্যা হওয়ায় দেখলাম একজন ফরাসি মানুষ নিজের থেকেই আমাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন ও  অনুবাদকের কাজ করলেন। নতুন দেশে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে এরকম ঘটনা মনকে ভীষণ আনন্দ দেয়। তারপর ড্রাইভ করে একেবারে Strasbourg শহরের মধ্যিখানে। Strasbourg এ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের হেড অফিস। আমরা যখন শহরে পৌঁছলাম তখন তাপমাত্রা ৩৪°সেলসিয়েস।  বেশ কষ্ট হচ্ছিলো (কারণ আমি গত ১৫ বছর ২৫°সেলসিয়েসের বেশি তাপমাত্রায় থাকিনি)।  গাড়ি একটা জায়গায় পার্ক করে আমরা হাঁটতে বেরোলাম। প্রথমে গেলাম Parc du Contades বা Contades পার্কে।  বিশাল গড়ের মাঠ, প্রচুর গাছ, বসার জায়গা, বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের আলাদা আলাদা খেলার জায়গা , কিন্তু কোনো টয়লেট নেই। সেখানে গাছের ছায়ায় বসে আমাদের আহারাদি সম্পন্ন করলাম। বেশ কিছু মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে রয়েছে। অফিস কর্মী পার্কে বসে লাঞ্চ করছে, মা তার শিশুকে পার্কে খেলতে নিয়ে এসেছে, কিছু পথচলতি মানুষ ইত্যাদি। একটা পুলিশের ভ্যান ও দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে কিছুক্ষন কাটিয়ে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। আমাদের অবিলম্বে একটি টয়লেটের দরকার হয়ে পড়েছিল। ওই পার্ক থেকে বেরিয়ে, পার্কের লাগোয়া একটা বড়ো সিনাগগ পেরিয়ে আমরা Place de la République এ পৌঁছলাম। এটা  আসলে তিন মাথার মোড় , যার চারদিকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন আছে।  যেমন ন্যাশনাল থিয়েটার, ন্যাশনাল ও ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি, পরিবহন দপ্তর, Palais du Rhin ইত্যাদি। আমরা প্রথমে পরিবহন দপ্তরে জিজ্ঞাসা করলাম যে সেখানে টয়লেট আছে কিনা। তারা বললো এখানে হবে না, লাইব্রেরিতে যাও। আমরা লাইব্রেরিতে গিয়ে বিনা পয়সায় টয়লেট ব্যবহার করতে পারলাম। সেখানে বসে একটু ঠান্ডা হলাম। তারপর বেরিয়ে Place de la République এ যে সুন্দর বাগান করা আছে সেখানে গিয়ে আমি গাছের ছায়ায় দিবানিদ্রা দিলাম। আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কাছেই একটা চার্চ ছিল, Temple-Neuf Church, সেটা দেখতে গেলো। তার ঘন্টা খানেক পর আমরা সকলে মিলে  আবার গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। তারপর গাড়ি নিয়ে সোজা ম্যানহাইমে। সেদিন তারপরে আর উল্লেখযোগ্য কিছু করিনি।

 

তার পরেরদিন সকালে আমরা গেলাম ম্যানহাইম থেকে ২৬ কিমি দূরে Speyer বলে একটা ছোট্ট শহরে। কিছুক্ষন শহরের মধ্যে ড্রাইভ করার পর হঠাৎ  দেখলাম এক জায়গায় যাত্রীবিমান, যুদ্ধ বিমান, হেলিকপ্টার ইত্যাদি  রাখা আছে। সেটা আসলে Technic Museum Speyer. আমরা সেখানে ঢুকলাম। টিকিটের দাম বেশ চড়া।  আমার বেশ গায়ে লেগেছে। মিউসিয়ামটা চার ভাগে ভাগ করা। প্রথম ভাগে প্রচুর ভিনটেজ গাড়ি ১৯২০, ৩০ ও ৪০ এর দশকের, বাষ্পচালিত রেল এঞ্জিন , ভিনটেজ মোটরসাইকেল ইত্যাদি রাখা আছে। সবকিছু এতো যত্ন করে রাখা আছে মনে হবে যে দোকানের শোরুমে এসে গাড়ি দেখছি। প্রত্যেকটা জিনিস ঝকঝকে। দ্বিতীয়ভাগ টি ওপেন এয়ার এ। সেখানে গোটা পঁচিশেক বিভিন্ন সাইজের ও সময়ের এরোপ্লেন রাখা আছে, এমনকি একটা বোয়িং ৭৪৭-২০০ এবং এন্টোনোভ এ এন ২২।  বোয়িং ৭৪৭-২০০ বিমানটি তিনটি সুউচ্চ ইস্পাতের খুঁটির সাথে হেলিয়ে বাঁধা আছে। একটা ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে সেই বিমানটির পেটের মধ্যে। বিমানের পেটের মধ্যে ঢুকলে মাথা ঘুরে যাবে কারণ বিমানটি একদিকে হেলিয়ে রাখা আছে। বিমান থেকে বাইরে চোখ রাখলে পুরো Speyer শহরটি দেখা যায়। বিমানের পাদদেশে স্লাইড করা আছে যাতে বাচ্চারা সিঁড়ি দিয়ে উঠে স্লাইড করে নেমে যেতে পারে। এছাড়াও সেখানে ছিল একটি আস্ত জাহাজ ও আস্ত একটি সাবমেরিন।

মিউসিয়ামের তৃতীয় ভাগে ঢুকে আমি বুঝলাম আমার প্রবেশমূল্য উশুল হয়ে গেছে। মিউসিয়ামের তৃতীয়ভাগটি একটি স্পেস মিউসিয়াম। ইউরোপের বৃহত্তম স্পেস মিউসিয়াম। আমি এর আগে কোনো স্পেস মিউসিয়াম দেখিনি। সেই মিউসিয়ামে রাখা জিনিষগুলি দেখে ও রচনাগুলি পড়ে  আমি বাক্যহারা হয়ে গেলাম। দেখলাম আসল স্পেস শাটল BURAN (সোভিয়েত ইউনিয়ন ), BOR – ৫ (unmannend oribital rocket aircraft, সোভিয়েত ইউনিয়ন), Apollo 11 lunar module এর মডেল, lunar rover এবং স্পেস স্যুটএর  মডেল, স্পেস ল্যাব মডিউল, আসল landing capsule of the Soyuz mission TM 19, ভস্তক ১ স্পেসক্রাফ্ট , Russian residential and navigation module of the International Space Station ISS এবং ৩.৪ বিলিয়ন বছরের পুরোনো চাঁদের পাথর। চাঁদের পাথর দেখাটা আমার জীবনের একটা স্মরণীয় ঘটনা। পুরো স্পেস মিউসিয়ামটা ঘুরে দেখতে ঘন্টা দুয়েক সময় লাগলো। তারপর আক্ষরিক অর্থে বাক্যহারা হয়ে বেরিয়ে এলাম। মিউসিয়ামের চতুর্থ ভাগে বাচ্চাদের অনেক রাইডস রয়েছে।  আমরা সেখানে কিছুক্ষন সময় কাটালাম।

তারপর গাড়ী করে আমরা হাইডেলবার্গ শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। Speyer থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরে হাইডেলবার্গ শহর। সেখানে যেতে যেতে শুধু সত্যজিৎ রায় আর প্রফেসর শংকুর কথা মনে পড়ছিলো। ‘প্রফেসর শংকু ও রোবু ‘ গল্পে হাইডেলবার্গ শহরের যথোপযুক্ত বর্ণনা দেওয়া আছে এবং আমি দেখলাম সেই বর্ণনা কতটা যথাযথ। হাইডেলবার্গ শহরে নেকার নদীর ধরে একটা জায়গায় গাড়ী পার্ক করে আমরা পাথরের তৈরী Karl Theodor Bridge বা ওল্ড  ব্রিজ পেরিয়ে আমরা old সিটি তে প্রবেশ করলাম। আমরা যখন সেখানে পৌঁছলাম, সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে ও সূর্যরশ্মি সরাসরি গিয়ে পড়েছে হাইডেলবার্গ কাসল এর গায়ে। তাতে তার সৌন্দর্য যেন শতগুনে বেড়ে গেছে। এবং তার পেছনে ঘন সবুজ বন।  আমরা প্রায় দু ঘন্টা সেখানে কাটালাম। তারপর গাড়ী করে আমরা ম্যানহাইমে ফিরে এলাম। মনের মধ্যে হাইডেলবার্গ ততক্ষনে একটা স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

ম্যানহাইমের পর্ব শেষ হলে পর আমরা গেলাম ৫৩০ কিমি উত্তরে একটা ছোট্ট গ্রামে যার নাম Eyendorf. এই গ্রামটি হ্যামবুর্গ শহর থেকে মাত্র ৫০ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। Eyendorf এ আমরা ছিলাম Airbnb -র মাধ্যমে বুক করা একটি জার্মান পরিবারের বাড়ীতে। দোতলা বাড়ী। তার উপরতলায় আমাদের থাকা ও নিচেরতলায় গৃহকর্তা ও কর্ত্রী থাকেন। আমাদের সেই বাড়িতে পৌঁছতে সন্ধ্যে ছটা বেজে গিয়েছিলো। গৃহকর্তা ও কর্ত্রী দুজনেই আমাদেরকে স্বাগত জানালেন ও আমাদের থাকার জায়গা ভালোভাবে দেখিয়ে দিলেন। আমরা সেখানে চার রাত ছিলাম। সেই বাড়িটিতে থেকেও আমাদের খুব আনন্দ হয়েছিল। আমরা যেদিন ওখানে পৌঁছলাম তার পরেরদিন ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিলো, তাই সেদিন আর কোথাও বেরোনো হয়নি। আমরা সারাদিন বাড়িতেই বিশ্রাম করে, রান্না বান্না করে খেয়েদেয়ে কাটালাম।

তার পরেরদিন আমরা বেরোলাম লুবেক শহর দেখবো বলে। Eyendorf থেকে লুবেকের দূরত্ত্ব ১২০ কিমি। লুবেক শহর পৌছিয়ে আমরা Trave নদীর ধারে গাড়ী রেখে নদীর পাড় দিয়ে বেশ খানিকটা হাঁটলাম। দুখানা ব্রিজ ক্রস করলাম। শহরটা ভীষণ সুন্দর, পুরোনো বাড়িগুলিকে যত্ন করে সংরক্ষিত করা আছে, নোংরা প্রায় দেখিনি বললেই চলে। লুবেকে ঘন্টা দুয়েক কাটানোর পরে আমরা আবার গাড়ী  করে Eyendorf এর দিকে ফিরে এলাম।

পরেরদিন আকাশ পরিষ্কার থাকায় আমরা গেলাম কাছাকাছি একটা পুরোনো শহর Lüneburg এ। এই শহরটি ১০০০ বছরেরও বেশী পুরোনো, নুন তৈরীর জন্য বিখ্যাত  ও উত্তর জার্মানীর সুন্দরতম শহরগুলির মধ্যে একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও  কোনো ক্ষতি না হবার ফলে Lüneburg তার কমনীয় মধ্যযুগীয় চরিত্রটি বজায় রেখেছে।  Ilmenau নদীর ধারে অবস্থিত এই শহরটি। নদীর ধারে গাড়ী পার্ক করে আমরা শহরে হাঁটতে বেরোলাম। পুরোনো বাড়ী, পাথরের রাস্তা, সুন্দর সব বাড়ীর ডিজাইন, প্রচুর ট্যুরিস্ট, শহরের মধ্যিখানে গাড়ী চলা বারণ, খালি পাবলিক বাস চলে, প্রচুর ওপেন এয়ার রেস্তোরাঁ, সেখানে লোকজন বসে পানাহার করছে, ঝকঝকে নীল আকাশ, সব মিলিয়ে একটা দারুন পরিবেশ। আমরা দেখলাম St. Johanniskirche (st. Johannis church), টাউন হল, ওয়াটার টাওয়ার এবং St. Nicolai church.

Lüneburg এর চেয়ে ভালো জায়গা দিয়ে বোধহয় আমাদের জার্মানী ভ্রমণ সম্পন্ন হতে পারতো না। অথচ এখানে আসার কোনো পরিকল্পনাই আমাদের ছিল না। আমাদের হোস্ট এই জায়গাটার উল্লেখ করে বলেছিলেন : “this is a must see “. আবার Zons শহরের খবর পেয়েছিলাম আমাদের ডোরমগেনের হোস্টের কাছ থেকে। আমরা এইজন্য ওদেরকে প্রচুর ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। Eyendorf এর পর্ব শেষ করে আমরা পরেরদিন সকালে গাড়ি নিয়ে হ্যামবুর্গ শহরে এলাম। শহরে আসতে শেষ ৯ কিমি যে কি পরিমান যানজটের মধ্যে দিয়ে আসতে হয়েছে, সেটা আর নাইবা উল্লেখ করলাম। এইরকম যানজট নাকি হ্যামবুর্গ শহরে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। হ্যামবুর্গ স্টেশনে গাড়ী ফেরত দিয়ে, ট্রেনে উঠে ফের কোপেনহেগেন পৌঁছলাম।  একই হোস্টেলে ছিলাম। পরেরদিন সকালে প্রাতঃরাশ করে কোপেনহেগেনের এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে ঘন্টা দুয়েক কাটালাম। সেখানে দেখলাম ১০০ বছরেরও বেশি পুরোনো ব্রোঞ্জের মৎস্যকন্যার মূর্তি। তারপর দুপুরের ট্রেন ধরে রাত সাড়ে আটটায় স্টকহোমে ফিরলাম। পরিশ্রান্ত শরীর, কিন্তু পরিপূর্ণ মনে আমাদের ইউরোপ ভ্রমণ সম্পন্ন হলো।

Keep reading

More >