চাঁপা ঠাকুমার উত্তমপুরুষ

“সুপারহিরো আমাদের যুগেও ছিল। দরকারে তরুণীদের প্রাণ বাঁচাতে তারাও বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ত।” টিভির পর্দায় চোখ রেখে সোফায় বসতে বসতে …

“সুপারহিরো আমাদের যুগেও ছিল। দরকারে তরুণীদের প্রাণ বাঁচাতে তারাও বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ত।” টিভির পর্দায় চোখ রেখে সোফায় বসতে বসতে চাঁপা ঠাকুমা বললেন।

গ্রিন গবলিনের বোমায় একটা উঁচু বাড়ির বারান্দা ভেঙে পড়ছে। সেই বারান্দার সঙ্গেই আর্ত চিৎকারে মেরি জেন ধাবিত হয়েছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে হাজির হল আর্তের রক্ষক স্পাইডারম্যান। চিলের মতো শূন্যে ছোঁ মেরে মেরি জেনকে বুকে জড়িয়ে ধরে জাল ছুঁড়তে ছুঁড়তে সে পৌঁছে গেল বিপদ থেকে বহু দূরে। সুন্দর একটা রুফটপ গার্ডেনে মেরি জেনকে নামিয়ে দিয়েই ব্যস্ত নগরের আকাশছোঁয়া বাড়িগুলোর আড়ালে আবার হারিয়ে গেল মাকড়সা মানব।

শুরু হল বিজ্ঞাপন।

 

টিভিটা মিউট করে নীপা তাকাল চাঁপা ঠাকুমার দিকে – “তোমাদের যুগ মানে আবার কী? এটা কি তোমাদের যুগ নয়?” ঠাকুমা চশমার ফাঁক দিয়ে মৃদু হাসলেন – “এটা তোদের যুগ। টেলিভিশান, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন। তখন টেলিফোন তো দূরের কথা, গাঁ-গঞ্জে ইলেক্ট্রিসিটিই যায়নি। আমাদের যুগে সন্ধে হল মানেই হাত-মুখ ধুয়ে অন্ধকার বারান্দায় হ্যারিকেনের আলোয় বই খুলে বসা। আমাদের পড়াতে আসতেন গ্রামের স্কুলের ইংরাজি শিক্ষক আনোয়ার আলি। লোকে বলত আনোয়ার স্যারের নাকি লেজ ছিল।”

শেষ কথাটা বলে ঠাকুমা ফিক করে হেসে ফেললেন – “দাঁড়া ওষুধটা খেয়ে নিই।” রাংতা থেকে একটা ওষুধ বের করে গেলাসে চুমুক দিলেন তিনি। চাঁপা ঠাকুমার নামটা বোধ হয় তাঁর গায়ের রঙ থেকেই এসেছে। নীপা যখন খুব ছোট, তখন ওর বাবার পোস্টিং হয়েছিল চাঁপা ঠাকুমাদের গ্রামের হাসপাতালে। নীপারা যে কোয়ার্টারে থাকত, তার পাশেই ছিল চাঁপা ঠাকুমাদের বাড়ি। সে বাড়ি আসলে ছিল ঠাকুমার বাবার। ঠাকুমার অন্য চার বোন বিয়ে করে স্বামীর বাড়ি চলে গেলেন ঘরকন্না করতে। শুধু চাঁপা ঠাকুমাই বিয়ে-থা করলেন না, বাবা-মায়ের সঙ্গে থেকে গেলেন নিজের গ্রামে। গ্রামের স্কুলেই পড়াতেন কিছুদিন আগে পর্যন্ত। এখন পেনশনের তদবির করতে কলকাতায় আসতে হয়েছে। সেই সূত্রে নীপাদের বাড়িতে আজ রাতটা থাকবেন।

নীপা মায়ের মুখে শুনেছে প্রতিদিন বিকালে ঠাকুমা ওদের বাড়ি আসতেন মায়ের সঙ্গে গল্প করতে। বারান্দায় দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসে আড্ডা দিতেন দুই অসমবয়সি বন্ধু। মায়ের কোলে নীপা আর চাঁপা ঠাকুমার কোলে আধবোনা সোয়েটার। তখনই আভাসে মা বুঝেছিলেন, কোনও প্রেম-বিরহেই চাঁপা ঠাকুমা অবিবাহিতা থেকে গেছেন। কিন্তু এ প্রসঙ্গে ঠাকুমা বিশদে কিছু বলেননি। ভদ্রতার খাতিরে মা-ও কোনওদিন তাঁকে প্রশ্ন করেননি।

পরে ওই গ্রাম থেকে নীপারা পাকাপাকিভাবে কলকাতা চলে এলেও চাঁপা ঠাকুমার সঙ্গে ওদের সম্পর্কে ছিন্ন হয়নি। ঠাকুমার বাবা আর মা একে একে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। চিঠিচাপাটির যুগ তখন, ঠিক দিনে না পৌঁছাতে পারলেও নীপারা দুবারই গিয়েছিল ঠাকুমাকে সান্ত্বনা দিতে। স্কুলের কাজে মাঝে মাঝে কলকাতায় এলে ঠাকুমাও দেখা করে যেতেন নীপাদের সঙ্গে।

 

গুনে গুনে ঠাকুমার রুটিনমাফিক সব ওষুধ খাওয়া শেষ। ওদিকে বিজ্ঞাপন বিরতির পর আবার পর্দায় হাজির স্পাইডারম্যান। সেদিকে তাকিয়ে চাঁপা ঠাকুমা বললেন – “তোর তো কাল অফিস। তুই কি এখন টিভিই দেখবি নাকি?” নীপা টিভিটা বন্ধ ঠাকুমার কোলে মাথা রাখল – “নাহ টিভি দেখব না। তুমি তোমার যুগের সুপারহিরোর কথা শোনাও বরং।”

স্মিত হেসে ঠাকুমা নীপার চুলে আঙুল বোলাতে বোলাতে গল্প শুরু করলেন।

 

আনোয়ার আলির আসল বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদের কোনও এক গ্রামে। আমাদের গ্রামের স্কুলের ইংরাজি শিক্ষক রিটায়ার করার পর, সরকার থেকে ওনাকে পাঠানো হয়। থাকতেন স্কুলের লাগোয়া একটা পাঁচিলঘেরা একতলা বাড়িতে। একবার কালাম চাচা ওই বাড়ির পাশের নারকেল গাছে উঠেছিল ডাব পাড়তে। গাছের ওপর থেকে চাচা নাকি দেখেছিল, কুয়োর পাড়ে দাঁড়িয়ে আনোয়ার স্যার বালতি মগ নিয়ে চান করছেন আর ওনার গামছার ফাঁক দিয়ে একটা লেজ বেরিয়ে আছে। আর সে লেজ যেমন তেমন লেজ নয়। হনুমানের লেজের মতো লম্বা আর বাঁকানো।

তাড়িখোর বলে কালাম চাচার বদনাম ছিল, তাই তার কথা আর সবাই গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দিল বটে, কিন্তু আনোয়ার স্যারের লেজের গপ্পো লুফে নিল আমাদের গ্রামের ফাজিল চাচা। ফাজিল চাচার আসল নাম বোধ হয় ফজলুর রহমান। কিন্তু হাতের কাছে যাকে পেত, তাকে নিয়েই সে ঠাট্টা করত বলে গ্রামের লোকে বিরক্ত হয়ে তাকে ডাকত ফাজিল বলে। আমরা ছোটরা বলতাম ফাজিল চাচা।

ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হত কানাকে কানা আর খোঁড়াকে খোঁড়া না বলার জন্যে। যে মানুষের যেটা খামতি, সেটা তার সামনে তুলে ধরলে মানুষটা মনে কষ্ট পায়। কিন্তু ফাজিল চাচাকে ছোটবেলায় কেউ এসব শেখায়নি বোধ হয়। সে কানাকে কানা এবং খোঁড়াকে খোঁড়া বলেই ক্ষান্ত দিত না; তাদের নিয়ে রসিকতাও করত। যেমন আমাদের বাড়িতে সকাল-বিকাল বাসন মেজে দিয়ে যেত আসিয়াদি। এই আসিয়াদিকে নিয়েও একটা গল্প বানিয়েছিল ফাজিল চাচা।

আসিয়াদির ছোটখাটো চেহারা। সারা গায়ে-মুখে ছোট-বড় আব ছিল। কপালের ওপর একটা আব এত বড় ছিল যে, তার বাঁদিকের চোখটাই ঢেকে গিয়েছিল। সে বেচারি কখনও ওই চোখটা খুলতেই পারত না। ফাজিল বুড়ো সন্ধেবেলা মোড়ের মাথায় ইদ্রিশ চাচার মুদির দোকানের ছোট বারান্দায় বসে গল্প শোনাত।

আল্লা একদিন একতাল মাটি দিয়ে একজন ফেরেশতাকে বলল, “যাও আসিয়া বানাও।” সেদিন সেই ফেরেশতার মেজাজ খুব খারাপ ছিল। তার আগের দিনই সে হিটলারকে বানিয়েছিল বলে আল্লার কাছে খুব ঝাড় খেয়েছে। “মজা পেয়েছ? বানানোর লোক পাওনি আর? এই লোকটা দুনিয়ায় পয়দা হয়ে হাজার হাজার লোক মারবে। হোক না তারা ইহুদি, মুসলমানদের জাত শত্তুর, তা বলে কি তারা মানুষ নয়? আর একবার যদি এমন ভুল দেখেছি তো কান ধরে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেব। দেখবে তখন কত ধানে কত চাল। বেহেশতে বসে খাচ্ছে-দাচ্ছে আর হিটলার বানাচ্ছে। যত্তসব!”

তা সেই ফেরেশতা আগের দিনের বকুনির শোধ তুলতে নাম-কা-ওয়াস্তে একটা ছোট মেয়ে বানিয়ে দিল। অনেকটা মাটি বেঁচে গেল। সময়ও পড়ে আছে অনেক। এখনই আল্লার কাছে ফেরত গেলে হাজারটা ফাই-ফরমাশ খাটাবে। তার থেকে এখানে বসেই সময় কাটানো যাক। সেই ফেরেশতা বেঁচে যাওয়া মাটির ডেলা থেকে ছোট ছোট গুলি পাকিয়ে সদ্য বানানো মেয়েটার গায়ে আনমনে মারতে লাগল। কতক্ষণ এভাবে কেটেছে কে জানে, হঠাৎ কাজ শেষের ঘণ্টা পড়ে গেল। আচমকা চিন্তার চটক ভাঙতেই হাতের বড় মাটির ডেলাটা ধাঁ করে ছুড়ে দিয়ে আসিয়াকে ফেলে ফেরেশতা ছুট দিল পরের কাজ করতে। অন্য একজন ফেরেশতা এসে আসিয়াকে উদ্ধার করল বটে, কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। আসিয়ার সারা গায়ে গুটলি গুটলি আব হয়ে গেছে। আর শেষ বড় ডেলাটা গিয়ে বসেছে কপালের একপাশে তার বাঁ চোখের ওপর।

 

আল্লা এবং তাঁর ফেরেশতাদের নিয়ে মজা করার জন্যে মসজিদের ইমাম সাহেব এবং গ্রামের আরও সব মুরুব্বিরা দারুণ চটে গেলেন। পারলে তাঁরা তখনই ফাজিল চাচাকে গ্রাম থেকে বের করে দেন। শোনা যায়, কিছু লোক রাতের অন্ধকারে ফাজিল চাচার বাড়িতে আগুন লাগানোর পরিকল্পনাও করেছিল। কিন্তু সে রাত থেকেই প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। পরপর দুদিন মুষলধারে বৃষ্টির কারণে কেউ বাড়ি থেকে প্রায় বের হতেই পারল না। দাদু বললেন – “আল্লার গজব এসে পড়েছে এই গ্রামে। ফাজিলটার জন্যে সারা গ্রাম ভেসে যাবে এবার।”

তিনদিন পরে বৃষ্টি থেমে গেল। গ্রাম ভেসে গেল না বটে, কিন্তু ফাজিল বুড়োর ছিটেবেড়ার বাড়ির একটা দিক ধ্বসে গেল। এই গোলমালের সুযোগে ফাজিল চাচার একমাত্র ছেলে আর বৌমা তাকে ছেড়ে আলাদা হয়ে গেল। ছেলে রটাল, তার বাপের ওপর জ্বিন সওয়ার হয়েছে, তাই আল্লা-রসুল নিয়ে মজা করে বেড়াচ্ছে। সেই কারণেই আল্লার অভিশাপে বাড়িটা ভেঙে গেছে। এমন লোকের সঙ্গে একবাড়িতে থাকা যায় না। যদিও সেই বৃষ্টিতে আরও কিছু কাঁচা বাড়ি পড়ে গিয়েছিল। তবু পাড়া-প্রতিবেশীরা বলল, গভীর রাতে তারা তালগাছ সমান উঁচু একজন মানুষকে ফাজিল বুড়োর বাড়ির চালে পা তুলে সব গুঁড়িয়ে দিতে দেখেছে।

জ্বিন ধরার জন্যেই হোক বা বাড়ি ভেঙে পড়ার কারণেই হোক, ফাজিল চাচাকে এরপর থেকে অনেকেই করুণার চোখে দেখত। ধর্ম নিয়ে মজা করার ফল লোকটা হাতেনাতে পেয়েছে। ছেলে আর ছেলের বৌ ছেড়ে চলে গেছে। এখন এই বুড়ো বয়সে খেটে খেতে হবে, হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হবে। গ্রামের সবাই প্রগলভতার জন্যে ফাজিল চাচার ওপর বিরক্ত হলেও, সারাদিনের খাটাখাটনির পর সবারই মুখরোচক আড্ডা ভালো লাগে। তাই অল্পদিনের মধ্যেই ইদ্রিশ চাচার মুদি দোকানের বারান্দায় আবার শুরু হয়ে গেল ফাজিল চাচার পরচর্চার সান্ধ্য আসর। আর সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ল আনোয়ার স্যারের লেজের গল্প।

 

একদিন স্কুল ছুটির পর আমাদের বাড়ি এসে হাজির আমাদের ক্লাসের ফেরদৌসী। বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল, “জানিস ফাজিল বুড়ো তোদের মাস্টারমশাইয়ের লেজ নিয়ে কী বলেছে?”

আমাদের মাস্টারমশাই মানে আনোয়ার স্যার। প্রতিদিন সন্ধেবেলা পড়াতে আসতেন। পড়ানোর পর রাতের খাবারটা আমাদের বাড়িতেই খেয়ে যেতেন। কলেজ থেকে সদ্য পাশ করে বেরিয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। পাতলা গোঁফের সাথে ওনার হালকা রুপোলি রঙের গোল ফ্রেমের চশমাটা দারুণ মানাত। ধুতির সঙ্গে সাদা ফুলহাতা জামা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে পরতেন। পড়াতেনও সুন্দর করে। ক্লাসে কেউ পড়া না পারলে, কখনও বলতেন না, “এ হে হে! এটা পারলে না?” বরং তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেন, “আজ পড়া পারলে না, পরে যখন আমার মতো স্কুলে পড়াতে যাবে, তখন না পারলে তোমার স্টুডেন্টরা হাসবে কিন্তু।” প্রত্যেক মাসে ক্লাস টেস্ট নিতেন, আর খাতা দেখানোর সময় লাড্ডু খাওয়াতেন। বলতেন, “অত কষ্ট করে পরীক্ষা দিয়েছ, তোমাদের মিষ্টি না খাওয়ালে চলে?” ওনার এইরকম ব্যবহারের জন্যে সবাই ইংরাজিতে ভালো মার্কস পাওয়ার চেষ্টা করত। এহেন জনপ্রিয় এবং আন্তরিক শিক্ষকের লেজ সম্পর্কিত গল্পগাছাকে স্বভাবতই আমরা গুজব বলে উড়িয়ে দিতাম। এমন সুন্দর একজন মানুষের আবার লেজ থাকতে পারে নাকি? ফেরদৌসীকে বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম – “তুই কি আজকাল ফাজিল বুড়োর আড্ডায় যাস নাকি?” ফেরদৌসী ফিক করে হেসে বলল – “আমায় বুবাই বলেছে।”

বুবাই ছেলেটা আমার দারুণ অপছন্দের। আমাদের ক্লাসেই পড়ে। আনোয়ার স্যারকে নিয়ে আড়ালে হাসিঠাট্টা করে। স্পোর্টসের শেষদিন প্রাইজ দেওয়ার আগে হেডস্যার বক্তৃতার মধ্যে বলেছিলেন, “আমাদের নতুন শিক্ষক আনোয়ার আলির উদ্যোগে এ বছরের স্কুল স্পোর্টস অন্যান্য বছরের থেকে আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে।” বুবাই নাকি তখন আনোয়ার স্যারের পেছনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনছিল। ও পরে বলে বেড়িয়েছে, প্রশংসা শুনে আনোয়ার স্যারের লেজ নাকি আনন্দে ধুতির মধ্যে নড়ছিল, ও দেখেছে। এমন জঘন্য রসিকতায় আমাদের ক্লাসের ছেলেগুলো হ্যা-হ্যা করে হাসছিল দেখে মেজদি বলেছিল – “হেডস্যারকে বলে একদিন সবকটা বাঁদরকে মার খাওয়াব।” মেজদির ওই কথা শোনার পর থেকে আমাদের দু বোনকে দেখলেই ওই ছেলেগুলো একসাথে চেঁচাত – “জয় শ্রী রাম।” ওদের দলের পাণ্ডা ওই শয়তান বুবাই।

আমার দাদু স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার সুবাদে আনোয়ার স্যারকে আমাদের গৃহশিক্ষক হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাঁর মতো জনপ্রিয় শিক্ষক আমাদের বাড়িতে পড়াতে আসেন, এটা বুবাইয়ের দলের সাথে সাথেই আরও অনেক ছাত্র-ছাত্রীরই ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিশ্চয়। নাহলে ফেরদৌসী বাড়ি বয়ে এসে ‘তোদের মাস্টারমশাই’ বলে অত উৎসাহ নিয়ে ফাজিল চাচার গল্প শোনাবে কেন? আমি চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি ফুটিয়ে তোলার পরও সে গল্পটা না শুনিয়ে ছাড়ল না।

 

আনোয়ার স্যারের তখনও জন্ম হয়নি, তাঁকে গর্ভে নিয়ে তাঁর মা তখন অন্তঃসত্ত্বা। শীতকালের এক রাত। স্যারের বাবা মোতাহার আলি খাওয়া-দাওয়া সেরে হাত ধুচ্ছেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে, হঠাৎ শুনলেন তাঁদের পোষা হাঁস-মুরগিগুলো অস্থিরভাবে ডাকতে শুরু করেছে। শেয়াল বা কটাশ হানা দিয়েছে ভেবে একটা লন্ঠন হাতে মুরগির ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন উঠোন পেরিয়ে।

মুরগির ঘরের কাছে গিয়ে যা দেখলেন, তাতে বেশ চমকে উঠলেন তিনি। ঘরটার দরজার নীচের মাটি সরাচ্ছে বেশ বড়সড় একটা প্রাণী। শেয়াল বা কটাশের থেকেও বড় এবং লোমশ। শুধু তাই নয়, জন্তুটার পিঠে সজারুর মতো গোছা গোছা কাঁটা। আর লেজটা বাঘের লেজের মতো লম্বা, নিশ্চিত শিকারের লোভে তিরতির করে নড়ছে। মাটি সরাতে জানোয়ারটা এতই ব্যস্ত যে, পেছনে মোতাহার আলির উপস্থিতি সে বুঝতেই পারেনি। খালি হাতে এমন একটা বিচিত্র জানোয়ারের মুখোমুখি হওয়া নেহাত বোকামি। তাই ভয় পেলেও পায়ে পায়ে পিছিয়ে গিয়ে রান্নাঘরের চালের একদিকে গুঁজে রাখা হাঁসুলিটা বের করে নিলেন তিনি। জন্তুটা তখনও কিছু টের পায়নি।

নিঃশব্দে তার পেছনে দাঁড়িয়ে মোতাহার আলি হাঁসুলিটা চালিয়ে দিলেন জন্তুটার লেজ লক্ষ্য করে। রক্ত হিম করা একটা আর্তনাদে সে ঘুরে দাঁড়াল। সামনে থেকে জানোয়ারটাকে আলো-আঁধারিতে দেখে মোতাহার আলি কেঁপে উঠলেন। মুখটা মানুষের মতোই, কিন্তু কদাকার। যেন বসন্ত রোগে ক্ষত বিক্ষত। লম্বা চুল-দাড়ির ফাঁকে সবথেকে উজ্জ্বল তার চোখদুটো। সে অপার্থিব চোখের দিকে তাকিয়ে সম্মোহিতের মতো স্থির হয়ে গেলেন মোতাহার আলি। আর সেই সুযোগে জন্তুটা থাবা চালাল। লম্বা লম্বা নখের গভীর আঁচড় ফুটে উঠল মোতাহার আলির বুকে। মাটিতে পড়ে গিয়েও বুদ্ধি হারাননি তিনি। হাতের লন্ঠনটা উঁচু করে ধরলেন। আগুনকে সব জন্তু ভয় পায়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। মোতাহার আলিকে ফেলে জঙ্গলে গা ঢাকা দিল সেই অদ্ভুত জানোয়ার।

সকাল হতে না হতেই এই ঘটনা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামের মধ্যে। লোকে এসে দেখল সত্যিই মুরগির ঘরের দরজার নীচে মাটি সরানো হয়েছে। এদিক ওদিক রক্তের ছিটে যত্রতত্র। একপাশে পড়ে আছে কালো মোটা লোমশ একটা লেজ। ডোমপাড়ার সতু করঙ্গা সেটা তুলে নিয়ে বেল্টের মতো লুঙ্গির ওপর বেঁধে নিল। লোম চেঁছে নিলে এই লেজের অনেকটা মাংস হবে।

ওদিকে মাঝরাত থেকেই মোতাহার আলির জ্বর এসেছে। তখনকার দিনে গ্রামে গ্রামে এত হাসপাতাল ছিল না। গ্রামের কবিরাজ এসে ক্ষত পরীক্ষা করে পরিস্কার করে একটা মলম লাগিয়ে দিলেন, সঙ্গে কিছু পথ্যও বাতলে দিলেন। তারপর মোতাহার আলির স্ত্রীকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন – “একরাতের মধ্যেই ঘা বিষিয়ে গেছে। খুব সাংঘাতিক ব্যাপার! পারলে সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারো। কিন্তু…” মোতাহার আলির স্ত্রী ডুকরে কেঁদে উঠেও নিজেকে শান্ত করলেন। তাঁর গর্ভে তখন আর একটা প্রাণ। এদিকে স্বামী শয্যাশায়ী। তিনি তাঁর বাপের বাড়ি খবর পাঠালেন। কিন্তু সেও তিনটে গ্রাম পেরিয়ে। তাঁর ভাইয়েরা এসে পৌঁছানোর আগেই রোগীর অবস্থা আরও আশাঙ্কাজনক হয়ে উঠল।

রাতে মোতাহার আলি প্রলাপ বকতে শুরু করলেন, “সে লেজ খুঁজতে আসবে। লেজটা কেউ তুলে আনো।” ধুম জ্বর গায়েই মোতাহার আলি বিছানা ছেড়ে উঠে যান সেই অদ্ভুত জানোয়ারের কাটা পড়া লেজটা নিয়ে আসতে। তাঁর বড় শ্যালক হাফিজ আঁকড়ে ধরে তাঁকে আবার বিছানায় ঠেলে শোয়ালেন। মেজ শ্যালক গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করতে গ্রামের মধ্যে গেছেন। ভোর রাতেই তাঁরা সদর হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন।

কিন্তু রাত যেন আর কাটতে চায় না। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাশের জঙ্গল থেকে ভেসে আসতে লাগল জান্তব চিৎকার। কে যেন যন্ত্রণার মধ্যেই হুংকার দিচ্ছে থেকে থেকে। তার সঙ্গেই মোতাহার আলি চেঁচাতে থাকেন, “ওরে সে এসেছে। লেজটা ফিরিয়ে দে।” বুকে ক্ষতের যন্ত্রণায় তাঁর সারা দেহ ধনুকের মতো বেঁকে বেঁকে উঠতে থাকে। তাঁর স্ত্রী অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে নামাজের আসনে বসে প্রার্থনা করতে থাকেন – “হে মাবুদ! হে পরোয়ারদেগার! আমার স্বামীকে রক্ষা করো।”

কিন্তু ভোরের কিছু আগেই মোতাহার আলির চিৎকার বন্ধ হয়ে গেল। সমস্ত যন্ত্রণা থেকে চিরমুক্তি ঘটল তাঁর। মোতাহার আলির জানাজা-দাফন হয়ে যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী চলে গেলেন বাপের বাড়ি। এর কয়েক মাস পরে জন্ম নিল এক পুত্র শিশু। অদ্ভুত ব্যাপার হল, সেই শিশুর একটা ছোটখাটো লেজও ছিল। সেই আজব জন্তুর অভিশাপের ফল। আর সেই শিশুই এখন আমাদের গ্রামের ইংরাজি শিক্ষক আনোয়ার আলি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর লেজ এখন বেশ মোটা আর তাগড়াই হয়ে উঠেছে।

 

গল্প শেষ হতে হতে বিকেলের আলো কমে এল। “এবার পড়তে বসতে হবে, স্যার আসবেন।” ইত্যাদি বলে ফেরদৌসীকে প্রায় জোর করেই বিদায় করলাম। যদিও জানি ফাজিল চাচার ওই গল্প সত্যি নয়; আমাদের গ্রামে বসে বসে আনোয়ার স্যারের জন্মের সময়কার খবর সে পাবে কোত্থেকে? কিন্তু আবার আশঙ্কা হল, যদি এ গল্প সত্যি হয়? যদি স্যারের সত্যি করেই একটা লেজ থেকে থাকে?

আমার মনটা করুণায় ভরে গেল। আহা রে! ছোটবেলা থেকেই বাপমরা একটা ছেলে মানুষ হয়েছে মামাবাড়িতে। হয়তো ঠিকমতো কেউ যত্নও করেনি কোনওদিন। আমাদের ক্লাসের সন্ধ্যারও বাবা নেই, সে তার মায়ের সাথেই মামাবাড়ি থাকে। একগাদা কাজ করতে হয় সন্ধ্যাকে। এমনকী গরুর গোয়ালও পরিস্কার করতে হয় মাঝে মাঝে। একদিন তাড়াতাড়ি স্কুলে আসতে হবে বলে কী একটা কাজ করতে চায়নি। তাই ওর মামী চ্যালাকাঠ দিয়ে মেরে ওর পিঠে দাগ বসিয়ে দিয়েছিল। অজান্তেই আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল।

তার ওপর যে ছেলের লেজ আছে, তাকে কী ছোটবেলায় পাড়ার ছেলেরাও কম জ্বালিয়েছে? সবাই নিশ্চয় মজা করত ওই লেজ নিয়ে। মনে মনে দেখতে পেলাম, আনোয়ার স্যার স্কুলে যাচ্ছেন, তাঁর হাফপ্যান্টের ফাঁক থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা ছোট্ট বাঁকা লেজ। দু-একটা ছেলে পেছন থেকে লেজটা আস্তে করে টেনে পালিয়ে গেল। আড়াল থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল – “জয় শ্রী রাম।”

এমনটা ভেবে একটু হাসি পেল বটে, কিন্তু নিজেই নিজেকে শাসন করলাম। অন্যের কষ্টে হাসতে নেই। সারাজীবন একটা মানুষ কষ্ট পেয়ে এসেছেন। এখন অন্য একটা জায়গায় এসে শান্তিতে একটু চাকরি করবেন, তাতেও একদল লোক তাঁর পেছনে লেগেছে। ভাবতে ভাবতেই আরও কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল চোখ থেকে।

 

আনোয়ার স্যারের কাছে আমরা তিন বোন পড়তাম। বড়দি তখন কলেজে ভর্তি হয়েছে সবে, তাকে দাদু নিজে পড়াতেন। মেজদি ক্লাস নাইন, আমি ক্লাস এইট আর আমাদের ছোট বোন মৌ ক্লাস ফোর। সেদিন মেজদি আর মৌ আমার আগেই পড়তে বসে গিয়েছে। আমি চোখের জল-টল মুছে মুখ হাঁড়ি করে বইখাতা নিয়ে গিয়ে বসলাম মাদুরের এককোণে। স্যার আমাদের সামনে একটা আলাদা কাপড়ের আসনে বসতেন।

আমার দিকে তাকিয়ে স্যার বুঝলেন কিছু গন্ডগোল হয়েছে। তাই মুচকি হেসে বললেন, “চাঁপা দেবী বিমর্ষ কেন? মা বকেছেন?” মৌ পাশ থেকে ফুট কাটল – “আজ ছোটদি কাঁদছিল।” মৌ আমায় কীভাবে কাঁদতে দেখেছে কে জানে, কিন্তু স্যার কথাটা শুনে কী বলবেন ভেবে না পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কাল যে অঙ্কগুলো দিয়েছিলাম, করেছ?” আমি নিঃশব্দে মাথা নেড়ে খাতাটা নিয়ে স্যারের সামনে গিয়ে বসলাম। স্যার অঙ্কগুলো দেখতে দেখতে বললেন, “এখানে আলাদা করে উত্তর কথাটা লিখে দেবে, বুঝলে? নাহলে…” স্যারের কথা শুনতে শুনতেই আমার চোখ থেকে একফোঁটা জল টপ করে মেঝেতে পড়ল। আমি মুখ নীচে করেছিলাম। স্যার সস্নেহে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “কী হয়েছে চাঁপা?”

আমার বুকে এতক্ষণ যা কষ্ট জমেছিল, স্যারের এই স্নেহমাখা স্বরে সবটা গলে বেরিয়ে এল চোখ থেকে। শুধু একবার অস্ফুটে বললাম, “ওই ফাজিল চাচা… আপনার নামে আজবাজে…” স্যার সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে একবার আমার মুখের তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই হো-হো করে হেসে উঠলেন। আমি দারুণ অবাক হয়ে স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার কান্না থেমে গেছে ওনার এই আচমকা অট্টহাস্যে।

“ছোটবেলায় আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন সত্যি। সেটা কথায় কথায় সেদিন কাকে যেন বলেছিলাম। তা ফজলুর সাহেব সেই শুনেই এমন গল্প বানিয়েছেন। যাকগে, ওসব কথায় কান দিও না।” তারপর আরও একচোট হেসে বললেন, “আজই আকবরদার মুখে শুনলাম গল্পটা। যাই বলো, তোমাদের এই ফাজিল চাচা বেশ রসিক মানুষ। গপ্পোলিখিয়ে হলে নাম করতেন।”

বুঝলাম স্কুলের পিওন আকবর মুনসীর কাছে স্যারও ফাজিল চাচার ওই গল্প শুনেছেন। কিন্তু তাঁর নামে এসব বাজে কথা রটানোর পরও স্যার ওই লোকটার ওপর রেগে যাননি! এই মানুষটাকে বোঝা খুব কঠিন। হঠাৎ মৌ প্রশ্ন করে বসল – “স্যার, আপনার সত্যি লেজ আছে?” স্যার একই রকম মজার সুরে বললেন, “শুধু লেজ? শিংও আছে।” নিজের মাথার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “চুলের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছি। কেউ খুব বিরক্ত করলে গুঁতিয়ে দিই।” মৌ খিলখিল হেসে গড়িয়ে গেল একদিকে। এইসব কথাবার্তায় আমার মনটাও অনেকটা হালকা হয়ে গেল। চোখ-টোখ মুছে আবার পড়াশোনায় মন দিলাম।

 

সেদিন ঘুমোনোর আগে আমার চুল বেঁধে দিতে দিতে বড়দি বলল, “তুই নাকি আজ আনোয়ারদার সামনে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলেছিস?” মেজদি মশারি টাঙাচ্ছিল; বড়দির কথায় সে ওইসব ছেড়েছুড়ে দিয়ে আমার মাথায় হাত রাখল স্যারের মতো করে – “কী হয়েছে চাঁপারানি?” আমি ফুঁসে উঠলাম, “আমায় স্যার মোটেও চাঁপারানি বলেননি।” বড়দি আর মেজদি হি-হি করে হেসে উঠল। বড়দি আমার চিবুক ধরে নাড়িয়ে দিল – “আহা রে! আমাদের চাঁপার জন্যে আর বর খুঁজতে হবে না। মাস্টার বর পাওয়া গেছে। চাঁপাকে দুবেলা ইংরাজি পড়াবে।” বড়দি বয়সে সামান্য বড় বলে আমি মেজদিকে চোখ রাঙালাম, “আজ রাতে উঠে তোর মশারি খুলে দেব। দেখবি মশার কামড়ে তোর কেমন মুখ ফোলে।” মেজদি ঘুমের ঘোরে হাত-পা ছোঁড়ে বলে আমি আর বড়দি আলাদা খাটে ঘুমোই।

মেজদিকে চিমটি কাটার এই সুযোগটা বড়দি ছাড়ল না – “গোপার মুখ ফুলে গেলে ফরিদচাচা আর তাকাবে ওর দিকে?” ফরিদচাচা আমাদের গ্রামের পোস্ট মাস্টার। বেশ বয়স হয়েছে। একবার ঈদের দিন বড়দি ওর এক বান্ধবীর বাড়ি যাচ্ছিল, সাথে মেজদিও ছিল। রাস্তায় দেখা ফরিদচাচার সাথে। বড়দি চাচাকে সালাম দিলো, “আস্‌সালামো আলায়কুম চাচা। আমাদের বাড়িতে এলেন না আজ?” চাচা সাইকেল থেকে নেমে সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, “আর বোলো না। তোমার চাচীর হাঁফানি বেড়েছে। ঘরের কাজ আমাকেই বেশিটা সামলাতে হচ্ছে।” তারপর একটু মুচকি হেসে বললেন, “ভাবছি আর একটা বিয়ে করে নিই। হ্যাঁ গা গোপা, আমায় বে করবে? আজ তো পুরো লালবিবি সেজে বেরিয়েছ দেখছি।” মেজদি লাল রঙের একটা ফ্রক পরে বেশ চড়া করে লিপস্টিক লাগিয়ে লাল চুড়ি, রিবন পরে সত্যিই লালবিবি সেজেছিল সেদিন। ফরিদচাচার বয়সি মানুষজন এমন রসিকতা করেই থাকেন। গ্রামগঞ্জে এগুলোকে নির্বিষ ঠাট্টা হিসাবেই ধরা হত। কিন্তু তারপর থেকে এই ঘটনা নিয়ে মেজদিকে সুযোগ পেলেই আমি আর বড়দি রাগাই। মৌ এখনও ছোট, তাই সে ঠাকুমার সাথে আমাদের পাশের ঘরে ঘুমোয়। আমাদের তিন বোনের ইয়ার্কি-ঠাট্টার বৃত্তে তার প্রবেশাধিকার নেই।

যাই হোক, সেই রাতের পর থেকে বড়দি আর মেজদি সুযোগ পেলেই আনোয়ার স্যারকে নিয়ে আমায় ঠেস দিয়ে কথা বলত। যদিও পুরো ব্যাপারটাই যথেষ্ট রাখ-ঢাক করে বড়দের চোখ-কান বাঁচিয়ে চলত আমাদের মধ্যে। নাহলে গুরুজনদের নিয়ে এমন তামাশার জন্যে দারুণ বকুনি কপালে ছিল।

আরেকদিন শোওয়ার আগে বড়দি আমার চুল বেঁধে দিতে দিতে বলল – “হ্যাঁ রে! আজ দেখলাম আনোয়ারদা নতুন পাঞ্জাবি পরে এসেছিল। ব্যাপারটা কী? তোর পাকা দেখা ছিল নাকি?” মেজদি অন্যান্য দিন বড়দির সুরে সুর মিলিয়ে আমার পেছনে লাগে। কিন্তু সেদিন সে কী মনে করে মেজদি বলে বসল – “স্যার, আমাদের পড়াতে আসেন। কিন্তু তুমি তো দেখি আড়াল থেকে সব খেয়াল করো। মতলবটা কী বলো তো?” পুরোটাই ঠাট্টা করেই বলা, কিন্তু বড়দি হঠাৎ ঝাঁঝিয়ে উঠল – “যেমন ছোট আছিস, তেমনই থাক। বেশি বড় বড় কথা বলিস না।” বড়দির গলাটা বোধ হয় একটু চড়া হয়ে গিয়েছিল। মা মৌকে ঠাকুমার ঘরে শুইয়ে দিয়ে আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন। বড়দির গলা শুনে আমাদের ঘরে ঢুকলেন – “কী হয়েছে রে তোদের? এত রাতে চেঁচামেচি কীসের?”

মাকে দেখে বড়দি যেন আরও রেগে গেল – “তোমার এই মেয়েগুলো এমন ত্যাঁদড় হয়েছে। বড়দের সঙ্গে কী করে কথা বলতে হয়…” শেষ কথাগুলো বলতে বলতে বড়দির গলা বুজে এল। প্রায় ছুটেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। নীচের থেকে দরজা বন্ধ হবার আওয়াজে বুঝলাম বড়দি চানঘরে গিয়ে ঢুকেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা দু বোন হতবাক হয়ে গেলাম। মা মেজদিকে জিজ্ঞাসা করলেন – “কী ব্যাপার রে গোপা? তোরা কী বলেছিস যে জবা ওইভাবে কাঁদতে আরম্ভ করল?” মেজদি অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে আমতা-আমতা করে বলল – “তেমন কিছু তো বলিনি…” মা একবার আমার দিকে আর একবার মেজদির দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

 

আপন মনেই এতক্ষণ পুরোনো দিনের কথা বলে চলেছিলেন চাঁপা ঠাকুমা। হঠাৎ গাঢ় নিশ্বাসের শব্দে সম্বিত ফিরল, তাঁর কোলে মাথা রেখে নীপা ঘুমিয়ে পড়েছে। সস্নেহে তার কপালে আলতো হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর নীপার মাথাটা সন্তর্পণে একটা বালিশের ওপর রেখে, তার গায়ে পাতলা চাদর টেনে দিলেন। সেই সময় বড়দি বোধ হয় নীপার বয়সিই ছিল, বা আর একটু ছোট। চাঁপা ঠাকুমা নীপাকে ছেড়ে ড্রয়িংরুমের বাইরে এসে দাঁড়ালেন অন্ধকার ব্যালকনিতে।

 

সেদিন রাতে চাঁপাকে একাই শুতে হল তার খাটে। মাথার কাছে জানালা খোলা। চাঁদের আলো মশারির মধ্যে রহস্যময় হয়ে উঠেছে। পাশের খাট থেকে মেজদি ডাকল – “চাঁপা, জেগে আছিস?” চাঁপা মৃদুস্বরে উত্তর দিল – “হুঁ।” গোপা এবার নিজের বিছানায় উঠে বসল – “দিদির কী হয়েছে বল তো? হঠাৎ অমন রেগে গেল।” বড়দির কী হয়েছে তা পুরোটা বুঝতে না পারলেই একটা আশঙ্কা গুড়গুড়িয়ে উঠল চাঁপার বুকে। সেটা বলতে গিয়েও কেন কে জানে সে মুখে আনতে পারল না। পাশ ফিরে বড়দির দিকের ফাঁকা বিছানাটার দিকে তাকিয়ে চাঁপা উত্তর দিল – “আমি জানি না। তুই ঘুমিয়ে পড়। অনেক রাত হয়েছে।”

তার পরের এক সপ্তা বাড়িতে বেশ কিছু বদল হয়ে গেল যেন। চাঁপা আর গোপা এখন এক খাটে ঘুমোয়। আর বড়দি তার আগের বিছানায় ঘুমোয় মায়ের সঙ্গে। আনোয়ার মাস্টারমশাই আগের মতোই নিয়মিত পড়াতে আসেন। শুধু রাতের খাবারটা এখন মায়ের বদলে জবা দিয়ে আসে। ডাইনিং টেবিলে কখনও কখনও জবা বসে আনোয়ার স্যারকে এটা-ওটা এগিয়ে দেয়। চাঁপা দুরুদুরু বুকে এই ছোটখাটো বদলের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে।

একদিন সেই উত্তর মিললও। মায়ের আজকাল প্রায়ই শরীর খারাপ থাকে। একটু-আধটু কাজ করার পরই ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েন। একদিন রাতের খাবার পর মা কুয়োতলায় উবু হয়ে বসে হুড়হুড় করে বমি করে ফেললেন। চাঁপা শুনতে পেল ঠাকুমা মায়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিরক্ত হয়ে বলছেন – “মেয়ের বিয়ের কথা চলছে, আর এদিকে মা দ্যাখো আবার পোয়াতি হয়ে বসে আছে।”

মৌ যখন ছোট ছিল, তখন চাঁপার সঙ্গে তার ভাব ছিল সবথেকে বেশি। পারলে সারাদিনই সে বোনকে আগলে রাখত। তবু পরিবারে নতুন সদস্য আসার খবরে চাঁপা খুব একটা আনন্দ পেল না। বুকের মধ্যে তীব্র একটা কষ্ট মাঝে মাঝেই খোঁচা দেয়। স্কুলে-বাড়িতে সারাটা দিনই সে মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়ায় এখন। আর কেউ তেমন লক্ষ না করলেও ব্যাপারটা মায়ের নজর এড়াল না। তিনি চাঁপাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন – “কী হয়েছে রে চাঁপা তোর? ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করছিস না।” চাঁপা এমন প্রশ্নের উত্তরে কী বলবে বুঝতে পারল না। তাই ছলছল চোখে জিজ্ঞাসা করে – “মা, আমাদের নাকি ভাই হবে?” মা চাঁপাকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন – “কেন? বোন যদি হয় তুই কি দেখবি না?” চাঁপা মুখ নিচু করে চোখের জল লুকিয়ে ধরা গলায় বলে – “আমি কি তা-ই বললাম? বোন হলেও…” বাকি কথাটা আর বলতে পারে না সে। মা চাঁপাকে বুকের মধ্যে টেনে বলেন – “কাঁদছিস কেন মা? কী হয়েছে?”

চাঁপা মায়ের কাঁধে মুখ রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে। তার কষ্টের আসল কথাটা কাউকে সে মুখ ফুটে বলতে পারবে না। তাই মাকে প্রবোধ দেয় – “তুমি আর কদিন পরে মামাবাড়ি চলে যাবে, তাই…” মৌ হওয়ার সময়ও মা অনেকদিন মামাবাড়ি ছিলেন। মা তাকে সান্ত্বনা দিতে বলেন – “ধুর পাগলি মেয়ে। আমি তো যাব আর আসব। তুই একা থাকতে পারবি না? তোর মেজদি থাকবে। বড়দি থাকবে।” চাঁপার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

সেই রাতের পর থেকে বড়দির সঙ্গে আর ভালো করে কথা হয় না। পুরো বাড়ির পরিবেশটাই কেমন যেন বদলে গেছে। সারাক্ষণ থমথম করে। এতগুলো লোক, তবু বাড়িতে কেউ কোথাও জোরে কথা বললেই চাঁপার বুকের মধ্যে গুড়গুড় করে ওঠে। মনে হয় দারুণ বেমানান কিছু ঘটে চলেছে তাকে ঘিরে। অবিশ্বাস্য রকম অশুভ কিছু। আগে আনোয়ার স্যার রবিবার পড়াতে আসতেন না বলে, মন খারাপ হত। এখন তাঁকে দেখলেই গলার মধ্যে একটা কষ্ট মোচড় দিয়ে ওঠে। বুক ভেঙে কান্না বেরোতে চায়। তাঁর সামনে বসে সন্ধেবেলা পড়াটাই এখন একটা বড় শাস্তি।

 

কয়েক মাস পর বাবা একদিন মাকে মামাবাড়ি রেখে এলেন। কান্নাকাটি করে মৌ-ও মায়ের সঙ্গে চলে গেল। বাড়িটা যেন আরও ফাঁকা হয়ে গেল। এর কয়েক সপ্তাহ পরে চাঁপা দেখল আবারও জিনিসপত্র গোছানো হচ্ছে। বাবা তদারকি করছেন আর পাশের পাড়ার আমিনুল চাচা এসে গাছের নারকেল পেড়ে একটা বস্তায় ভরছে। একটা মাঝারি ঝাঁকায় কিছু আম আলাদা করে রাখা আছে। সাধারণত কোনও আত্মীয় বাড়ি যাওয়ার আগে এইসব আয়োজন করা হয়। তাহলে কি বাবা কোথাও যাচ্ছেন? স্কুল থেকে ফেরার সময় হদিশ পাওয়া গেল মেজদির থেকে। বাবা আর দাদু আনোয়ার স্যারের মামাদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। দিদির সঙ্গে মাস্টারমশাইয়ের বিয়ের সম্পর্ক নিয়ে।

সেই রাত্রির কথা চাঁপা কখনও ভুলতে পারবে না। সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি সে। মা মামাবাড়ির চলে যাওয়ার পর সে আবার বড়দির সঙ্গে ঘুমোয়। পাশে শান্ত মুখে জবা ঘুমোচ্ছে। আবছা চাঁদের আলোয় তার মুখের দিকে তাকিয়ে চাঁপা আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। সেই অস্পষ্ট শব্দেও কখন যেন জবারও ঘুম ভেঙে যায়।

“এই চাঁপা কাঁদছিস কেন? মায়ের জন্যে মন খারাপ করছে?” চাঁপার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় বড়দি। চাঁপার চোখের জল বয়ে চলে। দিদির হাতে হাত রেখে ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিজ্ঞাসা করে – “তুই আমাদের ছেড়ে চলে যাবি দিদি?” দিদি ঘুমভাঙা চোখে মিষ্টি হাসে – “আমার কাছে আয়, মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।” বড়দিকে জড়িয়ে ধরে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল চাঁপা। হঠাৎ নীচের থেকে বাবার ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে গেল। দাদু আর বাবা দুপুরের ট্রেনে মুর্শিদাবাদ যাবেন। তাঁদের সঙ্গে যাবে আমিনুল চাচার ছোট ভাই। অত জিনিসপত্র সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। “সন্ধেবেলা আমিনুল আসবে। ও বাইরের ঘরে ঘুমোবে। চিন্তার কিছু নেই।” বাবা বড়দির দিকে তাকিয়ে বললেন – “সাবধানে থেকো তোমরা।”

সেদিন ছিল রবিবার। আনোয়ার স্যারের ছুটি, তাই পড়াশোনার চাপ তেমন ছিল না। সন্ধেবেলা চাঁপা আর গোপা লুডো খেলবে বলে বড়দিকে ধরল। জবা চোখ পাকিয়ে বলল – “বাবা-মা কেউ নেই বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছ? স্কুলের সব পড়া হয়ে গেছে? নিয়ে আয় দেখি, আমি পড়া ধরব।” ব্যাজার মুখে চাঁপারা বই-খাতা নিয়ে বসেছে কি বসেনি, ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়ায় দপদপ করে উঠল হ্যারিকেনের আলো। কড়কড় শব্দে দূরে কোথাও বাজ পড়ল। দেখতে দেখতে মুষলধারে নামল বৃষ্টি। ঝড় আর বৃষ্টিতে লেখাপড়া মাথায় উঠল। তিন বোন শেষ পর্যন্ত লুডো নিয়েই বসল। ঠাকুমা এসে বললেন – “এই ঝড়-বৃষ্টিতে আমিনুল আর আসবে বলে মনে হয় না। দরজা-জানালা এঁটে ঘুমিয়ে পড় সব তাড়াতাড়ি।”

 

পরদিন সকালেও বৃষ্টি থামার কোনও সম্ভাবনা দেখা গেল না। বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া, নিয়মিত হারে বাজ পড়া। স্কুলে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না এই দুর্যোগে। তার ওপর রান্নার লোক আঙ্গুরাদিও কামাই করেছে বৃষ্টির জন্যে। তিন বোন রান্নার আয়োজনে লেগে পড়ল।

তখন কটা বাজে বোঝার উপায় নেই, কারণ আকাশভাঙা বৃষ্টিতে মধ্য দুপুরেও শেষ বিকেলের অন্ধকার। সদর দরজায় দুমদুম ধাক্কা শুনে চাঁপা এগিয়ে গেল। একটা ছাতা নিয়ে বারান্দা থেকে উঠোনে নামতেই পা ডুবে গেল ঠান্ডা নোংরা জলে। এত বৃষ্টি হয়েছে যে, এর মধ্যেই এমন জল জমে গেল!

আমিনুল চাচা এসেছে। তালপাতার টোকা নিয়ে এসেছে বটে, কিন্তু পুরো শরীর ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। ঠাকুমা একটা গামছা এগিয়ে দিলেন – “হঠাৎ এই সময় এলে যে আমিনুল!” আমিনুল চাচা গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে হড়বড় করে অনেক কথা বলে ফেলল। আমিনুল চাচার বাড়িতে জল ঢুকছে আজ বেলা থেকে। কোথাও দাঁড়াবার জায়গা নেই। বর্ষা যদিও এখনও সেভাবে শুরু হয়নি, কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টি হলে কাঁচা বাড়িগুলোর মধ্যে জল ঢোকা নতুন কিছু নয়। তখন সেখানকার বাসিন্দারা গিয়ে আশ্রয় নেয় গ্রামের স্কুলবাড়িতে। সেখানেও জায়গা না হলে কেউ কেউ যায় রেললাইনের উঁচু জমিতে। আমিনুল চাচা তার বাড়ির আর সবাইকে স্কুলের বারান্দায় রেখে এসেছে। আজ রাতেও সে চাঁপাদের বাড়ি ঘুমোতে আসতে পারবে না। তবে ভয় নেই, এ অকালের বৃষ্টি, আজ-কালের মধ্যেই থেমে যাবে।

ঠাকুমার তত্ত্বাবধানে খিচুড়ি, ডিম ভাজা আর বেগুন ভাজা তৈরি হয়েছিল। দুপুরের খাওয়ায় চুকতে আমিনুল চাচা বিদায় নিল। ঠাকুমা চাচার দুই ছেলে আর স্ত্রীর জন্যে একটা বড় ডেকচিতে অনেকখানি খিচুড়ি বেঁধে দিলেন।

দুপুরে ভরপেট খেয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে চাঁপার মাথায় হাজার চিন্তা ভিড় করে এল। মামাবাড়িতেও এমন বৃষ্টি হচ্ছে কিনা কে জানে। বাবা আর দাদু যে কবে ফিরবে তারও ঠিক নেই। এমন বৃষ্টিতে প্রায়ই ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। এমন সাত-পাঁচ চিন্তা করতে করতে চাঁপার চোখ লেগে এল।

কতক্ষণ এভাবে চাঁপারা ঘুমিয়েছিল মনে নেই। ঘুম ভাঙল ঠাকুমার ডাকে। ঘরের দরজার কাছে এসে ঠাকুমা আকুল কণ্ঠে ডাকছেন – “ও চাঁপা, ও গোপা, গ্রামে নাকি বন্যা আসছে। নীচে আনোয়ার এসেছে।”

সদ্য ঘুমভাঙা চোখে ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লাগল তিন বোনের। আনোয়ার স্যার বসার ঘরে থমথমে মুখে বসে আছেন। তাঁকে অন্যান্যদিনের থেকে আলাদা লাগছে। গায়ে একটা পাতলা ফতুয়া, ধুতি মালকোঁচা মেরে পরা। বৃষ্টি এখন থেমে গেছে। কিন্তু স্থানীয় সংবাদে বলেছে, দামোদরের বাঁধ ভেঙেছে। রূপনারায়ণের পরিস্থিতিও সুবিধার নয়। একটু আগে এই গ্রামে জল ঢুকতে শুরু করেছে। আনোয়ার স্যার একটা ডোঙা নিয়ে এসেছেন সবাইকে স্কুলবাড়িতে নিয়ে যেতে। ঠাকুমা মাথা নাড়লেন – “আমরা এই দুর্যোগে নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাব? ওই একটা স্কুলে কত মানুষ ধরবে? আমরা মেয়েরা গিয়ে থাকব কী করে?” মাস্টারমশাই চিন্তিত মুখে বললেন – “ আপনাদের পাকা বাড়ি। কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু নীচের তলায় জল ঢুকতে আরম্ভ করলে থাকবেন কী করে? বাড়িতে কোনও পুরুষ মানুষ নেই। খাবার জলটুকু পাওয়া যাবে না। সামলাবেন কী করে সব?”

ঠাকুমা অনুনয়ের সুরে বললেন – “তুমি থেকে যাও এখানে। তুমি তো ঘরের ছেলে এখন।” আনোয়ার স্যার স্মিত হেসে মাথা নাড়লেন – “তা হয় না। গ্রামের মানুষ কষ্টের মধ্যে আছেন। কয়েকটা ঘর এখনই পড়ে গেছে। আপনারা স্কুলে গেলে আমি আপনাদের চোখে চোখে রাখতে পারব।” একটু থেমে ইতস্তত করে যোগ করলেন, “আর তাছাড়া আগামীকালের মধ্যেই তো ওনারা ফিরে আসবেন। তখন কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।” মাস্টারমশাইয়ের অস্বস্তির কারণ কারোরই অজানা নয়। রেললাইনে জল জমার কারণে যে কোনও মুহূর্তেই ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

 

একটা ছোট বাক্সে কিছু জামাকাপড় আর শুকনো চিড়ে-মুড়ি নিয়ে নেওয়া হল। উঠোনের জল পেরিয়ে সদর দরজায় গিয়ে সকলের মুখ শুকিয়ে গেল। আনোয়ার স্যার যে ডোঙাটা এনেছিলেন, সেটা যে কোনও কারণেই হোক যথাস্থানে নেই। হয়তো জলের তোড়ে ভসে গেছে। আনোয়ার স্যার ঠাকুমাকে বললেন, “আমি চাঁপা আর গোপাকে নিয়ে যাই প্রথমে। জল ভেঙে এদের নিয়ে যেতে সমস্যা হবে না।” তারপর জবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাদের দুজনকে নিয়ে যেতে আর একটা ডোঙার ব্যবস্থা করে আমি একটু পরেই ফিরে আসছি।”

সামনে আনোয়ার স্যার, তারপর মেজদি আর শেষে চাঁপা। কোমর জল ভেঙে এগিয়ে চলেছে স্কুলবাড়ির দিকে। আনোয়ার স্যার ওদের বারবার সতর্ক করছেন – “এদিক ওদিক পা ফেলো না। আমি যেভাবে যাচ্ছি, সেভাবে চলো। জলের মধ্যে চোরাস্রোত এখন।” জলে জামাকাপড় ভিজে গিয়ে একটা সোঁদা গন্ধ বের হচ্ছে। চাঁপা চারপাশে তাকিয়ে দেখল পাটল রঙের জলে নোংরা আবর্জনা, মরা ব্যাঙ, ছোটখাটো কীটপতঙ্গ ভেসে যাচ্ছে। গা ঘিনঘিন করে উঠল তার।

চাঁপাদের বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার পথে একটা বড় মাঠ পড়ে। গ্রামের মেলা বসে বলে, সেটা লোকমুখে মেলার মাঠ। মাঠের শুরুতেই একটা বড় বট গাছ। একটু দূরেই বেশ আওয়াজের সঙ্গে বয়ে যাচ্ছে বন্যার জল। সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে আনোয়ার স্যার নিজের মনেই বললেন, “ এর মধ্যেই জল অনেক বেড়ে গেছে। মাঠে দারুণ স্রোত এখন। তোমাদের নিয়ে এভাবে যাওয়া যাবে না।” গোপার দিকে তাকিয়ে মাঠের অন্যদিকের একটা বড় তেঁতুল গাছের দিকে নির্দেশ করলেন, “আমি আগে চাঁপাকে সঙ্গে নিয়ে ওখানে রেখে আসি। তুমি এই গাছটার শিকড়ের ওপর উঠে দাঁড়াও। নড়বে না একদম।”

চাঁপাকে প্রায় জড়িয়ে ধরেই আনোয়ার স্যার এগোলেন। মাঠটা অপেক্ষাকৃত নীচু জমিতে, তাই মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে চাঁপার গলা পর্যন্ত জল উঠে এল। কোমরের নীচ থেকে জলের তীব্র স্রোত অনুভব করা যাচ্ছে। কিন্তু আনোয়ার স্যার তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছেন। একটা হাত দিয়ে আড়াআড়ি তার গলাটা জড়িয়ে আছেন, আর একটা হাতে তার কোমর। এমন নৈকট্যে চাঁপার শরীর যেন অসাড় হয়ে আসতে চাইছে। পা ঠিকঠাক পড়তে চাইছে না। ইচ্ছা করছে এইভাবে জলের মধ্যে ভেসে যেতে। জলকন্যা হয়ে সে সাঁতার দিয়ে এগিয়ে যাবে দিগন্তের দিকে। আর তার পাশে পাশে সাঁতার কাটতে থাকবেন স্যার। এমন দুর্যোগের মধ্যেও চাঁপার কল্পনা বাঁধভাঙা জলের মতো একটা আবর্ত তৈরি করে হাতছানি দিচ্ছে।

মাঠের প্রায় মাঝামাঝি তারা। হঠাৎ একটা সাপ লাফ দিয়ে উঠল চাঁপার গায়ে। আশ্রয়ের জন্যে মরিয়া সেই সরীসৃপকে প্রতিবর্ত আতঙ্কে শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলতে গিয়ে পা পিছলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে আনোয়ার স্যারের থেকে অনেকটা দূরে চলে গেল চাঁপা।

চোরাস্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকল। জলের মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে ক্রমশ দম ফুরিয়ে আসতে লাগল চাঁপার। পায়ের নীচে জমি খোঁজার প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে দেখে আকাশের দিকে প্রাণপণে মাথা তুলতে চাইল সে। নজরে এল কারবালার সাঁকোর বাঁশের কাঠামো, মানে মেলার মাঠ ছাড়িয়ে বড় খালের কাছাকাছি এসে পড়েছে সে। প্রকৃতির সঙ্গে চাঁপার অসম এবং সংক্ষিপ্ত লড়াই যখন শেষের দিকে, তখনই একটা শক্ত হাত এসে তার চুলের গোছা ধরল। আস্তে আস্তে তার পুরো শরীরটাকে নিজের কাছে টেনে নিল সেই অদৃশ্য রক্ষাকর্তা। চাঁপার মাথাটা জলের ওপর তুলে ধরে তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে যেতে থাকল চোরাস্রোতের নাগপাশের বাইরে। চাঁপা তার সমস্ত সমপর্ণ করে নিশ্চিন্তে ভেসে রইল। এ যেন কিছুক্ষণ আগে দেখা সেই স্বপ্নের মতোই। জলের মধ্যে ভেসে চলেছে সে এক জলকন্যা। আর তার পাশে সাঁতরে চলেছে তার স্বপ্নপুরুষ।

কিছুক্ষণ পরে পিঠের ওপর আলতো ঘাসজমি ঠেকল। আনোয়ার স্যার চাঁপাকে জল থেকে তুলে এনে উঁচু ডাঙায় শুইয়ে দিয়েছেন। উদ্বিগ্ন গলায় ডাকলেন – “চাঁপা!” একটু থেমে যোগ করলেন – “তুমি ঠিক আছো? আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?” কোনও সাড়া না পেয়ে তিনি চাঁপার কাঁধ ধরে অল্প ঝাঁকুনি দিলেন – “চাঁপা!”

চাঁপা আধো জাগরণে দেখতে পেল তার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে আছে একজোড়া উজ্জ্বল চোখ। তার প্রথম সম্ভাবনা। সে আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে সেই পুরুষের গালে হাত রাখল। তারপর আর একটা হাত বাড়িয়ে চুলের মধ্যে আঙুল চালাল। মাস্টারমশাই দারুণ অস্বস্তিতে সরে যেতে চাইলেন, কিন্তু এ আহ্বান খুব পরিচিত। যেন কত জন্মের পার থেকে তাঁকে ডাকছে। এই স্পর্শ, এই চাহনি। আস্তে আস্তে ঝুঁকে পড়ে তিনি সাড়া দিলেন। তাঁর ঠোঁট অন্য অধরটি স্পর্শ করতেই কেঁপে উঠল চাঁপা।

 

আলোহীন সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাঁপা ঠাকুমার সারা শরীর শিরশির করে উঠল। ঠান্ডা বাতাসের একটা ঝাপটা তাঁকে আশরীর জড়িয়ে ধরল। কত বছর হল? চল্লিশ? পঞ্চাশ? এতগুলো দশক পার হয়ে যাওয়ার পরেও তো ভোলা গেল না সেই স্পর্শ।

সে বছর বন্যার পর আনোয়ার স্যার হঠাৎ করেই স্কুলের চাকরি ছেড়ে চলে যান। বছর দেড়েক পর বড়দির বিয়ে হয়ে যায় প্রবাসী এক অধ্যাপকের সঙ্গে। বিয়ের আগের দিন রাতে বিছানায় শুয়ে বড়দি চাঁপাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করেছিল – “হ্যাঁ রে। আনোয়ারদাকে তুই খুব ভালোবাসতিস, না?” এক চোখ টলটলে জল নিয়ে চাঁপা জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে ‘না’ বলেছিল। বড়দি ওকে জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিয়েছিল – “তোর আর আমার খুব মিল। আমিও তাকে ভালোবাসতাম না।” তারপর দুই বোন নিঃশব্দে কেঁদেছিল। অনেকক্ষণ পর বড়দি ধরা গলায় বলেছিল, “অন্তত একটা চিঠিও যদি লিখে যেত।”

চাঁপার সামান্য হলেও অহংকার হয়েছিল। ইংরাজি খাতার মধ্যে এক টুকরো কাগজ খুঁজে পেয়েছিল সে। কিশোরীবেলা বড় স্বার্থপর। নিজের সম্পদ সযত্নে গোপন করে রাখে সে।

 

কল্যাণীয়াসু,

আমি কেন দূরে চলে যাচ্ছি, সেটা এখনই তুমি বুঝবে এমন আশা করি না। যেদিন বুঝবে, সেদিন আমায় মুক্তি দেবে নিশ্চিত জানি। আমার মুক্তিতেই তোমার মুক্তি।

আশীর্বাদক,
মাস্টারমশাই

 

এতদিন পর আকস্মিক রোমন্থনে আজ বেপথু স্মৃতি অজান্তে চুরি করে নিয়ে গেল সযত্নে গচ্ছিত সেই চিরকুট। প্রৌঢ়ার হাত ফসকে কাগজের টুকরোটা ইতিউতি উড়তে উড়তে গিয়ে শান্ত হয়ে বসল নিস্তব্ধ একফালি ঘাসজমিতে। সেই যেখানে আলিঙ্গনবদ্ধ পুরুষ আর প্রকৃতি তাদের একমাত্র স্পর্শচিহ্ন অক্ষয় করে রাখছে কয়েকটি দশক ধরে।

সেই দৃশ্যের পাশ থেকে উঠে এসে জলের দিকে এগিয়ে গেল এক মুক্ত নারী। দিগন্তের আকাঙ্ক্ষায় জলকন্যার মতো শরীর এলিয়ে দিল উজানে।

Keep reading

More >

Site hosting cheap