জুবান সামহালকে

“নানান দেশের নানান ভাষা বিনা স্বদেশীয় ভাষা পুরে কি আশা” মাতৃভাষা মানুষের প্রাণের আরাম,মনের আনন্দ,আত্মার শান্তি। ইতিহাসের পাতায় জ্বলন্ত অক্ষরে …

“নানান দেশের নানান ভাষা
বিনা স্বদেশীয় ভাষা পুরে কি আশা”
মাতৃভাষা মানুষের প্রাণের আরাম,মনের আনন্দ,আত্মার শান্তি। ইতিহাসের পাতায় জ্বলন্ত অক্ষরে লেখা আছে আমাদের পাশেই বাংলাদেশ ও কাছাড়ে মাতৃভাষার বদলে খাস জুবান চালাবার চেষ্টা হলে মানুষ শুধু মুখের ভাষা বাঁচাতে কিভাবে প্রাণ দিয়েছে।
মাতৃ ভাষা যতই প্রিয় হোক, মানুষকে নানা প্রয়োজনে দুই বা ততোধিক ভাষা শিখতে হয়। বহু ভাষিক দেশে বা অঞ্চলে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে মাতৃভাষা ছাড়াও আরো একটা ভাষা প্রয়োজন হয়।  ইউরোপে ফরাসি, আমেরিকা মহাদেশে স্প্যানিশ, এশিয়ায় ইংরেজি যোগাযোগের ভাষা।

দরকার পড়লে শিখতেই হয়, আবার কেউ কেউ আছেন যাঁরা প্রয়োজন না থাকলেও নিছক শেখার আনন্দে একাধিক ভাষা শেখেন। এসব বহু ভাষিক মানুষদের নিয়ে কম গল্প বাজারে ছড়িয়ে নেই।
গোপাল ভাঁড়ের গল্প তো বাঙালী মাত্রই অবগত আছেন। মহারাজ কৃষ্ণ চন্দ্রের রাজসভায় একজন বহু ভাষী মানুষ এসেছিলেন। তিনি অনেকগুলো ভাষা সমান সাবলীলতার সাথে বলছিলেন। সবার ভীষণ কৌতূহল, ওঁর মাতৃভাষা কোনটা? সভায় অনেক পণ্ডিত মানুষ ছিলেন, কিন্তু ওঁর কথা শুনে কেউ ওঁর মাতৃভাষা কোনটা বের করতে পারলেন না। ধুরন্ধর গোপাল উপায় বের করলেন। পরের দিন সভায় উনি ঢুকছেন, গোপাল সভাকক্ষ থেকে বেরোবার ভান করে ওঁকে ধাক্কা দিলেন। ভদ্রলোক মহা বিরক্তিতে বলে উঠলেন “সড়া অন্ধা!”
এর একটা দক্ষিনী ভার্সন আছে। উক্ত মানুষটি বিজয়নগরে হাজির হয়েছিলেন। কৃষ্ণদেব রায়ের সভাকবি তেনালি রামা উক্ত ভদ্রের গায়ে ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি যা বলেছিলেন সেটা লিখলে আমায় পুলিশে ধরবে। মোগলাই ভার্সানও আছে। বীরবল গোপালের কায়দাতে ওঁকে কনুই দিয়ে গুঁতো মারেন। বীরবলের কনুইয়ের গুঁতোর উত্তরে তিনি বলেন “মিরু পিক্কিভা?” (তেলেগু ভাষায়” পাগল নাকি?”)
বাঙালি ঝগড়া হলে হিন্দি এবং কুকুরের নাম রাখার সময় ইংরিজি ভাষার শরণ নেয় এটা সর্বজন বিদিত। তারাপদ রায়ের “খাড়াকে খাড়াকে দাঁত নিকালকে হাসতা হ্যায় কিঁউ রে?” অথবা তপন রায়চৌধুরী কথিত রবিনসন নামক খাসি তো মোটামুটি প্রবাদে পরিণত। এই প্রেক্ষিতেই আমি একটা চিনে গল্প বলি।
বর্ধমান শহরে কয়েক পুরুষ ধরে কয়েকঘর চিনা বাস করেন।এইরকম একটি পরিবারের একটি ছেলের সাথে আমার আলাপ ছিল। ধরে নিন তার নাম শিন। সদর থানার উল্টো দিকে তার বাবার জুতোর দোকান ছিল এবং সেই দোকানের গ্রাহক হওয়ার সুবাদে ছেলেটির সাথে আলাপ হয়েছিল। সে আর আমি দুজনেই সমবয়সী ছিলাম ফলে আলাপটা শুরু হয়েই শেষ হয়ে যায় নি।
ওদের পরিবারের সবাই ঝরঝরে বাংলা বলতেন। একদিন টিউশন পড়ে ফিরছি, শিন এর সাথে দেখা। সেও টিউশন পড়ে ফিরছে। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে টুকটাক কথা বলছি। ওদের বাড়ি আগে পড়ে, আমার বাড়ি আর একটু দূরে পাশের পাড়ায় । ওদের বাড়ির দরজায় দেখি শিন এর মা দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে গনগনে রাগ ও বেজায় বিরক্তির এক বিচিত্র এক্সপ্রেশন। ছেলেকে দেখামাত্র তিনি বিশুদ্ধ বাংলায় খিঁচিয়ে উঠলেন, ” তোমরা বাবা ছেলে কি ঠিক করেছ আমার হাড় হলুদ না করে ছাড়বে না?” পরক্ষণেই আমার দিকে চোখ পড়তে তিনি নিজেকে সামলালেন এবং শিনকে চিনা ভাষায় কিছু বললেন। শিন তাঁর হাত থেকে একটা ওষুধের খাম জাতীয় কিছু নিল,তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল “বাবা ওষুধ খেতে ভুলে গেছে, দোকানে দিয়ে আসি।” বলে উল্টোবাগে হাঁটা দিল। আমিও বাড়ির পথ ধরলাম। বত্রিশ বছর আগেকার কথা, কিন্তু এত বছর পরেও আন্টির কথাগুলো হুবহু মনে আছে এই কারণে যে আমার ধারনা ছিল মানুষ রাগলে মাতৃভাষাটাই আগে বেরোয়। সে দিন আমার সে ধারনা উল্টে গেছিল।
শিল্পাঞ্চলের সাথে যাঁরা পরিচিত তাঁরা জানেন যে এই জায়গাগুলি মিনি ভারতবর্ষ। এবং মজার ব্যাপার হল মুষ্টিমেয় কিছু লোক বাদে সবাই পরিষ্কার বাংলা ও হিন্দি বলতে পারেন। শিখের মুখের বাংলা শুনলে দাড়ি পাগড়ি ধারী বাঙালী মনে হয় আবার বাঙালীদের কেউ কেউ এমন ঝরঝরে পঞ্জাবি বলেন তাকে জাঠ বলে ভুল হবে।
এখানকার ছেলে হওয়ার সুবাদে কথ্য হিন্দি মোটামুটি রপ্ত ছিল। স্কুলে অক্ষর পরিচয় হল এবং হিন্দি সাহিত্যের সাথে পরিচিত হলাম যদিও নিজের কুঁড়েমির কারণে সেই বিরাট খাজানার দু এক কণাই উপভোগ করতে পেরেছি।
কলেজে গিয়ে শুক্ল বলে একটি ছেলের সাথে বন্ধুত্ব হল। উত্তরপ্রদেশীয় এই ব্রাহ্মনবটু চমৎকার গজল গাইত। ওর হাত ধরে উর্দু ভাষার সাথে মোলাকাত হল।
উর্দু এমনিতেই হিন্দি ভাষার কাঠামোর ওপর ফারসি ও কিছু আরবি শব্দ বসিয়ে তৈরি হয়েছিল। অনেক শব্দ হিন্দিতেও ব্যবহার হয়।তার ওপর গজল মোটামুটি সহজবোধ্য উর্দুতে লেখা হয়। কাজেই মানে বুঝতে বিশেষ সমস্যা হত না। তার ওপর সেই সময় টি ভি তে মির্জা গালিব, গুফত-গু এবং গুল গুলশন গুলফাম নামক তিনটি সিরিয়াল শুরু হয়েছিল যার কল্যাণে উর্দু ভাষার রূপরেখা সম্পর্কে একটা ধারণা এসে গেছিল।
বি এড পড়তে গিয়ে খান এর সাথে বন্ধুত্ব হল। খান খাঁটি হাজারা পাঠান, খাস জুবান এককালে পুস্তু ছিল, এখন উর্দু। সে ঝরঝরে বাংলা বলত, চলনসই পড়তে এবং লিখতে পারত। রবি ঠাকুরের বহু কবিতা সে পাশাপাশি বাংলা এবং উর্দুতে আবৃত্তি করতে পারত।
খানকে ঘিরে আমাদের জনা পাঁচেক বন্ধুর একটা চক্র গড়ে উঠেছিল। টিফিনের সময় ক্যানটিনে চায়ের আসরে খান আমাদের সাদাত হোসেন মান্টো ও ইনতিজার হুসেনের গল্প, গালিব ও একদালার গজল কবিতার মত করে পড়ে শোনাত। খানই পড়ত কারন আমরা উর্দু মোটামুটি বুঝতে পারলেও পড়তে-লিখতে অপারগ ছিলাম।
একদিন অফ পিরিয়ডে কলেজের ফয়ারে জনা ছয় সাত বন্ধু আড্ডা দিচ্ছি, এক সৌম্যদর্শন প্রৌঢ় এসে উর্দু ঘেঁষা হিন্দিতে খানের খোঁজ করলেন। খান তখন ক্লাসে। আমিই ফোরম্যান হয়ে ওঁকে তশরিফ রাখার অনুরোধ করলাম; তারপর জানালাম খান ক্লাসে আছে, ক্লাস অন্তে তাকে হুজুরে পেশ করার বন্দোবস্ত হচ্ছে। তিনি আসন গ্রহন করলে ওঁর সাথে টুকটাক কথা বলতে লাগলাম। তারিফ-এ-হুজুর খানের পিতাঠাকুর সেটাও জানতে পারলাম।
মিনিট দশেক পরে বেল পড়ল, তার দু মিনিট পরে খানের আবির্ভাব। তিনি আমাদের ইজাজত নিয়ে স-খান রুখসত হলেন।
পরের দিন কলেজের বারান্দায় খানের সাথে দেখা। সাথে ঠাকুর। খান আমার পিঠ চাপড়ে বলল ,” ভালোই উর্দু বলছিলি তো কাল।”
আমি দেড় বিঘত হাঁ করে বললাম, “উর্দু?”
খান আর ঠাকুরের সমবেত অট্টহাসির চোটে একটা ঘুমন্ত বেড়াল হাঁইমাই করে উঠে  ছুট মারল।

ঠাকুর বলল,” Then what language did you speak to converse with his father?”
আমি তখনো হাঁ করে আছি দেখে খান আর ঠাকুর বুঝিয়ে বলল খানের পিতাঠাকুরের সাথে আমি যে ভাষায় বাক্যালাপ করছিলাম তা আসলে হিন্দুস্থানী, উর্দুরই একরকম কথ্য রূপ। হিন্দির সাথে এর এমন কিছু তফাত নেই। লেখ্য উর্দু যেমন আরবী-ফারসী কন্টকিত, কথ্য অতখানি নয়।
বোঝো!

#বচন_ফকিরের_কলকে

Keep reading

More >

Site hosting cheap