ঝাল নিয়ে ঝামেলা

পরের মুখে ঝাল খাওয়ার বদ অভ্যেস অল্পস্বল্প থাকলেও লংকার ঝাল আমায় বড় ঝামেলায় ফেলে। পশ্চিম ভারতের একটা গঞ্জ মতো জায়গায় …

পরের মুখে ঝাল খাওয়ার বদ অভ্যেস অল্পস্বল্প থাকলেও লংকার ঝাল আমায় বড় ঝামেলায় ফেলে। পশ্চিম ভারতের একটা গঞ্জ মতো জায়গায় অফিসের কাজে গিয়ে আমি এক জব্বর লংকাকাণ্ডের মধ্যে মুখ পুড়িয়ে ফিরেছিলাম কোন পুণ্যবলে কে জানে।

সাল দু’হাজার তিন, অক্টোবরের এক ভোরবেলায় বাস থেকে নামলাম প্রায় জনমানবহীন বাসস্ট্যান্ডে। শুনেছিলাম, শহরের মধ্যে একটা ‘লজ’ আছে। দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র অটোতে চড়ে কপাল ঠুকে রওয়ানা দিলাম সেই দিকে।

পৌঁছলাম একটা তিনতলা বাড়ির সামনে। অটোওয়ালার কাছে শুনলাম, দোতলায় মালিক থাকে, একতলার দোকান দুটো তাঁরই| তিনতলায় ‘লজ’, তিনটে ‘রুম’ আছে, আশেপাশেই ‘চায় নাস্তা খানা সব মিল যায়েগা’; একেবারে ‘ঘরগুণী’। একটা ঘর দখল করলাম, আড়াইশো টাকায় অত বড় ঘর, সাফসুতরো বাথরুম আর বিছানার কথা ভাবলে তারিফ করার মতোই ‘ট্যারিফ’।

ন’টা নাগাদ নিচে নেমে দেখলাম ‘নাস্তার’ দোকানটা খুলে গেছে। একটা উনুনে চা ফুটছে, আরেকটায় বসানো কড়াইতে ফুটন্ত তেলের মধ্যে ইয়া বড় বড় গোল গোল আলুর চপ ভাসুডুবু করছে| ভালোই হল, গ্যাঁট হয়ে বসে ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিলাম। গরম গরম দুটো আলুবন্ডা (নামটা আগে জানতাম না) এসেও গেল। সঙ্গে লালচে খয়েরি রঙের ঘন তরল একটা বস্তু, টকমিষ্টি চাটনি বলেই মনে হল।

খোঁচা দিয়ে আলুবন্ডার ছালটা ফাটাতেই আগ্নেয়গিরির মতো ধোঁয়া বেরিয়ে এল। ফুঁ দিয়ে এক টুকরো মুখে ঢোকালাম। জিভ জ্বলে গেল প্রথম কামড়েই, গরমে নয় ঝালে। ঠিক আছে, হয়তো লংকার টুকরো ছিল। এবার চাটনি মাখিয়ে আরেক টুকরো মুখে দিলাম। জ্বলুনি আরও বেড়ে গেল; চাটনিটাও লংকার। একটু সময় দিলাম ঠান্ডা হওয়ার জন্য; গরম আর ঝাল দুটো একসঙ্গে সামলানো মুশকিল, যদিও সাহেবদের ভাষায় দুটোই ‘হট’। সকালের খোলা হাওয়ায় আলুবন্ডা ঠান্ডা হল বটে কিন্তু কামড় দিতেই আমার কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে লাগল| দুটো আলুবন্ডা শেষ করতে আমার ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছছি, নাক মুছছি| প্লেট খালি দেখে দোকানদার জানাল গরম ব্রেড পাকোড়া আছে| ব্রেড পাকোড়া মাথায় থাক, পরের দিন থেকে চা আর পাউরুটি খাব| একটু খুঁজলে চিড়ে ভাজার প্যাকেট পেয়ে যাব নিশ্চয়ই| খাওয়ার জন্য বাঁচা নয়, বাঁচার জন্য খাওয়া; করুণ মুখে পয়সা মিটিয়ে উঠে এলাম।

অটো করে প্রজেক্ট সাইট-এ যাওয়ার সময় নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, বাড়ির তরকারির চেয়ে দোকানের চপে তো কোলকাতাতেও ঝাল বেশি থাকে; হয় তো বেশি মনে হচ্ছে সকালের প্রথম খাওয়ার বলে। হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় জ্বলুনি কিছুটা কমল, যুক্তিগুলো খাড়া করে বেশ একটা প্রশান্তি এল মনে।

আমাদের সহযোগী সংস্থার লোকজন প্রজেক্ট সাইটেই ক্যাম্প করে আছে। তারা বেশ খাতির করে দুপুরে ভাত ডাল আলু সেদ্ধ খাওয়াল, মেনু নিয়ে বারবার কুন্ঠা প্রকাশ করল। আমি অকুণ্ঠ প্রশংসা করে পরের কয়েকদিনের জন্য লাঞ্চের ব্যবস্থা পাকা করে নিলাম। কতটা পাকা বুদ্ধির কাজ করেছিলাম সেটা পরে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। ওরা বেশ যত্ন করেই খাইয়েছিল ওই ক’দিন, ভাত ডাল সবজি ইত্যাদি, যেদিন যেমন, পরিস্থিতির বিচারে অমৃততুল্য।

এ গেল দুপুরের কথা, এখনও রাত বাকি, বাত বাকি। বয়স তখন অনেক কম, তার ওপর কাজের জন্য হাঁটাহাঁটি দৌড়োদৌড়ি হত ভালোই, একটু বেলা করে খেলে রাত পর্যন্ত পেট ভার হয়ে থাকা তাই শুরু হয়নি। সুতরাং রাতের খাওয়া বাদ দেওয়ার উপায় নেই।

ন’টা নাগাদ তিনতলার টং থেকে নামলাম নৈশাহারের খোঁজে, একটা দোকান পেয়েও গেলাম কাছাকাছি। দোকানদার গড়গড় করে অনেক কিছুর নাম বলে গেল, ডাল ফ্রাই, আলু মটর, আলু চানা, চানা মশালা, আলু গোবি, আন্ডা কারি…..

– ক্যা বোলা, আলু গোবি। তিখা নেহি হোগা না?
– নেহি সার, বিলকুল নেহি।
– ঠিক হ্যায়, তিন রোটি ঔর আলু গোবি লাগা দো|

ফুলকপির তরকারি রুটি, সব অর্থেই একেবারে নিরিমিষ খাবার, তেল মশলা ঝাল কম হবে, এই আশায় মিনিট দশেক ধরে ছ্যাঁক ছোঁক আওয়াজ শুনলাম বসে বসে| তারপর অবশ্য যা এল তাতে “নাথিং ইজ টেকেন ফর গ্র্যান্টেড” কথাটার মানে হৃদয়ঙ্গম করলাম। ঝালের ঝামেলায় পড়ে কি খেলাম কেমন করে খেলাম আজ আর মনে নেই।

পরের দিন মেনু ঠিক করার সময় সাবধানী হলাম।
– ডাল হ্যায় ক্যায়া?
– চানা ডাল ফ্রাই হোগা।
– নেহি উসমে মির্চি হোগা। ওমলেট হোগা?
– জী সার|

বলে দিলাম, ডিমের ওমলেট আর রুটি। ওমলেটে কত আর লঙ্কা দেবে, দুচারটে কাঁচা লঙ্কার কুচি থাকলে বেছে ফেলে দেব। গ্লাসে চামচ ঘোরানোর শব্দ আর ডিমভাজার গন্ধে খিদেটা চাগিয়ে উঠল। বড় স্টিলের থালা ভর্তি বিশাল সাইজের একটা ওমলেট সামনে এল যথাসময়ে| কিন্তু দেখেই বুঝলাম আমি ভুল করেছি, এ থেকে লংকার কুচি বাছা আর কম্বলের লোম বাছা একই ব্যাপার। ডিমে মাখামাখি লংকার কুচি প্লেটে পড়ে রইল। দেখে মনে হবে ডিমের ভুজিয়া, কেউ আদ্ধেক খেয়ে ফেলে গেছে।

পরের দিন হাজার কাজের মাঝেও রাতের মেনু নিয়ে ভাবনাচিন্তা চালিয়ে গেলাম। খবর নিয়ে জেনেছি, ওই একটি দোকান ছাড়া আর খাওয়ার মতো দোকান আশেপাশে নেই। হয় সেই হাইওয়ের পাশে ধাবা, যেখানে যাওয়া আসা এক ঝকমারি ব্যাপার; নয়তো চটের পর্দা টাঙানো একটি দেশি আসবাগার, যেখানে ভেজা ছোলা, ডালমুট ইত্যাদি পাওয়া যেতে পারে কিন্তু ঝালের ঝামেলা বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

রাতে যথারীতি খেতে গেলাম|
– ঔর ক্যা বোলা থা উস দিন? আন্ডা কারি! কিতনা মির্চি ডালেগা?
– কারি মে থোড়া হোগা।

পথে এস বাবা, ‘কারি মে থোড়া মির্চি হোগা’ না! আমি খালি আন্ডা তুলে খায়েগা, ছোটবেলায় মা ঝোল থেকে মাংস তুলে জলে ধুয়ে যে ভাবে খাওয়াতো। তাছাড়া বাড়িতে ডিমের ঝোলের ঝোল আর আলুতেই সোয়াদ থাকে, ডিমের ভেতরে তো কিছুই মশলা ঢোকে না।

– দে দো, রোটি, আন্ডা কারি।

দশ মিনিটের মধ্যেই টেবিলে এসে গেল টকটকে লাল ঝোলের মধ্যে দুটো ডিম। ঝোলে আঙ্গুল ডুবিয়ে নাড়া দিতে গাদা গাদা লংকার কুচি ভেসে উঠল। দেখে প্রায় খাঁচাছাড়া আমার আত্মারামকে বুঝিয়ে বললাম, মায়াময় জগতে লংকার উপস্থিতিতে কি যায় আসে! বুদ্ধির্যস্য বলম তস্য, ফন্দি তো আঁটাই আছে। ডিমদুটো থালায় তুলে নিয়ে ভেঙে রুটিতে মুড়ে মুখে ঢোকালাম। নিশ্চিন্ত মনে চোখ বন্ধ করে কামড় বসলাম। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বিস্ফরিত হয়ে গেল, হেঁচকি উঠে এল; মুখে শুকনো রুটি আর ডিম। ব্রহ্মতালু গরম হয়ে জ্বলে ওঠার ঠিক আগে একটা চিন্তা ভুড়বুড়ি কেটে উঠল, এখানকার মুরগিগুলোও কি লংকার গুঁড়ো খায়!

এমনি করে এটা ওটা খেয়ে আরও দু’দিন কাটল। ক্যাম্প থেকে রাতের খাওয়ার বয়ে আনা যেত, কিন্তু দুপুরে খাওয়ার পরে আবার রাতের জন্য ছাঁদা বাঁধা বাড়াবাড়ি মনে হল| ওখানেই খেতে বসে দইয়ের কথা ওঠায় বিদ্যুৎ চমকের মতো মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল, রাতে দই দিয়ে ভাত খেলেই তো হয়।

রাতে খেতে গিয়ে বেশ বিজয়ীর হাসি হেসে দই আর ভাত বলে দিলাম। আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছি তখন, বুদ্ধি একটা বের করেছি বটে, ব্যাটার খেলার জন্য এতটুকু জায়গা ছেড়ে রাখিনি। দোকানদার করুণ মুখে, অন্ততঃ আমার তাই মনে হল, দুবার ধরে জিজ্ঞাসা করল আর কিছু দেবে কিনা।

– কুছ নেহি চাহিয়ে|
– ক্যায়সে খাওগে সার!
– ঠিক খায়েগা। খালি কার্ড-রাইস ব্যাস।
– ওহ, ঠিক হ্যায়, কার্ড-রাইস বানা দেতা হুঁ।
– হাঁ, ঠিকসে বানানা।
– বিলকুল সার, ঠিকসে বানা দেগা।

ভুলটা কোথায় করলাম তখনও বুঝিনি, স্কুলে পড়া ‘প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ’ চ্যাপ্টারটার প্রয়োগ না বুঝে পড়ার ফল এভাবে ফলবে ভাবিনি। উল্টে ‘খুব জব্দ করেছি’ মার্কা মুখ করে হাঁটু নাচাতে থাকলাম। আসলে আত্মবিশ্বাস আর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সীমারেখাটা খুব সূক্ষ্ম কিনা!

কিছুক্ষণ পরে ছোকরা খাবার এনে নামিয়ে রাখল টেবিলে, বড়সড় কাঁচের বাটিতে দই আর ভাত একসাথে মাখানো| ও হরি, কেতা মেরে ইংরেজিতে বলার ফল; এ তো দক্ষিণী কার্ড-রাইস বানানোর চেষ্টা করেছে। তা হোক, আমি তো একসঙ্গে মাখিয়েই খেতাম| খুব ছোট করে কুচোনো পেঁয়াজ, টমেটো ইত্যাদি দিয়েছে বোধহয়, ওপরে ধনে পাতাও ছড়িয়েছে| বাঃ গন্ধটা ভালোই উঠছে| কিন্তু বাটিতে লালচে আভা কেন! চামচ দিয়ে ধনেপাতা সরিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করতেই আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল।

দইভাতে লাল লংকার গুঁড়ো সুন্দর ভাবে মিশিয়েছে| পরিমাণ? পিলে চমকানিয়া। ধনেপাতা কুচির আড়ালে উঁকি মারছে অজস্র সবুজ তাজা মিহি লংকার কুচি!

আমার রোষকষায়িত দৃষ্টির সামনে দেঁতো হাসির হেসে দোকানদার জবাব দিল – দহি থোড়া খাট্টা থা, ইস লইয়া মশালা জাদা ডালা। আভি জমকে খাও সার।

আর জমকে খাও, আমিই তোর পাল্লায় পড়ে যমের দুয়ারে যেতে বসেছি। তোর মুণ্ডটাই চিবিয়ে খেতাম, ঝালের ভয়ে বেঁচে গেলি ব্যাটা| তেড়িয়া হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম – দুধ হ্যায়?

ঘাবড়ে গিয়ে বলল – মিল যায়েগা সার। চায় দুকান সে মাঙ্গা দেগা।

মিনিট পনেরোর মধ্যে হাতে গ্লাস ভর্তি দুধ নিয়ে এসে টেবিলে রাখল, চায়ের জন্য রাখা পাতলা দুধ; তাই দিয়ে ভাত খেলাম।

পরের চার পাঁচ দিন বেশ দুধেভাতে ছিলাম| দোকানদার অবাক হয়ে আমার খাওয়া দেখত| এমন আজব খদ্দের ও বাপের জন্মে দেখেনি। আমাকে অন্য গ্রহ থেকে আসা জীবও ভেবে থাকতে পারে, যেখানে লঙ্কা বলে জিনিসটা নেই| তবে পয়সা নিয়ে কিচিরমিচির করতাম না বলে আমার জন্মকর্ম বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করেনি কখনও। আর ওই কয়েকদিনের লঙ্কাকাণ্ডে আমি যে মুখপোড়া হয়নি সে আমার বাপদাদার পুণ্যফল।

*************

(লেখাটি ফেসবুকে পোস্টানো হয়েছিল)

Keep reading

More >

মানদন্ড