তরান্না-ই-রৌশন : আলোকগীতি

মহাল-এর পিছনদিকে লম্বা বাগানটার একদম শেষে  দেওদার গাছের সারির মাথার উপর দিয়ে এগিয়ে আসা কালো বিন্দুর ঝাঁকগুলোর দিকে তাকিয়ে আপনমনেই …

মহাল-এর পিছনদিকে লম্বা বাগানটার একদম শেষে  দেওদার গাছের সারির মাথার উপর দিয়ে এগিয়ে আসা কালো বিন্দুর ঝাঁকগুলোর দিকে তাকিয়ে আপনমনেই তিনি খুশী হয়ে উঠলেন। হে পরম করুণাময়, তোমার অপার করুণায় অবশেষে বরফ গলার দিন এসেই গেলো। ভোরের মল্লিকার মতো তাঁর স্নিগ্ধ মুখটিতে সদ্য নমাজ সেরে ওঠার পরের প্রগাঢ় প্রশান্তি, ঘাই হরিণীর মতো দীঘল দুচোখের দৃষ্টি  তিনি মিলিয়ে দিলেন আকাশ কালো করে উড়তে থাকা ইরানি বুলবুলির ঝাঁকের মধ্যে,কাছেই  নিশ্চয়ই কোনো গেঁহুর খেতি রয়েছে, নতুন পাকা গেঁহু খেতে খেতে আচমকাই ডানা মেলেছে ওরা।

এবার দীর্ঘ সাড়ে চার-পাঁচ মাস পরে বসন্ত আসতে চলেছে কাশ্মীরে। চারধারে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলোর মাথায় মাথায় বরফ গলা শুরু হয়েছে। আশমান ছোঁয়া গাছগুলো নতুন রোদ মেখে ঝকঝকিয়ে উঠেছে। নতুন জন্মলাভের আনন্দে মাতোয়ারা নীল ঝর্ণাগুলোর কলধ্বনি ভেসে আসছে নিস্তব্ধ ভোরের বাতাসে সওয়ার হয়ে। ছোট একটা তেরপাই টেনে জানলার পাশে বসলেন তিনি। তাঁর সামনে এলিয়ে থাকা বিশাল পীরপঞ্জল গিরিপথ। এই এত উঁচু, দুর্গম সব পাহাড়ের ওপাশে তাঁর বাপ-দাদা-পরদাদাদের দেশ জায়গা, সমরখন্দ, চাঘতাই, খোরাসান,বলক্‌, বদকশান- কেমন আছে সেসব মুল্‌ক এখন? কেমনই বা আছে হিন্দুস্তান? নহবতের সুরে ঘোর কেটে যায় ওঁর, দূরে চুনাপাথরের বিশাল পাহাড়ের পটভূমিকায় সপূর হ্রদের তীরে উঁচু টিলায় এই মুঘল কুঠি – মহাল সপূর। আশেপাশে আরো সব মহাল- পুঞ্চ, রাজৌরি, পীরপঞ্জল, নওসেরা। উত্তরে আরো সামনে স্কার্দু, চিত্রল, গিলগিট। এসব পথেই বারেবারে বিদেশীরা হামলা করেছে এই দেশে, আবার এই পথেই কত সুফী-সন্তেরা এসেছেন, সওদাগরেরা পশরা নিয়ে গেছে কাবুল, কান্দাহার। হায় খুদা, কত আজব তোমার মর্জি- একটাই পথ, রাহী আলগ, মঞ্জিলও আলগ। লম্বা শ্বাস ফেলে উঠে পশমের মোটা জুলপিখানা গায়ে ফেলে নিজের কামরার বাইরে আসতেই বিলকিসের সামনে পড়লেন তিনি। দীর্ঘদেহী এই তাতারনী বাঁদীমহলের সর্দারনী। তার কুর্ণিশে হালকা মাথা নেড়ে লঘুছন্দে দালানের অন্য দিকে পা বাড়ালেন তিনি।

-“মুলকে-মালিকা, আমার গর্দান যাবে যে”।

-“ বেফিকর রহো। আমার কথায় ভরসা নেই তোমার?”

-“মাফ কিজিয়ে মালিকা, এ কাজ কি আপনার?”

-“কার কী কাজ তা তুমি কী করে জানবে? তুমি নিজের কাজে যাও”।

দালানের শেষপ্রান্তের ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বাগিচার ঠিক মাঝখানে শ্বেতপাথরের ফোয়ারার পাশে তিনি ওদের দেখতে পেলেন।

বাসন্তী হলুদ নাদিরি, মাথায় সাদা রেশমি উষ্ণীষ। কী নির্মল শিশুর মত মুখ, যেন সাক্ষাৎ কোনো ফরিস্তাই এসেছেন বেহেস্ত ছেড়ে- শাহজাদা দারা, হিন্দুস্তানের ভাবী বাদশাহ।

অপরজনের আগুনরঙা আকবরি ডোরিয়ার সাথে মসলিনের বাদলকিনারি ওড়না, সৌন্দর্যের সাথে মেধার অপার মিলমিশে ভাস্বর শাহজাদী জাহানারা।

সোনালী মিনাকাজ করা চামড়ার মলাট পরানো কোনো কিতাব থেকে কিছু পড়ে শোনাচ্ছেন দারা। ফোয়ারার পাশে বসে তাই শুনতে শুনতে কোলে রাখা সোনার রেকাবী থেকে একটি দুটি করে আঙ্গুর, বাদাম আলগোছে মুখে ফেলছেন জাহানারা, কখনো বা ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন কাবুলী পিচ ভরা আরেকটি রেকাবী।

“বাজি, আজকাল কোনো কিছুতে আমি শান্তি পাই না কেন? কেন আমার মনে হয় চোখের সামনে কালো কঠিন পর্দা, আমি প্রাণপণে সে সরাতে চাই, ওপাশের রোশনিকে ছুঁতে চাই আমার সবটুকু দিয়ে, আমি পারি না , বাজি , আমি পারি না কেন?”

“সে আলোর সন্ধান তো তোমাকে কোনো গুরুই দিতে পারবে, ভাইয়া। মিঞা মীরের কথা মনে করো। তালাশ তো তোমার জারি আছে ভাইজান। নিজের মনকে শান্ত করো”

“আব্বা হুজুরের আসার সময় হয়ে গেলো না, বাজি?”

“কালই এসে পড়বেন। ভাইয়া এই মহালে আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়, মনে হয় একজোড়া চোখ আমাকে দেখছে। সে চোখ আমার চেনা, কিছু যেন বলতে চায়”

“আর সেই চোখের খোঁজেই তুমি সারাদিন মহালের এপ্রান্ত ওপ্রান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছো বাজী?”

দুই ভাইবোনের সম্মিলিত হাসির সুর নিয়ে পাহাড়ি টিয়ার ঝাঁক উড়ে যায় ঝিলমের দিকে। কিছু দূরে ফৌজদারী দপ্তরে হিসাবের কাজ চলতে থাকে দ্রুত তালে। বাদশাজাদা শাহজাহান কাল এসে পড়বেন মহালে। তার আগে সব বন্দোবস্ত হয়ে যাওয়া চাই।

“রেহম কিজিয়ে মুলকে-মালিকা, ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন, রেহম কিজিয়ে বেগমপনা। অবোধ ছেলে আমার, মাফ করে দিন ওকে”

কান্নার তালে কথা আটকে যাচ্ছিলো মহিলার। পায়ের উপর পড়ে সে রাস্তা অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো। চোখের ইশারায় হারেম রক্ষীদের ডেকে রাস্তা সাফা করতে এক লহমার বেশি লাগেনি। নাদানি! হুঁহ। স্বয়ং বাদশা-বেগমের দিকে চোখ তুলে চেয়েছে তোমার  ছেলে। শাস্তি সে কি জানতো না? বুরবক সেই ছেলের বুরবক মায়ের কান্না হারেমের বন্ধ দেওয়ালের মধ্যে পাক খেতে খেতে মিলিয়ে গেছে গুগগুলের ধোঁয়ার মতো। কিন্তু ইদানীং তা কেন ঘুরে ঘুরে কানে বাজে ঘুমের মধ্যে। বিছানায় উঠে বসেন, কামরার এক কোণে রাখা রুপোর পাত্র থেকে জল খেয়ে শান্ত করেন শুকিয়ে যাওয়া গলা, বুক। আজও মনে আছে সেই দৃষ্টি। নাহ, কোনো কামুক দৃষ্টি তো ছিলোনা, যা ছিলো তা হলো শুধুই বিস্ময়, বেহেস্ত-এর হুরী পরীকে চর্মচক্ষে দেখার বিস্ময় যা বদলে যাচ্ছিলো মুগ্ধতায়, দৃষ্টি দিয়ে সৌন্দর্য্যের পায়ে অঞ্জলিই দিচ্ছিলো সে বালক। ভালো কী লাগেনি তাঁরও? নয়তো কিসের অছিলায় তিনি একটু বেশিই সময় দাঁড়িয়ে রইলেন গবাক্ষে, অজ্ঞাতকুলশীল, তুচ্ছ এক বিধর্মী কিশোরের অপাপবিদ্ধ দুই চোখের পরিধির মধ্যে। নিজের রূপের সম্মোহিনী ক্ষমতা তো তাঁর অজানা নয়, যাতে বুঁদ হয়ে আজীবন রয়ে গেলেন তামাম হিন্দুস্তানের খোদ বাদশাহ নিজেই, তিনি জানতেন কী অপেক্ষা করছে ওই কিশোরের জন্য। উদ্যানরক্ষীদের হাতে পড়ে সে চালান হলো শাহী কারাগারে, দুইদিন পর দামাল হাতির পায়ে পিষিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো। আজ এতগুলো সাল পরে সেই চোখ, মায়ের সেই মর্মভেদী কান্না তাঁর পিছু ছাড়তে চায়না। ওড়নার প্রান্তে কপালের ঘাম মুছে রবাবটা নিয়ে বসেন তিনি।  পুনমের রাতে হলুদ জ্যোৎস্নায় ভাসা মুঘল কুঠির বিস্তীর্ণ চবুতরা জুড়ে কেঁপে কেঁপে ফেরে রবাবের সেই সুর, মহালের অন্তঃপুরে নিজের সুখদোলাতে আধোঘুমের মধ্যে জাহানারা চমকে পাশ ফেরেন। নিজের ঘরে অভ্রের আলোয় তজকিরাত-উল-আউলিয়াতে নিমগ্ন দারাকে আনমনা করে সেই সুর নিশ্চুপ রাত্রির বুকে আশ্রয় খুঁজে ফেরে।

লম্বা চাতালের ঢাকা অংশটাতে বসে ফৌজদারের কাছে কুঠির খবরাখবর নিচ্ছিলেন বাদশা। কিছুদুরে জাহানারা, দারা নিজেদের মধ্যে মেতেছিলেন কোনো আলোচনায়। বাদশার শীত নিবারণের জন্য একটু দূরে রাখা আগেনগারে বার বার কাঠ দিতে হচ্ছিলো। হঠাৎই বাদশার নজরে এলো এক ন্যুব্জ বৃদ্ধা বাঁদী বারবার এসে এই কাঠ পালটে দিয়ে যাচ্ছে। বয়সের ভারে গতি স্লথ, তার উপরে কাঠের ভার সব মিলিয়ে টেনে টেনে সে চলছিলো। শাহী নিয়মে কোনো বয়স্কা বাঁদী বাদশাহের খিদমতে লাগতে পারে না, বিরক্ত বাদশা ফৌজদারের কাছে জবাব চাইলেন।

না সালাম, না তসলিম , বাঁদী ঘুরে দাঁড়িয়ে জবাব দিলো, “ফৌজদারের দোষ নেই জাঁহাপনা, আমি নিজেই এ কাজ করতে চেয়েছি”

স্তম্ভিত জাহানারা, দারাশুকোর সামনে বাদশার দিকে ফিরে মুখের ওড়না সরিয়ে কুর্ণিশ জানালো বৃদ্ধা বাঁদী,

“গুস্তাকি মাফ, হজরত। এ কাজ আমি স্বেচ্ছায় করছি”

তিনজোড়া বিস্মিত চোখের সামনে, মেহরুন্নিসা, হিন্দুস্তানের নসীব এগারো সাল জুড়ে যাঁর চম্পককলি সদৃশ আঙ্গুলে অলিখিত ভাবে লেখা হয়েছে, যাঁর নামাঙ্কিত আশরফি তামাম হিন্দুস্তানে আজও স্বীকৃত মুদ্রা হিসেবে মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে, সেই বাদশা-বেগম, মুলকে মালিকা নূরজাহান বেগম। নিজের বাগী জীবনের দুঃসহ স্মৃতি এক পলকে মনে পড়ে গেলো বাদশাহ শাহজাহানের। পলকে কঠিন হলো চোয়াল, মুঠি দৃঢ় হয়ে উঠলো।

“অবাক হলে বাদশাহ খুরর্ম? শুধু তোমাকে একবার কাছ থেকে দেখবো বলে, তোমার কন্ঠস্বর শুনবো বলে এই দুঃসাহস আমার” স্মিত হেসে আবার ওড়নায় মুখ ঢেকে ধীর পায়ে দেওয়ালের অন্য দিকে এগোলেন তিনি।

সেই খুরর্ম! কত সাল বাদে ওকে দেখলেন মেহরুন্নিসা, ছবির মতো ভাসতে থাকে চোখের উপর। নওরোজের তেওহার, তরুণ খুরর্মের সাথে আরজুমন্দ, তাঁর প্রিয় আরজুর গুপ্তপ্রণয়, বাদশাহ জাহাঙ্গীকে রাজি করিয়ে দুজনের নিকাহ্‌, খুরর্মকে ঘিরে তাঁর তীব্র উচ্চাশা, বিফল মনোরথ হওয়ার পর তেমনই প্রবল প্রতিহিংসা, সব সব মনে পড়ে যায়। অনেকদিন, অনেকদিন আগ্রা থেকে নির্বাসিত থাকার পরে আজ ক্রোধ, অনুতাপ কিছুই আর আসে না। আসে শুধু সঙ্গলাভের ঈপ্সা। দুহাতের পাতায় নাতি নাতনীর মুখ নিয়ে কপালে চুম্বন এঁকে দেওয়ার ইচ্ছেটুকু।

কি ইশক্‌ আসাঁ নমুদ অব্‌বল

নিজের কামরায় জানলার পাশটিতে বসে শাদা মসলিনে রেশমি সুতোর ফোঁড় তুলতে তুলতে অস্ফুটে গেয়ে ওঠেন নূরমহল।

বলে উফ্‌তাদ মুশ্‌কিল হা-

“হাফিজ”

দরজায় জাহানারাকে দেখে উঠে দাঁড়ান তিনি।

“আদাব শাহাজাদী জাহানারা”

“আদাব দাদীজান। আপনি এখানে এভাবে?”

“ আমি কোথায় থাকবো সে কি আর আমি ঠিক করি। আমি জানি বেটা, তুমি অনেক পড়াশোনা করেছো, জালালউদ্দিন রুমি কী বলেছেন মনে নেই? ঈশ্বর আমাকে যেখানে নিয়ে যান তা শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, মেহমানিই তাঁর পরম ইচ্ছে। আমিও তাঁরই মেহমান হয়ে চলছি শাহজাদী, যে পথের শেষে শুধুই শান্তি আর শান্তি”

অস্ত সূর্যের আলোয় জীবনে প্রথম ও শেষ বার একসাথে নমাজে বসলেন হিন্দুস্তানের দুইকালের দুই শক্তিমতী নারী-

নয়তোয়ান উসালিয়া লিল্লাহে তা আলা

রাকাতে সালাতে নফল

মাতোয়া জাহান ইলা জেহেতেল

কাওবাতে সরিফাতে।

আল্লাহ হু আকবর-

বাদশাহের নির্দেশে কালই আবার নিশাতবাগের গোলাপ বাগিচা দেখাশোনার কাজে ফিরে যেতে হবে নূরজাহান বেগমকে। সপূরা কুঠির চাঁদনীধোওয়া চাতালে বসে দারাশুকো সামনের পীরপঞ্জালের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হে খোদাতালাহ, কোন খেয়ালে তুমি সম্রাজ্ঞীকে বাঁদী বানাও, ছেলের হাতে পিতার, ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের রক্ত ঝরাও। আবার সেই তুমিই এই জ্যোৎস্নাভরা রাত সাজাও, বসন্তে বাগিচায় ফুলের তেওহার আনো, শিশুর মুখে মা ডাক ফোটাও। পথ দেখাও, পথ দেখাও হে বন্দেগান, যে পথের শেষে শুধু তুমি আর আমি, বাতাসে তখন পারিজাতের খোশবাই আর এ বিশ্বচরাচর জুড়ে শুধু বাণীহারা সুর, যার জাত নেই, ধর্ম নেই, বাদশা নেই, বাঁদী নেই, শাহী নেই, গরিবী নেই। ধীরপায়ে নিজের মহলের দিকের এগোলেন সুফী দারাশিকো, সাফিনৎ-উল-আউলিয়া লেখার কাজে অনেকদিন ফাঁকি পড়ে গেছে।

 

(ভাবনা ঋণঃ শ্রী শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এবং শ্রীমতি ইন্দু সুন্দরেশান)

Keep reading

More >