নসীবপুরের জমিদারবাড়ি

নসীবপুরের জমিদারবাড়ি   ওই তো এসে পড়েছি। সামনেই জমিদারবাড়ি দেখা যাচ্ছে। মাঠের এক্কেবারে মাঝখানে। রেললাইন এমনকি গ্রামটাও এখান থেকে অনেকটাই …

নসীবপুরের জমিদারবাড়ি

 

ওই তো এসে পড়েছি। সামনেই জমিদারবাড়ি দেখা যাচ্ছে। মাঠের এক্কেবারে মাঝখানে। রেললাইন এমনকি গ্রামটাও এখান থেকে অনেকটাই দূরে। প্রতিবার পুজোর সময় আমাকে এখানে আসতেই হবে। সবাই অনেক ভয় দেখায়, নিষেধ করে। কিন্তু এই বাড়িটা আমাকে এমনভাবে টানতে থাকে যে না এসে পারি না।

দীঘিটা পেরোলে সামনেই সিংহ দুয়ার। দীঘিতে পদ্মফুল ফুটে আছে। আশেপাশের কোন পুকুরে শাপলা ছাড়া কিছু ফুটবে না। কিন্তু নসীবপুরের দীঘিতে এই আশ্বিনমাসে পদ্ম ফুটবেই। ফটকটা সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। আজ পঞ্চমী। ভেতর থেকে কাঁসর ঘণ্টা বাজানোর শব্দ ভেসে আসছে।

মার্বেল বাঁধানো উঠোনে ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। একচালার প্রতিমা। ডাকের সাজ এখনো শেষ হয় নি। বাড়ির সবাই প্রতিমার সামনে বসে আছে। সবাইকে কেমন জানি অস্পষ্ট দেখাছে। ওদের পাশ কাটিয়ে উপরে উঠে গেলাম। সিঁড়ি ভেঙে একদম তিনতলায় উঠে এলাম। চিলেকোঠার পাশেই আমার ঘর। ঘরে ঝুল পড়ে আছে। ধূলোয় ভর্তি চারিদিকে। ঝুলের গন্ধ আমার বড় ভাল লাগে। ঝুলে আটকে পড়েছে কতগুলো মাকড়শা। এদিক ওদিক আরশোলা উড়ে বেড়াচ্ছে। মেঝেতে দৌড়ে যাচ্ছে ইঁদুর। এইসব দৃশ্যগুলো আমি প্রতিবার এলেই দেখতে পাই। ব্যাগ থেকে একটা বিছানার চাদর বের করে পেতে নিলাম। একটা শাড়ি বের করে রাখলাম স্নান করে পড়ব বলে।

জমিদারবাড়িটা সুন্দরভাবে সেজে উঠেছে। হালকা ধূপের গন্ধে সারা বাড়িটা মম করছে। আগমনী গান বাজছে। ছাদের এককোণায় চলে এলাম। রেলিঙএর উপর বসলে সারা নসীবপুর দেখা যায়। হাওয়া এসে চুল উড়িয়ে দিচ্ছিল। আচল উড়ে যাচ্ছিল। বুকের কাপড় ঠিক রাখা যায় না এই বাতাসে। কথাটা মনে আসতেই হাসি পেল।

সামনেই বিরাট বাঁশবাগান। ওটা পেরোলে আমবাগান। গাছের পাতাগুলো হাওয়ায় কাঁপছে। এবার অক্টোবরের শেষে পুজো। বাতাসে একটা হালকা ঠান্ডার আমেজ। আরামে আর সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে।

হঠাৎ দেখি সিঁড়ির কাছে একটা বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। এই ছেলেটার চেহারা স্পষ্ট দেখতে পারছি। মুখটা কেমন বিষণ্ণ। মনে হয় অল্প ভয়ও পেয়েছে। একভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয় আমাকেই দেখছে। চোখের পলক পড়ছে না। খুব বেশি হলে বছর পাঁচেক হবে। নতুন জামা পড়েছে। সবে স্নান করেছে মনে হয়। চুলটা সিঁথি করে আঁচড়ানো। হাতে বালা, কপালে কাজলের টিপ পড়েছে।

একদম আমার ছেলে বিজয়ের মত দেখতে। মুখটা কে যেন হুবহু কেটে বসিয়ে দিয়েছে। ‘কেটে বসিয়ে দিয়েছে’ কথাটা আমারই কানে বাজল। বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওর মুখটা গম্ভীর। এটুকু বাচ্চার মুখ এত গম্ভীর হয়? কিছক্ষণ পরে ছেলেটা নিচে চলে গেল। ভাবলাম যাক কাউকে তো দেখা গেল। গতবার তো কাউকেই স্পষ্ট করে দেখতে পাই নি। এদিকে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। সারাদিন অনেক ধকল গেছে শরীরের উপর দিয়ে। ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙলে দেখি বেশ রাত হয়ে গেছে। ঘড়ি সঙ্গে আনি নি। তবে মনে হল রাত আটটা তো হবেই। চুলটা খুলে নিচে নেমে এলাম। মন্ডপের সামনে ছোট ছোট জটলা। বড় করে সিঁদুরের টিপ পড়েছি। আমাকে বেশ সন্দরী বউয়ের মত লাগছে। একটা চেয়ার টেনে বসলাম। রাতের বেলা সবার মুখটা মোটামুটি দেখতে পাই। এই বাড়িতে এখনও ইলেক্ট্রিক আলো আসে নি। চারিদিকে প্রচুর হ্যাজাক জ্বলছে। কাজের লোকেরা লন্ঠন হাতে এদিক ওদিক করছে। এ বাড়ি পুজোর সময় প্রতিবার রং করা হয়। এত বড় বাড়ি রং করা মুখের কথা নয়। কিন্তু এটাই প্রথা। জমিদার তেজেন্দ্র বাহাদুরের সময় থেকেই চলে আসছে। রাতের বেলা সিংহ দুয়ার বন্ধ থাকে। এই এলাকায় ডাকাতের খুব উৎপাত। বেশ কয়েকজন লেঠেল গায়ে তেল মেখে মোটা লাঠি হাতে দুয়ারের বাইরে ও ভেতরে পাহারা দিচ্ছে। দূরের কেওড়ার ঝোপ থেকে অনবরত ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে চলেছে। রাতচরা পাখিগুলো ডেকে যাচ্ছে একটানা। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল একটা লক্ষীপেঁচা। আহা কী জগৎ! কী আলো-আঁধারি! রাতের পৃথিবী জেগে উঠছে। প্রতিমার মুখের ঘামতেল চকচক করছে। মা আমার দিকে যেন রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। এই বাড়িতে যেন আমি অনাহূত। জোর করে ঢুকে পড়েছি। তাই কি?

বাচ্চা ছেলেটা একটু দূরে বসে আছে। ওকে স্পষ্ট দেখতে পারছি। কিন্তু ও মনে হয় আমাকে এখন আর দেখতে পারছে না। আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে ওর পাশে বসলাম। ওর নিঃশ্বাসের আওয়াজও আমি শুনতে পেলাম। কিন্তু ও এখন আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। একদম বিজয়ের মত দেখতে। সেই চোখ, সেই চুল, গায়ের রং। একটু পরে উঠে ও আরেকটা মেয়ের সাথে ওপরে চলে গেল। ওই বাচ্চা মেয়েটাকে আমি ভাল দেখতে পেলাম না। কত লোক মন্ডপে ঘোরাফেরা করছে। কাউকেই ঠিকঠাক দেখতে পারছি না। একটা ঝাপসা প্রতিরূপ সবার দেখতে পারছি। কেমন যেন ফিসফিস করে ওরা কথা বলে। ওদের ভাষাও আমি ঠিক বুঝতে পারি না। আবার কখনও কখনও বুঝতে পারি। বুঝতে পারি ওরা কী বলছে। একটু আগে একজন ভারি চেহারার লোক এক লেঠেলকে বলল, ‘ওরে গেটে ভালো করে তালা দে। মায়ের গায়ের…. গয়না… ডাকাত আসবে।’

ডাকাত আসবে। ডাকাত নিয়ে কত ইতিহাস এ বাড়ির। ডাকাতদের জন্য সিঁড়িগুলো ছোটো করে বানানো। যাতে একজনের বেশি দুজন পাশাপাশি উঠতে না পারে। সেবার ডাকাতের চিঠি আসার পর সেজবাবু একশজন লেঠেলকে ভাড়া করে এনেছিলেন। জমিদার বাড়ির চারিদিকে পরিখা কাটা হল। ওরা মাঘী অমাবস্যার রাতে মাত্র পনের জন এল। বেশিরভাগ লেঠেলদের গলার নলি কেটে মেরে ফেলল। বাকিরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে গেল। সেজবাবু বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন। বর্শা ছুঁড়ে বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল সেজগিন্নির সামনে। সেজগিন্নি গয়নাগুলো আঁকড়ে বসে ছিলেন। বাবুকে লুটিয়ে পড়তে দেখে গয়না ফেলে সেজবাবুর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সর্দার মাকে প্রণাম করে গয়না নিয়ে চলে গেল। বাড়ির আর একটা লোকের গায়ে আঁচড় পর্যন্ত পড়ল না।

আজ আর কোথায় ডাকাত? আমরা যেসব দিন দেখেছি, যেসব ডাকাত দেখেছি আজ আর তারা কোথায়? চোখ বন্ধ করলে ভৃগু ডাকাতের চেহারাটা এখনো চোখে ভাসে। ছ ফুটের ওপর লম্বা। সারা গায়ে তেল মাখা। লাঙ্গটের মত শক্ত করে বাঁধা ধুতি। পুরুষাঙ্গ ঠেলে বেরিয়ে আসছে যেন। পাকানো গোঁফ। তেমনি বাঁজখাই গলার আওয়াজ। ওই ডাক শুনলে নদীর এপারের রাতচরা সব পাখি একসাথে উড়ে নদীর ওইপারে চলে যেত। খুন করতে হাত কাঁপত না। কিন্তু মরে গেলেও মেয়ে আর বাচ্চাদের গায়ে হাত দেবে না। সেসব ছিল ডাকাত। ভাবলে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।

সবাই আজকে যেন বড় তাড়াতাড়ি নিচ থেকে ওপরে যে যার ঘরে চলে গেল। কিছু লেঠেল সিংহ দুয়ারের পাশে বসে ঝিমোচ্ছে। কেউ ঘুমোতে ঘুমোতেই মশা মারছে। খালি গা। গায়ে মাংশপেশি স্পষ্ট হয়ে দেখা যাচ্ছে। কাছে দাঁড়াতে গায়ে ঘামের গন্ধও পেলাম মনে হল। হেঁটে মায়ের মূর্তির পাশে গিয়ে বসলাম। মা এখন যেন আমার দিকে হাসিমুখে তাকাচ্ছেন। মা জানেন প্রতিবার আমি আসবই। আমাকে মাঝে মাঝে স্বপ্নেও দেখা দেন। কিন্তু সবার মধ্যে বেশি ঘুরলে মার মুখটা কেমন রাগি হয়ে যায়। কেন কে জানে? মায়ের পায়ে সুন্দর করে আলতা পরানো। ডাকের সাজের গন্ধ, মায়ের গায়ের ঘাম তেলের গন্ধ, কাঁচা মাটির গন্ধ, গদের আঠার গন্ধ আসছে। প্রাণটা জুড়িয়ে এল আমার। দূরে কোথা থেকে বেলফুলের গন্ধ নাকে লাগছে। দীঘির পারে একটা বড় বেলফুলের গাছ আছে। সকালে আসার সময় দেখেছি কুঁড়িতে ভরে গেছে গাছ। পাশেই ঠাকুরমশাইয়ের ঘর। বুড়ো মনে হয় দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে।

আমিই আর একা থেকে কী করি? আমারও তো কাজ আছে। সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াতে হবে। যদি কারোর দেখা পাই। এজন্যই তো ঘুরে ঘুরে এসময় প্রতিবার আসি। এ বাড়ির অনেক ঘরের কথা অনেকেই জানে না। তালা বন্ধ আছে বহু বছর। ওগুলো খুলে খুলে আমি বসি। চুপিচুপি। কেউ যেন টের না পায়। নতুন বৌঠানের ঘরটা খুলে বসলাম। মনে হল মেজবাবু  যেন এখুনি মদ খেয়ে আসবেন। বাইরে হয়ত ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ হবে।

বলতে বলতে দূরে ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ পেলাম। তার সাথে নূপুরের আওয়াজে মনে হল নতুন বৌঠান বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছেন। কতদিন বাদে দেখব। সেই প্রতিমার মত রূপ। টানাটানা চোখ। সরু কোমর। কোমরবন্ধের সাথে চাবির গোছা ঝুলছে। এই বাড়ির সব ইতিহাস আমার নখদর্পনে। আমি জানি এবার মেজ ঠাকুরপো ঘরে ঢুকলে দুজনের চরম একপ্রস্থ কলহ হবে। মেজবাবু হাতের বোতল ছুঁড়ে মারবেন নতুন বৌঠানের মাথায়। গরম রক্ত আমার হাতে চুঁইয়ে পড়ছে। এখনো গরম, টাটকা। নতুন বৌঠান আমাকে লক্ষ্য করছেন না। আমি ওনার মাথায় পট্টি বেঁধে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। ব্যাথায় ওনার হুঁশ নেই। অভিমানে ঠোঁটের কোণা তিরতির করে কাঁপছে। আমি লন্ঠনের আলো কমিয়ে দিলাম। মেজবাবু নেশায় কাঁপতে কাঁপতে বড়মার ঘরের দিকে চলে গেলেন।

আজ বাইরে সুন্দর পঞ্চমীর চাঁদ উঠেছে। কেউ নেই মন্ডপে এখন। সামনের দরজা দিয়ে বেরোতে গেলে লেঠেলরা জেগে যাবে। পেছনের রাস্তা দিয়ে আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। অনেকদিন পর আজ দীঘিতে স্নান করতে ইচ্ছে করছে। হালকা হালকা ঠান্ডা। কাপড় পরে জলে নেমে এলাম। শানবাঁধানো ঘাট। ভেজা কাপড় খুলে যাচ্ছে গা থেকে। কাছাকাছি কেউ নেই। পাশের বাঁশবন থেকে দুটো শেয়াল ডেকে উঠল। আমি অনাবৃত বুকে গলা জলে শরীরকে ভাসিয়ে দিলাম। আহা কত প্রেমের এই শরীর।

জমিদারবাড়ির লোকেরা এখন শুয়ে পড়েছে। একটা ঘরে শুধু আলো জ্বলছে। ওই ঘরের বউটা বড় রূপবতী। বরটাকে ঠিক দেখতে পেলাম না। ভুঁড়ি আর দশাসই চেহারা দেখে মনে হল অনেকটা যেন জিতেনবাবুর চেহারা। সেইরকম কামের ঘোলা নিঃশ্বাস পড়ছে। এই ধরণের পুরুষদের আমার চিনতে কোন ভুল হয় না। বউটা জানালা দিয়ে আমাকে দেখছে। এত দূর থেকেও ওর লাল টিপটা দেখতে পাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে পরদা টেনে দিল। আমি আস্তে আস্তে আমার শরীরের সাথে জড়িয়ে গেলাম ধীরে ধীরে। চোখ জড়িয়ে এসেছিল। কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না। চুল শুকিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলাম।

আজ সকাল থেকেই মন্ডপের সামনে প্রচুর লোকের ভিড়। বাড়ির সকলেই এসেছে বোধ হয়। ওদের হাওয়ায় ভেসে চলা নড়াচড়া বুঝতে পারছি। ওই সুন্দরী বউটা পদ্মফুলের কোয়া ছাড়াচ্ছে। স্নান করে এসেছে। মাথায় সিঁদুর। গায়ে একটা হাল্কা চাদর। ঝুঁকে আছে সামনে। নিচু হয়ে থাকায় পাশ থেকে সরু চিবুক দেখা যাচ্ছে। আমি ওর প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে বসলাম। একদম বড়মার চেহারা। ওর হাতের পাশে আমার হাত রাখলাম। আমার চেয়েও একটু ফর্সা। পদ্মের কুড়ির মতই গায়ের রঙ। মুখে একটা হালকা হাসি লেগে আছে। হঠাৎ কেন জানি চিৎকার করে ছিটকে সরে গেল। হাত থেকে খসে পড়ল কুঁড়ি। ভয় পেয়েছে কি? একটু দূরে গিয়ে বসলাম। কয়েকটা ছায়ামূর্তি ওকে সরিয়ে নিল।

জোরদার পূজো শুরু হয়ে গেল। ছোট ছেলেটা পাশে নাচছে। বউটা আমার দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে। আমি মিটিমিটি হাসলাম। গরম লাগছে বোধহয়। গায়ের চাদরটা সরিয়ে রাখল। আমি দৃষ্টি ঘুরিয়ে ছেলেটাকে দেখছিলাম। হঠাৎ কি হল ছুটে ছেলেটাকে কোলে নিয়ে বউটা দৌড়ে ঘরে চলে গেল। পুরো পুজোটা বসে বসে দেখলাম। দুপুরে যখন ভোজ হচ্ছে  ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। মাথাটা কেমন যেন ঘোরাচ্ছে। গা গুলোচ্ছে।

কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানি না। নিচে নেমে দেখি মা নেই মন্ডপে। মানে দশমী পার হয়ে গেছে। ভাসান হয়ে গেছে। পাশের ঘর থেকে শব্দ আসায় উঁকি দিলাম। দেখি বিরাট সভা বসেছে। বাড়ির সবাই আছে। অনেককেই এই কম আলোয় দেখতে পাচ্ছি। দেখি বউটা কাঁদছে। ভয়ে কেমন নীল হয়ে গেছে। ওরা নিজেদের মধ্যে কিসব ফিসফাস করছে। কিছু কিছু কানে এল। কালকে এক তান্ত্রিক আসবে… বউটা আর তার ছেলে নাকি কীসব দেখেছে… ছাদের উপর, মন্ডপে… রাতে দীঘিতে। দূরে কে এক অপূর্ব পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। বড়বাবার মত চেহারা। হ্যাঁ, হ্যাঁ অবিকল সেই চেহারা। সেই হাসি। সবার কথা শুনে খুব হাসছে আর বউটির পেছনে লাগছে। আস্তে আস্তে গিয়ে তার পাশে দাঁড়ালাম। গায়ে কী সুন্দর গন্ধ। কথা বললে মুক্তোর মত দাঁত চকচক করছে। আমি ওর পাঞ্জাবি, চুল ছুঁয়ে দেখলাম। হাসিটা কেমন সেতারের মত বাজছে। হালকা একটা কাঁপন যেন। আমার ওর সাথে জড়িয়ে যেতে ইচ্ছে হল। আগে চোখে পড়ে নি তো একে? বাচ্চাটার দিকে চোখ পড়তে দেখি আমার দিকে আবার তাকিয়ে আছে। আজ ওর চোখে ভয় নেই। আমাদের দুজনকে যেন দেখে পছন্দ হয়েছে। মুখ টিপে হাসছে। আমার কেমন লজ্জা হল। বাইরে বেরিয়ে ছাদে গিয়ে বসলাম।

আজ অন্ধকার বেশি। আকাশে কালো মেঘেরা জড় হচ্ছে। রাতে মনে হয় বৃষ্টি হবে। গুমোট করে আছে চারদিক। আবার পায়ের আওয়াজ হতে তাকিয়ে দেখি সেই পুরুষটি ছাদে একা একা আসছে। এই অন্ধকারে একা একা! সাহস আছে বলতে হবে। সবাই তো আর আমার মত সাহসী নয়! ঠিক আমার পাশটায় এসে দাঁড়াল। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আমার কাছটায় এসে কী যেন খুঁজছে। তারপর কী একটা যেন বলল। মুখে হালকা অবজ্ঞার হাসি। একটা সিগারেট ধরাল। আমাকে মনে হয় দেখতে পায় নি। না হয় আমার এত কাছে বসে আছে যে আমি তো ওর বুকের ধুকপুক শুনতে পারছি। কিছক্ষণ পরে চলে গেল নীচে। আমিও ঘরে চলে এলাম। আজ দশমী। মনটা খারাপ লাগছে।

কখন সকাল হয়েছে বলতে পারব না। ঘুম ভাঙলে দেখি নিচের তলা থেকে কেমন সব অদ্ভূত আওয়াজ আসছে। নীচে নেমে দেখলাম একটা যজ্ঞের মঞ্চ করে যজ্ঞ করা হচ্ছে। কালো, মাথায় জটাওলা ডাকাতের মত চেহারার এক তান্ত্রিক সমানে তারস্বরে মন্ত্র পড়ছে। আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। অথচ সবাই বসে আছে বুঝতে পারছি। তান্ত্রিক আমার দিকে ফিরে চোখে ভয়ঙ্কর ক্রোধ নিয়ে গণ্ডূষ থেকে জল ছুঁড়ে মারছে। আমার বেশ মজা লাগছিল ওর ওই অভিনয় দেখে। হঠাৎ কি হল জানি না আমার খুব মরে যেতে ইচ্ছে হল। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন মরে যেতে ইচ্ছে হল। আর মরার কথাটা মনে আসতেই মনটা অসম্ভব খুশিতে ভরে উঠল। আমি গুটিগুটি পায়ে আমার ঘরের দিকে গেলাম। আলমারি থেকে নতুন লাল পাড়ের শাড়িটা বের করলাম। চেয়ারটা ঘরের মাঝখানে নিয়ে কাপড়টাকে ফ্যানের সাথে বাঁধলাম। উত্তেজনায় আর যেন তর সইছে না আমার। গলায় ফাঁসটা লাগিয়ে যেই চেয়ারটা পা দিয়ে সরাতে যাব দেখি ছোট বাচ্চাটা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। একদম বিজয়ের মুখটা যেন বসানো। চোখ দিয়ে জল পড়ছে ছেলেটার। দৌড়ে ওর মা এসে ওকে কোলে তুলে ওর চোখ বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল। কাল সারারাত মনে হয় ঘুমোয় নি। ক্লান্তিতে আরও সুন্দর লাগছে দেখতে। কিন্তু সেই সুন্দর পুরুষটিকে তো দেখছি না। এখন একবারটি যদি দেখতে পেতাম! আরো সবাই এল। সবাই ঝাপসা। সবার বাতাসের মত নড়াচড়া বুঝতে পারছি। শেষে এল সেই সেই দানবের চেহারার কাপালিক। আমার দিকে ছুঁড়তে লাগল আরও জল। পড়তে লাগল মন্ত্র।

আমি পা দিয়ে চেয়ারটা সরিয়ে দিলাম। গলায় ফাঁসটা চেপে ধরল। আঃ কী অসাধারণ একটা শ্বাসরোধী অনুভূতি হচ্ছে। আমার বুক দুটো ভারি হয়ে আসছে। শক্ত হয়ে আসছে আস্তে আস্তে। পেটের নিচ থেকে যোনি, পাদুটো টানটান হয়ে আসছে। চোখ বুজে আসছে আরামে। পেছন থেকে জানালাটা হঠাৎ করে মনে হয় খুলে গেল। বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা হাওয়া এসে পিঠের কাপড় ফেলে দিল। ঠান্ডা হাওয়ায় চোখ বন্ধ হয়ে আসছে আমার। আহা এত সুখ কতকাল আমি পাই নি।

Keep reading

More >