পুজোর আগের গপপো ২

ফুটপাথের ধারে একখণ্ড পাথরের উপরে বসেছিল‌ সুজিত। সামনের সারিতে কুড়িটা গাড়ি পরপর পার্কিং করা। মাঝে মাঝে নজর রাখতে হচ্ছে কোনো …

ফুটপাথের ধারে একখণ্ড পাথরের উপরে বসেছিল‌ সুজিত। সামনের সারিতে কুড়িটা গাড়ি পরপর পার্কিং করা। মাঝে মাঝে নজর রাখতে হচ্ছে কোনো গাড়ি বেরিয়ে গেল কিনা। সামনের স্কুল আর পিছনের এসি মার্কেটের জন্য এই রাস্তায় পার্কিংয়ের বিশাল চাহিদা। তবে এখন স্কুল শুরু আর ছুটির সময় বাচ্চা ওঠানো নামানোর জন্য তিন মিনিটের ফ্রি পার্কিং দিয়েছে পুলিশ। ফলে সকালে, দুপুরে আর বিকেলে তিনবার করে ডবল লাইনে গাড়ি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

কলকাতায় বিভিন্ন রাস্তায় গাড়ি পার্কিং বাবদ কলকাতা পৌরনিগম যে কর আদায় করে তার বরাত পায় সুজিতের কোম্পানির মত কিছু সংস্থা। তারাই নিয়োগ করেছে সুজিতকে। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ডিউটি। গলায় পস মেশিন নিয়ে রাস্তার দিকে নজর রাখা। গাড়ি পার্কিং করলে পস মেশিনে গাড়ি নম্বর দিয়ে টিকিট ধরানো। তারপর গাড়ি বেরোনোর সময় আবার টিকিট। এবারে যন্ত্রই জানিয়ে দেয়, কতটাকা আদায় করতে হবে। টাকা নিয়ে ব্যাগে রাখা, রাত্রে অফিসে ফিরে টাকা আর পস মেশিন জমা দিয়ে বাড়ি ফেরা।

ওদের কোম্পানির বরাতে কর্পোরেশনের গোটা কুড়ি রাস্তার পার্কিংয়ের দায়িত্ব। অ্যান্ডারসন স্ট্রিটের ভাগে তিনজন, সবার কুড়িটা করে গাড়ি। সুজিতের থেকে একটু দূরে থাকে শোভনদা। তার পোর্শানে আবার কিছু মোটরসাইকেল-বাইকও রাখা যায়। বাইক রাখা অনেক ঝামেলার, বলে শোভনদা। এক মুহুর্ত আড়াল হলেই বাইক চালিয়ে ধাঁ। টাকাটা কাটা যায়‌ শোভনের থেকেই। ওই কটা টাকা থেকে কাটলে কি বা হাতে থাকে।

সুজিত সেই জন্য সতর্ক থাকে। সকাল আটটায় পেড পার্কিং শুরু। সেইসময় এই অ্যান্ডারসন স্ট্রিট ফাঁকাই থাকে। তার একটু পর থেকেই স্কুলের গাড়ি গুলো আসতে থাকে। অনেক গাড়িই বাচ্চার স্কুলের ছুটি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দুপুরের একলট গাড়ি আর শেষে বিকেল হতেই এসি মার্কেটের ভিড়। পাশের একটা হাউজিংয়ের গেট বন্ধ হয়ে যায় গাড়ির চাপে। এই নিয়ে রোজই সুজিতের সঙ্গে হাউজিংয়ের দারোয়ানের ঝামেলা হয়।

আসলে সুজিত দেখেছে যদি ছোট ছোট গাড়ি আসে আর একটু চেপে চেপে রাখা যায় তাহলে একুশটা গাড়ি ধরিয়ে দেওয়া যায়। মুশকিল করে হাউজিংয়ের গেটটা। একদম সামনের গাড়ির বনেটটা গেটের সামনে চলে আসে, সেই নিয়ে দারোয়ান ঝামেলা করে। তাও একটা গাড়ির পয়সা কম না ওর কাছে।

সজলদার কাছে শুনেছে নর্থের দিকে নাকি খুব ভালো সিস্টেম। ওর ডিউটি কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের সামনে। ওখানে এখনও পুরনো পদ্ধতিতেই কাজ চলে। পস মেশিন আসেনি। ফলে দুটো গাড়ি দুঘন্টা দাঁড়ালে সেটাকে একটা গাড়ি একঘন্টা করে দেখাতে কোনো অসুবিধা নেই। ওখানে আবার আড়াআড়ি ভাবে গাড়ি রাখা যায়, ফলে সারাদিনে যা গাড়ি পার্কিং করে তার থেকে বেশি কিছুটা কম করে দেখানোর সুব্যবস্থা করা আছে।

সজলদা একা নয়, এই চক্র নাকি অনেকদূর পর্যন্ত। তবে ওদের সুদিনও ফুরোলো কারণ পুজোর পরেই ওদিকেও মেশিন বসে যাবে। ফলে গাড়ির সংখ্যা আর সময়ে ঘাপলা করার কোনো সুযোগ থাকবে না। পুজোর পরে সুজয়ের কদিন খারাপ সিজন যায়, স্কুল ছুটি থাকে, এসি মার্কেটে লোকও কম আসে। তাই পুজোর আগেই যতটা ভালো কালেকশন করে দেওয়া যায়। তাহলে মালিক বোনাসটা একটু বাড়াতে পারে।

পুজোয় এচত্বরে কোনো হেলদোল নেই, রবিবারের মত ছুটির দিনের মেজাজ। তবে ওদের কোম্পানির যারা গড়িয়াহাট কিংবা কসবা সাইডে কাজ করে তাদের ওই সময় পোয়াবারো। সারা রাত পার্কিং খোলা আর পুরোটাই কাঁচা পয়সা। সুজয়ও দু-একদিন যায়, যেদিন ওর গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে বেরোনোর থাকে না।

এবারের পুজোর বোনাসের টাকাটা পেয়ে গেলে বাড়িতে যা দেওয়ার দিয়ে গার্লফ্রেন্ডকে কী কিনে দেবে ভাবছিল, বসে বসে। চিৎকারে চমক ভাঙল, দারোয়ানটা লাঠি নিয়ে এসেছে, ওদিকে শোভনদা চিৎকার করছে, একটা গাড়ি লাইন ভেঙে পাশের হাউজিংয়ের গাড়িতে ঠুকে দিয়েছে। পার্কিং ফী না দেওয়ার তালে ছিল। শোভনদা খেয়াল না করলে বেরিয়ে যেত। এত হইচইয়ের মধ্যে সামনের মোড় থেকে পুলিশ এসে যায়, নাটক দেখতে ভিড়ও জমে। সুজয় চিন্তা ছেড়ে বাস্তবে ফিরে আসে…

সুজয়ের পুজোর আগের গপপো এখানেই শেষ, অন্য একদিন আবার অন্য কারও পুজোর আগের গপপো নিয়ে ফিরে আসব…

Keep reading

More >