পুজোর আগের গপপো ৩

সৃজার মা চিৎকার করছিল, “আর বাদে কাল পরীক্ষা এখনও এই ক’টা পড়া তৈরি হল না। আজ তোর বাবা আসুক তারপর …

সৃজার মা চিৎকার করছিল, “আর বাদে কাল পরীক্ষা এখনও এই ক’টা পড়া তৈরি হল না। আজ তোর বাবা আসুক তারপর তোর একদিন কি আমার একদিন।” সৃজা চুপ করেছিল, তার ছোট বয়সের অভিজ্ঞতাই শিখিয়েছে চুপ করে থাকাই শ্রেয়।

সৃজা পড়ে সেন্ট অ্যাড্রিয়েলস স্কুলে ক্লাস থ্রিতে। সামনের চব্বিশ তারিখ থেকে তার টার্মিনাল পরীক্ষা শুরু হবে যা শেষ হবে চতুর্থীর দিন। পঞ্চমী থেকে পুজোর ছুটি পড়বে। গত ইউনিট পরীক্ষায় মায়ের আশানুরূপ ফল না হওয়ায় মা উঠেপড়ে লেগেছেন টার্মিনালে যাতে ভালো হয়।

ইউনিট থেকে টার্মিনাল পরীক্ষার সময়ের ব্যবধান খুব কম। এদিকে সিলেবাস পাহাড়প্রমাণ। শেষ মুহূর্তে এসে সব বিষয়ে মক টেস্ট, প্রোজেক্ট আর প্র্যাকটিক্যাল। তার মধ্যে সৃজা গান নাচ আর আঁকা শেখে। সুইমিংও, যদিও সেপ্টেম্বর মাস পড়েছে বলে সুইমিং এখন বন্ধ। সব মিলিয়ে সৃজার নাজেহাল অবস্থা।

সৃজার ঠাকুরদা মাঝে মাঝে সৃজার মাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যদিও তাতে ফল কিছু হয়না। ঠাকুরদা সৃজাকে বাংলা গল্প শোনান তাতেও মায়ের প্রচণ্ড আপত্তি। এত পড়ার মাঝে এটুকুই আনন্দ সৃজার। ঠাকুরদার গল্প শুনতে শুনতে সৃজা সেই কল্পনার দুনিয়ায় হারিয়ে যায়।

এই তো সেদিন ইংলিশ টিউটর মাকে খুব করে অভিযোগ করলেন। সৃজা লিখে এসেছে মাই ফাদার ইজ এ ইঞ্জিনিয়ার। মা খুব বকুনি দিল সৃজাকে। এতবড় মেয়ে এখনও এ আর অ্যানের পার্থক্য জানে না। সৃজা ভাবে কী কঠিন এই ইংলিশ। আচ্ছা ইঞ্জিনিয়ার বোঝা গেলেই তো হল, স্যার কী বোঝেন না?

দাদুর কাছে শোনা পরীর গল্প মাথায় ঘুরতে থাকে। তাইতো অন্য সাবজেক্ট গুলো ভুল হয়ে যায়। ওদিকে পুজো এসে গেল, স্কুলে কত্ত গল্প। মনিষীতার ছটা ড্রেস হয়েছে। বৃন্দারা পুজোয় ফুকেট বেড়াতে যাচ্ছে। সম্প্রীতিরা যাবে মলদ্বীপ। সৃজারা কোথাও যাচ্ছে না, বাবার ছুটি নেই। একটাও ড্রেস কিনে দেয়নি মা, বলেছে পরীক্ষার পরে কিনে দেবে।

দাদু অবশ্য অনেককটা পুজোসংখ্যা কিনে রেখেছে ওর জন্য। দাদু পড়ে শোনান আর সৃজা ছবি দেখে। কমিকস আর কার্টুন। কিন্তু মা দাদুকে থ্রেট দিয়ে রেখেছে টার্মিনাল পরীক্ষার আগে নো গল্পের বই। নাচ আর গানের রিহার্সাল চলছে যদিও সেদিকে একটুও মন নেই সৃজার। মা জোর করে বলে শিখতে যাওয়া।

কাল কম্পিউটার প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। মা কম্পিউটার সেন্টারে নিয়ে গিয়ে দুঘন্টা বসিয়ে রেখেছিল। ধর্ণা দেওয়া যাকে বলে। সৃজার ব্রেন ফেড হয়ে গেছিল। সোজা সোজা লোগোর প্রোগ্রাম ভুল করছিল। কম্পিউটার ম্যাম অনেক চেষ্টা করেও ঠিক করাতে পারছিলেন না। মা পিছন থেকে এটা কর ওটা কর বলছিল। শেষে কম্পিউটার ম্যাম মাকে বললেন বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করতে। তারপর খুব শান্ত ভাবে সৃজাকে সব কটা প্রোগ্রাম দেখিয়ে দিলেন।

ম্যামের ভরসা পেয়ে ঠিকঠাক সবকটা প্রোগ্রাম না দেখে করে ফেলল। কনফিডেন্স লেভেলটা বেড়ে গেছে সৃজার। ম্যাম বলেছেন সৃজা, আমি জানি তুমি পারবে, স্কুলের ল্যাবে মাথা ঠান্ডা রেখে প্রোগ্রাম গুলো করবে। তুমি ফুল মার্কস ডিজার্ভ কর। মায়ের হাত ধরে উড়তে উড়তে বাড়ি ফিরল সৃজা। কম্পিউটার ম্যাম মাকেও খুব বকুনি দিয়েছে এত বেশি বেশি চাপ দেওয়ার জন্য।

রাত্রে সৃজা স্বপ্ন দেখল সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। উঠতে উঠতে সিঁড়িটা হয়ে গেল লোগোর প্যাটার্ন। তারপরে স্ক্রীন থেকে পরপর লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক আর গণেশ বেরিয়ে এল। গণেশ ঠাকুরের হাতে একটা কর্নেটো আইসক্রিম। সৃজার খুব লোভ লাগছিল, এর মধ্যে সরস্বতী বলে উঠলো, “সৃজা তুমি ‌খুব ভালো পরীক্ষা দেবে। পরীক্ষার পরেই আমরা আসছি। একসঙ্গে আইসক্রিম খাব।”

ঘুম ভেঙে গেল সৃজার, আজকেই কম্পিউটার পরীক্ষা। আর কোনো ভয় নেই, সরস্বতী ঠাকুরের আশীর্বাদ তার সঙ্গে। ভাল করে পরীক্ষাগুলো দিতে হবে। মনের মধ্যে ড্যামকুড়াকুড় ঢাক বাজতে থাকে। পুজো এল বলে।

সৃজার পুজোর আগের গপপো এখানেই শেষ, অন্য একদিন আবার অন্য কারও পুজোর আগের গপপো নিয়ে ফিরে আসব…

Keep reading

More >