পুজোর আগের গপপো ৪

পুজোর আগের গপপো ৪ সরমার মন ভালো নেই। এবারে অর্ডার কম। আশেপাশে নতুন নতুন দোকান হয়ে গেছে। সবাই যে যার …

পুজোর আগের গপপো ৪

সরমার মন ভালো নেই। এবারে অর্ডার কম। আশেপাশে নতুন নতুন দোকান হয়ে গেছে। সবাই যে যার এলাকার দোকান থেকে ব্লাউজ বানিয়ে নিচ্ছে। বারাসত বাজারের সবথেকে বড় আর পুরনো লেডিস টেলার্স শ্রীলক্ষ্মী লেডিস টেলার্সের একজন মাস্টার ব্লাউজ মেকার সরমা। কবে থেকে সে যে এই দোকানে কাজ করছে তা আর মনে করতে পারেনা।

সে প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। সরমাদের দুই ভাই তিন বোনের সংসার। বাবার স্বল্প আয়ে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। ভাই দুটো বেকার, কাজকর্ম করার কোনো ইচ্ছে নেই। মেজোবোনটা দেখতে ভালো ছিল একবার দেখাতেই পছন্দ হয়ে গেল, ছেলের বাড়ি কিছু না নিলেও বিয়ে দিতে বেশ কিছু দেনা হয়ে গেছিল। পাওনাদার বারবার টাকা চেয়ে বাবাকে বিব্রত করছে।

এই অবস্থায় এগিয়ে এসেছিল সরমার বড়মাসি। বারাসতে শ্রীলক্ষ্মী লেডিস টেলার্সের মালিক ঠিক তাদের পাশের বাড়িতেই থাকতেন। থাকতেন কেন, এখনও থাকেন। সরমাদের ওই অবস্থায় মাসি গিয়ে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলে সরমাকে টেলারিংএর কাজে ঢুকিয়ে দেন। সরমারও সেলাই ফোঁড়াইতে আগ্রহ ছিল, কাজ শিখে নিতে দেরি হয়নি।

ধীরে ধীরে এই তিরিশ বছরে বাবার দেনা শোধ করেছে, বোনের বিয়ে দিয়েছে। বাবা অবশ্য বেশিদিন বাঁচেননি, ক্যান্সার ধরা পড়ে আর তিনমাসের মধ্যে সব শেষ। ভাইরা ছোট খাটো কাজ করতে শুরু করতেই সংসার আলাদা করে দিয়েছিল। এখন মা আর মেয়ের ছোট সংসার। মেজবোনের বড়ছেলেটাকে সরমাই মানুষ করেছে ছবছর বয়স থেকে। সেই সময় মেজবোনের ছোট ছেলে হল আর বড় ছেলেটা সরমার কাছে বড় হল।

সরমার ধারণা অনুযায়ী নতুন নতুন ডিজাইনের কাজ করে। মালিকও আরো কয়েকজন কারিগর রেখেছে। কিন্তু একদিকে রেডিমেড গার্মেন্টসের ফিটিংস অন্যদিকে পাড়ায় পাড়ায় দোকান ওদের ব্যবসা অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। তবে বেশ কিছু মহিলা ওদের থেকেই বানান। তাঁদের আর অন্য কারো বানানো পোশাক ফিট করে না।

কাল মালিক বলছিল কবে অর্ডার ক্লোজড বোর্ড লাগাতে হবে। যা কাজ আছে উঠে যাবে কিনা। গতকাল আর আজ মিলিয়ে অনেকগুলো অর্ডার এসেছে। মাসের প্রথমদিকে লোকজনের হাতে টাকাও থাকে। গত দুদিনের মত বাকি দিনগুলো গেলে ভালোই যাবে। অর্ডার ক্লোজড বোর্ড লাগানোর পর দু-চারটে অর্ডার আসে বেশি পয়সার কাজ।

রোজ ট্রেনে যাতায়াত করতে করতে বেশ কিছু নিত্যযাত্রী মহিলার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সরমার। তাদের থেকে সারাবছরই ব্লাউজ সালোয়ার থেকে নিদেনপক্ষে ফলস পাড় লাগানো আর পিকো করার কাজ পায়। রাতে বাড়িতে বসে সেলাই করে সকালে আবার ট্রেনেই ডেলিভারি করে দেয়। বেশিরভাগই স্কুলের শিক্ষিকা, তাঁরা প্রচুর পোশাক বানান আর এই টাকাটা হাতে হাতে পেয়ে যায় সরমা। এতে মালিকের কোনো ভাগ নেই। সংসারে সুসার হয় এটুকু তিল তিল করে জমিয়ে।

পুজো আসতে আর দিন সাতেক। ট্রেনের দিদিমনিদের যা বানানোর মোটা শেষ। দুএকজন আবার শেষ মুহূর্তে হাতে ধরিয়ে দেন। চতুর্থী পর্যন্ত স্কুল খোলা তাঁদের। টেলার্সের দোকান খোলা সেই সপ্তমী পর্যন্ত। দুর্গাপুজোয় বারাসতে তেমন হইচই না থাকলেও কালীপুজোয় প্রচণ্ড রমরমা। ফলে পুজোর পরেও আর একপ্রস্থ অর্ডার আসে।

সামনে দুর্গাপুজো আর তারপরে কালীপুজোর আসন্ন সুদিনের আশা করতে করতে অন্যদিনের মত তৈরি হয়ে বারাসতের উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য ট্রেন ধরতে এগোয় সরমা। সরমার পুজোর আগের গপপো এখানেই শেষ, অন্য একদিন আবার অন্য কারও পুজোর আগের গপপো নিয়ে ফিরে আসব…

Keep reading

More >