“বাসনার সেরা বাসা রসনায়”

প্রথমেই বলে রাখা ভালো – স্বচ্ছল পরিবার, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের খাওয়াটা একটু ভিন্ন রকমের ছিল । আর্থিক সঙ্গতি এর …

প্রথমেই বলে রাখা ভালো – স্বচ্ছল পরিবার, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের খাওয়াটা একটু ভিন্ন রকমের ছিল ।

আর্থিক সঙ্গতি এর প্রধান কারণ । মোটামুটি ভাবে দেশ বিভাগের আগে ওপার বাংলাতেও একই খাবার চলত, দিনে এবং রাতে ।

আর্থিক সঙ্গতির সাথে তাল রেখে তৈরি হত তালিকা ।

তার ওপর ছিল জাত পাত । ভাত না খেলে হবে না বাঙালি । আর মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসির পর খোদ কলকাতায় বিধান ছিল – যে এখানে ভাত খাওয়া যাবে না ।

কারণ – নন্দকুমার ছিলেন মুর্শিদাবাদী ব্রাহ্মণ ।

কালে কালে লোক সব ভুলে যায় । তাই ধীরে ধীরে প্রথাটা যায় উবে ।

তবে উচ্চবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবার দামী আতপ চাল খেতেন ।

সেদ্ধ চাল কার না কার হাতে সেদ্ধ করা কে জানে? “জাত” চলে যেতে পারে !

ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা নয় তবে সেটা হাতে গোণা ।

তো, যাই হোক “রজতগিরিনভং” ( রূপোর পাহাড়ের মত ) ভাতের চূড়ায় আগ্নেয়গিরির মত একটা ফুটো করে নিতেন খাদক, তাতে দেওয়া হত – এক পলা ঘি ।
সঙ্গে থাকত নুন, ঝিরিঝিরি আলু ভাজা আর কাঁচা লঙ্কা ।
এরপর সাধারণত আসতো – শুক্তো বা পাঁচমিশেলি তরকারি ।
ডাল আসতো তার পর, তবে মুশুর নয় । না না, প্রোটিন ফোটিন ওসব বাজে কথা ।

নন্দকুমারের মত এখানেও একটা বাধা ছিল ।
কারণটা, ধর্মীয়। প্রোটিনের সাথে কোন সম্পর্ক নেই।
আগে ইতিহাসটা জানাই, না হলে পরিস্কার হবে না বিষয়টা।
রাজীব লোচন রায় – এই নামটা বললে, অধিকাংশই চিনবেন না । কিন্তু যদি বলি- কালাপাহাড় । হাজার থেকে লক্ষ বার চিনবেন সবাই ।

কিন্তু প্রশ্ন – রাজীব লোচন রায় কি করে কালাপাহাড় হলেন ? সে অনেক কথা । গোঁড়ারা বলবেন – জোর করে এনার ধর্মন্তকরণ হয়েছিল । সত্যি নয় একেবারেই ।

এবারে রাজীব লোচন রায় কে ?

ইনি ব্রাহ্মণ ছিলেন, তবে কেউ বলেন উত্তর বঙ্গের বা কেউ বলেন পাণ্ডুয়ার ( বর্তমান হুগলি জেলায় ) ।

রায়, ইসলাম ধর্মীদের দেওয়া উপাধি – যাদের অস্থাবর সম্পত্তি প্রচুর থাকতো । চৌধুরী – যাদের স্থাবর সম্পত্তি প্রচুর । আর রায়চৌধুরী – যাদের এই দুটোই থাকতো ।

বিশেষ কিছু জানা না গেলেও ইনি ভালো যুদ্ধ শিখেছিলেন এটা কিন্তু সত্যি ।
ফলে, নজরে পড়লেন – গৌড়ের শাসক সুলেমান কারনানীর ।

বাংলা ও বিহারের শাসনকর্তা সুলেইমান কারনানী (কেউ আবার বলেন কারারানী) । সুলেমান কারনানী নামটা সিন্ধী হলেও, ইনি ছিলেন আফগান।

রাজীব লোচন রায়ের কর্মজীবন শুরু কিভাবে হয়েছিল সেকথা ইতিহাসে পাওয়া যায় না। পরে গৌড়ের সেনানীতে যোগ দিয়ে, সৈন্য পরিচালনা ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা দেখান ।

ব্যক্তিগত যোগ্যতায় তিনি সুলাইমানের শাসনামলে গৌড়ের ফৌজদারের পদ লাভ করেন। এভাবে তিনি সুলাইমানের কাছাকাছি আসার সুযোগ পান এবং তার কন্যার প্রেমে পড়েন। রাজীব লোচন রায় সুলাইমানের কন্যার পাণিপ্রার্থী হলে সুলাইমান তাকে ধর্মান্তরিত হবার শর্ত দেন।

কারো কারো মতে রাজীব লোচন রায়ের যুদ্ধ দক্ষতা দেখে সুলাইমান নিজেই তার নিকট নিজের কন্যার বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। উচ্চাভিলাষী রাজীব লোচন রায় সুলাইমানের প্রস্তাব গ্রহন করেন এবং ধর্মান্তরিত হয়ে সুলাইমানের কন্যাকে বিয়ে করেন।

নাম হয় – মহম্মদ ফর্ম্মুলি । তিনি স্বধর্মে ফিরে আসার চেষ্টা করলেও ব্রাহ্মণরা বাধা দেন ।

তাই মন্দির ভাঙতে শুরু করেন ।
এই কালাপাহাড়ের প্রিয় খাদ্য ছিল –মুশুর ডাল । এই ডাল, তুর্ক সেনারা খেত।

কালাপাহাড় এই ডাল খেতো বলে, পরে ব্রাহ্মণরা এই ডালের ওপর ফরমান জারী করে খাওয়া নিষিদ্ধ করে । ফলে, বিধবারাও খেতেন না ।

হলুদও নিষিদ্ধ হয়

হলুদটা পরে চালু হলেও-মুশুর ডালকে আমিষ হিসেবে গণ্য করা হয় এখনও ।

মুশুর ডাল বাদে, অন্য সব ডাল হত । বিউলি/ মাষকলাইয়ের ডাল, অড়হড় ডাল- হিং দিয়ে, সোনামুগের ডাল, ছোলার ডাল এই গুলোই মুখ্যত রাঁধা হতো এবং পাতে আসতো ।

থালা, বাটি এবং গ্লাস সবই কাঁসার ।বাটি করেই সব খাবার আসত ।

চিনে মাটির প্লেট যে ছিল না এমনটা নয়, তবে খুব কম লোক খেতেন ।

হ্যাঁ ! মাটিতে আসন/পিঁড়ি পেতে বসেই । চিনে মাটির প্লেটে খেতেন সাহেবী মনোভাবাপন্ন লোকেরা ।

টক বা অম্বল খেতে হলে পাথরের থালায় খাওয়া হত ।
কাঁসার থালায় লেবু রস খাওয়া হত না । আজকাল অবশ্য স্টিলের থালা আর চিনে মাটির প্লেট প্রচুর ব্যবহার হওয়াতে এই সমস্যাটা আর নেই ।

আজকাল রবিবারে মাংস খাওয়ার চল – সেটা কিন্তু তখন ছিল না ।

মঙ্গল – শনি বাদ ছিল আমিষ খাবার জন্য । কেউ কেউ আবার বৃহস্পতিবার টাও বাদ দিতেন আমিষ খাবার জন্য ।

বৈষ্ণব বাউনরা মাছ যাতে খেতে পারেন- তার জন্য নীচের বিধান এলোঃ-

ইল্লিশ, খল্লিস, ভেটকী, মদগুর এব চ।
রোহিত রাজেন্দ্র, পঞ্চমৎস্যা নিরামিষাঃ।।

অস্যার্থঃ- ইলিশ, খলসে, ভেটকী, মাগুর এবং রুই- এই পাঁচরকম মাছ নিরামিষ। খেলে দোষ নেই!

সাথে, আরও জুড়ে দিলেন:- কাঁচকলা দিয়ে রান্না করলে, সব রকম মাছই খাওয়া যায়!

“আমরম্ভা সমাযুক্তা সর্বমৎস্যা নিরামিষাঃ”
বুঝুন! কি বিধানদার ঠাকুরমশাই! সব ভালো ভালো মাছগুলোকেই নিরামিষ বলে চালিয়ে দিলেন!!

বাঙালি মানেই মাছ আর তারপরেই মাছে ভাতে বাঙালি – এই শব্দ বন্ধটি একেবারে বাঙালির সাথে সমার্থক ।

আলী সায়েবের সেই অমোঘ উক্তি –

কেচিদ্ বদন্তি অমৃতোঽস্তি সুরালয়েষু
কেচিদ্ বদন্তি বনিতাধরপল্লবেষু
ব্রুমো বয়ং সকল শাস্ত্র বিচারদক্ষা
জম্বীরনীরপূরিত ভর্জিত মৎসখণ্ডে ।

আহা- হা ! কেউ কেউ বলেন- অমৃত আছে সুরালয়ে। ( এখানে, সুরালয়ে- শব্দটার দুটো মানে আছে।সন্ধির খেলা আর কি! প্রথমটা পড়তে হবে- সুর+ আলয়= দেবতার মন্দির। দ্বিতীয়টা- সুরা+ আলয়= ভাঁটিখানা)
কেউ কেউ বলেন, না অমৃত বনিতার অধরপল্লবে ।

আর আমরা, আসলে “আমি” এখানে সম্মানার্থে বহুবচন আমরা, কারণ আমি সকল শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছি- সকল শাস্ত্র বিচার দক্ষা – আমরা বলি, জম্বীর নীর পূরিত – অর্থাৎ নেবু, জম্বীর, জামির- সিলেটিতে- নেবু, নেবুর রসে পূরিত মানে ভর্তি মৎসখণ্ডে ।

আলী সায়েব নিশ্চিত ছিলেন – এটা কোনো এক বাঙালি পণ্ডিতের লেখা !আমার তো মনে হয়,সংস্কৃত দক্ষ আলী সায়েব নিজে সিলেটি (করিমগঞ্জ)ছিলেন বলে নিজেই এই শ্লোকটি রচনা করেছিলেন কিনা!

তা যাই হোক, তারপরেই আসত মাছ । জিরে বাটা, কালোজিরে পাঁচফোড়ন দিয়ে রান্না , সঙ্গে মূলত বেগুন।
(চলবে)

তথ্যসূত্র :- নিজের অভিজ্ঞতা, অনেক বই , অবশ্য আমি সেগুলোই নিয়েছি, যাতে কমন আছে অনেক ।

Keep reading

More >

Site hosting cheap