প্রাণের মাঝে আয়

এক এক দিন ঘুম ভাঙতেই মনে হয় যেন মেঘ করে এল। অনেক দূর থেকে একটা শিরশিরানি হাওয়া আসে,আমি বারান্দায় এসে …

এক এক দিন ঘুম ভাঙতেই মনে হয় যেন মেঘ করে এল। অনেক দূর থেকে একটা শিরশিরানি হাওয়া আসে,আমি বারান্দায় এসে দাঁড়াই।খুব শীত শীত লাগে,আর ঠিক তক্ষুণি তোরই মত আদেখলা, বেয়াদপ তোর ভাবনারা এসে ভিড় করে। তাই বলে আবার ভেবে নিস না যে তোর কথা ভেবে ভেবে, ‘‘আমার দিন কাটে না, আমার রাত কাটে না..স্মৃতিগুলো কিছুতেই..’’। তোকে তো ভুলেই গেছি আমি।এই তো দেখনা, দিব্যি আছি- এক্কেবারে ক্যালেন্ডারের ছবির মতো ঝকঝকে, তকতকে, পালিশ করা পাট পাট বেনারসী শাড়ি যেমন। তোর মত একটা ক্যাবলা, উড়নচন্ডী,একটা বিশ্ব আকাট এর কথা এর মধ্যে মনে আনার কোন কারণই নেই আমার। কিন্তু তবু,তবু কেন বলতো…

উফ্ ,কি অসহ্য টাইপের ছিলি! বোকার মত হ্যা হ্যা করতিস! উজবুকের মত বেফাঁস কথা বলে কতবার কত জায়গায় বিপাকে পড়েছিস! আমি না বাঁচালে কে দেখতো রে তোকে? বড্ড জ্বালাতিস, বিরক্ত করে মারতিস।

(অবশ্য নাহ্ , শুধুই বিরক্ত করতিস বললে আমার সেই মেয়েবেলার অনেকটাই যে ফাঁকা হয়ে যাবে রে।দিনগুলো খুব একটা মন্দ ছিলো না, বল?)

আমাকে সাইকেল চালানো শিখিয়েছিলি বদলে সেইকদিন তোকে রোজ ট্রান্সলেশন করে দিতে হতো। আর তারপর শিখে যাওয়ার পর যেন ডানা গজিয়ে গেলো( মা বলতো,লেজ )কি হুটোপাটি! মনে আছে একবার জ্বর হয়ে ঝিমলি অনেকদিন পড়তে আসছিলো না, আমরা ঠিক করেছিলাম ওর বাড়ি যাবো। সেইই রথতলা, কিস্যু চিনি না। শীতের বেলা, রাস্তা ভুল করে ঘুরে টুরে তারপর বাড়ি ফিরলাম, সাতটা। তারপর মা’র বকুনি , মানে যাকে বলে রামবকুনি!
টকীজ-এর সামনে সেই একজনের কাছ থেকে আলুকাবলি কিনতাম না? তার অদ্ভুত আকৃতির অ্যালুমিনিয়ামের মগটার কথা মনে আছে তোর? লোকটা অবিকল একই রকম আছে জানিস? অনেকদিন পর গেছিলাম, মনে করতে পারলো না ঠিক।

অতীশ স্যারের সেই বাঁহাতে কিডনী আঁকা মনে আছে? স্যার এখন মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন। দেখা হতে ঠিক সেই আগের মতই বললেন, “কি র‌্যাআ..”।তোকে বাছা বাছা নামে ডাকতেন স্যার, তোর মনে আছে কী জানি না, আমার কিন্তু মনে আছে।

সব মনে আছে, একবার বৃষ্টি ভিজে কতদূর থেকে কৃষ্ণচূড়া এনে দিয়েছিলি…

দক্ষিণপাড়ার মোড়ের ওই আচারওয়ালী দিদার কাছ থেকে চালতামাখা, কুলের আচার কিছু কম খাওয়াসনি, কিচ্ছু ভুলিনি। তাই বলে ওইটাও ভুলে যাস না যে আমি তোর প্র্যাক্টিকাল খাতা বানিয়ে দিতাম, ওয়ার্ক এডুকেশনের কাজ করে দিতাম, জ্যামিতির একস্ট্রা করে দিতাম কত।কোনো কারণে মনখারাপ হলে আমাকে হাসানোর জন্য কত আজগুবি গল্প বলতিস। ওগুলো শুনে আরো পিত্তিজ্বলে যেত কিন্তু,কতকিছু বলতাম- ক্যাবলার মত হাসতিস শুধু।

H.S.এর আগে সেই দুপুরবেলা।একসাথে পড়া চারজনে মিলে, যত না পড়া আড্ডা, হাহা হিহি আর মারামারি। খুব মনে আছে আমার, ফেব্রুয়ারীর শেষ দিক ছিলো পড়তে পড়তে ভাল্লাগছে না, ধুসস্ বলে সাইকেল নিয়ে বেরোলাম। হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছিলাম, দুপাশে আমগাছে ভর্তি বোল আর কি জমাট গন্ধ তার! রাস্তা থেকে নেমে মাঠের আল ধরে কায়দা করে সাইকেল চালাতে গিয়ে তপু পড়লো ডোবায়। পিঙ্কু আর তুই তো খ্যাক খ্যাক করে হেসেই অস্থির।আমি ই তুললাম বেচারাকে। তারপর সাইকেল শুইয়ে রেখে চুপ করে বসে অনেক দূরে মাঠের শেষে সূর্য ডুবতে দেখা। হঠাৎ খেয়াল হতে দেখি হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে বসে আছিস। কি পাগল ছিলি!

তারপর তো পরীক্ষা, পরীক্ষা। ওহ বাবা, কি দিন! H.S.এর পর তুই কতদিন মামার বাড়ি না কোথায় যেন গেলি ঘুরতে। ফিরে এসে আমাকে শুনালি, কোন মেয়ে তোর দিকে কেমন করে তাকিয়েছে। শুনবো না বলাতে বললি,”এত দেমাক কিসের রে তোর?” দেমাক তো দেমাক, যা, তোর কী?

(“মিস করেছি তোকে” এটা তখন আমরা বলতে পারতাম না যে। রাগ ছাড়া আর কী হবে বল?)

এরপর তো আরো হইহই, রেজাল্ট, অ্যাডমিশন। তোরা চললি খড়গপুর,পায় কে তোদের! অনেকদিন পর পুজোর সময় দেখা। কি আশ্চর্য্য, আগের মতো তোকে দেখেই ঝগড়া করতে ইচ্ছে করলো না কিন্তু এবার! কত গল্প – তোদের নেহরু হল, হাই ফান্ডা প্রফ, মেয়ে ক্লাশমেট , কলেজ ফেস্ট,কত্ত কিছু। আমিও বললাম, আমার ডেইলি প্যাসেঞ্জারি, কলেজ, কলেজের বারান্দা থেকে সামনে গঙ্গায় বান আসা দেখা, BKC স্যার আর ত্রিদিব। এক ত্রিদিবকে নিয়েই তখন একহাজার গল্প। সব শুনলি, তারপর তোর সেই মার্কামারা খ্যাক খ্যাক হাসিটা হেসে বললি, “তোর দ্বারা ভালোবাসা হবে নাকি? তুই ভালোবাসা বুঝিস?”

সেই তোর সাথে শেষ দেখা। প্রচন্ড রাগে তোর নাম মুখেও আনবো না ঠিক করেছিলাম। দেখা আর হলোও না তো দেখ।

আজ তো দুজন দুইপ্রান্তে। তোকে কি ভুলেছি? সত্যিই ভুলেছি? কি জানি! স্বীকার করি, আনন্দের মুহূর্তে মনে না পড়লেও, মন ভার করে বসে থাকার সময়গুলোতে সদ্য গোঁফওঠা একটা ক্যাবলা ছেলের ততোধিক ক্যাবলামি মনে পড়েছে বৈকি,খুব পড়েছে। আজ বলতে পারি, মিস্ করেছি, সত্যি সত্যি। সেদিন বড্ড লেগেছিলো না রে? আঙ্গুলের দাগ বসে গেছিলো। লেগেছে তো লেগেছে.. বেশ করেছি। ভালোবাসা আমি বুঝি না, তুই কত বুঝতিস যেন?! তোর ওই জ্বালাতন, পাগলামি, বোকামি দিনের পর দিন সহ্য করেছি কেন, বুঝতিস তুই? যাক গে, তারপরেও কতদিন ভেবেছি মিটিয়ে নি তোর সাথে সবকিছু। পরেই আবার ভেবেছি, কেন তুই কে এমন হরিদাস পাল, তুই মেটাবি না কেন?

আমার কথা ভাবিস তুই? এখন তো শুনি তুই বড্ড কেজো মানুষ ( ভাবলে আমার যা হাসি পায় না , কি বলব!) সাত সমুদ্দুরপারে তোর দেশে যখন মনখারাপের মেঘ আসে, আমার কথা মনে পড়ে তোর?

আচ্ছা আবার যদি আগের মতো হয়ে যাই আমরা! আগের মত পিছন থেকে এসে চুল ধরে টানবি আবার? “আঙ্গুলগুলো টেনে দে তো” বললে অতটা জোরে আর চিমটি কাটবো না দেখিস, কথা দিচ্ছি।

আবার কৃষ্ণচূড়া এনে দিবি তো?

 

Keep reading

More >