বচন ফকিরের কলকে

লোটাকম্বলে  বচন ফকিরের কলকে নাম দিয়ে একটা সিরিজ শুরু করেছিলাম, একটা দুটো লেখার পরই কম্বল গোটাই। পরে ফেসবুকে সিরিজটা চালাচ্ছি। …

লোটাকম্বলে  বচন ফকিরের কলকে নাম দিয়ে একটা সিরিজ শুরু করেছিলাম, একটা দুটো লেখার পরই কম্বল গোটাই। পরে ফেসবুকে সিরিজটা চালাচ্ছি। এখন অবধি যে কটা লিখেছি সব কটা লেখা কম্বলীদের জন্য ফের এগেন। আজ প্রথম দুটো কিস্তি। পরের টা আসছে রবিবার।

১।আমাজনের জঙ্গলে

৩৭ তম কোলকাতা বইমেলা শেষ।গিল্ডের নিজস্ব ওয়েবসাইট জানাচ্ছে বারো দিনে ১.৭ মিলিয়ন অর্থাৎ১৭ লক্ষ লোক বইমেলা ঘুরে গেছেন। দিনে ১লাখ চল্লিশ হাজারের কাছাকাছি। বই বিক্রী হয়েছে কুড়ি কোটি টাকার ।সংখ্যার হিসাবে ফিগারটা ফেলে দেওয়ার নয়। মেলায় আগত জনসংখ্যা এবং বই বিক্রির হিসাব দেখলে বোঝা যায় যে যতই চ্যাচাঁক বই পড়ার অভ্যাস চলে যাচ্ছে, ব্যাপারটা মোটেও তা নয়।

আমাদের মতো বুড়ো হাবড়া বই পাগলের জন্য মফস্বলেও আজকাল চমৎকার বইমেলা হয়। আমাদের দুর্গাপুরেই তো বছরে দু-দুবার বইমেলা হয়; রথ ও কল্পতরু মেলা উপলক্ষে।কোলকাতা বইমেলার সাইজ বা গ্রেস হয় না; কিন্তু দুধের বদলি পিটুলিগোলাও না। প্রচুর ভালো ভালো বই আসে এবং বিক্রিবাটা মন্দ হয় বলে মনে হয় না। জেলার বইমেলাগুলো যোগ করলে দর্শনার্থী ও বই বিক্রির রেশিওতে আরো লাখ তিনেক লোক আর কোটি চারেক টাকার বিক্রি ধরে নিন।

এতো গেল ছাপা বইয়ের ব্যাপার। এর পর রইল না-ছাপা ছায়া বই অর্থাৎ ই-বুক।

চল্লিশের দশকে এর প্রথম আবির্ভাব; আজ আজ ই-বুক বইয়ের জগতে নি:শব্দে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। ছাপা বইয়ের সঙ্গে ই-বুকের তফাত বিস্তর। ছাপা বইয়ের তুলনায় ই-বুকের দাম কম, রাখবার জন্যে টেবিল- আলমারি বেদখল কিংবা ‘জবরদং’ করে বাড়ির লোকের দাঁতখিঁচুনি সইতে হয় না। একখানা কম্পিউটার/ ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট কানেকশন থাকলেই ভুবনগ্রামের সাধারণ পাঠাগারের দরজা খোলা। আর একখানা ‘কিন্ডল’ কিম্বা ট্যাব-কম্পু থাকলে তো আপনি কে আর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রই বা কোনজনা! প্যান্টের হিপ পকেটে আস্তো একখান লাইব্রেরি হামেহাল অ্যাট হিজ/হার ম্যাজেস্টিস সার্ভিস। আর দাম? একখানা ছাপা বইয়ের দামে চারখানা ই বুক কিনতে পারা যায়।

ই-বুক সোজাপথে অর্থাৎ আমাজন ডট কম এবং তার তুতো ভাইবোনদের সাইটে গিয়ে যেমন অনলাইন বা ডাউনলোড করে পড়া যায়, ব্যাঁকাপথে পাইরেটেড এডিশন পাওয়াও তেমন সোজা। ইদানিংকার যেকজন ছেলে ছোকরার সঙ্গে আলাপ আছে, প্রত্যেকেই ই-বুকের মুরিদ।আর বচনের মতো তিনপুরুষের বনেদি বই-পাগলের তো কথাই নেই।

বিদেশে (এবং স্বদেশেও) ই-বুকের কদর দিনকে দিন বাড়ছে।আজকাল প্রায় সব খবরের কাগজ,ম্যাগাজিন এবং বইয়ের ই-এডিশন পাওয়া যাচ্ছে।এন-আর-আইদের কাছে তো বটেই, দেশের বইপোকাদের জন্যেও এ এক মহাভোজ।

কত লোক এই ই-বুকের পাঠক? সঠিক সংখ্যা বলা শিবের অসাধ্যি।

ধরে নিন আরো লাখ পাঁচেক ই-বুকের পাঠক/পাঠিকা গণেশের বাহনটির পিঠে সোয়ার হয়ে আমাজনের জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করছেন।

বনেদি বই-পাগলরা বলবেন ছাপা বইয়ের মোকাবিলা ই-বুক করতে পারে না। ছাপা বই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করার মধ্যে যে রোমাঞ্চ আছে তা ই-বুক কোনদিন দিতে পারে না।দুপুরবেলায় ভাতঘুমের অভ্যাস না থাকলে খেয়েদেয়ে একখানা বই বা পত্রিকা হাতে নিয়ে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে শুয়ে বই পড়ার মজা কিন্ডলে আসবে কেন? কথাখান একবারে ফেলে দেওয়ার না।

অনেকে আনকোরা বইয়ের গন্ধে পাগল। আমাদের বাল্য ও যৌবন কালে ক্যালকাটা বুক ফেয়ারই ছিল নতুন নতুন বই কেনার একমাত্র মওকা।বইমেলা উপলক্ষে নতুন বই বেরোত একগাদা;আর সেই মিলনমেলায় প্রাণভরে নতুন বই কিনতাম আর নাক ভর সে বইয়ের গন্ধ নিতাম। বললে বলবেন বচন ফকির সন্ধেবেলা গাঁজার ঝোঁকে ভুলভাল ছড়াচ্ছে ; ইউনিভারসিটির ছাত্র তখন। বইমেলায় এক স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন কেনা বইয়ের গন্ধ প্রাণভরে শুঁকছি, সুভাষ মুখোপাধ্যায় পাশ দিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। তারপর মুচকি হেসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।এক যুগেরও বেশি হয়ে গেছে,চোখ বুজলেই সে স্নেহস্পর্শ এখনো পাই।

চোখের ডাক্তাররা ছাপা বইয়ের পক্ষে। ছাপা বইয়ের রেজলিউশন নাকি অনেক বেশী। ছায়া বই চোখের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। বিদেশে ‘গ্লকোমা’ নামক রোগের বাড়াবাড়ির একটা বড়ো কারণ নাকি অতিরিক্ত ই -বুকের ব্যবহার।

অন্যদিকে পরিবেশবিদেরা তেড়ে আসছেন এই বলে ছাপা বই নাকি বনকে বন উজাড় করে দিচ্ছে। ওর চেয়ে ই-বুক অনেক বেশী পরিবেশ বান্ধব।

সিতুমিয়ার ভাষায় ফাটা বাঁশের মাঝখান। শ্যাম রাখি না কূল? ছাপা বই রাখি, নাকি ছায়া বই?

সেটার ফয়সালা মহাকালই করুক।আমরা বরং চোঁ করে আমাজনের জঙ্গলে আর এক পাক মেরে আসি।

বঁ ভোয়াজ।

১৫-০২-২০১৩।

২। আ মরি বাংলা ভাষা  

আরও একটা একুশে ফেব্রুয়ারি এল, এবং চলে গেল।নানা জায়গায় শহিদ দিবস উদযাপন হল।বক্তৃতা, গান, টেলিভিশনে টক- শো,সব নিয়ে নিখুঁত একখানা প্যাকেজ।দেখে ভাল লাগল বছরে অন্তত একবার হলেও দিনটা উদযাপিত হচ্ছে।
কিছু বিশ্বনিন্দুক অবশ্য বলে থাকেন নুনটা আর একটু বেশি হলেই সব বরবাদ হয়ে যেত। তাঁদেরই একজনের মতে ভাষা দিবস নাকি এখন মহালয়া কিম্বা শবেবরাতের মত বছরভর ভুলে থাকা লোকগুলোকে একটু তিলজল মোমবাতি ঠেকানোর আচারে পরিণত হয়েছে। ষাট বছর পেরিয়ে বরকতদের আমরা ভুলে মেরে দিয়েছি।
কথাটা খুব ভুল না।এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ভাষা শহিদ দিবসের নাম শুনলে জিজ্ঞেস করে খায় না মাথায় মাখে।কাল একখানা টক -শো দেখছিলাম টি ভি তে। বক্তা ছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায় আর ইমানুল হক মশায়। তাঁরা যা যা বললেন তার সার করলে দাঁড়ায় বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ ঘোর অন্ধকার।
দুজনেই বিদগ্ধ মানুষ।ওঁদের কথা শুনতে খুব ভাল লাগছিল। কতকগুলো পয়েন্টে বাঙ্গালি মাত্রেরই একমত হওয়া উচিত। এই পোড়া বাংলাই বোধহয় একমাত্র রাজ্য যেখানে ব্যাঙ্কের পে -ইন-স্লিপের মত গুরুত্বপূর্ণ কাগজ বাংলায় লেখা হয়না। গভর্নমেন্ট অর্ডার? সে গুড়ে থান ইট। পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যে জি ও বেরয় ‘ ইঞ্জিরি’ তে। সাধে একশো বছর আগে কবি লিখেছিলেন”এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি। ”
প্রতুলদা ও হক সাহেবের আলোচনায় আরেকটা দিক উঠে এল। সেটা হল আজকের প্রজন্মের বাংলা ভাষা শিখতে বেজায় অনীহা। বই টই পড়া তো বহুদূরের ব্যাপার, বাংলায় কথা বলতেও নাকি এদের বেজায় অনিচ্ছা।
এইখানে ভাবনায় পড়লাম । অনীহা, নাকি অপারগতা।
চোখের সামনে বেশ কিছু গার্জেনের স্যাম্পল তো দেখছি । সন্তান নামজাদা ” ইংলিশ ম্যাডাম ” ইশকুলে পড়ে বলে ওঁরা লক্কা পায়রার মত বাজারে ল্যাজ তুলে ঘোরেন। বাড়িতে বাংলা বই কিম্বা পত্র পত্রিকার নো এন্ট্রি ।আর পারলে ইশকুলের মত বাড়িতেও বাংলা বললে ফাইন নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
একটাই মিনি সমস্যা।বাড়িতে বাংলা বই নিষিদ্ধ। কিন্তু ইংরিজি বই-ই বা ঢোকে ক টা? বাঙ্গালি ছাপার অযোগ্য ভাষায় গ্রাফিতি লেখা টি সার্ট কিনবে, একখানা বই কিনতে সে বেজায় নারাজ।
কুফলটা চোখের সামনেই ফলছে। আজকের মেট্রসেক্সুয়াল প্রজন্মের একটা বড় অংশ যে ভাষা শিখছে, যে ভাষায় কথা বলছে, সেটা না বাংলা, না ইংরিজি, না অন্য কিছু। সবকিছুর এক জগাখিচুড়ি। ওদের দোষ কি? ভাষা শিখতে হলে তো সাহিত্য পড়া দরকার। ছোটবেলা থেকে যদি কানের কাছে অবিরাম কেত্তন শোনে সায়েন্স -জয়েন্ট-ইঞ্জিনিয়ারিং-মেডিক্যাল-এম বি এ, বাংলা ইংরাজি পড়তে ইচ্ছে হয়? কিছুদিন আগে কাগজে পড়েছিলাম ভাল করে মনের ভাবই প্রকাশ করতে পারে না আজকের গাদা গাদা নম্বর পাওয়া প্রফেশনালরা। বেশকিছু ভাল নম্বর পাওয়া ছেলেমেয়ে নাকি ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ে স্রেফ এইজন্যেই বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এরা পড়ে বটে ইংলিশ মিডিয়ামে, মন দিয়ে শুনলে বুঝবেন এদের ইংরিজির উৎস হল থার্ড গ্রেড উপন্যাস, নয়ত জ্যাংগু মার্কা ফিলিম।তার ওপর সিস্টেমের উলটোদিকে হাঁটার বয়সোচিত ধর্ম তো আছেই। বহুদিন বিদেশের ইউনিভারসিটিতে পড়ানো এক ইংরাজির বিদগ্ধ অধ্যাপক একবার বলেছিলেন তাঁর নাতনির ইংরাজি নাকি তাঁর বিবমিষার উদ্রেক করে।
‘ আমিত্রায়ে’ কাকে যেন “ধূমকেতু মুখো” বলত না? ইনডিয়া রেসিডেন্ট আমেরিকান অর্থাৎ দিশি আমেরিকানরা আর এক কাঠি বাড়া। আমেরিকান কালচার  নকল করবে, অথচ আমেরিকান সাহিত্য পড়বে না। ফলে কথ্যভাষাটা চালিয়ে দিলেও পরীক্ষার খাতায় ধরা পড়ে যাচ্ছে।
তবে একটা কথা।পাঁকেই পদ্মফুল ফোটে ।সারা ভারতের গড়পড়তা তরুণতরুণীদের ঝোঁক যখন ইয়াঙ্কি কালচারের দিকে, এদেরই কেউ কেউ মাতৃভাষায় চমৎকার সাহিত্য চর্চা করে যাচ্ছে।বাংলা ভাষার লেখক-লেখিকাদের মধ্যে অনেক জনই আছেন যারা বয়সে নবীন,কর্পোরেট সংস্থা ,মায় সেক্টর ফাইভে কাজ করেন,দিনভর ফরফর করে ইংলিশ বলেন অথচ লেখালিখি করেন বাংলায়। কয়েকজন তো প্রথিতযশা। বাংলা ব্লগ, ই-বুক , ই-ম্যাগের সংখ্যা তো রোজই বাড়ছে। এগুলোর লেখক-লেখিকারা মঙ্গলগ্রহ থেকে বাংলায় পড়েন নি।এই অধম কয়েকজনকে জানে যারা বিদেশে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনলাইন সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। লেখালিখির মাধ্যম বাংলা।
আরও একটা কথা কিঞ্চিত ভরসা দিচ্ছে। এই কদিন আগে বইমেলা হয়ে গেল। কুড়ি কোটি টাকার বই নাকি বিক্রি হয়েছে। গড়পড়তা দুশো করেও দাম ধরি যদি, দশলাখ বই কিনেছে লোকে। এত বই নিশ্চয় ভূতে পড়বে না।
২২-০২-২০১৩

 

Keep reading

More >