#বচন_ফকিরের_কলকে ৩

#বচন_ফকিরের_কলকে (রসেবসে  ওয়েব ম্যাগে প্রকাশিত) IT ALL BEGAN WITH……………. আর পাঁচটা পাড়ার মত আমাদের পাড়ার একটা দোকানে চা বিস্কুট পাউরুটি …

#বচন_ফকিরের_কলকে

(রসেবসে  ওয়েব ম্যাগে প্রকাশিত)

IT ALL BEGAN WITH…………….
আর পাঁচটা পাড়ার মত আমাদের পাড়ার একটা দোকানে চা বিস্কুট পাউরুটি দুধ এইসব বিক্রি হয় এবং পাড়ার আর পঞ্চভদ্রের মত ওই দোকান থেকে দুধ এবং পাঁউরুটি ক্রয় আমার নিত্য কর্ম।তার সাথে প্রয়োজনমত চা, বিস্কুট, কেক লজেন্স ইত্যাদি ইত্যাদি থাকে।দিন দুই আগে সকালে মেয়েকে নিয়ে দোকানে গেছি দুধ আনতে।দোকানে দাঁড়িয়ে ফোন খুলে স্টিকি নোটস চেক করে দেখছি দুধ পাউরুটি ছাড়া আর কি কি নেওয়ার আছে এমন সময় কোমরের কাছে জামায় টান পড়ল। তাকিয়ে দেখি মেয়ে অবাক হয়ে শোকেসের দিকে তাকিয়ে দেখছে।বাঁ হাতের তর্জনী আর মধ্যমা মুখে, চোখ প্রায় ছানা বড়ার সাইজ নিয়েছে।

শো কেসের ভেতরের এক নম্বর তাকে কেক পেস্ট্রি, প্যাটিস সাজান। দু নম্বরে বিস্কুটের রাজত্ব, তিন নম্বর তাকে পাউরুটি থাকে। কিন্তু এগুলো তার অপরিচিত নয়।রোজ না হোক, মাঝে মাঝেই জোটে। তাহলে মেয়ে এত অবাক হয়ে দেখছেটা কি?
মেয়েকে জিগ্যেস করলাম,” কি দেখছ মা?”
সে তিন নম্বর তাকের দিকে পয়েন্ট করল,” ওই যে, ওইগুলো।“
একপাশে স্লাইস রুটি, পাশে নানা সাইজের বান।মেয়ে বানের দিকে দেখাতে আমি আর একটু নিচু হয়ে ভাল করে দেখলাম এবং প্রথম প্রতিক্রিয়া হল,” আহা, কি দেখিলাম।“
একপাশে দু কলম লাচ্চা বান দাঁড়িয়ে আছে।লাচ্চা বান দুর্গাপুরে আগে কখনো দেখি নি।এই প্রথম।এই বান আমি প্রথম খাই বাঙ্গালোরে।লাচ্চা পরটা যেমন হয়, তেমন দেখতে, ভাঁজে ভাঁজে জেলি অথবা ক্রিম, ওপরে ভাজা তিল, কুমড়োর সেঁকা বীজকুচো, সেঁকা পোস্ত ছড়ান।আর থাকে কুচো কুচো চেরি নাম্নী লাল করমচার টুকরো।ভেতরে দু এক টুকরো চালকুমড়োর মোরব্বা।একটু মিষ্টি মিষ্টি এই রুটি খাওয়ার সময় মুখে কটকট করে ভাজা তিল, ভাজা কুমড়ো বীজ লাগে এবং দুয়ে মিলে খেতে মন্দ লাগে না।পরে জেনেছি এই রকম মিষ্টি এবং নানারকম পুর দেওয়া বান গোটা দক্ষিণ ভারতে জনপ্রিয়।আমার নিজের খেয়ে ভাল লেগেছিল।যে কদিন বাঙ্গালোরে ছিলাম বেশ কবার চেখেছি। কিন্তু এই রুটি এখানে এল কি ভাবে?
দোকানির কাছেই জানতে চাইলাম,” এই রুটি কোথায় পেলে গো?”
দোকানি —দা দার্শনিকের নির্লিপ্ততায় উত্তর দিলেন,”কাস্টমার চাইলেই আসবে।“
কেসটা এতক্ষণে ক্লিয়ার হল।আমাদের পাড়ার থেকে হাঁটাপথে দু খানা কর্পোরেট হাসপাতাল আছে যাদের অনেকগুলি দক্ষিণ দেশীয় সেবিকা (এবং সেবকও) আছেন এবং তাঁরা ঝাঁক বেঁধে আমাদের পাড়ায় আতিথ্য গ্রহণ করেছেন কারণ এখানে বাড়িভাড়া অপেক্ষাকৃত কম।সবাই সিংগল না,কয়েকটি পরিবারও আছে।তাদের কল্যাণে এক এক দিন কারিপাতা ভাজার গন্ধে পাড়া ম-ম করে।সাইড এফেক্ট হিসাবে পাড়ার চপ-সিঙ্গারা-কচুরি জিলিপির দোকানে জন গণেশের দাবি মেনে প্রথমে রুটি –তরকা, পরে দোকানি কাকার ইচ্ছায় ইডলি দোসা আবির্ভূত হয়েছেন নচেৎ “দিদিমনিরা একটা দোসা খাওয়ার জন্য বারো ঘণ্টা ডিউটি করার পর আড়াই মাইল দূরে বাজারে যাবে নাকি?” তাহলে এঁদের চাহিদাতেই লাচ্চা বান হনুমানের মত বঙ্গোপসাগর ডিঙ্গিয়ে দক্ষিণ থেকে একবারে উত্তরপূর্বে এসে হাজির হয়েছে।
মেয়েকে চাখানর জন্য একখানা নেওয়া গেল।সে বেচারা উত্তেজনায় ফেটে যায় আর কি। আড়াই বছরের ক্ষুদ্র জীবনে এ হেন চিজ সে প্রথম দেখল।বস্তুটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ, তারপর প্রশ্নে প্রশ্নে ওপরে ছেটান দ্রব্য গুলির পরিচয় গ্রহণ ইত্যাদি পর্ব চলল, অতঃপর তিনি ফাইনাল ভারডিক্ট দিলেন ’পরটা পাউরুটি’।
‘পরটা পাউরুটি’র মোড়কে দেখলাম স্থানীয় এক বেকারির নাম জ্বলজ্বল করছে। চাহিদা তার মানে বেশ ভালই।আর একখানা নিজের ও কন্যার জননীর ভোগের জন্য নেওয়া গেল।“হাফ এ লোফ” আপ্তবাক্য ঠেলায় পড়ে অনুসরণ করা কারণ উভয়েরই রক্তশর্করা একবার ‘আছি হে’ বলে দুয়ারে কড়া নেড়ে গেছে।কাজেই মিষ্টিমাস্টা বুঝেশুঝে খেতে হয়।
দুই হাতে দুই ‘পরটা পাউরুটি’ নিয়ে কন্যা আপন আলয়ে ফেরত এসে জননী সকাশে তার সওগাত পেশ করল। জননী যে হাসিখানা দিয়ে আমায় আপ্যায়িত করলেন তার বর্ণনা করি এতখানি ভাষাজ্ঞান আমার নেই। শিব একটি বেলপাতাতেই তুষ্ট। মেয়েরা যে কখন কিসে তুষ্ট হয় তা বলা শিবেরই অসাধ্যি, শিব কিঙ্কর কা কথা।
পুত্রী কলত্র অতঃপর দুধ সহকারে নিজ নিজ অংশ সৎকারে মন দিলেন। আমি সকালে দুধ আনতে যাওয়ার আগে রুটি তরকারি সহযোগে টিফিন করে গেছি বলে আমার আধা রুটি ভাল করে মুড়ে সুড়ে ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিলাম বিকেলের চা দিয়ে খাব বলে।
ভুলক্কড় মানুষের অশেষ দুর্গতি। আধা রুটি যে নিজে ফ্রিজে রেখেছি নিজেই ভুলে মেরে দিয়েছি। বিকেলের চা বিস্কুট খাওয়ার অনেকক্ষণ পর যখন পাউরুটির কথা মনে পড়ল তখন সন্ধে পেরিয়ে রাতের খাওয়ার সময় আগতপ্রায়। রুটির শোকে মুখ তুম্বো করে দাঁড়িয়ে আছি দেখে গৃহিণী সান্ত্বনা দিলেন” যাক গে, কাল সকালে চা দিয়ে খেও ‘খন।ফ্রিজেই তো আছে।“
রাত্রে মোবাইলে অ্যালারম দিয়ে রেখেছিলাম যাতে সকালে ভুলে না যাই। মোবাইলও সকাল ছটায় আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল। রুটিকে ফ্রিজের দরজার খোপ থেকে টেনে বার করলাম।প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা ফ্রিজের ঠাণ্ডায় থেকে বেচারা কাষ্ঠাবতার ধারণ করেছে। গৃহিণী পরামর্শ দিলেন “কিছুক্ষণ রুম টেম্পারেচারে রেখে দাও, নরম হয়ে যাবে।“ পরামর্শ শিরোধার্য করে তাকে বাইরে রেখে বাথরুম পানে হাঁটা দিলাম।ফেরত এসে মনে হল একটু লাইনে এসেছে। ততক্ষনে চা ও এসে হাজির।  চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জুত করে ডাইনিং টেবিলে বসে দিলাম এক কামড়।
মিয়নো বিস্কুট খাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। পাউরুটি মিয়িয়ে গেলে যে পদার্থ দাঁড়ায় তার আস্বাদ পঞ্চাশ বছরের জীবনে এই প্রথম। সবিস্ময়ে শুনলাম আমার গলা দিয়ে কুঁইকুঁই আওয়াজ বেরিয়ে এল।গৃহিণী সরোষে বললেন,” ওকি ফইট্টা হচ্ছে সকালবেলায়?” জবাবে ফের কুঁইকুঁই।
ইতিমধ্যে কন্যা আমার হাত থেকে বাকি অংশটা নিয়ে এক কামড় বসিয়েছে। সেও মুখ বেঁকিয়ে জবাব দিল,” অ্যাঁয় ম্যাঁ,একবারে জুতো জুতো খেতে।“
কন্যার জননী হাসতে হাসতে বললেন ,”অমনি বাবার মত গপ্প বানিয়ে দিল, জুতো জুতো খেতে। যেমন বাবা, তেমনি মেয়ে। জুতো খেয়েছ কখনো যে জুতোর টেস্ট জানবে।“
মেয়ের অকপট স্বীকারোক্তি,” খেয়েছি তো। সেদিন টি ভিতে ওই টুপি পরা লোকটা জুতো খাচ্ছিল না, আমিও তাই বাবার জুতোটা এক কামড় খেয়েছিলাম। বিচ্ছিরি খেতে।“
আমি আঁতকে উঠলাম। আমার উত্তমাঙ্গের হাস্যমুখ চোখের পলকে ঝড়ের আগের বজ্রগর্ভ মেঘে রূপান্তরিত হল। তিনি সপাটে গর্জন করে উঠলেন,” কি বললি? জুতো খেয়েছিস?ছি ছি ছি ছি জুতোয় কি না কি লেগে থাকে, কত কত জারম, সেই জুতোয় তুই মুখ দিলি?মা গো মা, এই মেয়েকে নিয়ে আমি কি করব গো?”
আমি ন্যায্য পরামর্শ দিলাম,” ডেটল খাইয়ে ডিসইনফেক্ট করো।“
দুর্গা কিভাবে করাল বদনী রূপ ধারণ করেছিলেন এতকাল বইয়ে পড়েছি, আজ তার প্রাক্টিক্যাল ডেমো চোখের সামনে দেখলাম।পাছে নরমুণ্ডের মালার বউনিটা পাছে আমাদের বাপবেটির মুড়ো দুটো দিয়ে হয় সেই ভয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে তিন লাফে বাগানে পালালাম।অতঃপর জবাগাছের ঝোপের আড়ালে লুক্কায়ন।
পাঁচ মিনিট পরেই তাঁর আবির্ভাব।হাতে চায়ের ট্রে।মুখে রাগ,চোখের কোলে হাসি টিপ টিপ করছে।দেখে বুকে কিঞ্চিত বল এল।প্রবল চেষ্টায় মুখখানা কাঁচুমাচু করে সকন্যা ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে সারেন্ডার করলাম।
তিনি রাগ রাগ গলায় বললেন,” সকালবেলা মুখের চা ফেলে চলে এলে? সত্যি বাবা,কি যে করি তোমাদের নিয়ে?”
অতঃ পর বাগানেই চায়ের আসর বসল। চা পান করতে করতে বাগানে বসেই ত্রি পাক্ষিক চুক্তিতে ঢ্যাঁড়া সই পড়ল।মুখ্য শর্ত দুটি; মেয়েকে বিকেলে একখানা ক্যাডবেরি চকলেট কিনে দিতে হবে, আর আগামী পাঁচ বছর বাড়িতে চার্লির সিনেমা দেখা যাবে না।

Keep reading

More >