“বাসনার সেরা বাসা রসনায়”-২

এই কিস্তির প্রথমেই বলে রাখি – আমি যে সময়কালটা ধরতে চেয়েছি, সেটা আজ থেকে ৮০ থেকে ১০০ বছর আগের । …

এই কিস্তির প্রথমেই বলে রাখি – আমি যে সময়কালটা ধরতে চেয়েছি, সেটা আজ থেকে ৮০ থেকে ১০০ বছর আগের ।

এই ধারাটা চলেছিল – ৭০ র দশকের শেষ পর্যন্ত এবং কিছু কিছু বাড়িতে এখনও চালু আছে ।
প্রথমেই আসি – ডিম নিয়ে খাবার শুচিবাই।

সে সময় গণহারে কিন্তু পোলট্রি বা ডাকারি চালু হয় নি, হলেও খুব কম ।

মুরগীর ডিম তো ঢুকতোই না, কারণ মুরগী ইসলাম ধর্মালম্বীরা খান ।

রূঢ় বাস্তব কিন্তু এটাই সত্যি । পরে অবশ্য “রামপাখী” নাম দিয়ে মুরগীকে শুদ্ধ করে নেওয়া হয় সাথে ডিমও ।
মুজতবা আলীর মতে কোনো দেশ বা বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে “আশকথা-পাশকথা” না লিখলে, সেই দেশ বা বিষয়টা ঠিক বোঝা যায় না ।

আমি ওনার “হনুকরণ” করেই লিখছি এই সব –ক্ষমা প্রার্থনীয় ।
ডিম খাওয়া হলে সাধারণত হাঁসের ডিম খাওয়া হত, কারণ হাঁস হচ্ছে সরস্বতীর বাহন ।

এখানে খাবার ব্যাপারে সরস্বতীকেও ছাড়া ছাড়ি নেই !

তবে সচ্ছল পরিবার / জমিদারির রেশ থেকে যাওয়া পরিবার বা মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার সবাই কিন্তু অর্ধেক হাঁসের ডিম খেতে দিতেন পরিবারের ছোটদের । ধারণা গোটা ডিম খেলে নাকি – ছোটদের “পেট গরম” হবে ।
বড়রা অবশ্য গোটা একটা ডিম খেতেন ।
যেটা লিখিনি –সেটা হলো শাক

একমাত্র পুঁইশাক কামোদ্দীপক বলে হিন্দু বিধবাদের খাওয়া নিষেধ ছিল ।

এবারে শাক নিয়ে একটু “আশকথা-পাশকথা” লিখি ।

মহাভারতে এক জায়গায় আছে, দ্রৌপদীর কাছে একবার দুর্যোধনের প্ররোচনায় ক্রোধী ঋষি দুর্বাসা তাঁর অযুত শিষ্য সমেত পাণ্ডবদের আশ্রমে উপস্থিত হলেন । তার আগেই পঞ্চপাণ্ডব সহ দ্রৌপদী দুপুরের খাবার খেয়ে ফেলেছিলেন । যুধিষ্ঠির ঋষিদের নদী থেকে স্নান করে আসতে বললেন । অন্নের কী আয়োজন হবে এই ভেবে দ্রৌপদী আকুল হয়ে কৃষ্ণের স্তব করে বললেন ” হে দুঃখনাশন, তুমি এই অগতিদের গতি হও, দ্যূতসভায় দুঃশাসনের হাত থেকে যেমন আমাকে উদ্ধার করেছিলে সেই রূপ আজ এই সংকট থেকে আমায় ত্রাণ কর । তখন কৃষ্ণ হঠাৎ উপস্থিত হয়ে বললেন তিনি খুব ক্ষুধার্ত । দ্রৌপদী তাঁকে শূন্য হাঁড়ি দিলে তিনি দেখলেন তার পাশে সামান্য শাকান্ন লেগে আছে । তিনি তা খেয়ে বললেন ” বিশ্বাত্মা যজ্ঞভোজী দেব তৃপ্তি লাভ করুন । ” হঠাৎ পেট ভরে যাওয়ায় এবং পাণ্ডবরা হরির আশ্রিত জেনে দুর্বাসা তাঁর শিষ্যদের নিয়ে পালিয়ে গেলেন।
এই বার এই শাকান্ন মানে কি?
উপকরণহীন বা বিভিন্ন তরকারী ছাড়া শাক ও ভাত ।
সে নয় বোঝা গেল । কিন্তু, শাক কয় রকম ছিল – সেটা কিন্তু বেদব্যাস বলে যান নি বা গণেশও লেখেন নি মহাভারতে ।

আজকাল, বাড়ীতে মহিলারা নানা রকম আমিষ পদ রান্না করেন । এটা কোনো নতুন কথা নয়, তাই না?

তবে, এক সময় ছিল যখন – আমিষ রান্নার চেয়ে শাকের রান্না রাঁধতে পারলে সেই মহিলার কদর ছিল সমাজে ।
শাককে এখনও তুচ্ছ বলে ভাবা হয়, নানা ভোজবাড়ী বা দৈনন্দিন খাওয়াদাওয়াতে ।
কেউ হয়তো সখ করে খেলেন, কিন্তু সেটা নিয়মিত নয়।
এই সব লেখার আগে, একটু প্রাগকথন করা যাক, না হলে ব্যাপারটা ঠিক বোঝাতে পারব না ।
শাক বললে আমরা সচরাচর শাকপাতাই বুঝি, কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় শাক হল – পাতা, অঙ্কুর, কাণ্ড, মূলও বোঝায় ।
সংস্কৃতে –শিগ্রকং মানে শাক । শাক সাধারণতঃ দশ প্রকার ।
আমরা পুরোনো সংস্কৃত অভিধানে এই শ্লোকটা পাই :-

মূল-পত্র-করীবাগ্র-ফল-কাণ্ডাধিবাঢ়কাঃ ।
ত্বক পুষ্পং কবকং শাকং দশধা শিগ্রকঞ্চ তৎ ।।
মূল = মূলার শাক
পত্র = পলতে শাক ( পটলের পাতা)
অঙ্কুর = উদ্ভিদের প্রাথমিক অবস্থা
অগ্র = ডগা
ফল = কুমড়ো প্রভৃতি
কাণ্ড = কাণ্ড বিভিন্ন পর্ব ও পর্বমধ্য দ্বারা বিভক্ত।
মজ্জা = এখানে – ভিতরকার নির্যাস
ত্বক = ছাল
পুষ্প = ফুল
কবক = ব্যাঙের ছাতা
দশধা = দশরকম ।
আবার শাকবৃক্ষ মানে সেগুন গাছ ।
এত ভেতরে আর ঢুকবো না, তবে আমরা দেখি বাঙালির সেকালের বেঁচে থাকা ছিল শাক পাতা খেয়ে ।
সেটাই বরং আলোচনা করা যাক ।
চৈতন্য ভাগবতে পাই:-
শাকেতে ঈশ্বর বড় প্রীত ইহা জানি-
নানা শাক দিলেন প্রকার দশখানি ।।
গৌরাঙ্গদেবও বলছেন –
আমি ত এমন কভু নাহি খাই শাক ।
সকল বিচিত্র যত করিয়াছ পাক ।।
গৌরাঙ্গদেবের জন্য কিন্তু দুধ, দই, আর বিভিন্ন রকম তরকারি রাঁধা হলেও, তিনি শুধু শাকই খেয়ে প্রশংসা করেছিলেন ।

কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে আবার দেখতে পাই – ধনপতি সদাগর নিজের দশজন বন্ধু বান্ধবকে নিমন্ত্রণ করে, খুল্লনা সতীকে রান্না করতে বললেন :-
প্রভুর আদেশ ধরি
রান্ধয়ে খুল্লনা নারী
স্মরিয়া সর্বমঙ্গলা
ঘৃতে নালিতার শাক
তৈলেতে বেথুয়া পাক
বোদালি হিলঞ্চ শাক
কাটিয়া করিলা পাক

এই রকম বহুরকম শাকের রান্না দেখি । তাঁদের দেখছি – বনশাকে বড়ই পীরিতি ছিল ।

কবি বলছেন :-

শুভক্ষণে খুল্লনা করিলা অন্ন রন্ধ ।
প্রথম রন্ধনে উঠে অমৃতের গন্ধ ।।

খুল্লনা যখন পরিবেশন করছেন তখন কবি লিখছেন :-
প্রথমে সুক্তার ঝোল দিল ঘন্ট শাক ।
প্রশংসা করয়ে সবে খুল্লনার পাক ।।

আবার অন্যদিকে চাঁদ সদাগরের স্ত্রী সনকা কিছু কম নয় ।
তিনিও সিদ্ধহস্তা ।
স্নান করিল গিয়া বণিক্ – সুন্দরী ।
রন্ধন করিতে যায় অতি তাড়াতাড়ি ।।
অগ্নি প্রদক্ষিণ করি মাগে বরদান ।
মুই যেন রন্ধন করি অমৃত সমান ।।
কি কি শাক রাঁধলেন – সেটা একবার দেখা যাক :-
পাটায় ছেঁচিয়া নেয় পলতার পাতা
রান্ধেন বেগুন দিয়া ধনিয়া পলতা
জবানী পুড়িয়া ঘৃতে করিল ঘন পাক
সাজ ঘৃত দিয়া রান্ধে তিতা গিমা শাক
কোমল বেথুয়া শাক করিয়া কেচা কেচা
নাড়িয়া চাড়িয়া রান্ধে দিয়া আদা ছেঁচা
নারকেল দিয়া রান্ধে কুমড়ার শাক
একে একে দশ শাক করিলেন পাক

বিষ্ণুশর্মার হিতোপদেশে দেখি :-
স্বচ্ছন্দ – বনজাতেন শাকেনাপি প্রপূর্য্যতে
অস্য দগ্ধোদর স্বার্থে কঃ কুর্য্যাৎ পাতকং মহৎ
অর্থাৎ -বনে স্বভাবজাত শাক দিয়েই যখন পেট ভরে আর বাঁচা যায়, তখন অকারণে পোড়া পেটের জন্য প্রাণী বধ করে মাংস খেয়ে মহাপাপ করবো কেন?
আবার সেই মহাভারতে ফিরে আসি !
বকরূপী ধর্ম যখন যুধিষ্ঠিরকে চারটে প্রশ্ন করেছিলেন ।
তার মধ্যে একটা ছিল –
কশ্চ মোদতে ? অর্থাৎ – সুখী কে?
যুধিষ্ঠিরের উত্তর ছিল –

দিবস্যাষ্টমে ভাগে শাকং পচতি যো নরঃ—বারিচর স মোদতে ।
যিনি দিনের শেষে শাক দিয়ে ভাত খান, তিনিই সুখী।

আয়ুর্বেদ আবার অন্য কথা বলছে । প্রণেতারা শ্লোক লিখে ফেললেন :-

শাকং ভিনন্তি বপুরস্থি নিহন্তি নেত্রং

বর্ণং বিনাশয়তি রক্তমথাপি শুক্রম্ ।

প্রজ্ঞাক্ষয়ঞ্চ কুরুতে পলিতঞ্চ নূনং

হস্তি স্মৃতিং গতিমিতি প্রবদন্তি তজ্ জ্ঞাঃ ।।

শাকেষু সর্বেষু বসন্তি রোগান্তে হেতবো দেহবিনাশায় ।

তস্মাদ্ বুধঃ শাকবিবর্জ্জনস্তু কুর্য্যাৎ তথাম্লেষু স এব দোষঃ ।।

অর্থ হল –
শাক, শরীর ও হাড় নষ্ট করে । চোখ, গায়ের রং রক্ত, শুক্র, প্রজ্ঞা, স্মৃতি ও চলাফেরা সবই নষ্ট হয় ।

এমনকি শাক খেলে অকাল বার্ধক্য হয় । শাকে সমস্ত রোগই বাস করে, তাই এটা শরীর বিনাশের মূল ।
তাই বুদ্ধিমানেরা শাক খাওয়া বাদ দিন ।

বুঝতে পারা মুশকিল – তখনকার দিনে কি অজৈব সার দিয়ে শাক চাষ করা হত ?
কিন্তু বনে জঙ্গলে, ঝোপে ঝাড়ে জন্মানো শাকে কি করে সার দেওয়া হবে, বোঝা মুশকিল !

মাংসের সপক্ষে আয়ুর্বেদ আবার বলছে :-

মাংসং বাতহরং সর্বং ব্বৃংহণং বলপুষ্টিকৃৎ
প্রীণনং গুরু হৃদ্যঞ্চ মধুরং রস-পাকয়োঃ

মানে হল:-
সমস্ত মাংসই বায়ু নাশক, বলবর্দ্ধক, পুষ্টি কারক, তৃপ্তিপ্রদ,মধুররস এবং মধুরবিপাক ।

বলে রাখা ভাল – সংস্কৃতে মধুর মানে আমিষ রান্নাকেও বোঝায় ।

বড়ই মুশকিল ! এ যেন সেই নানা মুনির নানা মত !
একদিকে ঋগ্বেদে পাই – মাংস খেয়ে মানুষেরা দীর্ঘজীবী আর ধুরন্ধর বুদ্ধি ধরেন অন্যদিকে এটাও দেখতে পাই বৈষ্ণবরাও কিন্তু দীর্ঘজীবন লাভ করেছেন ।
তাই, সাধক প্রবর কুমার নাথ লিখছেন –

সবাই কি গো বুঝতে পারে এ বিষম ধাঁধা ।
ভুক্ত দ্রব্যের অণুর সঙ্গে ধর্মের অণু বাঁধা ।।

রমানাথ তর্কালঙ্কারকে মনে আছে ? সেই যে কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে বিশাল পণ্ডিত !
তিনি তো তাঁর কুটিরের সামনে তেঁতুল গাছের পাতার ঝোল ভাতের সঙ্গে খেয়ে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন ।
তিনি এর পরও ৮২ বছর পর্যন্ত বেঁচেছিলেন বলে শোনা যায় ।

আবার কালকেতুর উপাখ্যানে দেখি –
খুদ কিছু ধার লহ সখীর ভবনে

….কাঁচড়া খুদের জাউ রান্ধিও যতনে।

রান্ধিও নালিতা শাক হাঁড়ি দুই তিন

লবণের তরে চারি কড়া কর ঋণ।

সখীর উপরে দেহ তন্ডুলের ভার

তোমার বদলে আমি করিব পসার।….

ফুল্লরা বেচতে পারছে না মাংস । কখন?

দেখুন
বৈশখ হৈল আগো মোরে বড় বিষ।
মাংস নাহি খায় সর্ব্ব লোক নিরামিষ ।।
পিষ্ঠ জৈষ্ঠ মাসে প্রচণ্ড তপন ।
খরতর পোড়ে অঙ্গ রবির কিরণ ।।

মাছ নিয়ে কিন্তু কোথাও কোন অভিযোগ নেই । সবকালেই খাওয়া যায় ।
মুজতবা সাহেব খাদ্যরসিক ছিলেন! একবার তিনি, চাঁদনী রাতে তাজমহল না দেখতে গিয়ে রামপাখীর মাংস খাচ্ছিলেন- রেস্তোঁরায় বসে।

জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলেন- বাপু হে! ওই তাজমহল, কড়কড়ায়তে-মড়মড়ায়তে করে খাওয়া যায় না। তাই যাই নি!
খ্রিস্ট্রিয় ষোড়শ শতাব্দীতে- দুজন বড় মাপের বাঙালী কবি বিরাট বিরাট সংস্কৃত কাব্য লিখেছিলেন।
এঁদের মধ্যে একজন- কবিকর্ণপূর পরমানন্দ সেন। বাড়ী – কাঞ্চনপল্লীতে মানে আজকাল যাকে কাঁচরাপাড়া বলে। বিরাট বড়লোকের ছেলে আর খুব গুণী।

“শ্রীশ্রীকৃষ্ণাহ্নিক- কৌমুদী’ নামে একটা কাব্য লিখেছিলেন। এই কাব্যের দ্বিতীয় সর্গে ৮৫ থেকে ১১৮ শ্লোকে বসন্ততিলক আর পুষ্পিতাগ্রা ছন্দে শ্রী রাধার – রান্নার মনোরম বর্ণণা আছে।
আর একজন লেখক হলেন- শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ। এনার লেখা বইটির নাম হলো- “শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ এবং “গোবিন্দলীলামৃত’।
এই “গোবিন্দলীলামৃত’ তেই নানাধরণের খাবারের বর্ণণা আর রান্নার প্রণালী দেওয়া আছে।
তবে, শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ বেশ কিছুদিন বৃন্দাবনে থাকার ফলে একটু কম বর্ণণা দেওয়া আছে। কবিকর্ণপূর পরমানন্দ সেন বাংলাতে বসে লিখেছিলেন বলে বর্ণণাটা বেশ বিস্তৃত।
কবিকর্ণপুর বাথুয়া ( বাস্তুক), নটে ( মারিষ), নতির পত্র( পটলশাক) কলায়লতার শাক( কলায়বল্লী শিখা), ছোলার শাকের কচি ডগা ( চনকাগ্র শিখা), মটরশিখা, কোমল লাউডগা ( তুম্বিশিখা) আর পুদিনা শাকের কথা উল্লেখ করেছেন- ৮৭ নং শ্লোকে। এই শাকগুলো নাকি শ্রীরাধা, শ্রীকৃষ্ণের জন্য ভালো সরষের তেলে ভেজেছিলেন ।

ভাজার কথা বলতে গিয়ে কবি কর্ণপুর লিখেছেন– ( গোবিন্দলীলামৃত-৩.৯২-৯৩)

“বার্তাকু সূরণক মানক কর্করোথৈ
রম্ভামুঘোত্থ কণিশৈঃ কচুভিঃ পটোলৈঃ।
কুষ্মাণ্ডকৈর্লবলবৈঃ শিতসূচিরাজী
বেধেন নীরসতমৈর্বিবিধাহ্স ভাজী।।’
বার্তাকু= বেগুন। সূরণক= ওল। মানক= মান। কর্করোথ= কাঁকরোল।
রম্ভামুঘোত্থ = গর্ভমোচার ছোট ছোট কাঁচা কলা। পটোলৈঃ= পটল। কুষ্মাণ্ড= চালকুমড়ো।
এই আনাজগুলো ছোট ছোট করে কেটে ( কী ধৈর্য্য!!!!!! সরু সূঁচ দিয়ে বিঁধিয়ে ভেতরের রস গুলো বের করে নিতে হবে। এরপর ডালের বেসনে চুবিয়ে সেগুলো সরষের তেলে ভাজতে হবে। এটা অবশ্য কবিরাজ গোস্বামীর বিধান ।

কবিরাজ গোস্বামী আবার পাকা তেঁতুলের রস দিয়ে কলমি শাক, আর কাঁচা আম দিয়ে কালো নালতে পাতা রাঁধার কথাও বলেছেন।
কিন্তু, এই দুই কবির লেখাতে- পুঁই, পালং, মূলোর শাকের, কচুশাকে কথা পাওয়া যায় না!

কে জানে কেন!!!!! কবিরা কি এই শাকগুলো খেতে ভালোবাসতেন না!

নাকি শ্রীকৃষ্ণের দৈববাণী হয়েছিল- বুঝলে হে- আমি ওই সব শাক খাই না! তাই লিখো না।

কাসুন্দি, আদা- বাটা, নারকেল-বাটা দিয়ে কাঁঠালের বিচিও ” টেরাই’ করতে পারেন। “নতি পত্র’ মানে নলতে পাতার শুক্তুনির রেসিপি চাই!!!!! কুছ পরোয়া নেহি!

“যস্মিন্ প্রতপ্ত-কটু তৈল্যা-তিক্তপত্রীঃ।
সৎকাসমর্দদলিতার্দ্রক-সাধুমৈত্রীঃ।।’
কাসুন্দি, মিহি করে আদা বাটা দিয়ে , নলতে পাতাকে ম্যারিনেট করতে হবে। তারপর সরষের তেল গরম করে ছেড়ে দিয়ে, নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিন। অহো!!!! কী “সাধুমৈত্রীঃ’- অর্থাৎ, কাসুন্দি, মিহি করে আদা বাটা, সরষের তেল আর নলতে পাতার কী অসাধারণ বন্ধুত্ত্ব!!!!!
এবার দেখি, শ্রী রাধা, আর কী কী বানিয়েছিলেন! শ্রীকৃষ্ণ আসছেন- প্রেমটা একটু মাখো মাখো করতে হবে না? মাখো মাখো করতে গেলে তো দুধের দরকার! শ্রীরাধা, দুগ্ধালাবু বা দুধলাউ তৈরী করতে বসলেন।

সৌস্মেণ জীরকং- নিভং পরিকৃত্য তুম্বীং
সিদ্ধাঞ্জকেন পয়সা চ নিধায় কম্বীম্।
আলোড্য দত্তঘনসারমপাচি দুগ্ধাহ-
লাবুঃ সিতামরিচ জীরক হিঙ্গুমুগ্ধাঃ।।
———–
লাউকে জিরের দানার মত ঝিরিঝিরি করে কেটে, জল এবং দুধ মিশিয়ে সেদ্ধ করবে, আর সেদ্ধ করার সময় বারবার হাতা দিয়ে নাড়তে হবে। তারপর, কর্পূর, চিনি, মরিচ, জিরা, হিং দিয়ে ঘন হয়ে গেলে নামিয়ে নেবে।
তবে কবিরাজ গোস্বামী হিং দিতে কিন্তু বলেন নি। এটার নাম তিনি দিয়েছিলেন- দুগ্ধতুম্বী ( তুম্বী= লাউ)। এরপর, শ্রীরাধার মনে হলো- নাঃ! কম পড়ে যাচ্ছে!!!! আবার তিনি কচি মোচা কেটে ,” মরিচাঘ্য’ রাঁধতে বসলেন। মোচার ছোটো ছোটো শস্য গুলো ঝিরি ঝিরি কেটে জলে ডুবিয়ে খানিকক্ষণ রেখে দিলেন। তারপর, দুধ, মরিচ আর হিং দিয়ে ঘন ঘন নেড়ে ফুটে গেলে নামিয়ে রেখে ঠাণ্ডা হতে দিলেন।
কবিরাজ গোস্বামী হিং দিতে এখানেও বলেন নি! শ্রীকৃষ্ণ হিং ভালোবাসতেন কিনা জানা যায় না, তবে কবিরাজ গোস্বামী হিং ভালোবাসতেন না- এটা পরিস্কার!
(চলবে)

+++++
তথ্যঋণ :- উপেক্ষিতের উপকারিতা
রায় শ্রীযুত তারকনাথ সাধু সি আই ই বাহাদুর
বসুমতী সাহিত্য মন্দির
ইং – ১৯৩৫
২ ।উদ্বোধন শতাব্দী জয়ন্তী সঙ্কলনে, বিমান বিহারী মুখোপাধ্যায়ের রচনাঃ- সংস্কৃত সাহিত্যে বাংলার খাবার।

Keep reading

More >