বাহন

সময়টা যখনকার তখনও গ্রামে বিজলি আলো ঢোকেনি। শীতের আমেজ পুরোপুরি ভাবে যায়নি বলতে ভোরের দিকে ভালোই ঠাণ্ডা লাগে। সন্ধ্যে হলে …

সময়টা যখনকার তখনও গ্রামে বিজলি আলো ঢোকেনি। শীতের আমেজ পুরোপুরি ভাবে যায়নি বলতে ভোরের দিকে ভালোই ঠাণ্ডা লাগে। সন্ধ্যে হলে পথ-ঘাট বেশ শুনশান হয়ে যেত সেই সময়। রাস্তার মোড়ে দু-একটা চায়ের দোকান খোলা থাকত একটু রাত অবধি। পশ্চিমের সূর্য যখন নিভু নিভু মাঠ থেকে চাষের কাজ সেরে ফেরার সময় বেঁধে রাখা গরু গুলোকেও টানতে টানতে নিয়ে আসত বাড়ির কর্তারা। বাড়ির বৌয়েরা সন্ধ্যে দিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে পড়াতে বসতো। টিমটিমে মোমবাতির আলোয় গুণ গুণ করে পড়াশোনা করতো বাড়ির ছেলে মেয়েরা।

নৃপতিবাবু কলকাতায় এক সওদাগরি অফিসে চাকরি করতেন। ফিরতে ফিরতে প্রায়দিনই রাত হয়ে যেত। বাড়ি ফিরে খেতে বসে নৃপতিবাবু বললেন এবারে জমিতে ভালো ফলন হয় নি আর পুকুরের পারটা বর্ষা আসার আগেই বাঁধাই করতে হবে বুঝলে গিন্নী, এছাড়া বড় মেয়ের শ্বশুরের শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছে না বেয়াই বাড়ি একদিন দেখা করতে গেলেই হয়। সবে দুবছর হলো মেয়েটার বিয়ে দিয়েছি তার মধ্যেই এমন বিপত্তি বললো, বিমলা। তারপর এখনো চার মেয়ে কি করে পার করবো কে জানে। নৃপতিবাবু বললেন, দুশ্চিন্তা করো না তো। সব ঠিক হয়ে যাবে। শুনলাম সাঁপুই পাড়ার রঘুনাথ বাড়ুজ্জ্যে নাকি জয়ার শ্বশুরের চিকিৎসা করছেন। ছুটকি কোথায় গেল, তাকে কই দেখছিনা। বিমলা বললেন সে অনেক আগেই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তুমি যদি রোজ রাত করে বাড়ি ফের সে আর কত জেগে থাকবে। আচ্ছা বাবা তুমি রোজ এতো রাত করে বাড়ি ফের কোনদিন কিছু দেখনি বললো সেজো মেয়ে মিনতি। কি দেখার কথা বলছিস একটু বলবি, বললেন নৃপতিবাবু। ওই ভৌতিক ধরনের কিছু দেখার কথা বলছিস তো দিদি, বললো ন মেয়ে মায়া। মিনতি বললো ঠিক বলেছিস মায়া। মায়া ফিক ফিক করে হাসতে থাকলো। নৃপতিবাবুর মেজো মেয়ে ঝুমা বললো, বাবা বলোনা কোনদিন কিছু দেখনি? বিমলা বললেন, এই রাতে আর এসব শুনে কাজ নেই তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে শুতে যা দেখি। নৃপতিবাবু বললেন আগে খেয়ে নে তারপর জমিয়ে গল্প করা যাবে এই বলে ব্যাপারটা কাটিয়ে দিলেন।

রাতে শুয়ে মায়া বললো, ও বাবা বলোনা। নৃপতিবাবু বললেন আচ্ছা তবে শোন তোদের একটা অদ্ভুত ঘটনা বলি। তখন চাকরিতে ঢুকেছি বছর খানেক হলো। কাজের চাপে রাত করেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। সেদিন বাড়ি ফেরার পথে স্টেশন থেকে সাইকেল নিয়ে খানিকদূর আসার পর সাইকেলের টর্চটা যায় বিগড়ে। কিছুতেই জ্বলে না। তারপর আমার ব্যাগে যে টর্চ থাকে সেটা বাড়িতেই ফেলে এসেছি। অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই ধীরে ধীরে সাইকেল চালিয়ে আসছি। আবার খানিক আসার পরে মিত্তিরদের বাড়ির সামনের মোড় মাথাটায় সাইকেলের চেন যায় পড়ে। ধুর ছাই কি বিপদ! বলে জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম।

মিত্তিরদের বাড়ি সেতো এখান থেকে অনেক দূর, বললো মিনতি।  তাহলে আর বলছি কি বললেন নৃপতি বাবু, এদিকে চারিপাশে কোন জনমানব নেই যে বলব লণ্ঠনটা নিয়ে এসো সাইকেলের চেন তুলে বাড়ি ফিরি। সবাই এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো। ওই ভাবেই সাইকেলটা হাঁটিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরছি এমন সময় লক্ষ্য করলাম আমি একা হাঁটছি না ওই অন্ধকারে আমার পিছনেও কেউ যেন হাঁটছে। পিছনে তাকিয়ে তাজ্জব হয়ে গেলাম। ভয়ে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। তাকিয়ে দেখি এক ধরনের জন্তু। গরুর মতো চেহারা। অথচ গরু ঠিক নয়। আর গায়ের রঙ দুধের মতো সাদা। এইরকম ধরনের চেহারার গরু আমি আগে কখনো দেখিনি। আমার এই খোঁড়া সাইকেল কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। ওই ভাবেই এগোতে থাকলাম। যদি এটা গরুই হয়ে থাকে কাদের গরু এতো রাতে বাইরে ঘোরে। মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকাতে লাগলাম। দেখলাম সে আমার সঙ্গে সঙ্গে আসছে। আমি যতো জোরে এগোই ততো জোরে ওই জন্তুটাও এগোতে থাকে। খানিকক্ষণ পরে মনে সাহস এনে জন্তুটাকে রাস্তা ছেড়ে  দিলাম। আমি দাঁড়িয়ে পড়ায় সেও দেখি দাঁড়িয়ে পড়লো। কিছুতেই এগোয় না। বাকিটা পথ কিভাবে এসেছি একমাত্র আমিই জানি।

তারপর কি হলো বাবা, বললো মিনতি। বাড়ির সদর দরজার অনেক আগে থেকেই জোরে জোরে মাকে ডাকতে থাকলাম। মা আর বাবা দুজনেই লন্ঠন হাতে বেরিয়ে এলো।

ওই জন্তুটা তখন কি চলে গিয়েছিল, বললো মায়া। নৃপতিবাবু বললেন, না আমার পিছনেই আসছিল আগের মতো। মায়া বললো তারপর কি হলো? তারপর আমি বাড়ির সদর দরজার কাছে এসে সাইকেলটা ফেলে দিয়ে জোরে জোরে মাকে ডাকতে থাকলাম। মা তাড়াতাড়ি দরজা খোলো। মা লন্ঠন হাতে বেরিয়ে এসে আমায় জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে রে? আমি কাঁপা গলায় বললাম মা দেখোনা আমার পিছনে কি যেন একটা আসছে সেই মিত্তিরদের বাড়ির ওখান থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না। আমায় জোর গলায় ডাকতে শুনে বাবাও মায়ের পিছনে এসে সেই সবে দাঁড়িয়েছে আর জন্তুটাকে দেখে তো পুরো ভয়ে কাঁটা হয়ে গেছে। মায়ের এত সাহস মা হঠাৎ সদর দরজা থেকে বেরিয়ে এসে জন্তুটাকে উদ্দেশ্য করে বললো, তুমি কি কিছু খাবে? তোমার তো খুব খিদে পেয়েছে। জন্তুটা একবার আমাদের সবার মুখের দিকে তাকালো তারপর পিছনে ফিরে যেই পথ দিয়ে এসেছিলো সেই পথে চলে যেতে যেতে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে মিশে গেল।

তারপর কি হলো বাবা, বললো মায়া। নৃপতিবাবু বললেন আমি তারপর ঘরে ঢুকে মাকে সব কথা খুলে বললাম। মা বললেন বাবু তুই যখনই বললি মিত্তিরদের বাড়ির সামনে থেকে ওই গরুটা তোর পিছু নিয়েছে আমি তখনই বুঝে গেছি। তুমি আবার কি বুঝে গেলে জিজ্ঞেস করলো বাবা। মা বললো মিত্তিরদের বাড়ির সামনে শিব ঠাকুরের যে মন্দিরটা আছে দেখনি নাকি? তাতে কি এসে গেল আমার তো ওই জায়গা দিয়ে আসতেই কেমন গা ছমছম করে বললাম আমি। আরে ওটা গরু না ওটা ভোলেবাবার বাহন ষাঁড়। গায়ের রঙটা দেখলি না ধবধবে সাদা। এই তল্লাটে তো চোর ডাকাতের উপদ্রব আর কম নেই তার ওপর তুই এত রাত করে বাড়ি ফিরিস। ভোলেবাবাই তোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে এসেছে। এই সব হলো আমার শিবরাত্রি আর শ্রাবণ মাসের চারটে সোমবার উপোষ করার ফল। জয় ভোলেবাবা জয় ভোলেবাবা বলে বলে মা লন্ঠন হাতে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল রাতের খাবার আনার জন্য।

Keep reading

More >