মধুসূদন দাদা

সে প্রায় দেড় যুগ আগের কথা, তখন পকেটে প্লাস্টিক মানি রাখার চল হয়নি। পাড়ায় পাড়ায় মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে এটিএম ছিল …

সে প্রায় দেড় যুগ আগের কথা, তখন পকেটে প্লাস্টিক মানি রাখার চল হয়নি। পাড়ায় পাড়ায় মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে এটিএম ছিল না; কোথাও যেতে গেলে নোটের বান্ডিল পকেটে নিয়ে যেতে হত| প্যান্ট কাটানোর সময় না বললেও দর্জি ভেতরে একটা লুকোনো পকেট বানিয়ে দিত নিজের থেকে।

সেই সময়, আমাকে অফিসের কাজে একবার যেতে হল পশ্চিম ভারতের একটা ছোট শহরে; ওখানের একটা কারখানায় যন্ত্রপাতি বসাতে হবে, দরকার পড়লে ওখানেই কিছু লোক জোগাড় করে কাজ করাতে হবে| দিন পনেরোর ধাক্কা সামলানোর জন্য অফিস থেকে অ্যাডভান্স হিসেবে পাঁচশো টাকার একটা বান্ডিল নিয়ে ট্রেনে উঠলাম।

সন্ধ্যের মুখে ওখানে পৌঁছে একটা চলনসই হোটেলে উঠলাম, অবশ্য ওর চেয়ে ভালো কিছু ওখানে নেই। হোটেলের খাতায় নাম ঠিকানা লেখার পর রিসেপশনের টাকমাথা প্রৌঢ় ভদ্রলোক বিনয়ের সঙ্গে একটু অ্যাডভান্স চাইলেন। সবার সামনে টাকার বান্ডিল বের করায় গুরুর বারণ আছে, তাই একটু পরে পাঠিয়ে দিচ্ছি বলে ঘরে গেলাম|

ঘরে গিয়ে জামা ছেড়ে, গুপ্তধন বের করলাম; রুম সার্ভিসের একটা ছেলেকে ডেকে নোট গুনে দিয়ে নিশ্চিন্তে ফ্যানের নিচে বসলাম| কিন্তু গায়ে হাওয়া লাগার আগেই বেল বাজল; দরজা খুলতেই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন রিসেপশনের সেই ভদ্রলোক, হাতে আমার দেওয়া নোটের গোছা। টাকের ওপর অল্প ঘাম তাঁর, কিন্তু তাঁর কথা শুনে আমি দরদর করে ঘামতে শুরু করলাম।

স্বভাব বিনয়ী ভদ্রলোক বললেন, আমার দেওয়া নোটগুলো অধিকাংশই বাতিল, অনেক দিন আগেই ব্যাংক ওগুলো তুলে নিয়েছে। ইনিয়ে বিনিয়ে জানালেন, ওই নোট নিতে তিনি অপারগ; দুরকম নোট পাশাপাশি রেখে বুঝিয়েও দিলেন কোনটা কি। মনে রাখা দরকার, এ ঘটনা নভেম্বর, দুহাজার ষোলো সালের অনেক আগের, এমন নয় যে টিভি দেখে আর কাগজ পড়ে নোট বাতিল নিয়ে আমরা একেকজন বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছি। আশার কথা একটাই, নোটগুলো জাল নয়, বাতিল হয়েছে মাত্র। বিনয়বশতঃ উনি পরামর্শ দিলেন, পরেরদিন একবার ব্যাংকে গিয়ে খোঁজখবর নিলে হয়তো কিছু সুরাহা হতে পারে| ধন্যবাদ জানিয়ে বান্ডিল থেকে বেছে বেছে চালু নোট দিয়ে ওনাকে বিদেয় করলাম। ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পরে গুনে গেঁথে দেখলাম, বাতিল নোটের পরিমাণ সবমিলিয়ে প্রায় হাজার কুড়ি টাকা।

রাতের ঘুম মাথায় উঠল, শেষে হোটেলের বাসন মাজতে না হয় পয়সার অভাবে! আর এ সমস্যার কথা কাউকে বোঝানোও যাবে না, সবাই আমাকেই নোটের কারবারি ভেবে নিতে পারে।

পরের দিন দশটার আগেই ব্যাংকে র দরজায় ধর্ণা দিলাম। এ কাউন্টার ও কাউন্টার ব্যর্থ মনোরথে ঘোরার পর এক পদস্থ অফিসারের কাছে হাজির হলাম। উনি ধৈর্য্য ধরে সব কথা শুনলেন, নোটগুলো দেখলেন, তারপর ইনিয়েবিনিয়ে বললেন, ওনার কিছু করার নেই। ওই ব্যাংকের গাহেক হলে নাকি কাজ হয়ে যেত; শুকনো মুখে উঠে এলাম। চোখের সামনে বিরাট গামলায় সাবানগোলা জলে চোবানো বাসনগোছা ভাসতে লাগল|
ব্যাংকের গেটের কাছে একজন আমাদের পাকড়াও করলেন, উনি নাকি সমস্যাটা শুনেছেন, সাহায্য করতে চান। ডুবন্ত মানুষ, খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরলাম। জানা গেল, উনি নোটের কারবার করেন, কাটা-ফাটা নোট নতুন করে দেন, অচলকে সচল করেন; অবশ্যই কিছু কমিশনের বিনিময়ে| এবং হ্যাঁ, সরকারী লাইসেন্স আছে; আর লাইসেন্সের জন্যই নাকি কমিশনের পরিমাণটা বেশি। শরাব বাজারে ওনার দোকান, সন্ধ্যেবেলা ওখানে গিয়ে ‘মধুসূদন নোটওয়ালা’ বললেই যে কেউ দেখিয়ে দেবে।

অথৈ জলের মধ্যে খড়কুটোর ভরসায় মনে বল ফিরল। ফেরার পথে অটোতে বসে ভাবলাম, সমস্যায় পড়লে, মদুসূদনদাদা ঠিক হাজির হন, সে পাঠশালার ফিষ্টি হোক, ব্যাংক হোক আর শরাব বাজার হোক। নিজের রসিকতায় নিজেই মুচকি হাসলাম।

সন্ধ্যে হতে না হতেই চললাম নোট বদল করতে। অটোতে উঠে বললাম – শরাব বাজার। অটোওয়ালাদের শ্রবণ ক্ষমতার ওপর আমার ভরসা কোনোদিনই ছিল না, একবার দিল্লিতে সুন্দরনগর থেকে অটোতে উঠে রেডফোর্ট যাবো বলায় শিরিফোর্ট নিয়ে গেছিল| এও কি শুনল কে জানে, হু হু করে অটো ছোটাতে লাগল। একসময় একটা চৌরাস্তার মোড়ে এসে অটো থেমেও গেল, নেমেও পড়লাম। নোটওয়ালার খোঁজ অটোওয়ালা কে জিজ্ঞেস করলেই হত, কিন্তু জানা ছিল বুদ্ধিমান অপরাধীরা বারবার গাড়ি পাল্টায় ভেগে যাওয়ার সময়, বেশি কথাও বলে না কারও সঙ্গে মুখচেনা হওয়ার ভয়ে। আমি অপরাধী না হলেও নিজের বুদ্ধির ওপর অগাধ বিশ্বাস আছে; আর আগের মতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থাটা তখন নেই। মোড়ের মাথায় একটা পানের দোকান ছিল, বেশ একটা চালাক চালাক মুখ করে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাইয়া, শরাব বাজার কোন দিকে?”

হাতের কাজ থামিয়ে বড় বড় চোখ করে দোকানদার তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ; তারপর ঢোঁক গিলে বলল, “শরাব বাজার? কেয়া চাহিয়ে আপকো?”

টাকাপয়সার মামলা, গোপন থাকাই ভালো; বললাম “কুছ নেহি, থোড়া কাম থা”। লোকে এক আধ বোতল শরাব খোঁজে, আমরা একদম বাজার খুঁজছি! দোকানদার কি ভাবল জানে, ওর সন্দেহ আরও গাঢ় হল| এক ভদ্রলোক সিগারেট কিনে সবে দেশলাই জ্বালিয়ে ছিলেন, কাঠি তাঁর হাতেই জ্বলতে থাকল, ঠোঁটে সিগারেট ঝুলিয়ে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলেন। খুব স্বাভাবিক, ভদ্রবেশী শহুরে লোক, একটু আধটু মদ খেতেই পারে, কিন্তু একেবারে মদের বাজার খুঁজে বেড়াচ্ছে! তাও আবার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা চেপে যাচ্ছে!

হাতে ছ্যাঁকা লাগায় ভদ্রলোক সিগারেটটা ধরালেন শেষ পর্যন্ত। তারপর ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “শরাব কা দুকান তো বহুত হ্যায়, থোড়া আগে চলে যাইয়ে, আগলা চৌরাহা পে মিল যায়েগা|”

মোলো যা, শরাবের দোকান তো আমাদের হোটেলের পাশেই আছে. ওখানে গ্যাঁট সে বসে খাওয়া যায়। আবার বোঝানোর চেষ্টা করলাম, শরাব চাই না, শরাব বাজার চাই।

এবার এরা বোধহয় আমাকে মদের কারবারি ভাবছে, কেমন একটা বাঁকা চোখে দেখছে আমার দিকে| শরাবের ব্যাপারীরা তখনও ধারধোর করে দেশত্যাগী হয় নি, তাই সে সময় গাঁয়ে ঘরে শুঁড়িদের একটু বাঁকা চোখেই দেখা হত। এর মধ্যে আরো দুজন লোক জুটেছে দোকানের সামনে; একজন উপরপড়া হয়ে বলল, “আপকো কোন সা শরাব চাহিয়ে? ও সামনেবালা দুকান বহুত বড়া হ্যায়; বিয়ার হুইস্কি রাম সব মিল যায়েগা|”

আরেকজন বলল, “দেশি চাহিয়ে তো স্টেশন কে পাশ মিলেগা। উধার আরামসে বৈঠকে ভি পি সক্তে, রেড নেহি হোতা|”
ওরে বাবা, পাগল করে দেবে এরা! ধৈর্য্য রাখতে না পেরে বলেই দিলাম, শরাব বাজারে মধুসূদন নোটওয়ালার খোঁজ করছি, কিছু নোট বদলাতে হবে|

সবার মিলিত স্বস্তির নিঃশ্বাসে রাস্তার গোলমাল চাপা পড়ে গেল। তারপরে সবাই সমস্বরে বলে উঠল, তো ও হি বলিয়ে না, নোট বদলনা হ্যায়| তব সে শরাব কিঁউ খোঁজ রাহা হ্যায়|

সিগারেটের শেষ টুকরোটা পায়ে পিষে দাঁত কিড়মিড় করে প্রথম ভদ্রলোক বললেন, আরে ভাইয়া, শরাব বাজার নেহি, শরাফ বাজার। ইস গলিমে চলে যাইয়ে, দো মিনিট লাগেগা।

থ্যাংক্যু বলে ঠ্যাং বাড়ালাম গলির ভেতর। দুদিকে আলো ঝলমলে গয়নার দোকান, সোনার গয়না ঝকঝক করছে শোকেসের ভেতর। দোকানগুলোর নামধাম দেখে বুঝলাম জায়গাটার নাম সত্যিই শরাফ বাজার।

একটু এগিয়ে দেখলাম দুটো বড়বড় দোকানের ফাঁকে ছোট্ট ঘুপচি দোকানে সকালের সেই মধুসূদন দাদা বসে আছেন। আমাদের দেখেই হই হই করে আপ্যায়ন করলেন। নোট বদল হল, খুচরো চাই, কড়কড়ে নতুন নোট চাই ইত্যাদি আমাদের সব আবদার মেনে নিলেন হাসিমুখে। শুধু তাই নয়, মধুসূদন দাদার ভাঁড়ের দইয়ের বদলে ভাঁড়ের চা খাওয়ালেন। অবশ্য চা শেষ হওয়ার পরে আবার ভাঁড় ভর্তি হয় কিনা দেখার আগেই তিনি পায়ের কাছে রাখা বালতিতে ভাঁড় ফেলে দিলেন।

পকেট ভর্তি চালু নোট নিয়ে উঠে থ্যাংক্যু বলে উঠে পড়লাম। উনি শুকতারা না প্রক্রিয়া কি একটা বললেন, ঠিক বুঝলাম না| যাকগে, ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই, শরাব আর শরাফ এর খিঁচুড়ি আগে হজম হোক। আর দায়ে পড়লে বিপত্তারণ মধুসূদন দাদা সব জায়গাতেই আছেন, শুধু সঠিক মন্ত্র দিয়ে সঠিক পথে চলে ওঁকে খুঁজে বের পারলে ঠিক এসে উদ্ধার করবেন, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস|

Keep reading

More >