মিল্টনের সাথে চা

  কলকাতাতে আমার জন্ম, কিন্তু বেড়ে ওঠা রেলশহরে। বছরান্তে হয়ত দুইএক বার আসতাম সেটা অন্য রকম ব্যাপার ছিল। পরে যখন …

 

কলকাতাতে আমার জন্ম, কিন্তু বেড়ে ওঠা রেলশহরে। বছরান্তে হয়ত দুইএক বার আসতাম সেটা অন্য রকম ব্যাপার ছিল। পরে যখন প্রায় পাকাপাকি ভাবে কলকাতা এলাম আমি মানে শুধুই আমি আর কেউ না তখনও জানি না আমি কি করতে এসেছি এখানে। খেতাম, ঘুরতাম, এখানে সেখানে নাটক, খানিক পড়াশোনা, খানিক ভাষা শেখা আর শহর জুড়ে এন্তার একা একা চক্কর মারা।

কৈশোর আমার রেলশহরের সেখানে অনন্ত সবুজ আর মাঠ এমনকী শহরের পাশ দিয়ে একটা নদ ও ছিল যা এঁকে বেঁকে বয়ে যেত। কলকাতায় যখন এলাম তখন মাঠ কম বাড়ি বেশি তবে জিরাফের মত গলা উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট তখনও সেই ভাবে আকাশ খেয়ে ফ্যালে নি। আমি যে কখন কোথায় থাকতাম কি করতাম নিজেই জানতাম না , বাবা মা বুঝতে পারত না, আমি জানাতাম না আর বাকিরা আমার পাগলামি কে খানিক সমঝে চলত। খানিক ভালোবেসে, খানিক বাবা মার সম্মানে আর খানিক ‘ পরের ছেলে পরমানন্দ যত উচ্ছন্নে যায় তত আনন্দ” গোছের হয়ে হাত তুলে দূর থেকে দেখত। একজন ই ছিল যে প্রায় কেস স্টাডির মত করে আমাকে ক্লোজ ওয়াচে রাখত, সে আমার রাঙাকাকু, এই ভদ্রলোক কে গাবজাল দেওয়া বেশ চাপের ছিল। সরকারী কর্মচারী তায় , প্রত্যক্ষ রাজনীতি করেন, তায় হেব্বি জেদী আর টেঁটিয়া। যুক্তি ঠিক হলে তাকে আটকানোর সাধ্য কারোর ছিল না।

আর আমি ল্যাজ ইয়াআআ লম্বা তখন, শহরটা পায়ে চষছি , পেটে কিছু নাই চোঁ চোঁ করছে হয় জল নয় ছোলা খাচ্ছি কিন্তু মুখে কাউকে বলব না শালা আমি কি চাই । প্রেমের কথা আর কি বলব ও অধ্যায় বাদ দেওয়াই ভালো। তবে না বাওয়াল হরেক কিসিমের।

এর মধ্যে আমার এখানকার বন্ধুরা চাকরী পেতে শুরু করেছে, আমি তখন মামাবাড়িতে আছি । সেই সময়ে একটি ছেলে এল মামাবাড়িতে কিছু একটা দিতে বা নিয়ে যেতে। ছেলে এল মানে সে এল ‘টেনিয়া’ হয়ে ভ্যান চালকের সাথে। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম নাম।

বলে, ‘মিল্টন’

আমি প্রায় ছিটকে পড়ে যাই আর কি ?

কবি মিল্টন বা ফ্লাস্কের ব্র্যান্ড মিল্টন সে যাই হোক নামটা কে দিল ওকে। উত্তর পাওয়া গেল না, পড়াশোনা প্রায় করে না। তবে একটা সরকারী প্রাইমারী স্কুলে নাম লেখানো আছে।

কাজ হয়েগিয়েছিল, ওদের ফেরার পালা,

কি মনে হোলো আমিও ওদের সাথে চললাম বেশ খানিকটা হাটার পরে ভি আই পি রোডে পড়লাম। আমাকে ভ্যানওয়ালা মানে ছেলেটার কাকা সম্পর্কে বলল আপনি কদ্দুর যাবেন?

আমি বল্লাম, ভাবছি তোমাদের বাড়ি।

সে বলল, সে তো অনেক দূর!
আমি বললাম, ঠিক আছে আমি চেপে যাচ্ছি ভ্যানে,
বলেই তড়াক করে চেপে বসলাম, কাকা ভাইপো যারপরনাই অবাক আর খুশ। যেতে যেতে হাবিজাবি কত্ত কথা। ছেলেটা মানে মিল্টন বলল, তুমি সত্যি আমাদের বাড়ি যাবে!

এই করতে করতে উল্টোডাঙ্গা ব্রীজের নীচের বস্তির সামনে যেখানে দিয়ে আজকাল অটোগুলো সল্টলেকে ঢোকে সেখানে দাঁড়াল।

ছেলে নেমেই দৌড় মা কে ডেকে আনতে।

আমি যেতে যেতেই দেখলাম , ঘরের মধ্যে খানিক হুড়োহুড়ি।
ঢুকতে গেলে মাথা নিচু খানিক করতেই হয়। বেড়ার ঘর একটা চৌকি ,প্রতিটা পায়ার তলায় ৬ টা ইট দিয়ে উঁচু করট, চৌকির উপরে ছেঁড়া মাদুর।

আমি বসতেই মা এসে বলল, চা খাবেন একটু

আমি ঘাড় নাড়তেই , পাম্প স্টোভে জোর বাড়ল
চা এল, আমি খেতে খেতে দেখলাম মা য়ের মুখ টা অদ্ভুত আনন্দে ভরে যাচ্ছে।

ছেলেটার বই নিয়ে উল্টে পালটে দেখলাম। বললাম ভালো করে পড়িস

ছেলেটা বলল, আমি পড়লে কাজ করবে কে, আমরা সবাই কাজ না করলে চাল আর কেরোসিন ঢোকে না ঘরে।

আমার চা খাওয়া আটকে গিয়েছিল। তখনো এন জি ও ইত্যাদি কিছুই জানি না। খালি মনে হয়েছিল এত কিছু অভাবের মধ্যেও এত আন্তরিক আপ্যায়ন!

ফেলে আসি নি চা টা। শেষ না করলে আমার নিজের কাছে জবাবদিহি করতে পারতাম না।

—-

মৃগাঙ্ক

Keep reading

More >

মানদন্ড