রবীন্দ্রধারা বহিছে ভুবনে

প্রচন্ড গরমের সময় বাসের দরজায় বাদুড়ঝোলা অবস্থায় হঠাৎ যদি শুনতে পান “ওরে আয় রে….”, ভাববেন না কন্ডাক্টর গান গেয়ে আরও …

প্রচন্ড গরমের সময় বাসের দরজায় বাদুড়ঝোলা অবস্থায় হঠাৎ যদি শুনতে পান “ওরে আয় রে….”, ভাববেন না কন্ডাক্টর গান গেয়ে আরও প্যাসেঞ্জার ডাকছে| যদি শরীরটাকে টেনেহিঁচড়ে ভেতর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলেও নিজের পা কোথায় আছে নিজে খুঁজে পাবেন না| এমন অবস্থায় পায়ের জঙ্গলের গভীর থেকে হঠাৎ আওয়াজ আসতে পারে – “দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার…”| পুরোটা না শুনে ঝগড়া করার দরকার নেই, ‘পায়ের ওপরে’ বলেনি, বলছে “গানের ওপারে”| আসলে মোবাইলের রিংটোন সব| মোবাইল যেমন সহজলভ্য হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ তেমনি তাঁর বুর্জোয়া জমিদারের ইমেজ ছেড়ে পথেঘাটে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছেন। চ্যাটচ্যাটে ঘামের মত বঙ্গজীবনের অঙ্গে অঙ্গে জড়িয়ে গেছে তাঁর গান|

তবে, গেরস্ত ঘরে হারমোনিয়মের ওপর খোলা গীতবিতান এখন অতীত। রঙচঙে মলাটের ‘রবীন্দ্রনাথের সিনেমার গান’ বা ‘বাছাই প্রেমের গান’ এখন অনেক সহজলভ্য, সস্তাও বটে| অন্তর্জালে জালবন্দি হয়ে আছে বিনিপয়সার রবীন্দ্রসংগীত – পুনৰ্মিশ্রিত, পুনর্নির্মিত, সমকালীন ইত্যাদি নামও আছে তাদের। সুতরাং সুখে-দুঃখে-আনন্দে-ব্যথায়-রাস্তায়-ঘাটে সর্বত্র তাঁর উপস্থিতি; বলা ভালো সর্বঘটে কাঁঠালি কলা। কে যেন বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ বাঙালির শ্বাস। হক কথা, তবে শ্বাস ছাড়ারও একটা আরাম আছে, তেমনি রবীন্দ্রনাথকে কারণে অকারণে উগরে না দিলে আমাদের শরীরটা আইঢাই করে।

যাকগে, গুরুদেবের ব্যাপারে গুরুভার কথা বলার ধৃষ্টতা না দেখিয়ে একটু গালগল্প হোক| পাড়ার গল্প দিয়ে শুরু করা যাক|

বৈশাখ পড়তেই রবিপুজোর আয়োজন জোরকদমে শুরু হয়ে গেছে| মোড়ে মোড়ে ফেস্টুন টাঙানো হয়ে গেছে, নাচগানের স্কুলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের কলি – “মায়াবন বিহারিণী”, সঙ্গে তবলা| সরু গলায় গানের মাঝে হঠাৎ মেঝেতে শতরঞ্চি পেতে বসা দিদিমনির মোটা গলার আওয়াজ – “হরিণটা ধরতে এত দেরি করছ কেন! নাও, আবার শুরু কর। এই তোমরা আস্তে।” প্রথম কথাটা যে গাইছে তাকে, পরেরটা গোলমাল করা অপেক্ষারত ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে।

অনুষ্ঠানে নাচের চাঁদা বেশি, দিদিমণির ফি-ও বেশি; তাই ওখানে ঘুঙুর ছাড়া গান বাজনা সবই ‘এম পি থ্রি মিউজিক ট্র্যাক’-এ| ওখানে দিদিমনি আবার চেয়ারে আসীন – “এই কি করছো? তুমি বামদিক দিয়ে ঘুরলে কেন? এই যে তোমার ডান হাতটা কোমরের কাছে আসুক। সবসময় মনে রাখবে রবীন্দ্রনৃত্য মানে – পেয়ারা পাড়ো, পকেটে পোরো। এই যে মায়েরা আপনারা একটু চুপ করবেন!” শেষটা বাচ্চার মায়েদের উদ্দেশ্যে।

জটলা করে বসে থাকা মায়েরা একটু থমকে যান, তারপর আবার যথারীতি আলাপ আলোচনা শুরু হয়ে যায়।

– এই তুমি কোন শাড়িটা পরে আসবে গো?

-ওই যে গাদোয়ালটা কিনলাম|

– আমি একটা যামিনী রায় প্যাটার্নের হ্যান্ড-প্রিন্টেড শাড়ি আনিয়েছি আমাজন থেকে|

-এই তোমাদের পাশের ফ্ল্যাটের বৌটা আসছে না কেন?

-ওরা থাকবে না। পরশু বলে গেল ওরা শিলং যাচ্ছে|

-ওমা, সে কি! এরকম জমজমাট পূজো ওখানে হয় নাকি?

-তাই তো জিজ্ঞাসা করলাম, বলল – ওখানে নাকি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। শান্তিতে একটু রবীন্দ্রনাথকে ফিল করতে কত্তা-গিন্নি বাচ্চা বগলে চললেন শিলং।

-ঢং

এক অতি সচেতন মা ফটোকপি করা একটা কাগজ নিয়ে মেয়েকে পাখিপড়া করাচ্ছেন, এক কোণে এক টুল দখল করে; মেয়ে কিছুতেই গানের কথাগুলো মনে রাখতে পারছে না|

-বল, তারপর

-হাতে হাতে ধরি ধরি

-হুঁ, তারপর

-নাচিবি ঘিরি ঘিরি, মা ধাঁই গিড়ি গিড়ি মানে কি?

-ঠাস করে এক লাগাবো, এদিকে মন দে

দুই মা একটু দূরে খুব আস্তে আস্তে কথা বলছেন, এই হৈচৈ ব্যাপারটা মেনে নিতে রুচিতে বাধছে হয়তো।

-তোমার মেয়ে কি করছে গো?

-ওই তো ‘উ লা লা’ তে নাচবে, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’|

-বাঃ, খুব লেটেস্ট রবীন্দ্রসংগীত পেয়েছ, আমারটা সেই পুরনো ‘লাঠি’র গান – ‘আগুনের পরশমণি’| কত করে বললাম দিদিমণি শুনলেনই না। এবারটা যাক পরেরবার অন্য স্কুলে দেব।

আরেক কেয়ারফুলি কেয়ারলেস মা স্মার্টফোনে ব্যস্ত আছেন, ফটাফট আঙুল চলছে স্ক্রিনে, তবে চোখ কান সজাগ; বাচ্চা গাইছে “প্রথম আদি তব শক্তি”। বাচ্চা প্রতিদিনের মত সেদিনও গগনে গগনে জ্যোতি ছড়িয়ে আর আদিতে ফিরতে পারল না। দিদিমণি আবার শুরু করতে বললেন| স্ট্যাটাস আপডেট হতে দেরি হল না – এই তবলচিটা বেকার, আজও ফাঁকতালে দু’মাত্রা ঝেপে দিল| সঙ্গে সঙ্গে লাইকও পড়ে গেল কয়েকটা।

এদিকে প্যান্ডেলওয়ালা এসেছে, আগেই খাবার দোকান থেকে প্যাকেটের জন্য অ্যাডভান্স নিয়ে গেছে, ফুলওয়ালা এসেছিল, ইলেক্ট্রিশিয়ান আসবে। এসব সামলাচ্ছে পাড়ার এক অত্যুৎসাহী ছোকরা| প্যান্ডেলওয়ালার সঙ্গে অনেক দর কষাকষি করে ঠিক হল – মঞ্চের পেছনের পর্দায় কোলাজের মত করে হালকা রঙে লেখা থাকবে ভারততীর্থ কবিতাটা। তার ওপর রবিঠাকুরের রেখাচিত্র আর বড় বড় করে স্পষ্ট উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে – “সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে”;  রবীন্দ্রচর্চাও হল, জাতীয়তাবাদও হল।

পরেরটা অন্য পাড়ার গল্প| সপ্তাহে একদিন একটা বছর দশেকের বাচ্চাকে গান শেখাতেন এক মাস্টারমশাই| সময় মেপে গান শেখা ভালোই চলছিল, গোল বাঁধল এপ্রিল মাসে। মাস শেষ হওয়ার আগেই মাইনেটা হাতে দিয়ে বাচ্চার মা মিষ্টি হেসে গল্প জুড়লেন, আসলে আব্দার জানালেন। রবীন্দ্রজয়ন্তী দোরগোড়ায়, সন্ধ্যেয় হাউসিং কমপ্লেক্স-এ অনুষ্ঠান হবে, তারপরে সবাই মিলে খাওয়াদাওয়া। সকলের অনুরোধ রাখতে বাচ্চাটার একটা গান গাওয়া জরুরী| কিন্তু বাচ্চার জানা “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে” বা “আলো আমার আলো” ইত্যাদি গানগুলো বহুশ্রুত। সাপ্তাহিক চা-বিস্কুটের বদলে, কুচো নিমকি আর মিষ্টিকে সাক্ষী রেখে মাস্টারমশায়ের সঙ্গে বাচ্চার মায়ের রফা হল – অনুষ্ঠানের জন্য দুটো রেয়ার গান ‘তুলিয়ে’ দেওয়ার। সন্ধ্যেবেলার অনুষ্ঠান, ‘সন্ধ্যাসংগীত’-এর গান হলেই ভাল; তবে বেশ জমাটি গান হতে হবে|

মাস্টারমশাই অনেক ভাবনাচিন্তা করে “অভয় দাও তো বলি আমার wish কি” আর “কত কাল রবে বল’ ভারত রে” ‘তুলিয়ে’ দিয়েছিলেন। শ্রোতাদের অনুরোধে ঢেঁকি গেলার সম্ভাবনা মাথায় রেখে গলায় তুলে রাখা ছিল “যদি জোটে রোজ এমনি বিনি পয়সায় ভোজ”| গান খুব জমেছিল, হাততালি তো থামতেই চায় না! অনুষ্ঠানের পরে পানভোজন আরও বেশি জমজমাট হয়েছিল; গানগুলো অনুঘটকের কাজ করেছিল সন্দেহ নেই|

পরের গল্প দিল্লি-কলকাতা রাজধানী এক্সপ্রেসের দুই যাত্রীকে নিয়ে। একজন কোলকাত্তাই বাঙালি সাহেব, অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে পৃথিবী জুড়ে ব্যবসা করা বিদেশী কোম্পানির কর্তা; কোনও কারণে বাধ্য হয়ে আকাশপথ ছেড়ে ট্রেনে কলকাতা ফিরছেন| অন্যজন উত্তর ভারতীয়, ব্যবসায়িক কথাবার্তার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন মোবাইল পরিষেবার সুবিধা নিতে ট্রেনেই যাতায়াত করেন| ইনি জমি-বাড়ির ধূসর ব্যবসার একঘেঁয়েমি কাটিয়ে কলারের রং সাদা করার জন্য হালে একটি পাঁচতারা স্কুল খুলেছেন, সঙ্গে কলেজ তৈরির কাজ চলছে। ট্রেন ছাড়ার পরে দুজনের আলাপ জমে উঠতে সময় লাগেনি| আশেপাশের যাত্রীরা গভীর রাত পর্যন্ত রাজা উজিরদের অবিরাম মৃত্যু-আর্তনাদ শুনেছে|

রাজধানী এক্সপ্রেস অভিজাত শ্রেণীর ট্রেন, বাথরুমে জলের বিরাম থাকলেও গানবাজনা অবিরাম চলতে থাকে| সকালবেলা, ট্রেন পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় ঢুকে পড়েছে| যথারীতি গান চলছে “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই…”| চা খেতে খেতে দুনিয়ার অর্থনীতি বদলের ফাঁকে হঠাৎই রিয়্যাল এস্টেটের কানের ভেতর গানের গুঁতো পড়ল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে তিনি বললেন – “ভেরি সুইট!”

গর্বের সঙ্গে বহুজাতিক জানালেন, “অল টেগোর’স সং|”

“আই সি! হোয়াট ইট মিনস্? ক্যা মতলব হ্যায়?”

বহুজাতিক মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললেন, “টাইম পাস্ উইথ ফ্রেন্ডস ইন কফি শপ|”

মাছি তাড়ানোটা রিয়্যাল এস্টেটের নজর এড়ায়নি, বললেন, “ডোন্ট আন্ডার এস্টিমেট কফিশপ, দাদা। আপকা তিন’শ স্কোয়ার ফুট খালি স্পেস কোই নেহি লেগা, লেকিন উঁহা এক কফিশপ বানা দো, পুরা প্রজেক্টকা ভ্যালু বাড় যায়েগা|”

“ইয়েস ইয়েস, উই আর প্রোভাইডিং সিসিটিভি ইন সো মেনি কফিশপস। আই নো, হাউ দে আর ম্যানেজিং উইথ স্মল স্পেসেস|”

দুজনের হো হো হাসিতে আশেপাশের সবাই চমকে উঠল| রিয়্যাল এস্টেট মাথা নেড়ে আহা উহু করলেন কিছুক্ষণ, তারপরে যা বললেন তার নির্যাস হল – তিনি টেগোরের নাম খুব শুনেছেন, খুব বড় রাইটার ছিলেন, স্কুলে তাঁর ছবি রাখা আছে, ‘কিতাবে’ও ওনার লেখা আছে| ন্যাশনাল সং তো উনিই লিখেছেন|

বহুজাতিক তাল মেলালেন – নোবেল পেয়েছিলেন, অনেক টাকার প্রাইজ| ব্যাংক ফেল করায় পুরো টাকাটাই চোট হয়ে গেল| আসলে সে যুগের ব্যাংক মানে তো চিট ফান্ড বা পনজি স্কিম টাইপের, গভমেন্টের নজরদারি তেমন কিছু ছিল না| তবে খুব বড়োলোকের ছেলে ছিলেন বলে সামলে নিয়েছিলেন| বাংলাদেশে জমিদারি ছিল, জাহাজ, নুন, পাট ইত্যাদির ট্রেডিং বিজনেস ছিল। কিন্তু খুব কালচার্ড ফ্যামিলি! বেশির ভাগ সিনেমার স্টোরি তো উনিই লিখে গেছিলেন, রয়্যালিটিও পেতেন নিশ্চয়|

সহমত হলেন রিয়্যাল এস্টেট – হ্যাঁ, শুনেছেন তিনি| ব্যবসাটাকে ডাইভার্ট করেছিলেন টেগোর, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি বানিয়েছিলেন কোন একটা রিমোট জায়গায়। ‘জমিন’টা সিওর সস্তায় পেয়েছিলেন!

হ্যাঁ, শান্তিনিকেতনে, অনলি হান্ড্রেড মাইলস ফ্রম কলকাতা| রিমোট প্লেস হলেও ফরেন স্টুডেন্ট প্রচুর আসত| ক্যালকাটাতেও দু জায়গায় ইউনিভার্সিটি আছে – বহুজাতিক বিশদে জানালেন| একটু থেমে আবার আবার যোগ করলেন – শান্তিনিকেতন খুব রিমোট প্লেস হলেও ওই এরিয়াটায় কোম্পানি নজর রেখেছে; অনেক নতুন হোটেল-রিসর্ট হচ্ছে ওদিকে, মার্কেট পোটেন্সিয়াল খুব ভালো|

“তব দেখিয়ে, দেয়ার ইজ নো কনফ্লিক্ট বিটুইন বিজনেস এন্ড কালচার। ফিরভি বেঙ্গলি পিপল কালচার কালচার করকে গোয়িং ব্যাক এন্ড ব্যাক এন্ড ব্যাক|”

মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন বহুজাতিক – “নো ওয়ার্ক, অনলি তোড়ফোড়, চোরি|” একটু থেমে স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন – “বিগ মিসটেক ওয়াজ ইন হিজ বিল্ডিং প্ল্যান, সিকিউরিটি ম্যাটার্স নট টেকেন কেয়ার ওয়েল। মেডেলটাই চুরি হয়ে গেল| উই সেন্ট গুড প্রপোজালস রিসেন্টলি|”

ঝাঁপিয়ে পড়ে বহুজাতিকের হাতদুটো পাকড়ে ধরলেন রিয়্যাল এস্টেট, বললেন – “কুছ করনা হ্যায় তো হামে ভি ইনক্লুড কর লিজিয়ে দাদা। উইল ডু এভরিথিং ইন আনবিলিভেবল প্রাইস, আপকো য্যায়সে চাহিয়ে ওয়সে হি হোগা, প্রমিস| হামারা ভি কলারটা ফুল হোয়াইট হো যায়েগা|”

পরের গল্পটা একেবারে বাজারী গল্প| বাজারের সীমানায় সন্ধ্যেবেলা একটা ভ্যানরিকশা হাজারো জড়ি-বুটি-ওষুধ নিয়ে খদ্দেরের আশায় দাঁড়িয়ে আছে। পাশে দাঁড়ানো এক প্রৌঢ় একাধারে ভ্যানচালক, ওষুধ নির্মাতা, বিক্রেতা এবং চিকিৎসক| শুধু বিজ্ঞাপনে সাহায্য করার জন্য হ্যান্ডেলে একটা মাইকের চোঙা বাঁধা, তাতে রেকর্ড করা নিরবিচ্ছিন্ন ঘোষণা চলছে নানান ওষুধের উপকারিতা নিয়ে| একসময় এসে পড়ল যৌবন বৃদ্ধির ওষুধের কথা| পুরুষ ও মহিলা কণ্ঠে পালা করে গৌরচন্দ্রিকা আর ওষুধের গুনাগুন বর্ণনার পরে যুগ্ম কণ্ঠে গান শোনা গেল – “এখন আর দেরি নয়, ধর্ গো তোরা হাতে হাতে ধর্ গো|………”

শেষ গল্পটা কর্পোরেট দুনিয়া নিয়ে| কর্পোরেট কর্তাদের ‘যদি’ কথাটা একেবারেই না-পসন্দ| ‘অ্যাসাম্পশানস:’ লিখে নোট দিলে সাতখুন মাফ, ‘যদি’ নৈব নৈব চ|

যাইহোক, এক অফিসের বার্ষিক অনুষ্ঠান, অনেক রাত পর্যন্ত খানা-পিনা-নাচা-গানার ব্যবস্থা আছে। বড় সাহেবের উদ্বোধনী ভাষণের সময় হাতে হাত মিলিয়ে লড়াইয়ের শপথ নেওয়া হয়েছে। তারপর হাতে গ্লাস নিয়ে ছড়িয়েছিটিয়ে হালকা গল্পগুজব চলছে, সঙ্গে পাকোড়া-কাবাব। মাইক হাতে নিয়ে একজন ভাড়াটে গায়ক কিছু গান শোনানোর চেষ্টা করছে, বিশেষ বিশেষ গানের ফরমায়েশও আসছে মাঝে মাঝে। সন্ধ্যে রঙিন হচ্ছে ধীরে ধীরে।

হঠাৎ একজন অনুরোধ করে বসল – “একটা রবীন্দ্রসংগীত শোনান তো!”

বাকিরা হৈহৈ করে উঠল – “হয়ে যাক, হয়ে যাক”

গায়ক একটু গাঁইগুঁই করল – “না, মানে, আমি রবীন্দ্রসংগীত চর্চা সেভাবে করি না|”

আপত্তি উড়িয়ে দিয়ে আরও জোরালো আবদার এল, সন্ধ্যের রং গাঢ় হয়েছে| সবার বায়না রাখতে সাহেবও বলে বসলেন – “গান, গান, সবাই বলছে, গাইতেই হবে|”

আবার একটা হৈ হৈ রব উঠল| গায়ক ছেলেটি সামলে নিয়েছে, বলল – “গাইব, নিশ্চয় গাইব; আপনাদেরও আমার সঙ্গে গাইতে হবে|”

একটু আগে একসাথে লড়াইয়ের কথা হয়েছে, গায়ক ‘কমিট’ করেছে, ‘কনফার্ম’ করেছে ‘যদি’ ছাড়া; আবার হৈ হৈ শব্দ উঠল|

সিন্থেসাইজারের টুকটাক সুরের সঙ্গে একটু গৌরচন্দ্রিকা হল – খুব চেনা গান, সবাই জানে, ‘কাহানি’ ছবিতে স্বয়ং বচ্চন সাহেব নিজের গলায় গেয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

তারপরে গান শুরু হল – “যদি তোর ডাক শুনে কেউ”, প্রথাগত সুর ও ছন্দে| “না আসে তবে” থেকে সবাই গলা মেলালো| সাহেব অতি উৎসাহে তালি দিতে শুরু করলেন, সঙ্গে সঙ্গে অন্যরাও; কেউ একা নয়, সবাই মিলে একলা চলতে হবে।

একসময় ঘুরেফিরে এল সবচেয়ে অপছন্দের শব্দ ‘যদি’| তাল মিলিয়ে টার্গেট মিট করা অসম্ভব হয়ে পড়ল ওই ‘যদি’র জন্য| যখনই ঘুরে ফিরে ‘যদি’ আসে তখনই ঝপাং ঝপাং করে পরপর দুবার তালি পড়ে| কর্পোরেট ভাষায় একটা ‘প্রোজেক্ট মাইলস্টোন’, তার ঠিক পরেই ‘ব্যাকলগ’ আছে বলে ‘রিকভারি ম্যানেজমেন্ট’। একজন জাতে মাতাল তালে ঠিক (আক্ষরিক অর্থে) কর্পোরেট সংগীতবোদ্ধা, সাহেব সহ বাকিদের ঝপাং ঝপাং তালি মারতে দেখে হাসি চাপতে গিয়ে দু’পেগ বেশি খেয়ে নিল। তারপর ভাবতে বসল, কি দরকার ছিল বাপু এমন প্যাঁচ লাগাবার, শব্দটাকে বাদ দিয়ে বাক্যটাকে একটু উল্টেপাল্টে নিলে রবিঠাকুরের কি যেত আসত!

ভাবতে গিয়ে খেই হারিয়ে আরও দু’পেগ খেয়ে নিল সেই কর্পোরেট সংগীতবোদ্ধা; তারপর মাথায় এল – তাহলে কি ঘুরপথে রবিঠাকুরও ‘যদি’র মত অনিশ্চিত ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিতে চেয়েছেন! ভাবতে ভাবতে আবার নতুন পেগ নিতে গিয়ে জানা গেল বার কাউন্টার বন্ধ হয়ে গেছে| সরাসরি বড়সাহেবের কাছে কাউন্টার খোলানোর আর্জি জানাতে গিয়ে ব্যর্থ হল সে। টেবিলে মাথা রেখে হতাশার ভাবনার মধ্যে সে উপলব্ধি করল, রবিঠাকুর আরও কতগুলো জিনিস একই ভাবে বোঝাতে চেয়েছেন| যেমন,  কর্পোরেট সাহেবদের কাছে বড় রকমের আশা নিয়ে যেতে নেই। সেইজন্যই ‘বড় আশা করে’-তে ‘বড়’ শব্দটাও ছন্দের সোজাসাপ্টা রাস্তার বাইরে রাখা আছে। এটা আবিষ্কার করে সে কবিগুরুকে ম্যানেজমেন্ট-গুরু বলেও স্বীকার করে নিল মনে মনে। বিভিন্ন উদাহরণ সহ বিশ্লেষণ করতে করতে কর্পোরেট দুনিয়ার টার্গেট আর প্রফিটের পেছনে দৌড়োনোর প্রসঙ্গে যখন সে ‘সোনার হরিণ চাই’-এর ‘তোরা’তে পৌঁছল তখন তাকে ধরাধরি করে সবাই ট্যাক্সিতে তুলছে।

আপাতত এখানেই রবীন্দ্রচর্চার ইতি টানা যাক|

*************

(লেখাটি কেশিয়াড়ি, পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে প্রকাশিত ১৪২৪ সালের বার্ষিক “সুবর্ণধারা” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল)

Keep reading

More >