লন্ঠন

সময় পেরিয়ে গেছে আরও ছয় সাত বছর। মিনতি, মায়া এবং ছুটকি এরা সবাই বড় হচ্ছে নিজেদের মতো করে। নৃপতিবাবু নিজে …

সময় পেরিয়ে গেছে আরও ছয় সাত বছর। মিনতি, মায়া এবং ছুটকি এরা সবাই বড় হচ্ছে নিজেদের মতো করে। নৃপতিবাবু নিজে শিক্ষিত ছিলেন তাই ওনার প্রত্যেক মেয়েকেই স্কুলের গণ্ডির পেরোনোর পরই বিয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছেন। তখনকার দিনে এই সব ভাবনা কেউ মাথাতেই আনত না। মেজো মেয়ে ঝুমার বিয়ে হয়েছে বছর তিন হলো। সে এখন থাকে দিল্লীতে। নৃপতিবাবুর মেজো জামাইয়ের দিল্লীতে সোনার কারবার। বিয়ের তিন মাস পরেই ঝুমাকে নিয়ে দিল্লী রওনা দেয় রজত। বছরে তিন-চার বার আসে আর দিন পনেরো থেকে আবার ফিরে যায়। নৃপতিবাবুর বড় মেয়ে জয়া গত এক সপ্তাহ হল তার চার বছরের ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি এসে থাকছে। সামনের বৈশাখে সেজো মেয়ে মিনতির বিয়ে। দেখাশোনার সময় মিনতির শ্বশুরবাড়ির লোকজন নৃপতিবাবুকে কড়া গলায় শুনিয়ে গেছেন ও সব পরীক্ষা-টরীক্ষা শেষ করিয়ে মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি পাঠাবেন। সেই নিয়ে বিমলা মাঝে মধ্যেই নৃপতিবাবুকে বলছেন সব মেয়েদের এতো করে পড়াশোনা শেখাচ্ছো কি লাভ হচ্ছে। নৃপতিবাবু ওসব কথা কানেই নিতেন না।
তখন ওই এলাকার ভালো মাস্টার বলতে একমাত্র হরেন মাস্টারই ছিলেন। অনেক দূর দূর গ্রাম থেকে ছেলেমেয়েরা ওনার কাছে পড়তে আসত। নৃপতিবাবুর ভাইপো রাজু আর মিনতি একসাথেই হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় বসবে।
ঘটনাটা ঘটলো পরীক্ষার দিন দশেক আগে। সেদিন রাজু আর মিনতির সাথে মায়াও পড়তে গেছে হরেন মাস্টারের কাছে। রাতে বাড়ি ফেরার সময় হরেন মাস্টার বললেন, তোরা দুই বোন বাড়ি চলে যা। রাজু আজ এখানে রাতে থেকে পড়াশোনা করবে তারপর এখানেই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। সকাল হলে বাড়ি চলে যাবে। রাজুর বাড়িতে জানিয়ে দিবি একটু নাহলে আবার চিন্তা করবে। মিনতি মনে মনে ভাবল রাজুদের বাড়ি যেতে গেলে তাকে খালধারের পাশ দিয়ে ঘোষেদের বাঁশবন পেরোতে হবে। আর ফেরার সময় রায়বাবুর বাগানের ওপর দিয়ে এসে তেমাথা পুকুরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে সোজা বাড়ি চলে আসবে। আর সাত পাঁচ না ভেবে লন্ঠন হাতে নিয়ে দুইবোন বেরিয়ে পড়লো। খালধারের সামনে আসতেই রাজুর বাবার সাথে দেখা। তিনি কাজ সেরে পাড়ায় একটু আড্ডা দিতে বেরিয়েছিলেন। মায়া বলল, যাক কাকার সাথে দেখা হয়ে গেলো আর ওই ঘোষেদের বাঁশবন পেরোতে হলো না ওদিকটায় সন্ধ্যের পর গেলেই কেমন গা ছমছম করে। ভূপেনবাবু ওদের দুজনকে নিয়ে রায়বাবুর বাগানের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছতেই মিনতি বললো, কাকা তুমি এবার বাড়ি ফিরে যাও অনেক রাত হলো আমরা তো প্রায় এসেই গেছি। ভূপেনবাবু একটা বিড়ি ধরালেন তারপর বললেন, আচ্ছা আমি তবে চলি সাবধানে যা তোরা। তেমাথার সামনেটা আসতেই দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। এই তেমাথা জায়গাটার একটা বিশেষত্ব আছে। এখানে পাশাপাশি তিনটে পুকুর অবস্থিত। তেমাথার মোড়ের সামনেটায় এসে দাঁড়ালে মনে হয় যেন একটা বড় পুকুরকে কেউ তিনভাগে ভাগ করে দিয়ে তার গা দিয়ে রাস্তা বার করে দিয়েছে। তেমাথার পশ্চিমদিকের পুকুরটা মিনতিদের নিজেদের। পুকুর শেষ হলেই ওদের বাড়ি।
মিনতি মায়াকে বললো লণ্ঠনের আলোর জোরটা একটু বাড়িয়ে আমার হাতে দে। ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে। ওরা একটু কাছে গিয়ে দেখল একটা বেঁটেখাটো চেহারার বৌ লাল পেড়ে শাড়ি পড়ে মাথায় ঘোমটা টেনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মিনতি বললো, এত মনে হচ্ছে শর্মিলা। হ্যাঁরে শর্মিলা তুই এখানে এত রাতে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বাগানে পায়খানা যাবি নাকি রে? সে কিছু বললো না আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইলো। মায়া বললো, ওকে মনে হয় ওর বাবা দাঁড়াতে ওঠেনি তাই একা একাই বেড়িয়েছে। মিনতি বললো, আয় আমাদের সাথে আয় আর আমাদের বাড়ির পিছনের বাগানে চলে যা, ওখানে গিয়ে কাজ সেরে নে। সেও ওমনি ওদের সাথে পিছু পিছু চলতে থাকল। একটু এগোতেই মায়া বললো, শর্মিলাদিদি তুমি এমন ঘোমটা টেনেছ কেন তোমার মুখটাই তো ঠিক করে দেখতে পাচ্ছি না। মিনতি বললো, আর সেই থেকে তো কোনো কথাও বলছে না। মিনতির কেমন একটা সন্দেহ হলো। সে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে হাতের লন্ঠনটা ওর মুখের সামনে তুলে ধরলো। লণ্ঠনের আলোয় ওরা দেখল এ শর্মিলা নয়, এ শর্মিলা হতেই পারে না। এর যে মুখটা একপাশে বেঁকে আছে আর লকলকে জিভটা বেরিয়ে নিচের দিকে ঝুলছে তার ওপর চোখ দুটো যেন আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে। মিনতি বললো, এ যে ভূত ! বলেই হাতের লন্ঠনটা তার গায়ে ছুঁড়ে দিয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দেয়। মায়া অমন পৈশাচিক দৃশ্য দেখে একটুও নড়তে পারেনি। সে সেখানে দাঁড়িয়েই চিৎকার করতে থাকে। নৃপতিবাবু চিৎকার শুনে টর্চ নিয়ে ছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলেন মিনতি সদর দরজার কাছে এসে হাঁপাচ্ছে। নৃপতিবাবু বললেন, মায়া কোথায় চিৎকার করছে? মিনতি বললো, তেমাথার সামনে। ওখানে একটা ভূত বাবা ! আমি ভূতটার গায়ে লন্ঠন ছুঁড়ে দিয়ে পালিয়ে এসেছি। আর মায়া ওখানে একা রয়ে গেছে। তুই ওকে একা ছেড়ে এলি কি করে ?
নৃপতিবাবু যখন পৌঁছলেন আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। জমাট বাঁধা অন্ধকার চারিদিক ঘিরে ধরেছে। শোনা যাচ্ছে শুধু মায়ার চাপা গোঙানি। নৃপতিবাবু তাকে বাড়ি নিয়ে এসে দাওয়ায় বসালেন। তারপর শুরু হলো গায়ে লন্ঠন ছুঁড়ে দেওয়ার প্রতিশোধ। যত রাত বাড়তে থাকে দুই বোনের ভুল বকা তত বাড়ে। এদিকে জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে আর ওদিকে ওরা বলছে ওই দেখো বাবা ওই ভূতটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকছে আমাদের।
মিনতি বললো, বাবা তুমি শুনতে পাচ্ছো না ও যে বলছে আয় তোদের লন্ঠনটা ফেরত নিয়ে যা।

Keep reading

More >

মানদন্ড