সময়

বীরেন বাবু এক বেসরকারি অফিসের নিম্নশ্রেণির কর্মচারী। কম্পিউটারের এই যুগে উনি এখনো হাতে লিখেই হিসাব করেন। সবাই তা নিয়ে কানাঘুষো, …

বীরেন বাবু এক বেসরকারি অফিসের নিম্নশ্রেণির কর্মচারী। কম্পিউটারের এই যুগে উনি এখনো হাতে লিখেই হিসাব করেন। সবাই তা নিয়ে কানাঘুষো, হাসাহাসি করেলও বীরেন বাবুর কিছুই আসে যায় না। বীরেন বাবু একাই থাকেন। বছর পাঁচেক হল ওনার স্ত্রী মারা যান। ছেলে বিদেশে থাকে। ছেলের বিয়ের পর আর তেমন কোন রকম যোগাযোগ নেই বললেই চলে। বছরে দু একবার আসে, দিন দশেক থেকে আবার রওনা দেয়। ঘড়ি বীরেনবাবুর সবচেয়ে অন্যতম শখ। বাড়িতে বিভিন্ন রকমের হাত ঘড়ি, দেওয়াল ঘড়ি সংগ্রহ করে রেখেছেন। নানান দেশ বিদেশের ঘড়ি জোগাড় করে রাখা ওনার একধরনের নেশা বলা চলে । অফিসের কেউ বা কোন চেনা পরিচিত যদি বিদেশ যায় তাহলে বীরেনবাবু ঠিক সময় মতো হাজির হয় ঘড়ি আনতে দেওয়ার জন্য।
বিকেলের দিকে লালুর চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে গিয়ে বীরেনবাবু জানতে পারেন পাশের পাড়ার বল্টুর ছোট মামা বিদেশ যাচ্ছেন। তিনি নাকি মেক্সিকো তে চাকরি পেয়েছেন। সোজা গিয়ে ধরেন বল্টুকে, তার ছোটমামাকে বলে আর কিছু অগ্রিম টাকা দিয়ে মহানন্দে বাড়ি ফেরেন।
বেশ কয়েকমাস পর বল্টুর মামা দেশে ফিরতেই বল্টু নিজে এসে ঘড়ি দিয়ে আর বাকি থাকা কিছু টাকা নিয়ে যায়। এই ঘড়িটা হাত ঘড়ি। ঘড়ির বেল্টটা বাদামী রঙের চামড়ার, ডায়ালটা সোনালী রঙের, তিনটি কাঁটাও তাই। সংখ্যাগুলো আলাদাভাবে আলাদাভাবে বারো রকমের ডিজাইন করা। এককথায় চমৎকার হাতঘড়ি। অফিসের দাসবাবু তো বলেই বসলেন আহঃ খাসা হয়েছে।
বীরেনবাবু প্রায় সময়ই ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ঐ ছোট্ট একটা হাতঘড়ি বীরেনবাবুর মনের অদ্ভুত রকমের শান্তি এনে দেয়। কয়েকমাস ভালোভাবে চলার পর একদিন ঘড়িটা গেল বন্ধ হয়ে। বীরেনবাবুর মাথা গেল বিগড়ে। এ ঘড়ির ব্যাটারি তো এখানে পাওয়াও যাবে না। তবু চলে গেলেন ধর্মতলার রফিকের দোকানে। রফিক যদি কিছু জোগাড় করে ঘড়িটা ঠিক করতে পারে। রফিকের কাছে যেতেই রফিক বলল বীরেনদা ঘড়ি তো ঠিকই আছে, দিব্যি চলছে! শুধু শুধু আপনি এতটা এলেন। কিন্তু এই রকম ঘড়ি তো এ তল্লাটের নয়। এটা মেক্সিকো থেকে আনিয়েছি, স্পেশাল অর্ডার বললেন বীরেনবাবু।
রফিক খানিক্ষন বীরেনবাবুর দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর মুচকি হেসে বলল আপনি পারেন বটে।
এই ভাবে বেশ কিছুদিন ঠিক ভাবে চলার পর আবার গেল ঘড়ি বন্ধ হয়ে। বীরেনবাবু বিরক্ত হয়ে উঠলেন। তার সাধের ঘড়ি যদি এই ভাবে থেমে থেমে চলতে থাকে তাহলেই তো হয়ে গেল। আবার সন্ধ্যের দিকে রফিকের কাছে। রফিক আবার ঘড়ি নেড়েচেড়ে দেখে বলল বীরেনদা ঠিকই তো আছে। আপনার ব্যাপারটা কি বলুন তো?
দুদিন পর অফিস বেরোনোর সময় বাসস্টপে দাঁড়িয়েই আছেন অফিস গামী কোন বাস আর আসে না। কোন ট্যাক্সিও যাচ্ছে না ওইদিকে। এদিকে দেরীও হয়ে যাচ্ছে। অফিসে বড় প্রোজেক্টের কাজ চলছে। ম্যানেজারবাবু সবাইকে যথা সময়ে হাজির দেবার জন্য বলে গেছেন। ঘড়িটা আবার বন্ধ হয়ে গেছে। বীরেনবাবু মোবাইল ফোন বের করে ঘড়ির সাথে সময় মিলিয়ে নিলেন। ঘড়ি আবার চলতে থাকল। মনে মনে খুব রাগ হতে থাকল। অবশেষে বাস এলো। উঠে পড়লেন। বাসে জনা কয়েক লোকজন। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর পাশের সিটে বসে থাকা ভদ্রমহিলাটি জিজ্ঞাসা করলেন দাদা কটা বাজে? বীরেনবাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ঘড়িটা আবার বন্ধ হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে সময় বলতে হল। খুব অপমানিত বোধ হল বীরেনবাবুর। মিনিট দশেক আগেই বন্ধ হয়েছে। ঘড়িটা আর মেলালেন না। আর খানিক পথ যাবার পরেই বাসের চাকা গেল লিক হয়ে। দুবার ঘোঁৎ ঘোঁৎ আওয়াজ করে বাসটা সাইডে দাঁড়িয়ে গেল। বীরেনবাবু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন আজ আর অফিস যাওয়া হল না। বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভালো। বাড়ি ফিরেই বীরেনবাবু দেখলেন মা তারা লটারি সেন্টার থেকে লোক এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খোঁজ খবর করছে। কি ব্যাপার দিপু হঠাৎ এই পাড়ায়? আরে আপনাকেই তো খুঁজছিলাম বললো দিপু।
কেন কি হয়েছে দিপু? বীরেনদা আপনি ভুলে গেলেন, দু সপ্তাহ আগে আমার লটারি সেন্টার থেকে লটারি কাটলেন? ও হ্যাঁ হ্যাঁ। তা কিছু পেয়েছি? বললেন বীরেনবাবু। ২১ ইঞ্চি ফিলিপ্স এর কালার টিভি জিতেছেন। আপনি আসছেন না দেখে আমিই চলে এলাম। আজ সন্ধ্যেতে গিয়ে নিয়ে আসবেন। আর আমার কমিসনটাও একটু দেখবেন হে হে হে। আজ আসি। ঠিক আছে আমি সময় করে যাবো, বললেন বীরেনবাবু। ঘরে ঢুকে হাত ঘড়িটা খুলতে গিয়ে দেখেন ঘড়িটা আবার চলতে শুরু করেছে। কিন্তু একি ঘড়িটা তো অনেক্ষন আগেই বন্ধ হয়ে গেছিল, তাহলে এখনকার সময়ের সাথে মিলল কি করে। যদি চলতেও শুরু করে এখনের সময় থেকে তো পিছিয়ে থাকার কথা। বীরেনবাবু অনেক্ষন তাজ্জব হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
পরেরদিন সকালে বাজার করতে যাবেন বলে স্কুটার বের করলেন। বেশ খানিক্ষন চেষ্টা করেও স্টার্ট আর দিতে পারলেন না। যথারীতি স্কুটারটা আবার গ্যারেজে রেখে এলেন। ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলেন আবার বন্ধ হয়েছে মিনিট পঁচিশ আগে। অগত্যা হেঁটেই যেতে হল বাজার। বীরেনবাবু বললেন ধুস টাকাটাই বেকার গেল। বল্টুকে কিছু বলাও যাবে না। সেদিন আর অফিসে ঐ ঘড়ি পরে গেলেন না। তার জায়গায় অন্য একটি পড়লেন। সেটা যে কি ভুল করেছিলেন সেটা তিনি ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন অফিস পৌঁছে। ব্যাল্যান্স সীট মিলছে না, বিদেশি ক্লায়েন্টরা কড়া মাপের কথা শুনিয়েছেন বড়বাবুকে। বড়বাবু নিজের কেবিনে সমস্ত কর্মচারীদের ডেকে ডেকে অপমান করেছেন ঠিক করে কাজ না হওয়ার দরুন। তার ওপর বীরেনবাবু আগেরদিন অফিস না যাবার কৈফিয়ত দিতে গিয়ে একটু বেশি ঝাড় খেলেন বড়বাবুর কাছে। এতো দিন কাজ করায় যেটা দিতে হয় নি। সেদিন খুবই ঘেঁটে ছিলেন।
বীরেনবাবু মাস খানেকের মধ্যে ঘড়িটার ব্যাপার স্যাপার খানিক আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। ঘড়ির এই যখন তখন বন্ধ হয়ে যাওয়া আবার নিজের মতো সময় মিলিয়ে চালু হয়ে যাওয়া। তার কারণ ঘড়ি বন্ধ থাকলেই সময় খুব খারাপ যায়। আর যখনই চালু থাকে বেশ ভালোই যায়। এরই মধ্যে ঘড়ির সময় মিলিয়ে লটারি টিকিট কেটে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। পালদার কথা শুনে শেয়ার মার্কেটে টাকা ইনভেষ্ট করে লাভবান হয়েছেন। অফিসে পদোন্নতি হয়েছে। তেমনি খারপও গেছে। মোবাইল ফোন হাত থেকে পড়ে গিয়ে খারাপ হওয়া, বাজার করে ফেরার পথে ওনার স্কুটারের সাথে এক বাইকের ধাক্কায় পড়ে গিয়ে হাতে চোট, অফিস থেকে ফেরার সময় পকেটমারি। সেবার তো মরতে বসেছিলেন। এমন জ্বরে পড়লেন ওঠার ক্ষমতা নেই। একটু সুস্থ হয়েই বল্টুর কাছে গিয়ে খোঁজ করেন এই ঘড়ির ব্যাপারে। বল্টু বলে মামা ঘড়িটা এক অ্যান্টিক জিনিসপত্র রাখার দোকান থেকে কিনে আনেন। তাই একটু দাম পড়েছে। আর তো কিছু মামা বলেনি। এর বেশী কিছুই সে জানে না। বীরেনবাবু আর কথা বাড়াননি। বাড়ি ফিরে আসেন। বুঝতেই পেরেছিলেন এটি এক ভৌতিক ঘড়ি।
বীরেনবাবু এরপর থেকে সব কাজ ঘড়ি দেখে সময় মতো করতে থাকেন। পদোন্নতি হবার ফলে নতুন প্রোজেক্টের কাজের বেশ খানিক দায়িত্ব ওনার ওপর এসে পড়েন। হাতে লিখে হিসাব করেন কম্পিউটার জানেন না সেরকম ভাবে। তাই একটু অসুবিধা হচ্ছিলই। বীরেনবাবু ঘড়ি দেখে কাজে বসবেন না হলে বসবেন না। এই সব নানা কারণে প্রায়ই প্রোজেক্ট ম্যানেজার এর সাথে মনোমালিন্য হয়ে যাচ্ছিল যখন তখন। বীরেনবাবু ঘড়ির প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিলেন দিন দিন। সেটা উনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন ভালো রকমই।
প্রোজেক্ট জমা দেবার দিন বীরেনবাবুর বেরোতে দেরী হয়ে যায়। বেশ অনেক রাত অবধি কাজ করে ফাইল গুলো রেডি করেন। অনেকবার ম্যানেজারবাবু ফোন করেছেন ওনাকে। আগের দিন বলেই দিয়ে ছিলেন দেরী যেন না হয়। কিন্তু আজকেই ঘড়িটা বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। বীরেনবাবু বারবার সময় মিলিয়ে নিচ্ছিলেন। আজকের এই ভালো দিনে যে কেন ঘড়িটা এমন করছে কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। অফিস যাবার বাস ধরার জন্য রাস্তা পাড় হতে যাবেন এমন সময় ম্যানেজারবাবু ফোন করলেন। উনি ভাবলেন অনেক দেরী হয়ে গেছে তাই ম্যানেজারবাবু ফোন করছেন। তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রিসিভ করে কাঁধের সাথে চেপে ধরে ঘড়ির সময় মেলাতে মেলাতে রাস্তা পার হতে লাগলেন। উল্টো দিক থেকে আসা ট্রাকের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে গেলেন। তখনও ফোনে ম্যানেজারবাবু বলতে লাগলেন বীরেনদা আজ মিটিং ক্যান্সেল হয়ে গেছে। ডকুমেন্টস গুলো কাল আনলেও হবে, বীরেনদা হ্যালো হ্যালো? শুনতে পাচ্ছেন বীরেনদা?

Keep reading

More >