সাহেবী প্রবচন ও একটি সকাল

বাস্তব-বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘন্টা আষ্টেক স্বপ্নরাজ্যে বিচরণের পর সেদিনও সকালে রেডিও ওয়েভ বেয়ে ওয়েব দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। স্থবিরতা কাটাতে মোবাইল নিয়ে …

বাস্তব-বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘন্টা আষ্টেক স্বপ্নরাজ্যে বিচরণের পর সেদিনও সকালে রেডিও ওয়েভ বেয়ে ওয়েব দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। স্থবিরতা কাটাতে মোবাইল নিয়ে বসাটা জরুরি, আর মুখ ধোয়ার আগে মুখপুস্তিকায় বিখ্যাত লোকেদের কিছু জ্ঞানগর্ভ বাণী পড়ে নিলে সারা দিনের ভাবনার খোরাকটা পাওয়া যায়। গীতা বা গীতবিতানের লাইনগুলো মোটামুটি চেনা যায়, কিন্তু কালাম সাহেব বা স্বামীজী যে এত ভালো ভালো কথা বলেছেন জানাই ছিল না। মুখচেনা সাহেবদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাণী দিয়েছেন আইনস্টাইন, না চেনা সাহেবরাও কম যান না।

আজ যেমন খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর অগোছালো পোশাক পরা এক বৃদ্ধ সাহেবের বাণী পড়লাম। সাহেবের ছবি দেখে প্রভাত মুখুজ্জ্যের ‘ভিখারি সাহেব’এর বর্ণনা মনে পড়ছিল। যাইহোক, কথাটা ছিল, “Can we teach our kids that a car is not a symbol of success and walking does not mean poverty.” আহা, কি সুন্দর কথা! ভাবতে ভাবতে প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে পার্কের দিকে বেড়াতে বেরোলাম; বেরোতেই হয়, গিন্নির কড়া নজরদারিতে না বেরিয়ে উপায় নেই। তবে কেউ জানে না, আমি পার্কে গিয়ে মোটেই হাঁটি না, চুপচাপ একটা গাছের নিচে বসে থাকি, আর সাতপাঁচ ভাবতে থাকি| একটু বিশ্রামের হয়, রাতে স্বপ্ন দেখার পরিশ্রম আর সকালে উঠে দোমড়ানো ময়লা বেডশিটের বাস্তব সামলানোর কষ্ট কি কম নাকি!

রাস্তায় বেরিয়ে দেখলাম প্রতিদিনের মতোই আরেকটা দিন শুরু হচ্ছে; রাস্তার দুপাশে সার দিয়ে গাড়ি দাঁড় করানো আছে। ট্যাক্সি, অটো, বেশ কিছু প্রাইভেট গাড়িও আছে। কিছু ট্যাক্সি ড্রাইভার গাড়ি বের করছে, কেউ বনেট তুলে শেষবারের মত এটা ওটা দেখে নিচ্ছে। রাস্তার টাইমকলে এখন জল এসেছে, তাই জোরকদমে গাড়ি ধোওয়া চলছে। দুচারজন ছোকরা, যারা ভবিষ্যতে ট্যাক্সি ড্রাইভার হওয়ার আশায় এখন খালাসির কাজ করে, তাদের উৎসাহ অনেক বেশি। হাফপ্যান্ট পরে হাতে বালতি মগ আর লাল হলুদ কাপড় নিয়ে আগের দিনের ধূলো ময়লা পরিষ্কারে ব্যস্ত তারা।

এদের মধ্যে একটা হাড় জিরজিরে লোককে দেখি প্রতিদিন, শতছিন্ন  লুঙ্গিটা প্রায় নেংটির মত করে পরা। অনেকবারই দেখেছি হাতে পাঁচ সাতখানা গাড়ির চাবি থাকতে, কিন্তু লোকটা না মালিক, না ড্রাইভার, না খালাসী; লোকটা শুধু গাড়ি ধুয়েই জীবন চালায়। আজ দেখলাম পায়ের কাছে বালতি রেখে মগ হাতে লোকটা কিছু ভাবছে। ভাবতে ভাবতে কোমরের কাছে চুলকে নিচ্ছে, সারা সকাল সস্তার সাবানজল গায়ে মেখে থাকতে হয় লুঙ্গির কষির কাছটায় বড্ড চুলকায় কিনা!

কি ভাবছে কে জানে! তেলকালি সাবান মেশা জলে জায়গাটা কাদাকাদা পিচ্ছিল; হয়তো ভাবছে পা পিছলে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা গাড়ি পাওয়া যাবে কিনা| গাড়ির কাঁচে আজকাল হরেক স্টিকার লাগানো থাকে, কম্পিউটার লাগানো স্টিকারও আছে; গাড়ি চুরি হলে নাকি খুঁজে বার করতে খুব সুবিধা| হয়তো ভাবছে জলে স্টিকারটার কিছু ক্ষতি হবে কিনা বা গাড়ির কিছু হলে প্রথমেই ওর ডাক পড়ে, প্রশ্নের পর প্রশ্ন, গালাগালি কখনো কখনো চড় থাপ্পড় থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ায় ব্যাপারটা। হয়তো ভাবছে ওই স্টিকারটা ওকে সেই সমস্যা থেকে মুক্তি দেবে কিনা।

পায়ে পায়ে পার্কে ঢুকে পড়েছি। প্রতিদিনের মতোই পার্কে হাঁটিয়েদের  ভিড়; আট থেকে আশি, ঝাঁকে ঝাঁকে সবাই কেবল হেঁটেই যাচ্ছে। আলো ফোটার আগে থেকে সূর্য্য মাথায় চড়া পর্যন্ত এই ঘাম ঝরানোর পালা চলতেই থাকে| হাঁটিয়েদের চেহারা, পোশাক, দৃপ্ত ভঙ্গি দেখে ঝরে পড়া ঘামের সঙ্গে রুজিরুটির সম্পর্ক আছে মনে হয় না|

শুধু হাঁটার জন্যই বিশেষ পোশাক আছে বেশিরভাগ লোকেরই; আঁটো-ঢিলে, ফুল-হাফ, একরঙা-রঙচঙে সবরকম| একই পোশাক প্রতিদিন পরতে আবার অনেককেই দেখা যায় না। পায়ের জুতোও ঝকঝকে; কোম্পানির নাম বা লোগো তার আভিজাত্যের প্রমান দেয়| সে জুতো, হাঁটা শেষ হলে, আরামে বাড়িতে ঘুমোয়, আর সারাদিন তাকে বোঝা বইতে হয় না। গোড়ালির কাছে গুটিয়ে থাকা কেয়ারফুলি কেয়ারলেস মোজাগুলোও চোখ টানে। ছোটবেলায় শিখেছিলাম মোজা হবে টানটান, আঁটো হয়ে থাকবে পায়ের গোছ পর্যন্ত; সে জানা যে ভুল তা পার্কে হাঁটিয়েদের দেখে বুঝেছি। কিছু হাঁটিয়ের মাথায় টুপি, কারও চোখে রোদচশমাও আছে|

হ্যাঁ, আর আছে মোবাইল, প্রায় সবার সঙ্গে। মোবাইল যাদের হাতে, তাদের গতি একটু শ্লথ; যারা পকেটে রেখেছেন তারা হাঁটেন জোরে। অনেকেরই আবার বুক কাঁধ ঘাড়ে সরু তার পেঁচিয়ে আছে, দেখলে গলায় সাপ জড়ানো শিবঠাকুর মনে হয়। অনেকেই আবার পছন্দের জিনিস ভাগ করে নেওয়ায় বিশ্বাসী, তাঁদের মোবাইলের পূজা-প্রেম-ভক্তিরসে মাখামাখি দেশি-বিলিতি গানবাজনার আওয়াজ সবাই শুনতে পায়; গীতার স্তোত্র, গায়েত্রী মন্ত্র, হনুমান চল্লিশা সব কিছুই সবার জন্য। ধুপধুপিয়ে হাঁটার সঙ্গে স্তোত্রপাঠ শুনলে চোখে নটরাজ মূর্তি ভেসে ওঠে। পৈতের সময় ঠাকুর মশাই বলে দিয়েছিলেন গায়েত্রী মন্ত্র কাউকে বলতে নেই। সে শেখা ভুল বলে বুঝেছি পার্কে গিয়ে।

কমিউনিটি লিভিং-এ বিশ্বাসী অনেকেই আবার দলবল নিয়ে গল্প করতে করতে হাঁটেন; পুরুষদের দল আছে, মহিলাদেরও| আবার কিছু সিংহপুরুষ একদল মহিলাকে নিয়ে হাঁটেন; এরা বোধহয় পেট বা হার্টের ডাক্তারের পরামর্শে হাঁটতে আসেন নি, এসেছেন মনোবিদের পরামর্শে মন ভালো রাখতে|

সাহেব বললেন বটে হাঁটতে দেখলে গরিব বলে ভুল হতে পারে, কিন্তু এদের কাউকে দেখেই তা হওয়ার উপায় নেই। শুধু কিছু অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে সন্দেহের উদ্রেক করে| নিমের দাঁতন, কচি নিমপাতা এসব হাতে নিয়ে এরা অন্য হাঁটিয়েদের পেছন পেছন দৌড়োয়, আর বলতে থাকে – দশ টাকায় তিন আঁটি, নাও না বাবু| বেশিরভাগ সময় দশ টাকায় চার আঁটি দিতে বাধ্য হয়, পার্কেরই গাছের বলে ‘কস্ট অফ ক্যাপিটাল’ না থাকার যুক্তিতে। এককোণে এক বুড়ো বসে কিছু প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে, তাতে থাকে কচি গম গাছের রস, উচ্ছের রস, আমলকির রস ইত্যাদি, কাগজের কাপে ঢেলে বিক্রি করে। আগে কেটলি নিয়ে ঘুরে ঘুরে চা বেচত, এখন ‘বিজনেস ডাইভার্সিফাই’ করেছে। গেটের ঠিক বাইরে তাজা শাকপাতা লেবু লংকা এসব নিয়ে দুয়েকজন মহিলা বসে চট বিছিয়ে, যা আনে বিক্রি হয়ে যায়। ‘স্টক পাইলিং’ নেই, ‘ক্যাপিটাল ব্লক’ হয় না| হ্যাঁ, আর কিছু লোক, যারা পার্কের বেঞ্চগুলোতে শুয়ে বসে কাটায়, হাঁটিয়েদের ভিড় শুরু হওয়ার আগেই তারা কোথায় যেন চলে যায়। সেটাই বাঞ্ছনীয়, নয়তো দেশের মুন্ডপাত, সরকারের শ্রাদ্ধ আর বিলেতের গুণগানে পার্কের প্রভাতসংগীত চাপা পড়ে যাবে। যে ব্যবসায়ীর কস্ট অফ ক্যাপিটাল নেই, সময় মতো বিজনেস ডিভার্সিফাই করতে পারে, ক্যাপিটাল ব্লক নেই, তাদের আর যাই হোক গরিব বলা যায় না বোধহয়। আর দেউলিয়া কিনা বিচারের সময় যারা গা ঢাকা দিতে পারে তারা গরিব একথা কেউ কোনোদিন বিশ্বাস করেনি। তাছাড়া এরা তো ঠিক হাঁটিয়ের দলে নয়, তাই এদের গরিবিয়ানা বিচার করার দরকারও নেই।

সাহেব কাচ্চাবাচ্চাদের শেখানোর কথা বলেছেন; শুধু বলেন নি, জ্বলন্ত প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছেন সকাল সকাল। বাপুহে, শেখাতে আপত্তি তো নেই; জন্ম ‘টিচার’ আমি, হাতে অঢেল সময় আছে, সুযোগ পেলেই জ্ঞান দেওয়ার একটা মজ্জাগত অভ্যেসও আমার আছে। শুধু নিজের ছেলেপুলে কেন, পাড়ার এন্ডিগেন্ডি, ধেড়েবুড়ো সবার ঘেঁটি ধরে ‘টিচ’ করতে পারি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জানা জিনিসগুলো সব বদলে যায় যে, তাহলে ঠিক কি শেখাবো! ‘টিচিং’টা ‘চিটিং’ হয়ে যাবে না তো!

স্মৃতি হাতড়ে স্কুলে শেখা জিনিসগুলো মনে করার চেষ্টা করলাম, খুব অল্পই মনে পড়ল। মনে পড়ার মধ্যে বেশিরভাগটাই ক্লাস টেন-এ পড়া; আসলে সব ক্লাসে মাত্র একবছর পড়েছিলাম, টেন-এ পনেরো মাস| তাছাড়া মাধ্যমিকের হুড়কো ছিল|

বাংলায় ভারতচন্দ্রের “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”র ব্যাখ্যা বেশ মনে পড়ল| ওখানেই শিখেছিলাম শ্লেষ অলংকার, তাও একটু আধটু মনে পড়ল| নিরুপমার মৃত্যু এবং পণপ্রথা মনে পড়ল। ইংরেজিতে বোস ইনস্টিটিউট আর কাগজের একটা কোণা ছিঁড়ে লুকিয়ে রাখা চিঠি নিয়ে গোয়েন্দা গল্প ছাড়া আর কিছুই মনে নেই।

অংকে সময়-দূরত্ব আর সুদকষা পরিষ্কার মনে পড়ল; ভালো করেই শিখেছিলাম, এখনো এই দুটোর চর্চা চালিয়ে রেখেছি। তাছাড়া চালে-বালি, দুধে-জল মেশানোর অংকও ছবির মতো মনে আছে; ম্যানেজমেন্ট রিপোর্টে তাই দিয়েই তো চাকরি টিকিয়ে রেখেছি। ভৌতবিজ্ঞানে নিউটনের তৃতীয় সূত্র, অভিকর্ষ, অক্সিজেন তৈরিতে অনুঘটকের ব্যবহার ইত্যাদি কিছুটা মনে পড়ল। কোম্পানির বড়বড় সাহেবসুবোর সঙ্গে ওঠাবসা করতে এগুলো খুব কাজে লাগে এখনও। জীবনবিজ্ঞানে অভিব্যক্তি আর বিবর্তন মনে পড়ল অনেকটাই। বিষয়টা মজ্জাগত করে ফেলেছি একেবারে; ওর ওপরে নির্ভর করেই তো কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যেও টিকে আছি|

ইতিহাসে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ একটু একটু মনে পড়ল, বিশেষ করে মুঘল সেনাবাহিনীর বিশালত্বের কারণে গতি আর সিদ্ধান্তহীনতার পয়েন্টটা; আমাদের সময়ে ওটা ইম্পর্টেন্ট ছিল, কসে মুখস্ত করেছিলাম। ভূগোল আমার কাছে একটু গোলমেলে বিষয় ছিল, তবে কতগুলো বাঁধা গতে উত্তর লিখতে শিখেছিলাম| যেমন সস্তার কয়লা- বিদ্যুৎ, সহজলভ্য কাঁচামাল, জল ও পরিবহনের সুবিধা ইত্যাদিকে একটু ফেনিয়ে লিখলেই কোথাও কোনও শিল্প গড়ে ওঠার কারণ ব্যাখ্যা করা যেত। আজও সেগুলো কাজে লাগিয়ে বাঁধা গতে প্রজেক্ট রিপোর্ট বানাই, শিল্প হোক না হোক আমার নম্বর বাড়ে| ভূগোলের সময়-দ্রাঘিমার অংক তো এখনো প্রায় প্রতিদিন করতে হয়, জাপান-তাইওয়ান-সিঙ্গাপুর-মধ্যপ্রাচ্য-ফ্রান্স-ইতালি-ইংল্যাণ্ড-আমেরিকার সঙ্গে প্রতিনিয়ত মিটিং আর মেইলবাজি করতে হয় কিনা।

এর বাইরে তেমন কিছু মনে পড়ল না; মোদ্দা কথা হল, যেটুকু দিনগত পাপক্ষয়ের কাজে লাগে সেটুকু ছাড়া সব ভুলে গেছি| মনে পড়ে গেল, কিছুদিন আগে মেয়েকে পড়াতে বসে, স্কুলে শেখা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আফগানিস্তানের কথা বলার পর ম্যাপে আর ভারত-আফগানিস্তান সীমান্তই খুঁজে পাই না। মেয়ের গড়াগড়ি খাওয়া হাসি দেখে বুঝলাম যা শিখেছিলাম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে অনেকটাই। স্কুলে, আমাদের ছোটবেলায় ‘ওয়ার্ড বুক’ থেকে ইংরেজি শব্দ শিখতে হত| সেখানেই তো শিখেছিলাম ছাগলছানার ইংরেজি ‘কিড’|

সাহেবের কথা পুরোটাই খুব গোলমেলে মনে হল; হাজার ভেবেও কাকে শেখাবো কি শেখাবো কেন শেখাবো বুঝতে পারলাম না। সফলতা বা দারিদ্র্যের বিচার গাড়ি আর হন্টন দিয়ে শুরু করতে গিয়ে আবার হাসির খোরাক হই আর কি!   তাই আর না ভেবে দু হাত দিয়ে প্যান্টের ধুলো ঝাড়লাম, প্যান্ট থেকে হাতে লাগা ধুলোটাও ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে বাড়ির রাস্তা ধরলাম| সাহেবী প্রবচন থেকে যা বুঝলাম, আমি না গরীব না বড়োলোক; আমার গাড়িও আছে আবার হাঁটিও; তাই জাস্ট একজন মধ্যবিত্ত হিপোক্র্যাট আমি!

=========

(পরে জেনেছি ছবির সেই সাহেব এক বিখ্যাত চিত্রপরিচালক, স্বপ্ন আর কল্পনা দিয়ে মানুষকে ভাবানোই তাঁর কাজ| ভাগ্যিস তাঁর কথামতো কাজে নেমে পড়িনি!)

Keep reading

More >