সৃজনের আসা যাওয়া

ভালোবাসি, তাই যাই –আসি   বড্ড ভিড় থেকে নিজেকে আলাদা করে নিয়ে হলদে আকাশের দিগন্তরেখায় একবার চোখ রাখতেই ক্ষীণ সুরের …

ভালোবাসি, তাই যাই –আসি

 

বড্ড ভিড় থেকে নিজেকে আলাদা করে নিয়ে হলদে আকাশের দিগন্তরেখায় একবার চোখ রাখতেই ক্ষীণ সুরের একটা রেখা দেখা দিয়েও মিলিয়ে গেল! কিংবা চ্ছিন্ন শব্দগুলো  বিসর্জনের দিন থেকে মস্তিষ্কের জানালায়-কার্নিশে সেই যে বাসা বেঁধেছে যাওয়ার নামই নিচ্ছে না ! গোপাল জ্যাঠা যখন ঠাকুরে রঙ চড়াতো কি যে ভালো লাগত ! ধীরে ধীরে চোখ নাক ঠোঁটহীন প্রতিমা ক্রমশ দুর্গা হয়ে উঠত , যেন তারই দিকে চেয়ে আছে! মাটি চাই মাটি! … সেও পারবে , হাতে হাতে গড়ে তুলবে মুর্তি, তুলিতে জ্যান্ত করবে ।

শব্দগুলো ধরে রাখলে কেমন হয়! কিংবা সুর গুলো তারে বাঁধলে! … বন্ধুরা হাসবে , ঠাট্টা করবে … তারা কেন শুনতে পায় না ! তারা কেন দেখতে পায় না !গুমরে থাকতে থাকতে একদিন বাঁধ ভাঙে , এলো মেলো স্রোত ।

অন্যরা পারে নাই তো ! কারন তারা স্বাভাবিক, গতানুগতিক। মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশের (Dorsolateral  prefrontal region) নিজস্ব সেন্সর ব্যাবস্থাকে এরা মেনে চলে । আর তারা ? যারা সৃষ্টিশীল হয় …তারা যত উদ্ভট কথা , আজগুবী চিন্তা ,অলীক সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে , তাদের সেন্সরশিপ অকেজো ।সামাজিক জীবনধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য নয় এমন ঝুঁকিপূর্ণ জীবন যাত্রা তাদের ।চলতি,গড়পরতা ছকের বাইরে চিন্তা করাতেই যেন আশ্চর্‍্য আনন্দ । অন্যরা এই মস্তিষ্কের ছাঁকনিকে, এই  সেন্সরশিপকে অতিক্রম করতে পারে না , এবং সেটাই নাকি স্বাভাবিক অবস্থা !

সৃষ্টিশীল ব্যাক্তি মানে তাহলে কি পাগল ? এক রকম তাইই তো ! মস্তিষ্কের একটি অংশ কাজ করে না তাই একে বিকার বলাই যায় । নিজ মস্তিষ্কের নির্দেশ মেনে আশ্চর্য চিন্তা, বিচিত্র সৃষ্টি, অনাবশ্যক কার্যকলাপ থেকে আটকে রাখা ,  পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গড়পরতা জীবন যাপনই যদি স্বাভাবিকতা হয় ,তবে এঁরা আলবাত পাগল !

ঘোর লাগা থেকে উঠে আসতে থাকে আখর , নানা উদ্দাম সৃষ্টির মাল মশলা । অবচেতনার রাজা একদিন তিলে তিলে গড়ে ফেলে শব্দের পাহাড় , সুরের রামধনু … রঙের অরন্য

তারপর একদিন হঠাৎই অবচেতনার এই আশ্চর্য উর্জা ফুরিয়ে আসে , কিংবা আচমকা কোনো জাগতিক আঘাতে দুমড়ে যায় সৃষ্টিসুধার উৎসমুখ…শুকিয়ে যায় নিজেকে উজ্জীবিত করার স্পৃহা,… সাদা পাতা পড়ে থাকে এক লাইন আঁচড়ের অপেক্ষায় , নগ্ন ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে রাত কেটে যায়…গলায় স্কেল তুলতে হাঁফ ধরে যায়- দমকা কাশি আসে ,হারমোনিয়ামো বেসুরো বাজে যেন  …সৃজনশীল মানুষটি মরে যায় মননে !

এই কি শেষ ? না বোধহয় ,কেউ কেউ ফিরেও আসে … এরকমই একজনের ফিরে আসার গল্প বলব আজ …

 

একটি সুন্দর মন (A Beautiful mind)

নাম – জন ফ্রোবস ন্যাশ জুনিয়র (June 13, 1928 – May 23, 2015) গণিতজ্ঞ । প্রিন্সটন গ্র্যাজুয়েট স্কুলে পড়ার সময় যিনি ছিলেন উদ্ধত, বালকস্বভাব এবং একাধারে প্রতিভাযুক্ত । কে জানত তখন এই জন ন্যাশের গবেষণা যা নন কোওপারেটিভ গেম থিওরির জনক যা “ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম(Nash equilibrium)” নামে খ্যাত হবে এবং  এই গ্রহের অর্থনীতিতে বিপ্লব আনবে ! কে জানত একদিন তাকে নিয়ে সিল্ভিয়া নাসার লিখে ফেলবেন তাঁরই জীবনের উপর ভিত্তি করে উপন্যাস “ A beautiful mind” এবং রন হাওয়ার্ড ২০০১ সালে তৈরী করে ফেলবেন কালজয়ী সিনেমা ওই একই নামে! যে সিনেমা জিতে নেবে চার চারটি একাডেমী এওয়ার্ড! সে যতই ব্যাক্তি জন ন্যাশের জীবনের অনেক কিছু না থাকুক তাঁরই বিচিত্র, রহস্যমণ্ডিত জীবন নিয়েই তৈরী করা এই সিনেমাতে।

এও কি জন বা তার নিকট জনেরা জানতেন একদিন এই জন পাবেন নোবেল পুরস্কার!

মেধাবী ন্যাশ উচ্চশিক্ষা শুরু করেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়রিং দিয়ে , তারপর তিনি সরে আসেন রসায়ন শাস্ত্রে এবং শেষ পর্যন্ত গণিতে।১৯ বছরে স্নাতক হয়ে ন্যাশ বৃত্তিলাভ করে ভর্তি হন প্রিন্সটন গ্র্যাজুয়েট স্কুলে। গণিতে অসামান্য প্রতিভাধর ন্যাশ অবাক করে দেন তাঁর তৎকালীন শিক্ষকদের । ন্যাশ তাঁর কালজয়ী গবেষণা শুরু করেন প্রিন্সটন স্কুলেই।

এহেন জন ন্যাশ একদিন আক্রান্ত হলেন প্যারানয়েড স্ক্রিতজোফেনিয়ায়(Paranoid schizophrenia) , দাখিল হতে হলো হাসপাতালে!

 

লাল টাই পরা লোকগুলো …  

“ঐ …ঐ লাল টাইপরা লোক গুলো আমায় অনুসরন করে আলিসিয়া……ওরা সাংঘাতিক একটা চক্রান্ত করছে! … ঐ বজ্জাত চক্রান্তকারী কমিউনিস্টগুলো একটা সমান্তরাল প্রাশাসন গড়ে তুলছে”

…এমনই ধারনা বয়ে বেরাচ্ছিলেন ন্যাশ ১৯৫৯ সাল নাগাদ ।  ধরে নেওয়া যায় পেন্টাগন এর কিছু আগে, তখন পৃথিবীতে শীতল যুদ্ধের আবহ, ন্যাশকে আমন্ত্রণ করে কিছু দুর্বোদ্ধ সাংকেতিক বার্তার , যা কিনা লেখা সাংকেতি লিপিতে, সেই সাংকেতিক লিপির রহস্য ভাঙতে । এরপর থেকেই ন্যাশের মনে হতে থাকে তাকে ঘিরে গড়ে উঠছে এক গভীর চক্রান্ত ! সব সোভিয়েত শয়তানী ! …তিনি চিঠি লেখেন ওয়াশিংটন দূতাবাসে এই জানিয়ে যে চক্রান্তকারীরা এমনকি একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে ।  ন্যাশ জড়িয়ে পড়ছেন এক বৃহত্তর চক্রান্তে … অনুসরনকারী , চক্রান্তকারী সেই সব লোকগুলিকে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেতেন!……হ্যালুসিনেসন পৌঁছালো চরম পর্যায়। প্রভাব ফেলতে লাগল তার পেশায়, তার মেধালব্ধ সৃষ্টিকর্মে ।

১৯৫৯ এ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি লেকচার দেওয়ার সময় তার সঙ্গীরা বুঝলেন কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে , পরিচিত মানসিক অস্থিতির মানুষ ন্যাশকে নিয়ে যাওয়া হলো ম্যাকলিম হসপিটালে, তাঁকে চিহ্নিত করা হলো প্যারানয়েড স্ক্রিতজোফেনিয়া (Paranoid schizophrenia) আক্রান্ত বলে !

১৯৬১ সালে তাঁকে ভর্তি করা হলো নিউ জার্সি স্টেট হসপিটালে। এভাবে নয় বছর বিভিন্ন মানসিক হাসপতালে থাকতে থাকতে  অন্ধকারে তলিয়ে গেলেন জন ন্যাশ।

 

সিনেমায় নেই

নাঃ… সিনেমায় নেই ন্যাশের ছিলো এক সমকামী ব্যাক্তিত্ব । ন্যাশ র‍্যান্ড কর্পরেশনের প্রজেক্টের কাজ করার সময় তারই এক সহকর্মী(পুরুষ) গানিতজ্ঞকে যৌন প্রস্তাব দেন , যাঁরা নাম জন মিলনর।

ন্যাশের প্রথম প্রেম ও একতরফা আসক্তিও অন্য পুরুষদের প্রতিই । ন্যাশের এরকম অন্তত দুজন পুরুষ সঙ্গী ছিলো যাদের সঙ্গে ন্যাশের বিশেষ ধরনের বন্ধুত্ব ছিলো। ১৯৫৪ সালে  এমন কিছু কাজের জন্য,যা আইনত অশ্লীল ,তাঁকে গ্রেফতারও করা হয় যা তাঁর কেরিয়ারে গভীর ছাপ ফেলে।

মানসিক রোগে আক্রান্ত ন্যাশ ক্রমশ হয়ে ওঠেন প্রিন্সটোনের এক রহস্যময় ,ভৌতিকে ব্যাক্তিত্ব।

 

তবু আশ্চর্য ফিরে আসা !

ন্যাশের জীবনে এর আগেও নারী ছিলো , এমনকি ছিলো সন্তানও । তাঁর বিশেষ বন্ধুত্বের একজন ছিলেন এলিয়ানর স্টিয়ের (Eleanor Stier) , বস্টনবাসী একজন পেশাদার নার্স ।সালটা ১৯৫৩,জনের তখন ২৫ বছর বয়স ,এলিয়ানরের গর্ভে জনের প্রথম সন্তান জন্ম নেয় ।

এরপর আসে সেই নারী যাঁর সক্রীয় সহায়তা ও ধৈর্য ন্যাশকে লড়তে সাহায্য করেছিলো তার দীর্ঘ ,অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিক হাসপাতালের কালকুঠুরী থেকে বেরিয়ে মেধার বিশ্বব্যাপী আলোয় – এলিসিয়া লার্ডে(Alicia Larde) ও ন্যাশ বিয়ে করেন ১৯৫৭ বসন্তে।তাদের প্রথম এবং ন্যাশের দ্বিতীয় পুত্র সন্তান জন্ম নেয় ১৯৫৯ সালে।

ক্রমশ এলিসিয়া ন্যাশের মানসিক বিপর্যয়ের অভিঘাতে ভেঙে পড়তে থাকেন ,এবং একদিন ডিভোর্স ফাইল করেন …সালটা ১৯৬২। এলিসিয়ার সঙ্গ হারান অন্ধকারে নিমজ্জিত, মানসিকভাবে বিপর্যস্থ ন্যাশ।

ন্যাশ আবার ফিরে আসেন এলিসিয়ার কাছে ১৯৭০ সাল নাগাদ। যদিও মানসিক দুরত্ব তখন কয়েক আলোকবর্ষ , এলিসিয়ার দাবী অনুযায়ী তাঁর গৃহে ন্যাশ একজন ভাড়াটে বৈ আর কিছু নন , তবু এলিসিয়ার সহযোগী অবস্থান ও ধৈর্য ন্যাশকে লড়তে সাহায্য করে স্ক্রিতজোফেনিয়ার বিরুদ্ধে, ইনস্যুলিন শক থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে, নিজের ভৌতিক বিভ্রম বা হ্যালুসিনেসান থেকে বেরিয়ে মেধার আশ্চর্য আলোয় ফিরে আসার তীব্র লড়াইয়ে।

তারপর একদিন সারা পৃথিবী কুর্নিশ করে জন ফ্রোবস ন্যাশ জুনিয়রকে…।

১৯৯৪ এ নোবেল কমিটি তাকে সম্মানিত করে Nobel Memorial Prize in Economics দিয়ে ,তার গেম থিওরির বৈপ্লবিক গবেষণার জন্য ।

তুলনায় কম হলেও সৃজনের আসা ,এবং একদিন চলে যাওয়াই সাধারনত দেখা গেলেও , এরকম ফিরে আসার গল্পও রয়েছে ।হয়তো সৃজনের উপযোগী একটি সুন্দর মন,একটি সুন্দর বাসার খোঁজেই।

 

———————————————————–

Keep reading

More >