স্টেথোস্কোপঃ ১

স্টেথোস্কোপঃ ১   আজ খবরের কাগজে বেড়িয়েছে ক্যানিং হাসপাতালে শিশু মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা হয়েছে। রোগির আত্মীয়রা এক বছর …

স্টেথোস্কোপঃ ১

 

আজ খবরের কাগজে বেড়িয়েছে ক্যানিং হাসপাতালে শিশু মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা হয়েছে। রোগির আত্মীয়রা এক বছর আট মাসের এক শিশুর মৃত্যুর জন্য ইমারজেন্সি ডিউটিতে থাকা ডাক্তারবাবুকে ধরে মারধর করেন। ওনাকে বাঁচাতে গিয়ে এক মহিলা চিকিৎসকও প্রহৃত হন। ঘটনাচক্রে সেই মহিলা চিকিৎসক আবার আমার ব্যাচমেট। পরে অবিশ্যি জানতে পারি আমার বন্ধুকে কোন নিগ্রহ সহ্য করতে হয় নি। ডাক্তার এবং মৃত রুগির আত্মীয় উভয়ের তরফ থেকে ক্যানিং থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।

শিশুমৃত্যু সবসময় যন্ত্রণার। হাসপাতালে শিশু বিভাগ সবসময় স্পর্শকাতর। এই ক্ষেত্রে শিশুটির মাথায় অ্যাক্সিডেন্টে চোট লাগে ও রক্তক্ষরণ হয়। বাসন্তী হেলথ সেন্টার থেকে ফিরিয়ে দেয়। সিটি স্ক্যান করে দেখা যায় ইন্টারনাল হেমারেজ। ভালো সেটআপের হাসপাতালও ফিরিয়ে দেয়। বাচ্চাটি ক্যানিং হাসপাতালে মারা যায়। রুগির আত্মীয়দের অভিযোগ হল বাচ্চাটিকে ফেলে রাখা হয় চিকিৎসা হয় নি। ডাক্তারবাবুদের অভিযোগ হল, এই হাসপাতালে এই রুগির চিকিৎসার কোন সুযোগই নেই। ডাক্তারবাবুর ঢাল তরোয়াল না থাকলে তিনি কি করবেন?

আমি কলকাতা ন্যাশানাল মেডিক্যাল কলেজে প্রি-ক্লিনিক্যাল বিষয়ে অধ্যাপনা করি। আমাদের রুগিদের সাথে সরাসরি যোগ নেই। তবু এই মেডিক্যাল কলেজটি যথেষ্ট উপদ্রূত হলেও এখানে সবসময় যে পুলিশ পোস্টিং থাকে তাতে সাময়িকভাবে গন্ডগোল রুখে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ক্যানিং, বাসন্তী, নামখানা এসব যায়গায় যেসব ডাক্তাররা ইমারজেন্সি ডিউটি দেয় তাদের অবস্থা খুবই করুণ। আমি আগে আমার এক স্বর্গত পড়শির মুখে শুনতাম ডাক্তারবাবু নাকি রাতে গ্রামের আল ধরে পেশেন্ট দেখতে গেলে সাপও পথ ছেড়ে দাঁড়ায়। আর আজ কি অবস্থা! আমি যখন আজ থেকে পনের বছর আগে ডাক্তারি পাশ করি তখন অবস্থা খারাপ থাকলেও এতটা ভয়াবহ ছিল না। এই কারণে নতুন পাশ করা ছেলেরা আর সরকারি চাকরিতে উৎসাহ দেখাচ্ছে না। এমনকি অনেকের ডাক্তারি পড়াতেও উৎসাহ নেই।

আসলে প্রায় পনের বছর ধরে ডাক্তারি প্র্যাক্টিস করতে গিয়ে বুঝেছি মানুষের শরীর একটি অত্যাশ্চর্য যন্ত্র। মানুষ যতই মহাকাশে রকেট পাঠাক, স্পেস স্টেশন তৈরি করুক এরকম একটি যন্ত্র সে বানাতে পারবে না। কোনোদিন পারবে না। বিজ্ঞানকে বিশ্বকর্মার কাছে হেরে যেতেই হবে। আমার আট বছরের মেয়ের প্রধান উৎসাহ হল আমাদের শারীরবিদ্যার গল্প শোনা। সে অল্প শুনেই অবাক হয়ে যায়। বলে, বাবা এত কিছু আমাদের হিউম্যান বডিতে হয়? কিভাবে হয় বাবা? ওর বিস্ময় দেখে আমি বুঝতে পারি অতি সামান্য কিছু জেনেই আমার বিস্ময় কেটে গেছে অথচ সত্যি কতই না বিস্ময়ের বাকি আছে। বিজ্ঞানীর বিস্ময় তাই শিশুর মত।

মানুষের দেহের প্রধান অসুবিধা হল অভিযোজনগতভাবে তার মাথা সাঙ্ঘাতিক ক্ষমতাবান হলেও শরীরটা তার বড়ই পল্কা এবং সেই কারণেই রোগ ব্যাধিতে বড়ই ভঙ্গুর। আমরা ডাক্তাররা সে যতই চেষ্টা করি না কেন এই জীবন মৃত্যুর সম্ভাব্যতাকে অস্বীকার করতে পারি না। সাধারণ মানুষ সেটা বোঝে না। তাদের পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভবও নয়। তাই তারা ডাক্তারকে ঈশ্বরের আসনে যেমন বসাতে পারে, শয়তানের আসনে টেনে বসাতেও তাদের এক মিনিট দেরি হয় না।

চতূর্দিকে ভিড়, হৈ-হট্টগোল, আর্ত চিৎকার, বিলাপ, গরম, গায়ের গন্ধ, মুখের গন্ধ, পুঁজের গন্ধ, বাসি রক্তের গন্ধ এর মধ্যে সদ্য এম বি বি এস পাস করা সদ্য গোঁফ গজানো একজন বসে একদিনে গ্রামীণ আউটডোরে প্রায় পাঁচশ রুগি দেখছেন। আপনি তার কাছে কি আশা করেন? আমাদের এই হেলথ কেয়ার সিস্টেম নিয়ে আপনি আপনার সন্তানকে ডাক্তারি পড়ানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখাবেন? সাধারণ মানুষেরও কিছু করার নেই। তারাও কোথায় যাবে? সবচেয়ে অসুবিধা মধ্যবিত্ত মানুষের। ওরা নিম্নবিত্ত মানুষের মত সরকারি হাসপাতালের এক বেডে তৃতীয়জন হয়ে শুয়ে থাকতেও পারবে না আবার কর্পোরেটের কড়ি গোনার ক্ষমতাও তাদের নেই।

গত পাঁচদিন আগে আমার এক প্রতিবেশিকে আমি বাড়িতে দেখতে যাই। ওনাকে আমি গত দশ বছর ধরে দেখছি। ব্লাড সুগার প্রেশার কিডনির অসুখ ওবিসিটি নানা রোগে উনি আক্রান্ত। ওনার ছেলে বলল তিন দিনের জ্বর। আমি দেখলাম সেরকম অসুবিধে নেই। জ্বরের ওষুধ দিয়ে বাড়ি এলাম। ওনার সাথে, ওনার ছেলে মেয়ে বউমার সাথে গল্প করলাম। রাত দেড়টায় ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে কলিং বেল বাজিয়ে ডেকে নিয়ে গেল। বাড়ি গিয়ে দেখি কাকিমা বিছানায় মৃত শুয়ে আছেন। এই অল্প সময়ে মারা গেছেন হয়ত সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ। কিন্তু ঘটনায় আমি ডাক্তার হিসেবেও এত হতচকিত যে আমি কি বলব। ওনাকে আমি দশ বছর দেখছি। আমার পাড়ার লোক। ঘরের পাশের। পুরনো পেশেন্ট ডাক্তারবাবুর আত্মীয়ের মতই হয়ে যান। তাদের কষ্ট আমরাও অনুভব করি। আমি সত্যি এত মর্মাহত হলাম, সারা রাত ঘুমোতে পারলাম না। সে ক্ষেত্রে কারুর কাছে আমাকে জবাব্দিহি করতে হল না। কত নতুন পেশেন্ট আসে। তেমন কারুর ক্ষেত্রে এই দুর্ঘটনা হলে কি হত? আমি গ্রামে পোস্টেড হলে রুগির আত্মীয়দের কেউ প্ররোচিত করলে আমার কি হত? কে বাঁচাত আমাকে?

আমি এমন অনেক দেখেছি। বলতে গেলে অনেক সময় পেরিয়ে যাবে। ধীরে ধীরে বলব। আমার কথা। আমার ডাক্তারি জীবনের কথা। আজ আমি তাই আর প্রশংসায় ভাসি না। গালাগালিকেও উড়িয়ে দিই না। আমি জানি মধ্যাহ্ন সূর্যের মাঝে আমি দাঁড়িয়ে আছি। পুড়ে আমাকে মরতে হবেই। যতক্ষণ না আমি যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে দিয়ে পাকাপাকি গাছের ছায়ায় ফিরে আসছি।

Keep reading

More >