স্বপ্ন ভাঙার ইতিহাস

নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ভাগে যখন Y2K দরজায় কড়া নাড়ছে, কম্পিউটার জানা লোকেদের দর আকাশ ছুঁই ছুঁই, আইটি সেক্টর দুরন্ত বাচ্চার মত …

নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ভাগে যখন Y2K দরজায় কড়া নাড়ছে, কম্পিউটার জানা লোকেদের দর আকাশ ছুঁই ছুঁই, আইটি সেক্টর দুরন্ত বাচ্চার মত দৌড়োচ্ছে, মেয়ের বাপেরা খোঁজ নিচ্ছে ছেলে কোর সেক্টরে আছে না আইটি, তখন ভারতবর্ষের এক বিশাল কোলিয়ারি অঞ্চলের সমস্ত কম্পিউটারের দেখভাল করার চাকরি নিয়ে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হওয়ার পথে পা রাখলাম| কাছাকাছি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র আর অ্যালুমিনিয়াম কারখানাতেও দরকার মতো সাপোর্ট দিতে হবে।

সঙ্গে সদ্য বিয়ে করা সুন্দরী বৌ আর পকেটে ডলার নিয়ে প্লেনের সিঁড়িতে পা রাখা বন্ধুদের দেখে বলতাম, অবশ্যই মনে মনে, দেশের উন্নতির সঙ্গে কয়লা, বিদ্যুৎ, অ্যালুমিনিয়াম আর কম্পিউটারের গভীর সম্পর্ক আছে| প্রাগৈতিহাসিক যুগের কয়লা থেকে আধুনিক কম্পিউটার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার সুযোগ কাজে লাগিয়ে একদিন আম্মো কেউকেটা হব; দেশে কম্পিউটার বিপ্লব আসবে আমার হাত ধরে| শুধু একটু ধৈর্য্য ধরে কম্পিউটারের কাজে দক্ষতা অর্জন করতে হবে, আর দেশ মানে তার ধূলোমাটি-সমাজসংস্কৃতি নিয়ে একটু ‘জানকারি’ থাকতে হবে। তখন আমার মনে, কোর আর কম্পিউটারের “দ্বন্দ্ব অহর্নিশ”|

দক্ষতা অর্জনের আশায় কাজটা খুব মন দিয়ে করতাম; অফিসের কাজের বাইরেও “থোড়াসা দেখিয়ে না”র মতো ব্যক্তিগত অনুরোধেও আপত্তি করতাম না| কম্পিউটার খোলাখুলি আর জোড়াজুড়ি করতে পারতাম বলে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নাম করতে বেশি সময় লাগেনি| খোলাখুলি জোড়াজুড়ি করতাম, ‘দেখে রাখব পরে আসুন’-এর চক্কর ছিলনা বলে জনপ্রিয়তাও ছিল| ফ্লপি ড্রাইভ সাড়ে পাঁচ না সাড়ে তিন ইঞ্চি, ক্যাবিনেট দাঁড়ানো না শোয়ানো, রাস্তাঘাটে এসব পরামর্শের বিনিময়ে চা-সামোসা-পকোড়া, বাড়ি গিয়ে গেম লোড করে দিলে বা ভাইরাস স্ক্যান করলে হালুয়া বা পোহা জুটে যেত| ওখানে কয়লার ধূলোর সঙ্গে কাঁচা টাকা উড়ত, তাই বাড়িতে কম্পিউটার কেনার একটা চল ছিল। অনেকেই জেলা শহরে লেটেস্ট মডেলের কম্পিউটার কিনতে যাওয়ার সময় আমাকে সঙ্গে নিতেন ‘জানকার আদমি’ হিসেবে|

সব মিলিয়ে আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে ‘বিশেষ অজ্ঞতা’ সহ দিব্যি দিন কাটছিল| কিন্তু একটা ঘটনা আমাকে তপস্যার পথ থেকে বিচ্যুত করল; মারি টারি ছিল বোধহয়। ব্যাপারটা খুলেই বলি|

একদিন খবর পেলাম কোলিয়ারির হাসপাতালে বক্ষরোগ বিভাগের একটা কম্পিউটার বিগড়েছে। হাসপাতাল আমাদের কোম্পানির চুক্তির বাইরে হলেও পূর্বপরিচিত বিভাগীয় কর্তা ডঃ রাও আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ‘ইয়াদ’ করেছেন| হাসপাতালের ব্যাপার, মানুষের রোগজ্বালা জীবনমরণের প্রশ্ন; তাছাড়া কয়লার গুঁড়োভর্তি বাতাস, আমার সর্দিকাশির ধাত, দক্ষতা অর্জনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায়ের তাগিদও ছিল| মেকানিকদের মতো টুলব্যাগ নিয়ে ঘোরাঘুরি, আমার ইমেজের সঙ্গে খাপ খায় না; তাই পকেটে শুধু ‘পেচকস’ নিয়ে চললাম দেশসেবা করতে।

গটগটিয়ে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকলাম| যথাস্থানে পৌঁছে দেখলাম ফুসফুস পরীক্ষার একটা বিশাল যন্ত্রের সঙ্গে লাগানো যন্ত্রগণকটি চলছে না; ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ান-পিয়ন সবাই চিন্তিত মুখে টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। দুঃশ্চিন্তার কারণ আছে, আনকোরা নতুন যন্ত্র, এক হর্তাকর্তা সদ্য ফিতে কেটে গেছেন, বুক বাজিয়ে প্রচার হয়েছে বুকের বারোটা বাজলে বড় শহরে যাওয়ার দরকার নেই। এখন যন্ত্র না চললে যন্ত্রণার শেষ থাকবে না, কি রুগী কি ডাক্তারের| তাই ডঃ রাও আমার ‘এক্সপার্ট’স ওপিনিয়ন’ শোনার পরে যন্ত্র সারাই করার জন্য সরবরাহকারী সংস্থায় খবর পাঠাবেন।

যত্র দেশে যদাচারম| আমি টেবিলের কাছে গিয়ে ডাক্তারদের মতোই কম্পিউটারে হাত ছোঁয়ালাম| সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল, মতামত দেওয়াও শুরু হয়ে গেল| গম্ভীরমুখে বললাম, একদম ভীড় করবেন না, আমাকে দেখতে দিন। দেখেশুনে বুঝলাম কম্পিউটার চলছে, ফুসফুস পরীক্ষার যন্ত্রও চলছে; শুধু মনিটরের তারটা খুলে গেছে, তাই ডিসপ্লে নেই; নিশ্চয়ই অতিরিক্ত কর্তব্যপরায়ণ (বা নেশাগ্রস্ত) কোনো ঝাড়ুদারের কাজ|

তারটা ঠিকমতো লাগিয়ে দিতেই আনন্দের হিল্লোল উঠল ঘরের মধ্যে| ডঃ রাও জাপটে ধরে, পিঠ চাপড়ে ধন্যবাদের বন্যায় ভাসিয়ে দিলেন আমাকে। ‘কেমন দিলাম’ ভাব লুকিয়ে রেখে নিস্পৃহ গলায় কি হয়েছিল, সংক্ষেপে জানিয়ে দিলাম| সঙ্গে ঝাড়ুদেওয়ার কিছু নিয়মকানুনও বলে দিলাম| সবাই হাঁ করে শুনল, নিজেকে পেসেন্টপার্টি পরিবৃত ডাক্তার মনে হচ্ছিল| মুখ দেখে সবার মন পড়তে পারছিলাম; মনে মনে নিশ্চই ভাবছিল সবাই, সত্যি কি এক্সপার্ট মাইরি, কম্পিউটার তো জানেই ঝাড়ু দিতেও জানে!

ফেরার জন্য পাততাড়ি গোছানোর সময় দেখলাম ডঃ রাও আরও দুজনের সঙ্গে কি যেন আলোচনা করছেন চাপা গলায়| কথা শেষ করে ডঃ রাও আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বললেন; ভাবলাম কিছু উপহার টুপহারের ব্যাপার হয়তো, ডাক্তাররা শুনেছি অনেক কিছু পান।

ও হরি! পুরোটা শুনে বুঝলাম, কম্পিউটারটা চালু হলেও উপস্থিত লোকজন ঠিক ভরসা পাচ্ছেন না; ভয় পাচ্ছেন আবার যদি খারাপ হয়ে যায়। তাই পুরো মেশিনটা এক রাউন্ড চালিয়ে দেখতে চান ওনারা, চলার সময় কম্পিউটার বেগড়বাই করলে হাতেনাতে পাকড়াও করার জন্য আমার থাকা দরকার। করুণা হল, লক্ষ লক্ষ বছরের পুরোনো মডেলের একটা যন্ত্র নিয়ে কারবার এঁদের, কম্পিউটারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি আর নিত্যনতুন মডেল নিয়ে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। ডঃ রাওয়ের কথা মতো আধ ঘন্টার মামলা, একটা খালি চেয়ারে বসে পড়লাম; ডাক্তারবদ্যিকে না চটানোই ভালো।

ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না, রুগীর নামধাম এন্ট্রি করলে মেশিন চালু হবে আর থামবে একেবারে রিপোর্ট প্রিন্ট করে| একজন আউটডোরে গেল রুগীর খোঁজে। ফিরল নিরাশ হয়ে, ফুসফুসের ওই পরীক্ষাটা করার মতো কোনও রুগী নেই সেদিন| এবার খোঁজ পড়ল ওয়ার্ডে, সেখানেও সুবিধে হল না| যাকে তাকে ধরে পরীক্ষা করাতে ডঃ রাও একটু দোনামনা করছেন, অনাবশ্যক পরীক্ষার জন্য বদনাম হতে পারে|

সবাই হতাশ, আমি কেটে পড়ার তাল করছি, হঠাৎ সরু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ডঃ রাও বললেন, তুমিতো প্রায়ই সর্দিকাশিতে ভোগ, চেম্বারে বহুবার এসেছ, শুয়ে পড়ো।

কথাগুলো বুঝতে সময় লাগল, ঢোঁক গিলে বললাম, আমি? আমার তো কাশি সেরে গেছে।

তা হোক, ঘন ঘন কাশি হলে ফুসফুসের জোর কমে যায়, সে অনেক ঝামেলা। বসে পড়, বসে পড়। তুমি ‘আপনা আদমি’, তোমারই টেস্টগুলো করে দিই। এই আউটডোর থেকে একটা টিকিট করিয়ে আনো; পুরো নামটা কি যেন?

এরপরের কথা সব মনে নেই; শুধু মনে আছে, অনেকক্ষণ শুয়েবসে কাটিয়েছিলাম। এমনিতে শুয়ে বসে সময় কাটানোতে আপত্তির কিছু নেই, কিন্তু বুকেপিঠে ওইসব যন্ত্রপাতি লাগিয়ে ডাক্তারের নির্দেশমত শোওয়াবসা সহজ কাজ নয়, উপভোগ্য তো নয়ই| ‘আপনা আদমি’ হওয়ার ফল প্রতিটা নিঃশ্বাসে টের পাচ্ছিলাম।

– টানো টানো, হ্যাঁ, এইবার ছাড়ো
– আবার টানো, ধরে রাখো, ধর ধর, হ্যাঁ, ফোঁস করে
– না না, মুখ দিয়ে, বড় হাঁ করে
– হ্যাঁ, এইবার কাশো, জোরে, জোরে
– বাঃ, এইতো, সুন্দর, এবার এক নাক বন্ধ করে

ছাড়া পেলাম একসময়| এমন অবস্থা যে ‘হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম’ বা ‘মুক্তির নিঃশ্বাস ফেললাম’ বলার উপায় নেই, এতক্ষন নিঃশ্বাসের কসরৎ করেই হাঁফ ধরেছে যে! জামা গলাতে গলাতে আড়চোখে দেখলাম প্রিন্টার থেকে মহাসমারোহে রিপোর্ট বেরোচ্ছে। রোগবালাই-এর চিহ্ন নেই, খুব সুন্দর রিপোর্ট এসেছে, জানিয়ে দিলেন ডাক্তারবাবু| অন্যরাও এমনভাবে, সম্ভবতঃ অভ্যেস বশে, ‘সব ঠিক আছে’, ‘ভয় নেই’, ‘একদম নরম্যাল’ বলতে লাগল যেন দীর্ঘ রোগভোগের পর জটিল কিছু সন্দেহ করে টেস্ট করা হচ্ছিল| রাগে গা জ্বলছিল, কথাই বলতে পারছিলাম না।

বাইরে এসেই নিকুচি করেছে বলে রিপোর্টটা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেললাম| প্রতিটা নিঃশ্বাসে টের পাচ্ছিলাম, অনুরোধে পড়ে কম্পিউটার কম্পিউটার খেলা বিশেষ অজ্ঞতাই বটে| প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ভুলেও আর ও কাজ নয়|

সত্যিই আর কম্পিউটার নিয়ে ‘খোলাখুলি’ বা ‘জোড়াজুড়ি’র কাজ শত জোরাজুরিতেও করিনি| এমনকি থানা থেকে আসা অনুরোধও ফিরিয়ে দিয়েছি, যদি কম্পিউটারে কেসের হিস্ট্রি এন্ট্রি হচ্ছে কিনা দেখার জন্য আমার নামেই কেস ঠুকে দেয়!

*******************************************************************

(এই লেখাটি ফেসবুক-এ পোস্টানো হয়েছিল)

Keep reading

More >