হল্লুমান

লীলা মজুমদার ‘লঙ্কাদহন পালা’ তে এই নামেই সম্বোধন করিয়েছিলেন পবনপুত্রকে। উনি বীর, উনি ভদ্র (বানর সুলভ নন), উনি সাত্তিক, নিরহঙ্কারী …

লীলা মজুমদার ‘লঙ্কাদহন পালা’ তে এই নামেই সম্বোধন করিয়েছিলেন পবনপুত্রকে।

উনি বীর, উনি ভদ্র (বানর সুলভ নন), উনি সাত্তিক, নিরহঙ্কারী এবং দেখা যাচ্ছে যে যুদ্ধটা স্রেফ একা দিন ৩/৪ এ নামিয়ে দিতে পারতেন, রামের জন্য ১৪দিন ধরে বোরডাম সহ্য করলেন। মাঝখানে একটু ‘লু ব্রেক’ এর মত গন্ধমাদন আনতে গেছিলেন এই যা।

আমাদের ওয়ার্ক এডুকেশন- ফিজিকাল এডুকেশন এর স্যার একটা গল্প করতেন (যখন যখন ওনার সাবধান-বিশ্রাম এর প্যানপ্যানানি ভাল লাগতনা)। লঙ্কা টঙ্কার যুদ্ধ মিটে গেছে, হনূমান কিষ্কিন্ধায় গেছেন, ওনার মায়ের সাথে একবার দেখা করতে। মা কে রামের বীরত্বের অনেক গল্প বলছেন, কিভাবে তিনি রাবনের মত বীরকে মারলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। হনুমানের মাতৃদেবী পুজো-আচ্চা জাতীয় কিছু একটা করছিলেন আর গপ্পো শুনছিলেন, তো হাতের কাজটা সেরে নিয়ে বললেন, “তুই একটা আস্ত মুর্খ!”

হনুমান তো হাঁ! একটা ইয়াব্বড় সাগর লাফালুম, এমনি ঢাউস একটা পর্বত বগলে করে নিয়ে এলুম, রামকে কাঁধে চড়িয়ে যুদ্ধু করালুম আর বলে কিনা আমি মুর্খ!

তা অঞ্জনা (স্যার নাম বলেননি কোনদিন) দেবী বললেন, “হ্যাঁ, ভেবে দেখ তুই অতবড় পাহাড়টাকে না এনে টুকুস করে লঙ্কাটাকে এনে রামের দোরগোড়ায় রাখতে পারতি, বেকার এত খাটনি হতনা।”

আজ কি একটা কথা হতে হতে পুরাণের কথায় চলে গেছিলাম সেখান থেকে কথা এল সমস্ত পুরাণের বেস লাইন সেম, শুধু একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গপ্পো বলা হয়েছে, মায় চরিত্র গুলোও এক রকম। চীনা মিথোলজিতে ‘মাঙ্কি কিং’ বলে একটি চরিত্র আছে যিনি দুর্বিনীত ছিলেন (হনুমান ও ছোটবেলায় ছিলেন), দেবতারা তাকে বর দিয়ে রেখেছিলেন যে এই মাঙ্কি কিং মরবেওনা আর কেউ তার লোম ও ছিঁড়তে (এখানে কথাটা উপযুক্তার্থে ব্যবহৃত) পারবেনা। হনুমানেরও এরকম বর ছিল। এঁকেও (মাঙ্কি কিং) মাঝে মধ্যে মনে করিয়ে দিতে হত কি ভীষণ ক্ষমতা এঁর, হনুমানকেও দিতে হয়েছিল সাগর পার হবার সময়। মোদ্দা কথা হল হয় বাল্মিকী নয় চীনা ম্যান কেউ একজন ঝেঁপেছে আর নয়ত সে সময় কপিরাইট নিয়ে বাওয়াল হত না।

একটু হেজিয়ে নিলাম, আর একটু। আসল কথা হল এই কথা বার্তা থেকে আমার মনে হল বাল্মিকী হনুমানের মত লোককে ঠিক স্পেস দেয়নি। ভারতীয় সাহিত্যের এই এক দোষ, বুদ্ধির গুন গাইতে বেশি ভালবাসে, গায়ে শক্তি থাকাটা যেন শুধুই দু-ফোটার অতিরিক্ত পোলিও খাবার ফল। দেখুন রাম, অর্জুন এদের নিয়ে কি আদিখ্যেতা! এমন যে যারা একটু বলশালী বা স্বাস্থ্যবান হন তারা যেন মাথামোটা হবেনই, এবং তারা প্রেম ট্রেমও করতে পারবেন না। বলরাম সারা জীবন মদ খেয়ে কাটালেন কেন? কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় তীর্থে চলে গেলেন কেন? ব্যাসদেব চোখের সামনে কৃষ্ণ কে দিয়ে গুচ্ছ প্রেম করালেন আর ওঁকে? এদিকে অ্যাকিলিস কে দেখুন (ট্রয় সিনিমার ইন্ট্রোডাকশন সিনটার কথা মনে করুন)।

মানে এই মেগা সিরিয়াল ধারা আবহমান কাল ধরে চলে আসছে, নইলে কেউ একজন লিখতে পারত হনূমান বা ভীম কে নিয়ে কিছু একটা, এক রাজশেখর বসু ছাড়া আর কেউ হাতই দিলেন না। অবিচার!

তা যাক কি আর করা! আমি উপেন্দ্রকিশোর এ আসি। ইনি ছেলেদের রামায়ণ, মহাভারত লিখেছিলেন (আমি দেখেছি এই নামকরণে ভুল করার ফলে মেয়েরা বিশেষ করে এই বই গুলো বোধহয় পড়েইনি)। ওখানে রামায়নের একটা জায়গায় রাবণ আর হনুমানের একটা মারামারির জায়গা ছিল। উফ! কি ভীষণ কম মারামারি লিখে কি এপিক মারামারির পর্যায়ে নিয়ে গেছেন কি বলব। গল্পটা এরকম, রাবন তো সেজেগুজে এসেছেন আজ রাম-লক্ষনকে কেলিয়ে লাট করবেন বলে। এসেই শক্তিশেল ছুড়ে দিলেন লক্ষণকে আধমরা করে। এইবার হনুমান ক্ষেপে গেলেন, গিয়ে এক লাফে রথে চড়ে রাবণের বুকে এক কিল। রাবণ মিনিট পাঁচেক অজ্ঞান। হনূমান এতটা ভাবতে পারেননি, দশটা মাথা, কুড়িটা হাত এক কিলেই কেলিয়ে যাবেন এটা দেখে ভেবলে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাবণ উঠেই হনুমানকে এক থাবড়া। এরপর আর মারামারির কথা লেখেননি।

🙁 বাল্মিকী তো ওপথই মারাননি। আসলে গপ্পোটা এখানেই, রাবণকে মারার টেন্ডারটি রামের ছিল তাই কবি আর চাপ নেননি। কিন্তু ঐ প্রথমে লিখেছি, হনুমান লড়লে ৩থেকে ৪দিন লড়াই হত। রাবন যতবড় বীরই হোন হনুমান তো মরত না আর ঐ রেটে লাফালাফি করলে রাবন জাস্ট হাঁপিয়ে গিয়ে সীতাকে ছেড়ে দিত। একটাই প্রবলেম হত, মধু কবির অত ভাল কাব্যটা লেখা হতনা এই যা!

Keep reading

More >