হাতের লেখার খাতা

বাবা-মা যখন জমি কিনলো বাড়ি করবে বলে,তখন আমি ফাইভে পড়ি।আমাদের বাসাবাড়ির পাশের পাড়ায় কেনা হলো জমি।এর আগে বহু জমি-বাড়ি দেখেছে …

বাবা-মা যখন জমি কিনলো বাড়ি করবে বলে,তখন আমি ফাইভে পড়ি।আমাদের বাসাবাড়ির পাশের পাড়ায় কেনা হলো জমি।এর আগে বহু জমি-বাড়ি দেখেছে বাবা।একবার তো একটা বাড়িসহ জমি রেজিস্ট্রির জন্য অ্যডভান্সও করা হয়ে গেল একগাদা টাকা।তার পর পরই সেই জমির লোক বললো,”বাড়ি দেবো না।”টেনশনে টেনশনে মায়ের রাতের ঘুম উড়ে গেল।বাবার রক্তে সুগার বেড়ে গেল।বাবা চিনি খাওয়া ছেড়ে দিল।পাঁঠার মাংস,আলু,ভাত,রসগোল্লা সঅঅব ছেড়ে দিলো।তারও বহুবছর পর ঘুরে ঘুরে জুতোর শুকতলা খুইয়ে সেই টাকা উদ্ধার হলো।তাদের বাড়ির মেয়েরা রোজ বিকেলে আমার মায়ের সঙ্গে গল্প করতে আসতো।আমাদের বাসাবাড়ির বারান্দায় বসে মুড়ি-সিঙাড়া খেয়ে ‘খাসখবর’ আর ‘জন্মভূমি’ দেখতো।তাদের তৎকালীন প্রেমিকদের গল্প করতো।আমার আর ভাইয়ের জন্মদিনে ইন্দ্রাণী স্টোর্স থেকে কেনা পেনসেট উপহার দিতো…একটা বলপেন আর একটা নিব্ পেন।শুধু টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলতো না কেউ।এতো বড়ো দাগা দেওয়ার পরও মা তাদের সঙ্গে কিভাবে সম্পর্ক রাখতো,এটা আজও আমার মাথায় ঢোকেনি।

বাবা-মা জমি দেখতো।আমাকেও নিতো সঙ্গে।কিছুদিন পর আর কথা এগোতো না।আমার কিরকম বদ্ধমূল ধারণা হলো,আমি বোধহয় অপয়া।আমি দেখলে আর আমাদের জমি-বাড়ি হবে না।একটা নিজস্ব বারান্দা আর একটা খোলা ছাদ পাওয়া হবে না।সারাজীবন পিসিমনির এই স্যাঁতসেঁতে বাড়িতে বাস করতে হবে।আমি বাবার সঙ্গে জমি দেখতে যাওয়া ছেড়েই দিলাম।তারই পর পর বাবা এই জমিটা কিনলো।টালির একটা ঘরওয়ালা জমি।সামনে বেড়া।পিছনে বাঁশঝাড়।আমি বললাম,”রেজিস্ট্রি হোক,তারপর জমি দেখবো।”একটা রোববার আমাদের বাসাবাড়ির শোবার ঘরে রেজিস্ট্রি হয়ে গেল জমিটার।মা মিষ্টিমুখ করালো উপস্থিত সকলের।বাবা বিকেলবেলায় আমার হাত ধরে নিয়ে গেল জমি দেখাতে।সামনে একটুকরো লম্বাটে জমি।তারপর টালির একটা ঘর।তার পিছনে পুরো চৌকো একটা জমি।ততদিনে বাঁশ কাটা হয়ে গেছে।শুধু বাঁশঝাড়ের গুঁড়ি পড়ে আছে।এটা আমাদের!কি অবাক যে হলাম!

তারপরটুকু কি ব্যস্ততায়ই না কাটলো!একদিন ভিতপুজো হয়ে গেল।বাঁশের গুঁড়ি তুলে ইয়াবড়ো বড়ো গর্ত খুঁড়ে পিলার জমানো হলো।হেডমিস্ত্রি সদানন্দকাকু গর্বিতস্বরে বললো,”যা পিলার করছি,পঞ্চাশ বছরেও কিস্যু হবে না।”দ্রুত গাঁথনি উঠলো।বাবা রোজ রাতে অফিস থেকে ফিরে এসে জল দিতো সেগুলোয়।সকালে এসে দুরমুশ করতো মেঝে।একটা কালো ডায়রীতে পেন গোঁজা থাকতো।তাতে রোজকার মালমশলা আর মিস্ত্রি খরচের হিসেব মুক্তোর মতো হাতের লেখায় লিখে রাখতো বাবা।রোজ বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে বাড়ি দেখতে আসতাম।বালি-সিমেন্ট-ইট-কাঠের গন্ধ আর বিকেলের গন্ধ মিলেমিশে কিরকম আরাম বোধ হতো।বাবার কাছ থেকে পশ্চিম দিকের ছোট শোবার ঘরটা চেয়ে নিয়েছিলাম।সেই হাফ-ফিনিশড্ ঘরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করতাম,”এটা আমার ঘর!”

দোতলায় ওঠার সিঁড়ি ঢালাই হলো।ল্যান্ডিঙে বিজয়ীর মতো দাঁড়ালাম।আমাদের সিঁড়ি হচ্ছে!আমরাও ছাদে উঠবো!কি অবাক বিষয়!এখানেই একদিন বিকেলে শিঙ্কু আর পিউ এসেছিল।তিনজন বসে গল্প করেছিলাম।পাশের প্লটের তুলোগাছের লম্বাটে ফলগুলো ফেটে গিয়ে ‘বুড়ির চুল’ উড়ছিল বাতাসে।বিকেলশেষের হলদে আলোয় রাঙা রং ধরেছিল।রাস্তায় টুংটাং সাইকেলের বেল্ বাজছিলো।পাশের বাড়ির মহিলা তার বারান্দায় বসে সাতক্ষীরার টানে কাদের সংসারের খবর যেন রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করছিল প্রতিবেশিনীর কাছে।আমি দেখছিলাম,ছাদ ঢালাইয়ের জন্য লোহার শিকের খাঁচা তৈরী করছে মিস্তিরিকাকুরা।

ছাদ ঢালাইয়ের পরই আমরা চলে এসেছিলাম এ বাড়িতে।প্লাস্টারবিহীন ঘরদোর।মেঝে হয়নি।দরজা জানলা হয়নি।ছাদ খোলা।জলের লাইন নেই।মিটার বসেনি ইলেকট্রিকের।পাশের বাড়ির থেকে একটা লাইন টানা হয়েছিল।তাতে সব ঘরগুলোয় শুধু বাল্বের হলদে আলো জ্বলতো।সবটাই আনকোরা।নতুন এবং অসুবিধাজনক।কিন্তু কোনো অসুবিধা বোধ করিনি আমরা কেউ।এক গরাস করে ভাত মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে ইট বার করা দেওয়াল দেখতাম তৃপ্তিভরে।পাটীগণিত করতে করতে একটু হেঁটে নিতাম নিজেদের মেঝেতে।প্রতি সন্ধেতে আয়োজন করে তারা দেখতে উঠতাম ছাদে।মাদুর বিছিয়ে বসে থাকতাম অনেক রাত অবধি।’নিজেদের বাড়ি’ এই শব্দটায় কি তৃপ্তি…কি অহংবোধ…কি গর্ব!

একটা ফ্ল্যাট কিনছি।মাঝে মাঝে যাই সেখানকার কাজ দেখতে।টাইলস্,কুকিং টপ পছন্দ করে জানাই প্রোমোটারকে।টুকটাক সাজেশনও দিই কোন্ অংশটা কিরকম চাইছি সেটা বোঝাতে।লোহালক্কড়-সিমেন্ট-বালি-পুট্টি-পাথরের সেই বিশেষ গন্ধটা আমায় ঘিরে থাকে।মিস্ত্রীরা কাজ করে আমার আশেপাশে।কেউ গুলতানি করে।কেউ দুপুরের খাবার খেয়ে ঝিমোয়।প্রোমোটার এদিকওদিক যায় কাজ দেখতে।আমি ক্ষুদে ফ্ল্যাটটার ভিতরে হেঁটে বেড়াই আর বাবার কথা মনে পড়ে।বাড়ি নিয়ে কি পাগলামিই না ছিল বাবার!প্রতি রবিবার ঝুল ঝাড়া থেকে শুরু করে সবজির বাগান করা,পুঁইমাচা মেরামত করা,শিরীষ কাগজ দিয়ে গ্রীল ঘষে প্রাইমার লাগানো,ছাদের ঘরের মাথায় অ্যাসবেস্টসের ছাদ পিটানো,দরজা জানলায় রং করা…কি না করতো বাবা!অথচ নিজের হাতে গড়া বাড়িতে আমার প্রচন্ড সংসারী আর ঘরকুনো বাবা বছর পাঁচেকের বেশী থাকতে পারেনি।আমি এঘর ওঘর ঘুরে ছোট্ট বারান্দাটায় এসে দাঁড়াই।রাস্তা দিয়ে টো টো চলে যায় হুশ করে।মোড়ের মাথার মাঠটার রেলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে একটা কুকুর ঝিমোয়।আমার আশেপাশে কোথায় যেন বাবা এসে দাঁড়ায়।

Keep reading

More >