কিছু কথা মেঘ, কিছু পাহাড়িয়া

(১) উমিয়াম লেক এর উপর সূর্য পড়ে আসছে তখন।মেঘের ছায়া বুকে নিয়ে শান্ত লেকটার অসাধারণ শিল্যুয়েট স্পর্শ করে এক পশলা …

  • (১)
    উমিয়াম লেক এর উপর সূর্য পড়ে আসছে তখন।মেঘের ছায়া বুকে নিয়ে শান্ত লেকটার অসাধারণ শিল্যুয়েট স্পর্শ করে এক পশলা হাওয়া চুলগুলো এলেমেলো করে গেলো।খেয়াল হলো, অনেকটা সময়ই কেটে গেছে কখন অন্যমনে।পাহাড়ের গায়ে আপনখেয়ালে ফুটে থাকা ক্যালেন্ডুলার হাসি চোখে জড়িয়ে পথ এগোলো সামনে।গৌহাটি পেরোনোর পর থেকেই পাহাড়গুলো সাথে চলা শুরু করেছিলো,পাকদন্ডীর বাঁক,আলো-ছায়া আঁকা রাস্তা, রাস্তার ধারে ফুটে থাকা পরিচিত কাঞ্চন, নাম না জানা বুনোফুল গুলো-একেবারেই অপরিচিতও অবশ্য এখন আর নয় এদের কিছুই,তবু প্রতিবার যেন আলাদা করে বলে জীবনকে আরো কিছু ভালোবাসা দেওয়া উচিৎ।

সেবার রাস্তাটা এর পরে নিয়ে গেছিলো বড়াপানির কাছে একটা রেস্তোরাঁয়। কিছু খাওয়া দাওয়া , বিশ্রামের পর পাহাড়িয়া পথে গন্তব্য-শিলং।

১৮৬৪ সালে ছোট্ট এই গ্রামটিকে খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড় এলাকার নতুন সিভিক স্টেশন হিসেবে ঘোষণা করেন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। বহু বছর ধরে শিলং পূর্ব বাংলা এবং আসামের ” সামার ক্যাপিটাল” ছিলো। ১৮৭৪ এ যখন আসামে চিফ কমিশনারের অফিস আসে, সেই সময় শিলং হল “নিউ ক্যাপিটাল অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন”।মেঘ পাহাড়ের এই শহর বিদেশী মানুষগুলিকে তাদের প্রিয় স্কটল্যান্ডের কথা মনে করিতে দিতো,এ শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ স্থাপত্যগুলি আজও সেই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রবল ক্ষতি হয়ে ছিলো এ শহরের , প্রায় সবই নতুন করে তৈরি করতে হয়েছিলো সেই সময়।১৯৭২ এ নতুন রাজ্য হয় মেঘালয়,তার রাজধানী হয় শিলং।

শহরের প্রাণকেন্দ্র পুলিশ বাজারকে এক পাশে রেখে রাস্তা উঠলো নংথিম্মাই।সরু উঁচাই এক রাস্তার পাশে সবুজ বড় গেটে পৌঁছে হর্ণ বাজতেই খুলে গেলো দরজা। মোরামের রাস্তা আর বিশাল লন নিয়ে সুন্দর বাংলোটা বুঝিয়ে দিলো ছুটির নিমন্ত্রণ যথার্থই।

(২)

নিউ কলোনীর মধ্যে দিয়ে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে খানিক এদিক সেদিক ঘুরে রাস্তা এসে পড়লো লাইতুমখারে। ঝলমলে নভেম্বর দুপুর।রাস্তার পাশে পাশে চলতে থাকা সবুজ পাহাড়, অলস মেজাজে ঘুরে বেড়ানো স্থানীয় মানুষেরা, রঙবাহারি শীতজামায় প্রজাপতির মতো মেয়ের ঝাঁক, স্কুল ড্রেসে পুতুলের মত বাচ্ছাগুলো -সব আছে একইরকম।রাস্তার ধার আলো করে পয়েনসেটিয়া ফুলের জলসা।প্রকৃতি এখানে অকৃপণ,সহজের সাথে সুন্দরের চিরন্তন ছন্দোবন্ধন।

এই রাস্তা ধরেই সেবার আসা মিসেস উইলিয়ামস এর কুকিজ শপ, ডেইজি তে।সদ্য তৈরি হওয়া ব্রাউনি আর ম্যাকারুনের গন্ধে পুরো পাড়াটা ম’ ম’ করছিলো যেন। গন্ধটাই পথ চিনিয়ে নিয়ে গেছিলো।প্রথমবার ঢুকে অবস্থা যেন সেই হ্যান্সেল গ্রেটেলের মতো,কোনটা ছেড়ে কোনটা নেওয়া যায়! ষাটোর্দ্ধা শেরি উইলিয়ামস নিজেই এলেন পরিত্রাণের জন্য,বেছে দিলেন বেশ কিছু কুকিজ, কাপকেক আর অবশ্যই ব্রাউনি।জানালেন কলকাতায় আসেননি কখনো কিন্তু পুত্রবধুটি তাঁর বাঙ্গালী। প্রায় চল্লিশ বছর হতে চলা এই দোকানটি শেরির মায়ের ছিলো। আগামীদিনে তাঁর এম বি এ করা কন্যা এই দোকান দেখবে কিনা তাই নিয়ে কিছু বিষাদের মেঘ জমলো চশমার কাঁচে,চলেও গেল পলকেই,”ভিজিট এগেইন…গড ব্লেস ইউ…”

মিসেস উইলিয়ামসের মতো অনেক মহিলাই এখানে ছোটো বড় বিভিন্ন দোকান ব্যবসা চালান।মাতৃতান্ত্রিক এখানকার সমাজে মহিলারাই বেশি পরিশ্রমী।শারীরিক শক্তিতেও পুরুষের তুলনায় একটুও কম যান না তাঁরা।ধাপ ধাপ সিঁড়ি রাস্তা দিয়ে ভারি বস্তা, জলের বালতি নিয়ে এঁদের অনায়াস চলাচল সমতলে থাকা চোখে অবাকই লাগে।

বাংলোতে ফিরে প্রি লাঞ্চ কফির সাথে ব্রাউনির স্বাদ হঠাৎই ভেসে এলো যেন। সম্বিত ফিরে পেতে মনে হলো থেমে থাকলে চলবে না তো,অনেক অনেক স্মৃতি ছুঁয়ে দেখা এখনো বাকি যে।বেলাশেষের আলসেমি মাখছে পাহাড়ি শহর।কার প্যাস্টেল উপচে যাওয়া অরিওলিনে ধুয়ে যাচ্ছে ওপর নিচের আঁকা বাঁকা সব পথগুলো।

(৩)

সংক্ষিপ্ত আকাশ যাত্রা প্রায় নীরবেই কেটে গেলো মেঘ মেঘ আর মেঘ দেখে।তখনো যেন ঠিক বোঝা যাচ্ছিলো না কোন দিন অপেক্ষা করছে সামনে। নামার পর শিলং এর পথে যখন সঙ্গী হলো সবুজ পাহাড় আর ঝিলিমিলি রোদ্দুর, ভালোলাগা চুঁইয়ে আসতে লাগলো পথের সাথে চলা তিরতিরি নদীটার মতো।

নংথিম্মাই, মূল শহর থেকে একটু দূরে এই শান্ত এলাকায় রয়েছে রাজীব গান্ধী ইন্ডিয়ান ইন্সটিট্যুট অফ মানেজমেন্ট বা আই আই এম, শিলং। সারাদেশের আই আই এম গুলির মধ্যে এটি সপ্তম। শিলং শহরে ছড়ানো আরো অনেক প্রাচীন ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে এটিও এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

সুন্দর লনটা পেরিয়ে আঙ্গুরলতায় ঢাকা পর্চে গাড়িটা যখন থেমেছিলো , ঘড়িতে প্রায় ৬টা।অন্ধকার হয়ে গেছে বেশ, ঠান্ডাও লাগছিলো খুব। ভিতরে ঢুকে প্রথম দৃষ্টিপাতেই মনে হলো এক বাড়ি নির্জনতা, নাগরিক জীবন যাকে ভুলতে বসেছে।পা ডুবে যাওয়া কার্পেট, কিউরিও আর অ্যান্টিক আসবাবে সাজানো বাংলোটির সর্বত্র পরিমিত রুচি ও সৌন্দর্য্যবোধ চোখে পড়তে বাধ্য। এই বাংলোটির মালকিন, মিসেস বড়ুয়া নিজের হাতে সমস্ত দেখাশোনা করেন। ঘরের উষ্ণ আবহাওয়া চোখ টানলো প্রথমেই কোণার ফায়ারপ্লেস এ।বেতের ছিমছাম আসবাবে পরিচ্ছন্ন ঘরটির আন্তরিক আরাম পথশ্রমের ক্লান্তি যেন ভুলিয়ে দিলো। এ উষ্ণতা, এ নির্জনতার বড় দরকার ছিলো।ফ্রেশ হয়ে বাইরে বেরোতেই সারল্য ভরা একটা মুখ, প্রদীপ কলিতা, এখানকার কেয়ারটেকার কাম ম্যানেজার।কিছু বলার আগেই কফির গন্ধ স্নায়ুগুলোকে টান টান করে দিলো। লিভিং রুম ঘুরে দেখতে গিয়ে চোখে পড়ল কালো আবলুস কাঠের কারুকাজ করা দেওয়াল আলমারি, ছোটো বড় টেবিল, অনেক পুরোনো ক্রকারিজ আর একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো।রাতের সাথে সাথে ক্লান্তিও নেমে আসছিলো, তাই খাওয়া দাওয়ার পর্ব তাড়াতাড়িই সেরে ফায়ারপ্লেসের উষ্ণতার সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিতেই যেন এক লহমায় ভোর হয়ে গেলো।

এযাবৎ কালের জীবনে অমন সুন্দর ভোর খুব কমই দেখেছিলাম।সারি সারি পাইনের ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যরশ্মিতে ভিজে যাচ্ছে লনের সবুজ ঘাস,অত্যন্ত যত্নে তৈরি করা বাগান ভরে ফুটে আছে নানান রঙের অ্যাজালিয়া, পপি, গোলাপ , আরও কত হাসিমুখ। আর সেই আশ্চর্য্য সুন্দর গোলাপি ফুলগুলো, কলিতাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম স্থানীয় নামে একে বলে ধূপ।পরে জেনেছি এগুলি হলো ওয়াইল্ড হিমালয়ান চেরি। উতরোল হাওয়ার সাথে বাগানময় উড়ে বেড়াচ্ছে সেই ড্রিমফ্লাওয়ার , তার পাপড়ি, রেণু। অজস্র টুনটুনির প্রবল ব্যস্ততা উঁচু উঁচু গাছগুলির মাথায়। পরিষ্কার আকাশে সুখস্বপ্নের মত হালকা সাদা মেঘ।চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। এই আলো আকাশের আনন্দগান জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে নেওয়ার অদম্য ইচ্ছা কথাহীন করে রাখলো অনেকটা সময় জুড়ে। তারপর কিছু অলস পায়চারির শেষে রোদ ধোয়ানো বারান্দায় ব্রেকফাস্ট করতে করতে আমাদের ঘড়ির কাঁটা লাঞ্ছিত জীবনকে অনেক দূরের মনে হচ্ছিলো।

সামনের কয়েকটা দিন… খুব ভালোলাগার, নিরবিচ্ছিন্ন উদযাপনের দিন ।

( ৪)
পুলিশ বাজার থেকে স্টেট ব্যাঙ্কের রাস্তায় যেতে চারপাশে জ্যাকারান্ডার উৎসব লেগেছে যেন। সঙ্গতে আছে গোলাপি কোরাল শাওয়ার।ফুলের ভারে পাতারা হারিয়ে গেছে। ফুল আর স্মৃতির নেশায় বুঁদ হয়ে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল হলো রাস্তা ভুল হয়ে গেছে। সে যাক, আসলে যাওয়ার কথা তো ছিলোনা কোথাওই।
হইচই জমজমাট পুলিশ বাজার।এক নজর চোখ বোলালেই দেখা যাবে ৬০ শতাংশ ট্যুরিস্টই বাঙালি।জমিয়ে কেনাকাটা চলছে, অফ সিজনে সস্তা দামে পাওয়া চাদর,বাঁশ-বেতের ঘর সাজানোর জিনিস, গৃহস্থালির টুকিটাকি।এক পাশে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে খুব ডাকাডাকি, ” শিলং পিক, সোহরা, চেরাপুঞ্জী”।

শিলং পিক-মূল শহর থেকে ১০কিমি দূরে প্রায় ১৯৬৫মি উঁচু এই জায়গা নিঃসন্দেহে শহরের আসল আকর্ষণ। লাগোয়া এলাকা জুড়ে এয়ারফোর্সের সাজানো গোছানো বেস ক্যাম্প। পরিচ্ছন্ন রাস্তাগুলির দুইপাশে প্রচুর গাছ। স্নিগ্ধ সাদা হাইড্রেঞ্জিয়া আর প্রাণবন্ত ইয়েলো ট্র্যাম্পেট এর মিলমিশে চোখের আরাম অপরিসীম।

বেড়াতে যাবো বলাতে কলিতা ডেকে দিলো ট্যাক্সি। ড্রাইভারটি নিতান্তই তরুণ স্বল্পভাষী, নাম রাজীব ডেকা। সে অনেক কিছুই দেখালো- এলিফ্যান্ট ফলস, লেডি হায়দরি পার্ক, ওয়ার্ড লেক, কিন্তু ঠিক মন মতো হচ্ছিলো না যেন। সব শেষে চলা শুরু শিলং পিক এর দিকে। শুরু অসামান্য পথের পাঁচালী, শেষের কবিতায় পড়া শিলং পাহাড়। খুব ভালোলাগা দুটি চরিত্রের প্রথম দেখা ওরকমই কোনো একটা পাহাড়ী বাঁকে, তারপর ওই আদ্যন্ত রোমান্টিক গল্প কথা যা কিনা বছরের পর বছর ধরে প্রেমের ভাষায় শব্দ জুগিয়ে গেছে।
যাওয়া আসার পথে চোখে পড়ছিলো রাস্তার ধারের কালভার্টগুলো। অপ্রশস্ত আঁকা বাঁকা রাস্তা, একধারে ঢালু খাতে পাইনের জঙ্গল, রাস্তার পাশে শ্যাওলার চাদরমোড়ানো পুরোনো কালভার্ট, আশেপাশে ফার্ণের ঝোপঝাড়। এক একটাকে দেখে মনে হচ্ছিলো কতদিন সেগুলোতে কেউ বসেনি। হয়তো কোনো একসময় কোনো তীব্র প্রেমের সাক্ষী ছিলো ওরা, কোনো উদাস সন্ধেবেলা ওখানে বসে দূরে মেঘ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কেউ মনে করেছে তার প্রিয় মানুষকে। দুপুরের ঝলমলে রোদ্দুর মেখে হুটোপাটি করে খেলা করেছে বাচ্ছার দল, তাদের মায়েরা বসে গল্প করেছে। আমার খুব ইচ্ছে করছিলো ওখানে বসি, পায়ে হেঁটে নামি ঢালু বনপথ বেয়ে। ওই ইচ্ছেটুকু জমিয়ে রেখে সে পথ পেরিয়ে যেখানে এলাম, সেখানে সব কথা থেমে যায়। কথা বলবার জায়গা সে নয়, দৃষ্টি দিয়ে নিবিড়় ভাবে ছুঁয়ে থাকার জায়গা। শেষবেলার সোনারং এর রোদ্দুরে উদ্ভাসিত শহরের ছবি। পেছনে ঢেউএর মতো পাহাড়ের সারি। পুরো শহরটা দেখা যাচ্ছে নিচে আর ওপরে মেঘের বসত। কিন্তু সেদিন হাতে সময় ছিলো অপ্রতুল। বিকেল ৫টা বেজে গেলে এয়ারফোর্সের নিয়মে আস্তে আস্তে ফেরার পথ ধরতে হয়। ওয়াচ টাওয়ার থেকে আসতেই সুগন্ধে খিদে যেন চনমন করে উঠলো। অসাধারণ স্বাদের বাঁধাকপির পকোড়া না খেলে ওখানে বিকেল জমবেই না।

পরদিন বেলা কেটেছিলো বাংলোতেই। ঠিকই ছিলো সূর্যাস্ত দেখবো শিলং পিক থেকে। কিন্তু বেরোনোর সময় থেকেই আকাশ মেঘলা, মনখারাপই লাগছিলো। কিন্তু আন্দাজই ছিলো না কী বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে। মেঘ মেঘ আর মেঘ- ধোঁয়ার চাদরের মতো মেঘ আশপাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে অলস ভাবে। ঢেকে যাচ্ছে পাইনের মাথাগুলো, নীচের খাতের গাছপালাগুলো। একটু দূরের মানুষগুলোকেও আবছা লাগছে। মেঘ ডুবানো কফি খেয়ে নিজেকে উষ্ণ করছিলাম। তারপর উপরে যখন গেলাম, কথা হারালো আবারও। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে মেঘের উড়ান চলেছে, ঢালু গা বেয়ে বেয়ে হামাগুঁড়ি দিয়ে মেঘ উঠছে আর থেকে থেকে কনকনে বাতাস। আচমকা একদিকে মেঘ সরিয়ে সূর্য উঁকি দিলো, ঝলমলিয়ে উঠলো মেঘছেঁড়া আলো। কোথা থেকে যেন খবর হয়ে গেলো, আবার ছুটে এলো মেঘের দল। আকাশ আর দিগন্তলীন পাহাড়ের প্রেক্ষাপটে সে যেন এক খেলা শুরু হয়েছিলো প্রকৃতির আপন খেয়ালে। পরম সৌভাগ্যে তার সাক্ষী হয়ে রইলাম যেন। এবারে আমি অনেকবারই ভেবেছি , ইশ আমার যদি একটা ভালো ক্যামেরা থাকতো! কিন্তু সেদিন ওই মুহুর্তে মনে হচ্ছিলো ক্যামেরার সাধ্য কোথায় এই সৌন্দর্য্য ধরে রাখার!! ঠিক যেইরকম ভালোলাগার আবেশ নিয়ে ছবিটা মনের মধ্যে গেঁথে রইলো, সে সংরাগ কোন ক্যামেরার চোখে ধরা পড়তো!
আস্তে আস্তে থালার মতো চাঁদ উঠলো পাহাড়ের ওপারে। মেঘভেজা বাতাস পাইনপাতার গন্ধ নিয়ে এলো। ফেরার পথে অন্ধকার হয়ে এলো, ভালো লাগছিলো ওই অন্ধকার, আবার টের পাচ্ছিলাম একটা মনখারাপের মেঘ একই রকম ভাবে ছেয়ে ফেলছিলো।সময়ের শেষটা এগিয়ে আসছিলো।

(৫)

মোবাইলের তীব্র শব্দটা ভাবনার মেঘকুয়াশা থেকে হিঁচড়ে টেনে আনলো যেন। তার সঙ্গে অট্টহাসি, উল্লাস। বিরক্তি চেপে নিয়ে চোখ ঘুরলো নিচে বিছিয়ে থাকা শহরে,জড়িমড়ি করে থাকা পথগুলোকে ওপর থেকে দেখতে ভারি ভালো লাগে।

এমনি কত রাস্তা আছে,ক্লান্ত এবং ভ্রষ্ট
স্থির কিছু তার আছেও আবার, কিছু অনির্দিষ্ট
পথের শেষে পথের শুরু, চলার পরে চলা
ফুরিয়ে ফেলা গল্প কিছু নতুন করে বলা


ভোর ভোর উঠে ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। বাইরে থেকে শনশন হাওয়ার শব্দ আসছিলো, মনে হচ্ছিলো প্রবল ঝড় বৃষ্টি বুঝি। চিন্তা হচ্ছিলো, এতটা পথ যাওয়া। কিন্তু দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েই হতবাক!! নরম মিষ্টি আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারধার, কাচের মতো নীল আকাশটা, তীব্র অথচ মিষ্টি বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে ওই গোলাপিফুলগুলো- কী অসাধারণ সকাল!! হাতে থাকা আর বাকি সময়টুকুতে আবার শেষবারের মতো প্রাণে ভরে নেওয়া ওই সকালের আবেশকে, যা অনেক অনেক দিনের সঞ্চয় হয়ে থাকলো। ফেরার পথে ওই তিরতিরে নদী সাথে চললো আবার যাওয়ার। চলতে চলতে আবার সেই উমিয়াম- এবার আবার অন্য রূপ। নীল আকাশের প্রতিবিম্ব বুকে নিয়ে সকালে আলোয় ভাস্বর। আবার সেই ক্যালেন্ডুলার বাঁধনভাঙ্গা হাসি।

আবার পথের শুরু ছুটি শেষের দিকে….

……
প্রতিটা পথেরই কিছু যাত্রা থাকে মনে হয়। গন্তব্যের চাপ সকলের থাকে না, থাকা উচিতও নয়। এই পাইনবনের বুক চিরে ফার্নের ওড়না মুড়ে যে রাস্তাগুলো এদিক ওদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে চলে যাচ্ছে, তার যেগুলো খাদের দিকে নেমেছে ক্রমশঃ, সে পথের শেষে কার গন্তব্য অপেক্ষমান?!

এ পাহাড়িয়া গল্প যাঁরা ধৈর্য্য ধরে পড়লেন তাঁরা হয়তো বুঝলেন এ এক পথ মেলার গল্প। এ এক হারানো পথেরও গল্প। কিন্তু পথ কি হারায়? হারায় মানুষ- ঠিকানা, দিশা, নিয়ন্ত্রণ। দিনের পর দিন একই ভাবে থেকে যায় এই পাইনবন, এই পাহাড়ের লহর, পথের পাশের ফুল ফুল হাসি। মেঘভেজা বাতাসে যেন কার কান্না কোনো পিয়াসি চোখের সন্ধান করে যায়। কুয়াশার চাদরে ঢাকে সান্ধ্য পাহাড়তলী-

চিরতরে থেমে থাকা গাড়িটার উইং মিররে ধীরে ধীরে চাঁদ ভেসে ওঠে…

Keep reading

More >