কুক কেলভির ঘড়ি শেষপর্ব

#কুক_কেলভির_ঘড়ি শেষপর্ব ভীম একটু রাত করেই ফিরল। মুখে চিন্তার ছাপ। সবাই উদগ্রীব হয়ে ওর প্রতীক্ষা করছিল। ভীমের মুখ দেখে পরাণ …

#কুক_কেলভির_ঘড়ি শেষপর্ব

ভীম একটু রাত করেই ফিরল। মুখে চিন্তার ছাপ। সবাই উদগ্রীব হয়ে ওর প্রতীক্ষা করছিল। ভীমের মুখ দেখে পরাণ বললেন” কিরে, মুককানা অমন ভেটকে আচিস ক্যানো? সায়েবের মেটাই পচন্দ হয়নিকো?
“পচন্দ হবে নি ক্যানো, বেজায় পচন্দ হয়েচে। আমি তো দাঁইড়ে থেকে খাইয়ে এলুম। হাবড়ে হাবড়ে খেলে সব।“
“তাহলে লাট সাহেবের বাড়িটে ধরা যাবে বলচিস?”
“আগে তো ফাগুনের পোঁয়ারোটা পার করি, তাপ্পর বাড়ি ধরা।“
“ ফাগুনের পোঁয়ারো, সিদিন কি? কি হয়েচে খোলসা করে বল দেনি?”
“হয়েচে কি ঠিক আটটায় লাটসায়েবরা খেতে বসল। নটার সময় আমার ডাক পড়ল। কিনা দাঁইড়ে থেকে মেটাইয়ের সম্পক্কে বলে বলে দিতে হবে। তা দেলুম। একখান করে পাতে পড়ে আর আমি বুইজ্জে দি কোনটা কি। তাপ্পর হল কি, খেয়েদেয়ে হাত ধুয়ে সায়েব আমায় কাচে ডাকলে। বলে কিনা তোমার মেটাই খেয়ে খুব ভাল নেগেচে, এমন একখান মেটাই বাইনে দাও য্যা গোটা কলকাতায় কোথাও পাওয়া যাবেনে কো। মার্চ মাসের শেষদিন, মানে আপনার ফাগুনের পোঁয়ারো, মেমসায়েবের জন্মদিন। ওদিন লাটবারিতে দুশো লোক খাবেদাবে। লাটসায়েব ওইদিন সবাইকে নতুন মেটাই খাওয়াবে। কি বেপদ বলুন দিনি, হাতে আর দুটো গোটা হপ্তাও নেই। ওদিকে আমি আবার হ্যাঁ করে দেচি।“
“বাপধন, তোকে আজ দেকচি নে। পারলে তুইই পারবি। আর পারবি নাই না ক্যানো। অমেত্ত কলস দি‍য়ে চন্নগরকে কাত করে দিলি, আর একখান নতুন মেটাই লাটসায়েবের সামনে ধত্তি পরবি নে?”
“আজ্ঞে সন্নেশ হলি তো এতখানি ভাবতে হোত নেকো। সায়েবদের খাওয়ার সময় নক্ক করেচি ওরা সন্নেশের চাইতে রসের মালটাই বেশি পচন্দ করচে। রসের মদ্যি কিচু করতে হবে। এক কাজ করলি হয় বাবা, পচ্চিমারা যেমন গুলাব জামুন বানায় খোয়া, ময়দা এলাচ দিয়ে ঘিয়ে ভেজে; তেমনি করে করব। ময়দার যায়গায় ছ্যানা দেব আর ওদের মত মেওয়াতি করব না। গুলাবজামুনের ভেতরটা কেমন থসথসে। আমি খেয়েছি, ভাল নাগে নি কো।“
“কইরে দ্যাক। কাল লক্ষীবার, মায়ের নাম নে কালকেই নেগে পড়।“
“তাই হোক। ছোট আকাটা সকালে এট্টু নিক্কে নোব।“

পরেরদিন দুপুরে ভীম তার ভাবনামত মিষ্টি তৈরির তোড়জোড় করছে এমন সময় পরাণকে আসতে দেখে একটু চমকে গেল।পরাণ দুপুরে বাড়িতে খেতে যান, একবারে সন্ধেয় আসেন। ভীম অবাক হলেও বুকে একটু বলও পেল। রসের মালে সে সন্দেশের মতো স্বচ্ছন্দ নয়,পরাণ অভিজ্ঞ কারিগর, তিনি পাশে থাকলে সুবিধা হয় বইকি।
পরাণ এসেই একটা যোগাড়েকে হুকুম দিলেন,” ছোট কড়ায় সোয়া দুসের দুধ চাপা।“ তারপর খোয়ার তাড়ুটা তুলে নিলেন। ছেলেরা একটু আপত্তি করল, কিন্তু তিনি কোন কথা শুনলেন না। নতুনবাজারের কেনা খোয়া নয়। ভীম যে মিষ্টিটা বানাবে তার জন্য তিনি আজ নিজের হাতে দুধ মেরে খোয়া বানাবেন।
বাবা ছেলে লেগে পড়লেন। পরাণ উনুনে, ভীম পাটায়। নিজের হাতে ছানা বাটতে লাগল সে। এক ভাই আর একটা উনুনে রস চাপিয়ে দিয়েছে।

খোয়া হতে হতে ভীমের ছানা বাটা হয়ে গেছে। খোয়া ঠান্ডা হলে সে সাড়ে চার আধ ভাগে ছানা আর খোয়া মেশাল। তাতে এলাচ গুঁড়ো দিল, আর সামান্য সালটু। ওতে মাল খরা খরা হবে, গুলাবজামুনের মত নেতিয়ে যাবে না।
পরাণ হাত দিয়ে মিশ্রণটার ঘনত্ব পরীক্ষা করলেন,” ঠিকই লাগছে। এবার গোল্লা পাক্যে নে। সদা ঘি চাপা।“
চন্দননগরের বিশু গোয়ালার ঘিয়ের গন্ধে কারখানা ভুরভুর করে উঠল। পরাণ বারকোশখান তুলে ধরলেন, ভীম প্রথমে উনুনে ব্রহ্মার লেচি ফেলল, তারপর বারকোশ থেকে একগন্ডা করে মাল তুলে কড়ায় ছাড়ল,” জয় মা।“ তারপর সাবধানে নাড়তে লাগল।
ধীরে ধীরে ছানার গোল্লাগুলোয় লালচে রঙ ধরল। রঙ একটু গাঢ় হলে ভীম কড়াখানা নামিয়ে নিল। ওদিকে দেড় তারের রস তৈরি। ভীম সাবধানে ছানতা দিয়ে কড়া থেকে গুলিগুলো তুলে নিয়ে রসে ফেলল। এবার আধ ঘন্টার অপেক্ষা, তারপরই ফলাফল জানা যাবে।

আধ ঘন্টা পরে যখন ভীম রস থেকে মিষ্টি তুলে একখানা শানকিতে সাজাচ্ছে, তখন পুরো দোকান কারখানা ঘরে জড়ো হয়েছে।
পরের মিনিটদশেক কারখানা ঘরে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। যোগাড়েরা ভীমকে কাঁধে তুলে ধেই ধেই নাচছে, বলরাম ভীমের পায়ের ধুলো নেবে বলে পা খুঁজে বেড়াচ্ছে, ভীম চেঁচাচ্ছে,” ও বলাদাদা, তুমি বাউন; আমর পাপ নাগবে গো।“ পরাণ মিঠাইয়ের শানকি হাতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, সহদেব ডিগবাজি খাচ্ছে।
ভীম গোল্লা পাকানোর সময় প্রতিটা গোল্লায় একটা করে বড়ো এলাচের দানা দিয়েছিল। মিষ্টি কামড়ালে কুট করে দাঁতে লাগছে, আর এলাচের খোশবাইতে মুখ ভরে যাচ্ছে।
সবাই ঠান্ডা হলে পরাণ বললেন,” বাকিগুলো কড়ায় থাক। আর এট্টু রস ঢুকুক। সন্দেবেলা নাটসায়েবের বাড়ি নে যাবি। দেখ সায়েবের পচন্দ হয় কিনা। তবে যা মাল বাইনেচিস,মনে হয় না সায়েবের অপচন্দ হবে। দেকা যাক।“
ভীম আজও রাত করে ফিরল। আজ তার মুখ ঝলমল করছে। পরাণ বললেন,” মুককানা দেইকে তো মনে হচ্চে সায়েব তোর মেটাই পচন্দ করেছে। কিরে ঠিক বলিচি?”
“ভীম হেসে বলল,” যা কইচেন। সায়েব মেমসায়েব মুকে দে একবারে নাপ্পে উটেচে। সায়েব আমার পিট চাপড়ে দে কইল ব্রাভো; আর একবারে দু ঘান মালের বায়না দে দেল। শ দুই নোক খাবে তো। জানেন বাবা, এক কান্ড হয়েচে। সায়েব আমায় মেটাইয়ের নাম জিগগ্যেস কল্লে; তা আমার মাতায় ধাঁ কইরে বুদ্দি খেলে গেল। আমি বন্নু এজ্ঞে যেনার খাতিরের মেটাই, ওনার নামে নাম।“
“কি নাম বল্লি সায়েবকে?”
“লেডি কেনিং।“

মাসছয়েক পর একদিন এক সাহেব দোকানে এলেন,” বাবু, তোমার তৈরি নতুন মিষ্টি খেতে এলাম।“

ভীম ও পরাণ তাঁকে অভ্যর্থনা করে শানকিতে করে কয়েকটা লেডি ক্যানিং তাঁর হাতে তুলে দিলেন। মুখে মুখে এই মিষ্টির নাম হয়ে গেছে লেডিকেনি।
সাহেব আটটা লেডিকেনি খেলেন তারপর দুটো কড়াপাক চাইলেন। ভীম নিজের হাতে কড়াপাক এনে দিল।
সাহেব বললেন,” বাবু, তোমার দোকানে একটাও ঘড়ি নেই কেন?”
ভীম নিজের ট্যাঁকঘড়ি দেখিয়ে বলল,”এটা আছে। বড়ো ঘড়ি কার জন্য কিনব? কেউ তো ইংরিজি লেখা পড়তে পারে না। বাংলায় হলে তাও কথা ছিল।”
সাহেবের ভুরু কুঁচকে গেল,” বাংলা লেখা? ওয়াল ক্লকে বাংলা? ঠিক আছে বাবু, এ চ্যালেঞ্জ আমি নিলাম। তোমার পকেট ওয়াচে যা যা লেখা আছে আমাকে বাংলা হরফে লিখে দাও।“
ভীম বলল,”আপনার নামটা জানতে পারি?”
সাহেব মুচকি হেসে বললেন,” জেমস কুক, কুক অ্যানড কেলভির কুক।“

১৮৫৮ সালেই বিলেত থেকে তৈরি হয়ে এসেছিল ওই ঘড়ি। ওয়ালনাট কাঠের খোল,কালো আবলুস রঙ। এক থেকে বারো সংখ্যা, কুক কেলভী, তার নিচে লন্ডন সব বাংলা হরফে লেখা।এক থেকে এগারো কালো রঙে লেখা, বারোর রঙ লাল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হরফগুলো লিখেছিলেন একজন সাহেব আর্টিস্ট, যিনি একবর্ণ বাংলা জানতেন না।ঘড়ি দেখে গোটা কলকাতার চক্ষু চড়ক গাছ। এ রকম বাংলা হরফে লেখা ওয়াল ক্লক কলকাতায় সম্ভবত এক খানাই আছে।
মুগ্ধ হয়ে শুনছিল শর্মিষ্ঠা, আজ খবরের সাংবাদিকা। বুমটা এগিয়ে দিয়ে বলল তাহলে আজ ২০১৮, এ ঘড়ির বয়েস একশো ষাট।
ঘড়ি বলল,” টং-টং-টং। “
==============================================

Keep reading

More >